গণমাধ্যম ও জনসম্পৃক্ততা – মইনুদ্দীন কাদেরী শওক

প্রকাশিত: ৮:৫৫ অপরাহ্ণ , অক্টোবর ১৮, ২০২১
পাঁচ দশক ধরে সাংবাদিকতার সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও পুরাপুরি লেখক হতে পারিনি। জীবনের প্রথম দিকে বেশীর ভাগ সময় রিপোর্টার হিসেবে মাঠে-ময়দানে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনের মত-অভিমত নিয়ে গণমাধ্যম আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস।
আমাদের সমাজে ঐতিহাসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারণে জনগণ দু’টি সমান ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে আছে জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, যারা উৎপাদনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। অন্যদিকে আছে জনগণের ক্ষুদ্রতর অংশ যারা উৎপাদন থেকে হয় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয় উৎপাদনের সঙ্গে ক্ষীণ সূত্রে পরোক্ষভাবে জড়িত। মূল সংকট সৃষ্টি হয়েছে এই জন্যে যে, সেই উৎপাদন-বিচ্ছিন্ন মুষ্টিমেয় অংশের হাতেই সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। ফলশ্রুতি দাঁড়িয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মূল উৎপাদক জনগণের উপর এই গোষ্ঠী প্রায় শাসন-শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা চালানো সম্ভব হচ্ছে জনগণের বৃহদাংশের দেশের সকল কর্মকা- থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবার ফলশ্রুতিতে। এই বিচ্ছিন্নতা জনগণের মূল অংশকে নিষ্পেষণই করছে না, পুরো জাতির অগ্রগতির ধারাতেই বার বার গ্যাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নতার পেছনে মূল যে শক্তিটি কাজ করছে সেটি হল অশিক্ষা এবং এই অশিক্ষা ও বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করছে বিরাট জনগণের মধ্যে অসচেতনতা যা কখনো পরোক্ষ কখনো প্রত্যক্ষভাবে জাতীয় অস্তিত্বকে দুর্বল করে দিচ্ছে বা দিতে পারে। একটি কথা এ প্রসঙ্গে স্নর্তব্য যে, যে কোন সরকার জনগণের কি না তা বোঝা যায় সে সরকার জনগণকে সচেতন করবার জন্যে কতটুকু সচেষ্ট রয়েছে তার উপর। কোন সরকার যদি জনগণকে সচেতন করা থেকে দূরে থেকে বহু বুহ সদিচ্ছার কথা বলতে থাকে তবুও আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি সে সরকার জনগণের নয়। জনগণকে সচেতন করলে জনগণ যেমন দেশের প্রতিটি স্তরে-কার্যক্রমে নিজকে নিবেদিত করতে পারে সর্বতোভাবে, দেশের সকল প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে তেমনি সর্বশক্তি নিয়ে রুখে দাঁড়িতে পারে। এই কথা ধরে আমরা আর একটি প্রশ্নে যেতে পারি- কেন জনগণের মূল অংশকে নানাভাবে দেশের সকল কার্যক্রম গতিধারা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়, কেন তাদের অসচেতন রাখা হয়? এই প্রশ্নের সাথে সংযুক্ত আর একটি প্রশ্ন আসে সেটি হচ্ছে : জনগণকে বিচ্ছিন্ন রেখে কারা লাভবান হয়?
