আজ বিশ্ব বই দিবস

আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য চাই নিয়মিত বইপাঠ

প্রকাশিত: ৫:৫৯ অপরাহ্ণ , এপ্রিল ২৩, ২০২১

সাঈফী আনোয়ারুল আজিম:
আজ বিশ্ব বই দিবস। ২৩ এপ্রিল সারা বিশ্বব্যাপী বই দিবস পালন করা হয়। বই পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তুলতে দিবসটির প্রচলন হয় ১৯৯৫ সালে।

বই পাঠের অন্যতম নিরিবিলি জায়গা হলো গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগারে বই পড়ার মজাটাই আলাদা। যারা বইপাঠকে নিজের আত্মার সাথে মিশিয়ে নিতে পেরেছেন, তারাই উপলদ্ধি করতে পারবেন এটি আত্মার জন্য কত বড় খোরাক।

বই মানুষকে সভ্য করে তোলে। বিনয়ী হতে শেখায় । জ্ঞানের উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেয়। হাজার বছর আগের ইতিহাসকে তুলে ধরে খুব সহজে পাঠকের কাছে। প্রতিটি বইয়ের পাতায় পাতায় লুকায়িত থাকে অর্জন করার অমূল্য জ্ঞানভাণ্ডার।

বইপড়াকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নত দেশের নাগরিকরা তাঁদের শয়নকক্ষকে লাইব্রেরি বানিয়ে নিয়েছে। তাঁদের ঘরের একটি কোণায় ছোট্ট গ্রন্থাগার না থাকলে তারা নিজেদেরকে খুব অপমানবোধ করে। অর্থাৎ বইটি তাঁদের জীবনসঙ্গীর মত। তারা বইকে নিজের বন্ধু বানিয়ে নিয়েছে। জীবন সংগ্রামে সাফল্য অর্জেনর জন্য তারা বইকে বেচে নেন।।তাইতো আজ উন্নত এবং বহুগুণে সমৃদ্ধ।

আমাদের দেশের চিত্র কিন্তু ভিন্ন। আমরা নিজের গৃহ কিংবা শয়নকক্ষকে লাইব্রেরিতে পরিণত করতে পারিনি। তেমন আগ্রহও নেই বইপাঠের প্রতি। দেশের অধিকাংশ গণপাঠাগার পাঠকশূন্য। বুকশেলফে সারিবদ্ধ বই, পাঠক নেই, পাঠকের জায়গা দখল করে নিয়েছে পোকা মাকড়। তারা সেখানে একপ্রকার স্থায়ী বসত গড়ে তুলেছে, এগুলো যেনো একেকটা আস্তুতগাড়।

এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য চরম দুঃখ সংবাদ। আমরা দিনদিন বইবিমুখ জাতিতে পরিণত হচ্ছি। জ্ঞানের গভীরতা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছি। প্রযুক্তির ছোঁয়া আমাদেরকে কর্মেক্ষেত্রে বহুদুর এগিয়ে নিলেও মনুষ্য হিসেবে আমরা বহুদুর পিছিয়ে। সভ্যতার আলো বিমুখ এবং বিনয়ী হতে না পারায় আজ শিক্ষিত অশিক্ষিতজনেরা এমন সব কর্মকান্ড ঘটাই, যা আমাদেরকে অমানুষের কাতারে নিয়ে যায়। অর্থাৎ আমরা আকৃতি এবং পোশাকে- মানুষ হলেও মন মানসিকতায় মনুষ্যত্ববোধ অর্জন করতে পারিনি।

আমরা দিনদিন পশুত্বে পরিণত হচ্ছি। আমরা সভ্যতার আলো থেকে বহুদুর পিছিয়ে গেছি।

টাকা আর রাতারাতি সম্পদশালী হওয়ার লোভ আমাদের অন্তরে জেঁকে বসেছে। এই লোভ আমাদের প্রজম্মকে ধ্বংস থেকে ধ্বংসের গহীন সাগরে নিয়ে গেছে। সর্বনাশা মাদক আমাদের পুরো প্রজম্মকে গ্রাস করেছে। পাড়ায় পাড়ায় কিশোর গ্যাং আমাদের সামাজ ব্যবস্থাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। আমাদের অন্তরের পাশবিকতা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে।

