বাংলাদেশের কৃষকদের উদ্ভাবিত ধান

প্রকাশিত: ৬:০০ অপরাহ্ণ , জুলাই ২২, ২০২১

বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলে বন্যা আর লবণাক্ততার প্রভাবে ধানের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে৷ সমস্যা সমাধানে কৃষকেরা নিজেরাই নতুন জাতের ধান উদ্ভাবন করে চলছেন৷

জমির ক্রমশ বেড়ে চলা লবণাক্ততা আর ঝড়ের প্রভাবে সাতক্ষীরার শ্যমনগরের কৃষক দিলীপ চন্দ্র তফাদারের জন্য ধান চাষ ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল৷ সে অবস্থা কাটাতে পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া জ্ঞান কাজে লাগালেন তিনি৷ বিলুপ্তপ্রায় স্থানীয় জাতের কিছু ধান সংগ্রহ করে সংকরায়ন পদ্ধতিতে উদ্ভাবন করলেন নতুন এক জাত৷ নাম দিলেন চারুলতা, যা লবণাক্ত মাটি, জলাবদ্ধতা, সেই সঙ্গে ঝড়ের বিরুদ্ধেও ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে৷ এমনকি সার বা বীজ ছাড়াই যথেষ্ট বাড়তে পারে চারুলতা, জানালেন দিলীপ৷

দিলীপ বলেন, একটা সময় ছিল যখন এখানকার মানুষ ধান চাষ করেই যথেষ্ট আয় রোজগার করতে পারতেন, অন্য কিছু করতে হতো না৷ তবে সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে৷ যে কারণে বাঁচার তাগিদেই তারা নতুন জাতের ধান উদ্ভাবনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন৷ এই কৃষক জানান তার উদ্ভাবিত জাতটির উৎপাদন প্রচলিত ধানের চেয়ে দ্বিগুণ৷

শুধু দিলীপ নন, সাতক্ষীরার শ্যামনগর অঞ্চলের অন্য কৃষকরাও পরিবর্তীত পরিস্থিতি মোকাবিলার দায়িত্ব নিজেরাই নিয়েছেন৷ শ্যামনগরের কৃষি কর্মকর্তা এস এম এনামুল ইসলাম বলেন,‘‘এখানকার দুর্যোগ প্রবণ অঞ্চলের কৃষকরা অসাধারণ কাজ করেছেন৷ তারা স্থানীয় জাত সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন জাত উদ্ভাবন করে চলছেন৷”

কুষি অফিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শ্যামনগরে প্রায় ৪৫ হাজার কৃষক রয়েছেন৷ ১৯৮০-র দশক থেকে সেখানে চিংড়ি চাষের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার পর আশেপাশের কৃষি জমিতে বাড়তে শুরু করে লবণাক্ততা৷ ২০০৯ সালের সাইক্লোন আইলা এই পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তোলে৷ এরপর একের এক সাইক্লোনে জমি ক্রমশ লবণাক্ত হয়েছে, বহু কৃষক বাধ্য হয়েছেন ধান চাষ ছেড়ে দিতে৷
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন নামের একটি সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে শ্যামনগরসহ পাঁচটি এলাকার ৭৮ হাজার একর কৃষি জমি চিংড়ি ঘেরে পরিণত হয়েছে৷ সেই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনে নদীতে লবণাক্ততার পরিমান বাড়তে থাকায় কৃষকদের টিকে থাকাটাই ক্রমশ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে৷

এই পরিস্থিতিতে নতুন জাতের ধানই একমাত্র আশার আলো দেখাতে পারে, মনে করেন শ্যামনগরের নিকটবর্তী হৈবতপুর গ্রামের কৃষক শেখ সিরাজুল ইসলাম৷ তিনি নিজের ঘরেই একটি ধান গবেষণা কেন্দ্র চালু করেছেন৷ সেখানে মজুদ আছে ১৫৫ টি স্থানীয় জাতের ধান৷ এরিমধ্যে সিরাজুল দুইটি জাত আবিষ্কার করেছেন যেগুলো লবণাক্ত পানিতে টিকে থাকতে পারে৷ অঞ্চলটির ১০০ কৃষককে তিনি এই ধানের বীজ বিনামূল্যে বিতরণ করেন৷

সমুদ্র উপকূলবর্তী বা নদীর তীরে লবণমিশ্রিত পানিতে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে এমন কিছু ধান চাষ করা যায় কীনা তা নিয়ে এখন গবেষণা করছেন সিরাজুল৷ তবে সেগুলো হয়ত ততটা পুষ্টিকর হবে না, বলেন তিনি৷ ধানের বীজ নিয়ে তার আরো বড় পরিকল্পনা রয়েছে৷ ‘‘আমি শহরে ধান বীজের বাজার গড়ে তোলার চিন্তা করেছি৷ সেখানে কোন বীজ বিক্রি হবে না, বরং কৃষকরা বীজ বিনিময় করবেন,” নিজের পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন সিরাজুল৷

কৃষকদের এমন প্রচেষ্টা স্থানীয় পর্যায়ে কৃষির উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হুমায়ূন কবির৷ দিলীপসহ বিভিন্ন কৃষকদের উদ্ভাবিত ধান বারিতে পাঠানো হয়েছে৷ কৃষকদের মধ্যে বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেগুলো তারা গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখেন৷
বারির গবেষকরা নিজেরাও অন্তত ১০০ জাতের নতুন ধান উদ্ভাবন করেছেন, যার কয়েকটি লবণাক্ত ও জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু৷ তবে শ্যামনগরের কৃষকরা বলছেন সেগুলোর বেশিরভাগই তাদের এলাকার উপযুক্ত নয়৷ থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনকে কয়েকজন জানান, অনেক জাতের ধান তাদের কাছে পৌঁছায় না, সেগুলো হয় উচ্চমূল্যের নয়ত তাদের অঞ্চলে চাষের মতো নয়৷ ‘‘আমি অনেকবার সেগুলো চাষ করেছি, কিন্তু ফলন ভালো না,” এমনটাই মত কৃষক বিকাশ চন্দ্রের৷ তার বদলে তিনি এখন সিরাজুল ইসলামের উদ্ভাবিত একটি ধান চাষ করছেন৷

বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইনডিজেনাস নলেজ এর হিসাবে গত এক যুগে কৃষকরা নিজেরাই দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষম ৩৫টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন৷ সেগুলোর বেশিরভাগই অবশ্য মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যে রয়েছে৷ অলাভনজনক এই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি শ্যামনগরের কৃষকদের নতুন জাত উদ্ভাবনে কারিগরি সহযোগিতা দিচ্ছে৷ তাদের আঞ্চলিক সমন্বয়ক পার্থ সারথি পাল থমসন রয়টার্সকে বলেন, ‘‘শ্যামনগরের কৃষকরা নিজেরাই নিজেদের সমাধান খুঁজে পেয়েছেন৷ যে কারণে অনেক দুর্যোগ-প্রবণ অঞ্চলে ধান চাষ ফিরে এসেছে৷ এটি ভবিষ্যত কৃষকদের জন্য নতুন আশার আলো৷” (থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন)