মদ, জুয়া, নারীতে আকর্ষণ ও সামাজিকীকরণ!

প্রকাশিত: ৬:১৯ অপরাহ্ণ , মে ১, ২০২১

মো. জিশান মাহমুদ
নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি মানুষের রয়েছে স্বভাবজাত আকর্ষণ। ইসলামের মৌলিক কয়েকটি নিষিদ্ধ বস্তুর অন্যতম হলো নেশা বা মাদকদ্রব্য, জুয়া তথা অসৎ উপার্জন ও অবৈধ নারীসঙ্গ।

যে বস্তু ব্যবহারে নেশার উদ্রেক হয়, মানুষের মস্তিষ্ক বিকল হয়, স্বাভাবিক জ্ঞান ঠিকভাবে কাজ করে না; সেসব বস্তুই মাদক। ১৯৯০ এর দশকে আমরা যারা মফস্বল শহরে বেড়ে উঠেছি, আমরা মাদক বলতে ফেন্সিডিল ও মদকে (বাংলা ও ফরেন) বুঝতাম। পরবর্তীতে ঢাকা আসার পর হিরোইনের কথা শুনেছি। তার ও কিছু পরে গাঁজার নাম শুনেছি। এখন তো ইয়াবায় আমাদের চারিদিকের পরিবেশ সয়লাব। আমরা মদখোরদের মদদী, ফেন্সিডিল ব্যবহারকারীদের ফেন্সিখোর, হিরোইন সেবনকারীদের হিরোইঞ্চি, গাঁজা সেবনকারীদের গাঁজাখোর ও ইয়াবা ব্যবহারকারীদের বাবাখোর বলে অভিহিত করি। সময়ের আবর্তে ফেন্সিডিল, হিরোইন, গাঁজা, ইয়াবাকে ব্যবহারকারীদের যেভাবে আমরা ঘৃণা করে আসছি, মদ খাওয়া মানুষকে এখন আর আমরা সে পরিমাণ ঘৃণা করছি না। এখন মদ খাওয়াটা হালের সকল পার্টির একটা ফ্যাশন। মদ খাওয়াকে আমরা প্রায় সামাজিক স্বীকৃতি দিয়েই ফেলছি।

বর্তমানে জুয়াবাজির জন্য বিভিন্ন রকমের আসর বসে বিভিন্ন দেশে। ক্রিকেট, ফুটবল ও অন্যান্য খেলাধূলার প্রতিযোগিতায়ও বাজি ধরা হয়। হাউজি, ক্যাসিনো, ফ্লাস, পাশা, বাজি রেখে ঘোড়দৌড়, তাসখেলা, চাক্কি ঘোরানো ও রিং নিক্ষেপ ইত্যাদি। ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে ১৯৯১ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচ ছিল পাকিস্তান বনাম ইংল্যান্ড। আমার প্রথম বাজি খেলা। সেদিন এক বন্ধুর সাথে পাঁচ টাকা বাজি লেগেছিলাম। ইংল্যান্ড হারায় সেসময় আমি পাঁচ টাকা হেরেছি। আবাহনী-মোহামেডান খেলায় আমরা বাজি ধরতাম হরহামেশাই। পাড়ামহল্লার কত ফুটবলম্যাচ, ক্রিকেটম্যাচ দশ-বিশ-পঞ্চাশ টাকার বাজিতে খেলেছি। এখনকার ছেলেরাও খেলে। বাজির সবচেয়ে বড় আধুনিকায়ন নিয়ে এসেছে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগ (আইপিএল)। পুরো ভারতবর্ষের প্রতিটি পাড়ায়, মহল্লায় আইপিএলের ম্যাচে বাজি ধরা হয়। সরকার জানুক বা জেনেও চুপ থাকুক, একে একে বিপিএল, সিপিএল, বিগ ব্যাশসহ নানান ক্রিকেট ও ফুটবল ম্যাচে বাজি ধরার সংস্কৃতি বর্তমান আছে। বছর দুয়েক আগে এক পত্রিকায় আইপিএল খেলে শেরপুরের এক ছেলের সর্বস্বান্ত হয়েছে দেখলাম। দুই বছর পূর্বে ঢাকার এক বস্তিতে আইপিএলকে কেন্দ্র করে বউ বাজি রাখার ঘটনাও পত্রিকা মারফত জেনেছি। কিছু ছেলে নিয়মিত বাজি ধরে তাস খেলে। হাউজি, ক্যাসিনো নিয়ে কিছুদিন পূর্বেও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বড় ধরনের জুয়া-বাজি ছাড়া সাধারণ বাজি গুলো যেমন ম্যাচ বাজি, বাজি ধরে ম্যাচ খেলাকে আমাদের সমাজে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা শুরু হয়েছে।