তাইতো, যখন যা ইচ্ছা, তা করতে কোন দ্বিধাবোধ নেই আমাদের । ভালো আর মন্দের উপলদ্ধির জ্ঞান আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছে।

এসব কিছু একটিমাত্র কারণ, আমরা জ্ঞানের আলো থেকে দূরে সরে পড়েছি। যে জ্ঞানের আলো আমার জীবনকে প্রদীপ্তময় করে তুলবে, সে জ্ঞানের পাঠশালা থেকে আমরা বহুদুরে ছিটকে পড়েছি। আমাদের অন্তরে অন্ধকার জমাট বেঁধেছে। আলোর শিখা বিচ্ছুরিত হয়ে গেছে।

তাইতো আমরা যখন যা খুশি করতে পারি। কোন লজ্জাবোধ নেই। দ্বিধাবোধ নেই। নেই বড়দের প্রতি সম্মান এবং ছোটদের প্রতি সেন্থ।

পত্রিকার পাতা খুললেই আমরা কিছু ঘটনা দেখে শিউরে উঠি। নিজেকে প্রশ্ন করি মানুষ কি এমন জঘন্য কাজ করতে পারে? কিন্তু আমার জানা নেই যে, সে আকৃতিতে মানুষ হলেও তার মনুষ্যত্ব হারিয়ে গেছে বহু আগে। কারণ মনুষ্যত্ববোধ সৃষ্টির জ্ঞান তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

যদি আমরা সভ্য হতে চাই, তাহলে আমাদেরকে জ্ঞানের জগতে প্রবেশ করতে হবে। বইপাঠের প্রতি মনোযোগী হতে হবে। সেখানে সভ্যতার ছোঁয়া খোজতে হবে। যেতে হবে বইয়ের ঘর গ্রন্থাগারে। সেটি আলোর শিখা। জ্ঞানের প্রজ্জ্বলিত বাতিঘর। হৃদয়কে আলোকিত করার বাতবঘর। সেখান থেকে সভ্য হওয়ার, বিনয়ী হওয়ার শিক্ষা লাভ করা যায়।

আজকের বিশ্ব বই দিবসে এটি আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক, আমরা বইমুখী হব। নিজের ঘরকে বইয়ের ঘরে পরিণত করব। লাইব্রেরিতে অধ্যবসায় করতে যাব। অন্তরে জমাটবেঁধে থাকা অন্ধকারকে জ্ঞানের আলোর মাধ্যমে ছোঁড়ে ফেলে দেব। হৃদয়ে জাগ্রত করব মনুষ্যত্ববোধ।

আমাদের লক্ষ্য হোক, বই পাঠের জন্য সবাইকে আগ্রহী করে তুলব। প্রতিটি শিশু এবং যুবককে বই পাঠের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেব। মনে রাখতে হবে সন্তানের ভবিষ্যতের সাফল্যের একক বৃহত্তম সূচক হল বই। আমরা আমাদের বাচ্চাদেরকে শিশুকাল থেকে বইমুখী করে গড়ে তুলতে পারি। শিশুকাল থেকে সন্তানকে বইমুখী করে গড়ে তুলতে পারলে তার জীবনের পরবর্তী সময়গুলো বইপাঠের মধ্যদিয়ে অতিবাহিত হবে। সে জ্ঞানের শিকড় খেকে শেখরে পৌঁছাতে পারবে।

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, জীবনে তিনটি জিনিষের খুব প্রয়োজন, সেটি হলো, বই,বই এবং বই।

আসুন আমরা বইমুখী হই। গ্রন্থাগারমুখী হই। নিজের আত্মাকে বইয়ের সাথে মিশিয়ে নিই। সভ্য এবং বিনয়ী হওয়ার জন্য জ্ঞানমুখী হই। বইপাঠের মধ্যদিয়ে একটি নতুন আলোর স্বপ্ন বুনি।
—–
সাঈফী আনোয়ারুল আজিম
উপকূলীয় পাবলিক লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা
ও গণমাধ্যমকর্মী।