প্রকৃতপক্ষে এই শেষোক্ত প্রশ্নের উত্তরই আমাদের সকল প্রশ্নের উত্তরের দিক পাল্টে দিতে সক্ষম। কেননা, জনগণকে বিচ্ছিন্ন রেখে লাভ হয় তাদেরই যারা জনগণকে ঘুম পাড়িয়ে তাদেরকে অবাধে শোষণ করতে পারে, ইচ্ছামতো চালাতে পারে, অজ্ঞানতা অশিক্ষার দোহাই দিয়ে ইচ্ছামতো কালা কানুন চাপিয়ে দিতে পারে জনগণের উপর এবং এই গোষ্ঠী সন্দেহাতীতভাবে শোষকগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এরা যে দেশে যে কালে ক্ষমতায় থাকে তখনই সে দেশে সে কালে জনগণকে বিচ্ছিন্ন রাখার, তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার অপচেষ্টা দেখা যায়।
বিপ্লবের আগে গণচীনের জনগণ আমাদের জনগণের মতই অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার ইত্যাদি অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়েছিল। ঘুমন্ত থাকতে বাধ্য হয়েছিল তাদের সকল চেতনা। বিপ্লব তাদের মুক্তি দিয়েছিল এই পাশবিক স্তর থেকে। তাদের চেতনাকে জাগিয়ে তোলার জন্যে কমিউনিস্ট পার্টি কাজ করে গেছে। জনগণকে সচেতন করে বিপ্লবের মিছিলে নিয়ে আসবার উদ্যোগের ক্ষেত্রে প্রথম সমস্যা দেখা গিয়েছিল অশিক্ষাকে কেন্দ্র করে। যার দরুণ পত্রিকা মারফত যোগাযোগ করা মুশকিল হয়ে পড়েছিল। রাশিয়ায় বিপ্লবের সময় ঠিক এমন সমস্যা হয়নি। সেখানে যেহেতু বিপ্লবের সময় পুঁজিবাদী বিকাশ ঘটেছিলো সেজন্যে শিক্ষার হারও বেড়েছিলো। সেজন্যেই লেনিনের পার্টির পত্রিকার মাধ্যমে রাশিয়ার শোষিত জনগণের অধিকাংশ সচেতন হয়ে উঠতে পেরেছিলো, নিজেদের গুপ্ত ক্ষোভকে প্রকাশ করবার মাধ্যম খুঁজে পেয়েছিলো তারা। চীনে এই সুবিধাটা ছিল না। সামন্তবাদী প্রভাবে অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবে ছিল সমগ্র সমাজ। কিন্তু চীনা বিপ্লবের পুরোধা কমিউনিস্ট পার্টি সেজন্যে থেমে থাকেনি। খুব দ্রুত পার্টি এর বিকল্প পথে কাজ শুরু করেছে। মানুষের কাছে পৌঁছুবার জন্যে তারা বিপুলভাবে পোস্টার, পেইন্টিংকে ব্যবহার করেছে। মানুষ সেই ভাষায় মুক্তির আশ্বাস পেয়ে অগ্রসর হয়েছে যা দীর্ঘকালীন সংগ্রামে শোষকচক্রের চিরনিপাতে মূল শক্তি যুগিয়েছে।
জনগণই ইতিহাসের মূলশক্তি এই তীব্র সত্যকে বিশ্বাস করলে জনগণের কাছে পৌঁছবার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের পরিস্কার ধারণা থাকা আবশ্যক। ক্ল্যাসিক্যাল ব্যাখ্যা মতে মানুষের কাছে পৌঁছানো যায় দু’ভাবে : এক, সরাসরি-মুখোমুখি কথা বলে যার মধ্যে পরামর্শ, সালিশ, জনসভা, প্রত্যক্ষ প্রচার ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত; দুই, মাধ্যমকে অবলম্বন করে মানুষের কাছে পৌঁছানো যা পরোক্ষ যোগাযোগ স্থাপন করে। জনসংখ্যার বিস্তার, সময়ের অগ্রসরতায় জটিলতা বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ সম্ভব হয়ে উঠে না এবং বর্তমান যুগে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাটি প্রায় ক্ষেত্রেই অচল, সেজন্যে পরোক্ষভাবেই যোগাযোগ স্থাপন করা হয়ে থাকে। পরোক্ষ যোগাযোগে মাধ্যম ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই মাধ্যমগুলোর মধ্যে আছে ঃ সংবাদপত্র, পোস্টার, পেইন্টিং, চলচ্চিত্র, নাটক, বেতার, টিভি, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, অনলাইন পোর্টেল ইত্যাদি।
মাধ্যম হিসেবে এগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহারই মানুষের কাছে পৌঁছূবার জন্যে যথেষ্ট। কিন্তু এইসব মাধ্যমগুলো তখনই যথার্থ ব্যবহারের নিশ্চয়তা পায় যখন তা জনগণের প্রতিনিধির হাতে থাকে। জনগণের স্বার্থবিরোধী শক্তির হাতে থাকলেই এই সব মাধ্যমের ব্যবহার এবং চরিত্র সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং তা একটি বিশেষ গোষ্ঠীর সেবাদাস হিসেবে কাজ করতে শুরু করে।
সংবাদপত্র
গণসংযোগ মাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্রের ভূমিকা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। এটি যথার্থ শক্তির হাতে থাকলেই তার ভূমিকা পালন করতে পারে ঠিকভাবে। উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতে সংবাদপত্র এখন শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি ধনিক গোষ্ঠীর হাতে তাদের সকল দৈনিক, সাপ্তাহিক, সাময়িকী। অনেক সময় একজনেরই মালিকানায় থাকে একাধিক দৈনিক, সাপ্তাহিক, সাময়িকী। এগুলোর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কিছুটা ভিন্ন ভিন্ন হয়। এসব পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকে ধনিক শ্রেণীরই আরেকটি গোষ্ঠীর ব্যবসায়ীক স্বার্থ। তারা এসব পত্রিকাকে বিজ্ঞাপন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। মোটামুটিভাবে এসব পত্রিকা ধনিক শ্রেণীর কয়েকটি গোষ্ঠীর ব্যবসায়িক স্বার্থের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেজন্যে তাদের স্বার্থ বিরোধী কোন সংবাদ বা তথ্য এসব পত্রিকায় প্রকাশিত হতে পারে না। একবার একজন সাংবাদিক বিজ্ঞাপনদাতা ব্যক্তির স্বার্থ-বিরোধী একটি সংবাদ সরবরাহ করেছিলো বলে পত্রিকার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তাকে চাকুরী থেকে বরখাস্ত করেছিলো।
আপাতঃদৃষ্টিতে উন্নত-পুঁজিবাদী দেশগুলোর পত্রিকা দেখে স্বাধীন জনসংযোগ মাধ্যম বলে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সেগুলো ঐ সব দেশে প্রতিক্রিয়াশীল স্বার্থের প্রতিনিধি মাত্র। এজন্যেই, ঐসব পত্রিকায় সরকার বিরোধিতার ভান থাকলেও তাতে দেশের মূল প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর হাজারো কুকর্মের কোন সংবাদ থাকে না।
সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো তাদের এইসব পত্রিকার মাধ্যমে অনুন্নত দেশগুলোর উপরও অহিফেন বিস্তারের চেষ্টা করে। অনুন্নত দেশগুলোতে সংবাদপত্রের অবস্থান ভিন্নতর। এখানে জনসংখ্যার অধিকাংশই অশিক্ষিত, দেশের সকল কার্যক্রম, কথাবার্তা ইত্যাদি থেকে কার্যতঃ বিচ্ছিন্ন। সেই হেতু, এসব দেশের পত্রিকা ঘুরে ঘুরে একই বৃত্তে থাকে। নির্ভরশীল থাকে বিজ্ঞাপনের উপর। ভয় থাকে উপরের থাবার। কর্তৃপক্ষীয় নীতির সমালোচনামূলক চরিত্রের কিছুটা আভাস থাকলেই পত্রিকার বিজ্ঞাপন বন্ধ হবার, থাবার, আক্রমণের সম্ভাবনা। সংবাদপত্রে কার্যরত সাংবাদিকরা একটি বৃত্তের মধ্যে পাখা ঝাপটিয়ে বেড়ান। তাদের এই পেশা তাদের অন্তরের নেশার প্রতিফলন হলেও, জনগণের কাছে পৌঁছাবার আকুল আগ্রহ থাকলেও খুব কম সংখ্যক সাংবাদিকই হাজারো প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে টিকে থাকতে পারেন। সাংবাদিকের পাখা ভারী হয়ে গেলে তাকে ইচ্ছামতো নাড়াচাড়া করতে সুবিধে হয় চক্রের। এসব কারণ অনুন্নত দেশে সংবাদপত্র শিক্ষিত মহলে এবং পরোক্ষভাবে অশিক্ষিত মহলে যেভাবে কাজ করতে সক্ষম ততটুকুও পারে না। দেশের বাস্তবতা, সমস্যা, আশা-আকাক্সক্ষা, গতিপথ, চেতনা ইত্যাদিতে জনগণ নিজেদের যুক্ত করতে পারে না- সংবাদপত্রের দায়িত্ব পালনে এই ব্যর্থতা পুরো সমাজকেই আহত করে জানা কিংবা অজানা মতে। পাশাপাশি সংবাদ-পত্রের বিপ্লবী ভূমিকার দৃষ্টান্তও খুব দুর্লভ নয়। রাশিয়ায় বিপ্লবের ঠিক পূর্ব সময়টায় বিপ্লবী পার্টির সংবাদপত্র এক বিরাট দায়িত্ব পালন করেছিল যা সে সময় অন্য কোন মাধ্যমে ততটা সম্ভব ছিল না। সংবাদপত্র যখন জনগণকে অবাধে প্রতিফলিত করতে পারবে, দেশ ও জাতির স্বার্থে অবাধে সমস্ত অন্যায় ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখতে পারবে, জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ তুলে ধরতে পারবে তখনই সংবাদপত্র সত্যিকার গণসংযোগ মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারবে।
পোস্টার
‘এই জানোয়ারদের খতম করতে হবে’ লেখা ইয়াহিয়ার বিকৃত ছবি সম্বলিত ৭১এর পোস্টারের কথা এখনও নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। এমন বহু সংখ্যক পোস্টার শিক্ষিত অশিক্ষিত সকল মুক্তিপাগল মানুষকে একটা প্রতিজ্ঞাদীপ্ত আব্বানে উদীপ্ত করেছিল মুক্তিযুদ্ধে। শুধু আমাদের দেশেই নয়, গণসংযোগ ক্ষেত্রে পোস্টারের এই ভূমিকা বহু স্বাধীনচেতা জাতিই প্রত্যক্ষ করেছে। চীনে বিপ্লবের সময় গণসংযোগ মাধ্যম হিসেবে পোস্টারের ভূমিকা ছিল অন্যতম। অশিক্ষা যখন সংবাদপত্রের গন্তব্যকে সীমিত করে দেয়, অথবা প্রতিক্রিয়াশীলতার হাত যখন সংবাদপত্রকে চরিত্রহীন করে তখন পোস্টারকে ব্যবহার করে মানুষের কাছে পৌঁছুনোয় অনেকখানি সাফল্য লাভ সম্ভব।
পেইন্টিং
শুধু আমাদের দেশে নয়, প্রায় সকল অনুন্নত দেশেই পেইন্টিংকে শহরের একটি শ্রেণির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখার চেষ্টা চালানো হয়। পেইন্টিং যারা করেন সেই শিল্পীরা এবং যারা এগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা করেন তাদের সামাজিক শ্রেণীগত পটভূমি চেতনার বিভ্রান্তি, বিদেশী অপছায়া ইত্যাদিতে তারা পেইন্টিং এর মূল ক্ষমতাকে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন। বিদেশকে বুকে করে পেইন্টিং ড্রইংরুমে ঝুলে থাকে। তার আবেদন এক থেকে সহস্র জনের কাছে পৌঁছে যেতে পারে না। কিন্তু আমরা বিভিন্ন দৃষ্টান্ত থেকে দেখেছি যে, পেইন্টিং মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রতিফলিত করে অগ্রসর চিন্তা থেকে- সংগ্রামী জীবনকে উত্তরণের পথ দেখাতে পারে এবং পেইন্টিং এর মাধ্যমে শিল্পীর অগ্রসর চেতনা একজনের মধ্য থেকে সহস্র লক্ষ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর পেইন্টিং এমন একটি গণসংযোগ মাধ্যম যে মাধ্যমে শিক্ষিত অশিক্ষিত সবার কাছেই প্রায় সমানভাবে পৌঁছুনো যায়। পেইন্টিং এর এই চরিত্র অর্জনের জন্যে একদিকে যেমন শিল্পীর সচেতন স্বতঃস্ফূর্ততা আবশ্যক তেমনি আবশ্যক পেইন্টিং এর মাধ্যম হিসেবে সহজ পথকে অবলম্বন করা।
বেতার
বেতার গণসংযোগ মাধ্যম হিসেবে অত্যন্ত ফলপ্রসূ হলেও এটি এমন একটি মাধ্যম যেটি সরকারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন। সরকারের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বেতারের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন দিক থেকে সম্পৃক্ত। সরকার যদি জনগণের যথার্থ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে চান তবে বেতারের ভূমিকা অবশ্যই মানুষের স্বার্থের সাথে বিরোধিতা করবে না। জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষা ও জাতীয় চেতনার সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন, সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টি, জাতীয় অগ্রগতির লক্ষ্যকে সুস্পষ্ট গতিতে উজ্জ্বল রাখা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বেতার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশের বেতার এখনও কার্যকর ফলপ্রসূ ভূমিকা নিতে পারেনি। জাতীয় চেতনার অগ্রসরতাকে নিশ্চিত করবার জন্যে, জাতীয় অস্তিত্বকে সুদৃঢ় করবার জন্যে বেতারের ভূমিকা আরও সুচিন্তিত হওয়া প্রয়োজন। অধিকাংশ মানুষের জীবনকে এড়িয়ে জাতীয় প্রতিনিধিত্ব করা সম্ভব নয়। তাছাড়া বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বেতারের আরেকটি সমস্যা আছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চলই গ্রাম, এই বহুল প্রচারিত সত্যের পাশাপাশি আরেকটি সত্য হচ্ছে যে, খুব কম সংখ্যক গ্রামেই শতকরা একটির বেশী পরিবার বেতার রাখতে পারে। বেতারের সকল অনুষ্ঠান, বেতারের সকল কার্যক্রম এইজন্যে একটি বিশেষ বৃত্তের মধ্যেই থাকে। যদিও এর উপযোগিতা গ্রামের অশিক্ষিত বৃদ্ধ থেকে শিশু পর্যন্ত। বেতার রাখবার সামর্থের সঙ্গে এখানে আরেকটি প্রশ্ন আছে, সেটি হচ্ছে বেতারে প্রচারিত অনুষ্ঠানের সার্থে অধিকাংশ দারিদ্রক্লিষ্ট ক্ষুধার্ত শত সমস্যা জর্জরিত মানুষের চাহিদার বৈসাদৃশ্য। বর্তমানের মত বৈসাদৃশ্য বজায় থাকলে তা মানুষের কাছে নিজের দায়িত্ব দিয়ে পৌঁছুতে ব্যর্থ হবে।
টিভি
কিউবায় বিপ্লবের পর ফিডেল ক্যাস্ট্রো দেশের নিরক্ষরতার বিপুল বোঝা দুর করবার জন্যে টিভিকে ব্যবহার করেছিলেন। অডিওভিস্যুয়াল মাধ্যম হিসেবে টিভির ক্ষমতা অন্যান্য মাধ্যম থেকে বেশী। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টিভির ব্যবহার বিদেশে এখন অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। আমাদের দেশেও টিভি রয়েছে, তবে এখনও তা বিলাসিতার কোলেই রয়ে গেছে। উচ্চমূল্য, বিদ্যুতায়িত এলাকার সীমাবদ্ধতা, গড়পড়তা মানুষের নিম্ন আয় ইত্যাদি কারণে টিভি আমাদের দেশে একটি বিশেষ গ-ীর মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে আছে। টিভির অনুষ্ঠানের চরিত্রও ঐ একটি বিশেষ গ-ীকে লক্ষ্য করেই নির্ধারিত হয়। অনুষ্ঠানের মোট সময়ের অর্ধেক কিংবা তারও বেশী সময় বিদেশ থেকে আমদানীকৃত দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা চতুর্থ শ্রেণীর ছবি দিয়েই পূর্ণ করা হয়। বছর বছর ধরে দেশে নিরক্ষতার বিরুদ্ধে ‘সংগ্রাম’ চলছে, কিন্তু নিরক্ষরতার হার খুব একটা বাড়েনি। কোন পথে নিরক্ষরতা দূর করা যাবে সে গবেষণাতেই কর্তৃপক্ষের এনার্জি শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই নিরক্ষরতা দূরীকরণে টিভি একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়া দেশে শিক্ষার মান সম্পর্কেও প্রশ্ন উঠছে। শিক্ষার মান বৃদ্ধির ব্যাপারে টিভির উদ্যোগ বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। টিভির মূল ভবন যখন রামপুরায় স্থানান্তর করা হয় তখন একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে জনৈক বুদ্ধিজীবী বলেছিলেন, টিভির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বিনোদন, শিক্ষা নয়। এ প্রসঙ্গে আমি বলবো, যে বিনোদন শিক্ষার বিরোধিতা করে সে বিনোদনের আমাদের প্রয়োজন নেই। তাছাড়া শিক্ষাকে বাদ দিয়ে শিক্ষাহীন বিনোদন নিয়ে মেতে থাকবার মত উপযুক্ত জাতি এখনও আমরা হয়ে উঠিনি। আমাদের শিক্ষার সূচনাই হয়নি এখনো। উপরোক্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর ব্যক্তিদের অত্যধিক পরাক্রমে টিভির চরিত্র এখনও মানুষের চাহিদা থেকে অনেক দূরে রয়েছে। শুধু শিক্ষাই নয়, জাতীয় প্রগতি, কৃষি, শিল্পসহ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উত্তরণের জন্যে টিভি মানুষের জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে যাবার ক্ষমতা রাখে। যে ক্ষমতা এখনও বাংলাদেশ টিভি প্রয়োগ করেনি। টিভির সে ক্ষমতা অর্জন ও প্রয়োগ করতে হলে একদিকে তার চরিত্র পরিবর্তন করতে হবে অন্যদিকে তার মূল্য যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে।
চলচ্চিত্র
আইনেস্টাইনের একটি ছবি রাশিয়ার মানুষকে বিপ্লবের কাছাকাছি নিয়ে আসতে সাহায্য করেছিল। আইনেস্টাইন তার ছবিতে এক দিকে জনগণের উপর অত্যাচার, নিষ্পেষণ, অন্যদিকে জনগণের প্রতিরোধকে মর্মস্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছিলেন যা মানুষের অবচেতন অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম হতে পেরেছিল বলেই তারা ছবি দেখে আরও বেশী করে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন প্রতিরোধে। চলচ্চিত্রের ক্ষমতা বিস্তৃত। সুস্থ এবং সৎ শক্তিশালী চলচ্চিত্র যেমন মানুষকে সচেতন করে তুলতে পারে তেমনি অসৎ বিকৃত চলচ্চিত্র মানুষকে বিভ্রান্তির জালে ফেলতে পারে। চলচ্চিত্র এমন একটি মাধ্যম যেটি অন্য যে কোন মাধ্যম থেকে মাধ্যম থেকে অধিক কার্যকর হতে পারে। ‘নিরক্ষর স্বর্গে’ বইটি থেকে নিঃসন্দেহে নয়নমণি অনেক বেশী কাজ করেছে। বিশেষ করে আমাদের দেশে যেখানে অশিক্ষার হার বেশী সেখানে চলচ্চিত্র সেই অশিক্ষার কুশিক্ষার কুসংস্কারের মধ্যেও চেতনার বিপরীত প্রবাহ সৃষ্টি করতে পারে। দেশকে, জাতির লক্ষ্যকে, চেতনার সিঁড়িকে পৌঁছে দিতে পারে মানুষের কাছে। বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে চলচ্চিত্রের ভূমিকা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। এদেশের চলচ্চিত্র গুটিকয়েক ব্যক্তির কালো টাকা বানানোর মাধ্যম হয়ে উঠেছে। মানুষকে ঠকিয়ে, মানুষের অনগ্রসর চেতনার সুযোগ নিয়ে পয়সা কামানোয় ব্যস্ত আমাদের চলচ্চিত্র। আমাদের চলচ্চিত্রের অধিকাংশের মধ্যেই নেই আমাদের জীবনের কথা, আমাদের সমস্যা, আমাদের আনন্দ বেদনার কথা, আমাদের উত্তরণের আশ্বাস। আমাদের দেশের চলচ্চিত্র মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে এজন্যে যে তা রয়েছে মানুষের, অগ্রগতির, সুস্থ চেতনার শত্রুর হাতে। সেই সব ব্যক্তির হাতে মানুষ শিক্ষিত হলে- সচেতন হলে যাদের অথবা যাদের প্রভুর ক্ষতিই হতে পারে। চলচ্চিত্রকে যথাযথ গণসংযোগ মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এই সব ব্যক্তিদের উৎপাটিত করতে হবে।
নাটক
নাটকের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ হলেও নাট্য আন্দোলন জনগণের চেতনার এককটি স্তরকে অগ্রসর করে দেখার আশ্বাস দিতে পারে।