প্রেম ও যৌনতা নিয়ে আমাদের সময়ে আমাদের পরিবার গুলো বেশ রক্ষণশীল ছিল। আমরা কাউকে ভালো লাগলেও ভালো লাগার অনুভূতি প্রকাশ করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছি। আমাদের সময়ে কারো প্রেমে পড়াটা সামাজিকভাবে খুব লজ্জার বিষয় ছিল। যৌনতার কথা চিন্তা করাও অলীক ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও প্রেম করেছি খুব সাদামাটাভাবে। আমাদের সময়ে প্রেমটা ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের যায়গা। তাই বলে কি আমাদের পরিবেশ খুব ভালো ছিল? তা কিন্ত নয়, আমাদের সময়েও আমরা বেশ্যা চিনতাম। বেশ্যাবাড়িতে পুরুষের অবাধ যাতায়াতও দেখতাম। টানবাজারসহ বিভিন্ন গঞ্জে, হাটে বাজারে পতিতালয় ছিল। এখন ডিশ কানেকশন, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের ছেলে-মেয়েদের কানেক্টেভিটি বৃদ্ধি পেয়েছে। ছেলে-মেয়েরা প্রেমকে প্রেমের দৃষ্টিতে দেখছে না। এই তো বছরখানেক আগে আমার ভবনের একটি ফাইভে পড়া মেয়েকে দেখলাম লিফটের মাঝে বয়ফ্রেন্ডকে চুমু দিতে। আমাদের সময়ে নারীর সতীত্বকে যেভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে এখন সেগুলো সামাজিকীকরণ করা হয়েছে। আমাদের সময়ে সৎ ছেলে ও সতী নারীর কদর ছিল। আমাদের সময়ে সেটেল্ড ম্যারিজ হত বেশি। এখন কোন অভিভাবককেই আর পাত্র-পাত্রী খুঁজতে দেখা যায় না। এখনকার ছেলে-মেয়েরাও ভেবেই নেয় মাস্টার্স পাশ করা কোন ছেলে-মেয়ে কি আর সৎ থাকতে পারে? ধীরে ধীরে সমাজে আমরা এসব কিছু মেনে নিয়ে সামাজিকীকরণ করে নিয়েছি।

আমরা আমাদের সন্তানদের ধর্মীয় অনুশাসনের অনুশীলন, নীতি-নৈতিকতা, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ ও সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে ব্যর্থ হচ্ছি। আমরা নিজেরাও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে অনেক অন্যায়কে মেনে নিচ্ছি বলেই আমাদের পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্রে মাদক, জুয়া ও ব্যভিচার এর মত অপরাধের আকার চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পেয়ে অপরাধের শৃঙ্খল তৈরি করছে। তাই কোনো অস্বাভাবিক ঘটনাকে আমরা বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করে এড়িয়ে চলছি। এই এড়িয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র।

মাদক, জুয়া ও ব্যভিচার সর্বধর্মেই নিষিদ্ধ, সব আইনেই গর্হিত ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সফল ও সার্থক জীবনের জন্য মাদক, জুয়া ও ব্যভিচারের কবল ও ছোবল থেকে নিজেদের ও পরিবারকে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হবে। দেশের উন্নয়নে ও জাতির সুরক্ষার জন্য এসব অসামাজিক পাপাচার, অপরাধ ও অপকর্মের বিষয়ে পারিবারিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে প্রশাসনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

-আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

** লেখার মতামত লেখকের।নিউজ৭১অনলাই’র সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে।