দুঃসময়ে চাপে ভাড়াটিয়া

প্রকাশিত: ৯:৪৭ পূর্বাহ্ণ , জুলাই ৫, ২০২০

করোনাকালে অর্থনৈতিক সংকটে কেউ চলে যাচ্ছেন গ্রামের বাড়ি। কেউ আবার বড় বাসা ছেড়ে উঠছেন সেমিপাকা ঘরে। ‘টু লেট’ ঝুলছে এখানে-সেখানে। আর যারা জীবন ও জীবিকার সমন্বয় ঘটিয়ে টিকে থাকার চেষ্টায় নগরীতে রয়ে গেছেন, সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সেই ভাড়াটিয়ারা। মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত সকলেরই একই দশা। বাড়িওয়ালাদের চাপে তারা দিশেহারা। একের পর এক অভিযোগ জমা পড়ছে প্রশাসনের কাছে। বিভিন্ন সংগঠন বাড়ি ভাড়া কমানোর দাবিতে সোচ্চার রয়েছে।
অবশ্য বাড়িওয়ালাদের কেউ কেউ বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, অনেকেরই জীবন-জীবিকা এই ভাড়া। ভাড়া না পেয়ে অনেকে কষ্টে দিন পার করছেন। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদগণ এই সংকটে উভয় পক্ষ যেন স্বস্তিতে থাকে তেমন কোনো সমঝোতায় আসার পক্ষে মতামত পোষণ করেন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জরিপ মতে, নগরীতে বসবাসরতদের মধ্যে ৯০ শতাংশই ভাড়াটিয়া। অভিযোগ উঠছে, করোনার কারণে কর্মক্ষেত্রে বেতনের টাকা নিয়ে চলছে টানাপোড়েন। যাদের কাছে জমা টাকা ছিল তা-ও শেষ হওয়ার উপক্রম। অনেকেরই সংসার চালানো দায় হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এসব সমস্যার মধ্যে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে বাড়ি ভাড়া। নগরীর বেশিরভাগ পাড়া-মহল্লার ভাড়াটিয়াদের ভাড়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন বাড়ির মালিকরা। অনেককে বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার জন্যও বলছেন বলে পাঁচলাইশ এলাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করা এক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন।
নগরীর ডবলমুরিং থানা এলাকার বাসিন্দা মো. আলমগীর আজাদীকে বলেন, বাসা ভাড়ার নিয়ম হলো এই মাসের ভাড়া পরের মাসে ৫ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে দিতে হয়। আমি যে বাসায় ভাড়া থাকি তার বাড়িওয়ালা গত মাস থেকেই বলে আসছেন চলতি মাসের ভাড়া সেই মাসের ৩০ তারিখের মধ্যে দিতে হবে। অন্যান্য ভাড়াটিয়া বাড়িওয়ালার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। আমি এখনো মানিনি। তিনি বলেন, বাড়িওয়ালা গত মাসে তার কাছে ৩ বার ভাড়া চেয়েছেন। এ মাসেও রাগারাগি করেন। কিন্তু কী করব ভাই, হাতে তো এখন টাকা নেই। নিউ মনসুরাবাদের আরেক বাসিন্দা বলেন, বাড়িওয়ালা আমাকে বাসা ছেড়ে দিতে বলেছেন। বিষয়টি আমি স্থানীয়ভাবে সমাধান করলেও ভয়ে থাকি, কখন না আবার বাসা ছেড়ে দিতে বলে। বাসায় থাকা নিয়ে সমস্যা হতে পারে এই ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা তো আর ইচ্ছা করে ভাড়া ধরে রাখি না। করোনার কারণে সংকট চলছে। মানবিক হয়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু বাড়িওয়ালারা কী করছেন? তাদের ভাড়া চাই। এ কারণে প্রশাসনের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা। এদিকে ‘ভর্তুকি দিয়ে বাড়ি ভাড়া অর্ধেক করার জন্য’ গত ১৭ এপ্রিল প্রেস ক্লাবের সামনে নতুনধারা বাংলাদেশ (এনডিবি) নামে একটি সংগঠন প্রতীকী অনশন করেছে। সংগঠনটির চেয়ারম্যান মোমিন মেহেদী বলেছেন, দুর্নীতি-চুরি থামিয়ে আমজনতার কথা ভেবে ভর্তুকি দিয়ে বাড়ি ভাড়া অর্ধেক করুন। জনগণের ভোগান্তি কমান।
করোনার কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাড়ি ভাড়া মওকুফের দাবি জানিয়ে দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলন, ফিউচার অফ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সংবাদপত্রে বিবৃতি প্রদান করা হয়েছে। বিবৃতিতে তারা বলেন, করোনার কারণে স্বল্পআয়ের মানুষ কোনো কাজকর্ম করতে পারছে না। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। যে শ্রমিকরা দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করতেন তারা বেকার হয়ে পড়েছেন। এরই মধ্যে দেখা দিয়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে জনগণকে রেহাই দিতে ভাড়াসহ বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও ট্যাঙ মওকুফের জন্য নির্বাহী আদেশ জারির দাবিও জানান তারা।
এদিকে এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামসহ সারা দেশের ভাড়াটিয়াদের বাসা ভাড়া, দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিলসহ সব ধরনের ইউটিলিটি বিল মওকুফের দাবি জানিয়েছে ভাড়াটিয়া পরিষদ। ভাড়াটিয়া পরিষদের সভাপতি মো. বাহারানে সুলতান বাহার ও সাধারণ সম্পাদক খাতুনে জান্নাত ফাতেমা খানম যৌথ বিবৃতিতে এ দাবি জানান।
করোনার সংকটকালে বাড়ি ভাড়া নিয়ে বাড়িওয়ালা আর ভাড়াটিয়াদের মধ্যকার এই সংকট নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। কেননা ভাড়াটিয়ারা যেমন চাপের মুখে থাকেন তেমনি অনেক বাড়ির মালিকের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে বাড়ি ভাড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থ থেকে। দুর্যোগপূর্ণ এই সময়ে সংকট কাটাতে অর্থনীতির চাকা সচল করার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে সমঝোতার ভিত্তিতে সংকট সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। কেউ যেন কারো প্রতি অমানবিক না হয়। এমন পরিস্থিতিতে সাময়িক সময়ের জন্য কম ভাড়া দেয়ার ব্যাপারে বাড়ির মালিক ও ভাড়াটেরা সমঝোতা করতে পারেন কিংবা একই বাড়িতে দুটি পরিবার একসাথে থাকতে পারেন বলে পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ নাজনিন আহমেদ। আজাদী