দিতে পারে প্রতিরোধের চিন্তার অগ্রসরতার বিপরীত প্রবাহের দর্শন। মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে নাটক খুঁজে বের করে আনতে পারে জীবনের সাধারণ রূপ থেকে উত্তরণের আভাস। বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে নাটকের উপযোগিতা একই কারণে প্রচুর। বর্তমানে এখানে সীমিত পর্যায়ে হলেও নাট্য আন্দোলন চলছে। তবে আন্দোলনের ধারা যদি বর্তমানেই মতই থেকে যায়, যদি আরও বিস্তৃত ব্যাপক চরিত্র পরিগ্রহ করতে এটি ব্যর্থ হয়, যদি এ আন্দোলন মানুষের কাছে পৌঁছবার প্রক্রিয়া না হয়ে ব্যক্তিগত তৃপ্তির স্বার্থবহ হয় তবে এ আন্দোলন যেমন সার্থক হবে না তেমনি এর ভবিষ্যতও আশাপ্রদ হবে না।
বাংলাদেশ শতকরা সত্তর জনেরও বেশী মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে অবস্থান করছেন। অশিক্ষিত অর্থাৎ পূর্ণ নিরক্ষর হয়ে আছেন শতকরা প্রায় ষাটজন।
বাংলাদেশের কৃষিভিত্তি অর্থনীতিতে এখনও স্যমন্তবাদের প্রভাব আছে, যদিও পুঁজিবাদও তার সাথে তাল মিলিয়ে চলছে। গ্রামাঞ্চলে ধনী কৃষক, মধ্য কৃষক, দরিদ্র কৃষক, ভূমিহীন মজুমরদের মধ্যে নেতৃত্ব করছেন ধনীকৃষক- তাদের মধ্যেকার জোতদার মজুতদার। অর্থের দাপটে তারাই জনগণের প্রতিনিধি।
গড়পড়তা বাংলাদেশের চরিত্রই এই। যেহেতু মানুষকে অজ্ঞান করে রাখাই এই সব শোষক প্রতিনিধির স্বার্থের সঙ্গে সবচাইতে বেশী সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেহেতু তারা সবসময়ই মানুষকে শিক্ষা, সচেতনতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে সচেষ্ট। শোষক প্রতিনিধিদের মধ্যে আঁতাত গড়ে ওঠে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। যার গড়পড়তা ফলাফল হয় সকল গণসংযোগ মাধ্যমের বন্ধ্যাত্ব। মানুষকে জাতীয় চেতনার মিছিলে আনতে না পারলে সকল ভারী ভারী কথাই শূন্য কলসীর মত শুধু বাজবেই, কোন কাজে দেবে না। মানুষকে সচেতন করে না তুললে জাতীয় অস্তিত্ব সুদৃঢ় করা সম্ভব নয় কোন মতেই, জাতীয় অগ্রসরতাও সম্ভব নয়। সেজন্যেই জাতীয় সকল কার্যক্রম মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে, সচেতন মানুষের মিছিল তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এগিয়ে আসবে। মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার কুফল হাড়ে হাড়ে বোঝার মতো যথেষ্ট ঝড়ঝাপটা আমাদের উপর দিয়ে যাচ্ছে, এ নিয়ে আর বিলম্ব নির্বুদ্ধিতারই পরিচয় দেবে। মানুষের কাছে পৌঁছানো কোন কঠিন কাজ নয়।
একথা আমাদের সকলেরই মনে রাখতে হবে যে, ঘুমন্ত স্বতঃস্ফূর্ততা কোন কিছুরই উজ্জ্বল সমাধান দিতে পারে না, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্যে চাই সচেতন স্বতঃস্ফূর্ততা। সচেতন স্বতঃস্ফূর্ত জনশক্তিই বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতকে নিশ্চিত করতে পারে। সেজন্যেই, মানুষের কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে দ্রুত উপলব্ধি করে তার সর্বাধিক ব্যবহার না করলে আমাদের নিজেদের জন্যেই বয়ে আনবে অন্ধকারাচ্ছন্ন অনিশ্চয়তা। জনগণকে যারা মূলশক্তি বলে বিশ্বাস করেন তারা এ ব্যাপারে নিশ্চয়ই সচেতন পদক্ষেপ রাখবেন।
——————————————————
নিবন্ধক: সাংবাদিক-মুক্তিযোদ্ধা, ওয়ার্ল্ড এসোসিয়েশন অব প্রেস কাউন্সিল (ডব্লিউএপিসি) নির্বাহী পরিষদের ও বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের সাবেক সদস্য। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, ইজতিহাদ।