বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু

প্রকাশিত: ২:১৫ অপরাহ্ণ , নভেম্বর ৯, ২০২১
কে জি মুস্তাফা

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী জীবনের ইতিহাস। এ ইতিহাস গড়ে উঠেছে বাংলার বঞ্চিত দলিত মানুষের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সুরক্ষার দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে ১৯৪২-৪৪ সালে যে মহাদুর্ভিক্ষ অবিভক্ত বাংলার জনসাধারণকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করেছিল, সেই দুর্ভিক্ষই তাদেরকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধিকার অর্জনের পথপ্রদর্শন করেছিল। এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় মুসলিম লীগের কর্ণধার মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাংলার মাটিতে পদার্পণ করেননি। দেশবাসী এটা ভোলেনি।

বাংলার এই ক্রান্তিকালে যুবসমাজ ধ্বংস ও মৃত্যুকে খুব কাছে থেকে দেখেছে। তারা দেখেছে, উপনিবেশবাদী শক্তি দেশীয় মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে কীভাবে চরম বিপর্যয়ের পথে ঠেলে দিচ্ছে। এই অভিজ্ঞতাই সেদিনের তরুণ সমাজকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যাপকভিত্তিক মুক্তিসংগ্রাম গড়ে তুলতে শিখিয়েছে। এই সংগ্রামী তরুণদের মধ্য থেকেই উঠে আসেন পরবর্তীকালের মহান নেতা, যাঁর আজীবন সংগ্রামের ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি স্বাধীন দেশ। নিখিল ভারত মুসলিম লীগ কাউন্সিলের লাহোর অধিবেশনে ২৩ মার্চ, ’৪০ প্রস্তাব বাংলার মুসলিম যুবসমাজকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম আসাম-বাংলার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে সর্বভারতীয় নির্বাচনের পর সে স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। মুসলিম লীগ সাংসদদের দিল্লি কনভেনশনে লাহোর প্রস্তাবের একাধিক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে আসে একটিমাত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-যুবক নেতারা

প্রতিবাদমুখর হন।এই পরিস্থিতিতে ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট কলকাতায় শুরু হয় ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ছাত্রনেতা শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ইসলামিয়া কলেজের ছাত্ররা শান্তি মিছিল নিয়ে কংগ্রেস নেতা ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়ের বাড়িতে দাঙ্গাকারীদের হামলা প্রতিহত করে। সেদিনের এই প্রতিকূল পরিস্থিতি সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করে শেখ মুজিবুর রহমান উপস্থিত ছাত্র অবিসংবাদী নেতা আসনটি অর্জন করেন। ইতোমধ্যে ১৯৪৭ সালের ২ জুন ব্রিটিশ সরকার বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগ করার ব্যবস্থাসহ ভারত বিভাগ পরিকল্পনার খসড়া প্রকাশ করে। বাংলা বিভাগের আয়োজন প্রতিহত করার সব রকম প্রয়াস ব্যর্থ হওয়ার পর সারাদেশের সমমনা ছাত্রনেতারা শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সমবেত হন কলকাতার সিরাজুদ্দৌলা হোস্টেলে। সভায় উল্লেখ করা হয় যে, পাকিস্তানের দুই অংশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ নেতৃত্বের বাংলার প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণের কারণে পূর্ববঙ্গ সর্বপ্রকার বৈষম্যের শিকার হবে। ছাত্রনেতারা মনে করেন, পূর্ববঙ্গের স্বার্থরক্ষার জন্য মুসলিম লীগ নেতৃত্ব তৎপর হবে-এমন কোনো সম্ভাবনাও নাই, এ অবস্থায় পূর্ববঙ্গের স্বার্থরক্ষার জন্য ঢাকায় একটি সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং ছাত্র ও যুবকদের ব্যাপকভিত্তিক শক্তিশালী সংগঠন এবং আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এই সময় আসাম থেকে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী কলকাতা এসে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন এবং পাকিস্তানে সরকারি মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে জনগণের মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একমত হন। দুই নেতার এই ধারণা নিয়ে পূর্ববঙ্গের সর্বত্র সমমনা ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। মুজিব পূর্ববঙ্গের প্রতিটি জেলায় সফর করে বিরোধী রাজনৈতিক দল গঠনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন।

শেখ মুজিব বিরোধী রাজনৈতিক দল গঠনের কাজে ব্যস্ত থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যোগাযোগ অক্ষুণ্ন রাখেন। তাঁর সক্রিয় সহযোগিতায় ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠিত হয় গণতান্ত্রিক যুবলীগ। পরের বছর ১৯৪৮ সালে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। গণতান্ত্রিক যুবলীগ সরকারি নির্যাতনে বেশিদিন টিকতে পারেনি। কিন্তু ছাত্রলীগ দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করে এবং কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থক ছাত্রসংগঠন ছাত্র ফেডারেশনের সহযোগিতায় বন্দি মুক্তি আন্দোলন গড়ে তোলে।

এদিকে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করেন। পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ’৪৮ সালের ১১ই মার্চ রাজপথে আন্দোলন নিয়ে আসে। শেখ মুজিবুর রহমানসহ বহু ছাত্রনেতা গ্রেফতার হন। আন্দোলনের মুখে পূর্ববঙ্গের খাজা নাজিমুদ্দিন সরকার ছাত্রদের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ওই চুক্তিতে বাংলাকে প্রাদেশিক সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়। কারামুক্তির পর শেখ মুজিব এই ধোঁকাবাজির বিরুদ্ধে আবার আন্দোলনের ডাক দেন। তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসভায় প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল ঘোষণা করা হয়। একই বছর ১৯শে মার্চ ঢাকার ছাত্রসমাজ রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া শুরু হয়। পাকিস্তানে বাঙালি জাতির ভাষা ও সংস্কৃতি সুরক্ষার আন্দোলন, তথা বাঙালির জাতীয় সত্তা বিকশিত করার সংগ্রাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা ১৯৪৯ সালের ২রা মার্চ ধর্মঘট করলে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ ও কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থক ছাত্র ফেডারেশন কর্মচারীদের দাবির সমর্থনে ছাত্র ধর্মঘট ঘোষণা করে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শেখ মুজিবসহ ২৭ জন ছাত্রছাত্রীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়। মুজিবকে ১৫ টাকা জরিমানা করা হয়। এই দমননীতির মুখে আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে এবং সরকার মুজিবসহ ২৫ জন ছাত্রনেতাকে গ্রেফতার করে। কর্তৃপক্ষের হঠকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যেতে অস্বীকার করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আন্দোলনের সময় ঢাকা ও অন্যান্য জেলে রাজবন্দিরা দীর্ঘ অনশন ধর্মঘটের মাধ্যমে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ে মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন।

এদিকে মওলানা ভাসানী ১৯৪৯ সালের ২২ ও ২৩শে জুন আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলন আহ্বান করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে আটক শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করেন এবং সম্মেলনে তারা কী ভূমিকা পালন করবেন সে সম্পর্কে নির্দেশ চান। আওয়ামী মুসলিম লীগ সম্মেলন সফল করার জন্য শেখ মুজিব ছাত্র প্রতিনিধিদের নির্দেশ দেন। সম্মেলনে সারা প্রদেশে মুসলিম লীগ বিরোধী নেতা ও কর্মীরা বিপুল সংখ্যায় যোগদান করেন। এদের মধ্যে অনেকে প্রস্তুতিমূলক কাজ করেছিলেন। এই সম্মেলনে পূর্ববঙ্গে একটি শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক দলের বিকাশ ঘটে। শেখ মুজিব জেলে থাকা সত্ত্বেও তাঁকে নির্বাচিত করা হয় দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। সেদিন ঢাকার রোজ গার্ডেনের ওই সম্মেলনে জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাতার প্রতি আস্থা প্রকাশ করা হয়। যে সমস্ত গুণ একজন রাজনৈতিক নেতাকে শীর্ষপদ লাভ করতে সাহায্য করে থাকে, তার সবই ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে। উদ্যম, সাহসিকতা ও লক্ষ্য অর্জনে অবিচল দৃঢ়তা ছিল তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে তিনি সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন মাত্র চার বছরের মধ্যে। এই পদে তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। সংগঠন গড়ে তোলার অনন্যসাধারণ দক্ষতা ছিল তাঁর। মাত্র এক বছরের মধ্যে তিনি তাঁর দলকে পূর্ববঙ্গের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলে পরিণত করতে সমর্থ হন। এক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উদার, তিনি বহুসংখ্যক বামপন্থি নেতাকর্মীকে আওয়ামী মুসলিম লীগৈ টেনে নেন।

পঞ্চাশের দশকের প্রথমদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টিগুলো যখন সশস্ত্র সংগ্রামের পথ পরিহার করে গণআন্দোলন গড়ে তোলার কর্মসূচি নেয়, তখন পূর্ববঙ্গের কমিউনিস্ট পার্টি তাদের কর্মীদের একাংশকে আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগদান করতে উৎসাহিত করে। কমিউনিস্ট পার্টির নীতি পরিবর্তনের রাজনৈতিক তাৎপর্য অনুধাবন করতে শেখ মুজিবের বিলম্ব হয়নি। তিনি ১৯৫২ সালের অক্টোবরে পাকিস্তান শান্তি পরিষদের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসাবে চীন সফর করেন এবং তার পরের বছরই পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ সভাপতি মোহাম্মদ তোয়াহা এবং সাধারণ সম্পাদক অলি আহাদকে আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগদানে উদ্বুদ্ধ করেন। এ সময় সারা পূর্ব বাংলার বামপন্থি কর্মীরা ব্যাপক হারে আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেন। ফলে আওয়ামী মুসলিম লীগ দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়।

শক্তিশালী আওয়ামী মুসলিম লীগ নির্বাচনী ঐক্য গড়ে তোলে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে। হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে পর্যুদস্ত করে। এই ফ্রন্টের মূল চালিকাশক্তি ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং তার সুযোগ্য সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। দলকে আরও ব্যাপকভিত্তিক করার জন্য ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে। দেশের সব শ্রেণির নাগরিকদের এই দলে যোগদানের সুযোগ করে দেওয়া হয়। আওয়ামী মুসলিম লীগকে আওয়ামী লীগে রূপান্তরের রাজনৈতিক সংগ্রামে জয়লাভ করে শেখ মুজিব যথার্থ জাতীয় নেতার মর্যাদা লাভ করেন।

শেখ মুজিব নিজেকে দলের সাধারণ কর্মীদের কাছ থেকে কখনই দূরে সরিয়ে রাখেননি। প্রয়োজনে তিনি মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেছেন; কিন্তু সাধারণ সম্পাদকের পদ ত্যাগ করেননি। মন্ত্রিত্বের চেয়ে দলের কাজ বড়, এই রাজনৈতিক সচেতনতা থাকার ফলেই তিনি ১৯৫৭ সালে শিল্পমন্ত্রীর পদে ইস্তফা দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেছেন।

পাকিস্তানের প্রথম সামরিক শাসনকর্তা আইয়ুব খান চেয়েছিল শেখ মুজিবকে ধ্বংস করতে। সামরিক সরকার আট আটটি দুর্নীতির মামলা দায়ের করে একটিও প্রমাণ করতে পারেনি। বিনা বিচারে কারাগারে আটক রাখে বছরের পর বছর বাঙালির এই মহান নেতাকে।

পূর্ব পাকিস্তানসহ সারা পাকিস্তানে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন যখন দানা বেঁধে ওঠে; তখন কাশ্মীর উদ্ধারের স্লোগান দিয়ে দেশবাসীর ওপর চাপানো হয় যুদ্ধ। যুদ্ধাবস্থা ঘোষণা করে দেশের মানুষের সব রকম গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হয়। কিন্তু ১৯৬৫ সালের ভারতবিরোধী এই যুদ্ধই আইয়ুব খানের কাল হলো। যুদ্ধে কাশ্মীর উদ্ধার তো দূরের কথা, সেখানকার সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো ভারত দখল করে নেয়। ওই যুদ্ধ আরও প্রমাণ করে যে, পূর্ব পাকিস্তানের সুরক্ষা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সম্ভব নয়। এদেশের মানুষের মনে তখন প্রশ্ন দেখা দেয়, আমাদের আত্মরক্ষার বিকল্প ব্যবস্থা কী?

প্রখর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বিকল্প ব্যবস্থা বাতলে দিলেন তাঁর ছয় দফায়, পূর্ব বাংলার মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। মুজিবের ছয় দফার আন্দোলনে সারাদেশ উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে। বার বার কারারুদ্ধ করেও আইয়ুব খান মুজিবকে স্তব্ধ করতে ব্যর্থ হয়।

এই পরিস্থিতিতে সাজানো হলো তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। অসন্তুষ্ট বাঙালি সৈন্যদের আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করা হয়। কিন্তু ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ উত্তাল আন্দোলনের মুখে ভেসে গেল আইয়ুবী ষড়যন্ত্র। মামলার আসামিরা মুক্ত হয়ে সগৌরবে ফিরে এলেন ক্যান্টনমেন্টের বন্দিখানার বাইরে। বীর মুজিবকে ছাত্ররা ভূষিত করল বঙ্গবন্ধু অভিধায়।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭০-এর নির্বাচনি যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের দুটি আসন ছাড়া সব আসনে জয়লাভ করেন। নির্বাচন-পরবর্তী চক্রান্ত প্রতিরোধ করতে ডাক দেন অসহযোগ আন্দোলনের। সারা বাংলাদেশ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। হানাদার পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে কারারুদ্ধ করেও যুদ্ধে পরাজিত হয়। বঙ্গবন্ধু ততদিনে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি পান দেশে-বিদেশে।

লেখক: প্রয়াত সাংবাদিক