ভোলার মনিরামে ক্যাফে মাশরাফির সফলতার গল্প

প্রকাশিত: ১:০৫ অপরাহ্ণ , মার্চ ১২, ২০২১

ভোরের শিশির সিক্ত সকাল পেরিয়ে সবে রোদেলা আকাশ।গ্রামীণ জনপদের ছায়াসুনিবড় বাড়ির উঠোন পেরিয়ে সরু রাস্তা, একটু হাঁটার পরেই ভোলা-চরফ্যাশন প্রধান সড়ক। এরপর আমাদের ব্যস্ততম কুঞ্জেরহাট বাজার।আজ মনটা কেনো যেনো বাঁধনহারার মতো, ফোন দিলাম প্রিয় জাকারিয়া আজম স্যারকে। স্যারের আহ্বানে বন্ধু ভুট্টোকে নিয়েই চলে এলাম মনিরাম বাজারে, এরপর সেই কাংখিত রকমারি খাবারে সাজানো ক্যাফে মাশরাফি।সেদিনের গল্পই এখানে তুলে ধরার চেষ্টামাত্র।যে লেখায় বারবার প্রকাশ পেয়েছে, “কেউ সফল হয়ে জন্ম নেয় না।”

মোঃ বেলাল হোসেন।সদা হাস্যোজ্জ্বল উদ্যোমি এক যুবকের নাম।নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং সংসারে সবার মুখে হাসি ফোটাতে ডিগ্রী পড়া অবস্থায় পারি জমান মালয়েশিয়া। কাজ করেন একটি কন্টিনেন্টাল রেস্টুরেন্টে। কিন্তু, সেখানে তার মন টেকেনি বেশিদিন, চলে এলেন দেশে। কোনো চাকরি না নিয়েই নিজে কিছু করতে চান! এ ভাবনা এবং প্রচেষ্টা থেকেই একদিন হয়ে গেলেন ক্যাফে মাশরাফি এন্ড জুস বার’র মালিক এবং সফল উদ্যোক্তা।

ভোলার হাফিজ ইব্রাহীম কলেজের প্রভাষক ও সুজন ব্যক্তিত্ব জাকারিয়া আজমের আমন্ত্রণে সম্প্রতি বন্ধু মোঃ রবিউল হাসান ভুট্টো কে নিয়ে ভোলার বোরহানউদ্দিনের মনিরাম ক্যাফে মাশরাফির আতিথিয়েতা গ্রহণ করি।খাবারের দেশী ও বিদেশি তালিকা হতে আমরা বেছে নেই নুডুলস্ ও কফি।সু্স্বাদু ও টাটকা খাবার পরিবেশন করেই ক্যাফে মাশরাফির বেলাল হোসেন শোনালেন তার উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনের গল্প।

আলাপচারিতায় সে জানালেন, মুলাইপত্তন গ্রামের ঐতিহ্যবাহী দফাদার বাড়িতে তার জন্ম।বাবা মো. হাবিবউল্যাহ, মা বিবি রহিমা।দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে বেলাল বড়। উদ্যোক্তা বেলাল বিয়ে করেছেন সাত বছর।স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদাউস চাকরি করেন পুষ্টি বিষয়ক একটি বেসরকারি সংস্থায়।মাঝে-মধ্যে ক্যাফে মাশরাফিতে এসে স্বামীকে সাহায্যও করেন।সুখের দাম্পত্য জীবন কাটছে তাদের।বাবা-মা, স্ত্রী ও এক ছেলেকে নিয়ে তাঁর স্বপ্ন আকাশ ছোঁয়া।

বেলাল হোসেন ২০০২ সালে এসএসসি, ২০০৫ সালে এইচএসসি ও ২০০৭ সালে ডিগ্রী তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর ওই বছরই তিনি মালয়েশিয়া পারি জমান।সেখানে উইন্ড মিল রেস্টুরেন্টে চাকরি নেন।ধীরে ধীরে শিখে ফেলেন হরেকরকম বিদেশী রান্না।একটা পর্যায়ে ভাবেন নিজ দেশের নিজ এলাকায় একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্ট খুললে কেমন হয়!সেই ভাবনা থেকে ২০১৯ সালের মাঝা-মাঝি দেশে ফিরে আসেন।

ভাবনার জগতে থাকা স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে চেষ্টা শুরু করেন।তিনি ক্রিকেট খুব ভালোবাসেন। তার প্রিয় তারকা মাশরাফি বিন মূর্তজা ! অবশেষে মাশরাফির নামেই নিজের এলাকা মনিরামে খুলে ফেলেন ক্যাফে মাশরাফি এন্ড জুসবার।অল্প সময়েই সাড়া ফেলে দেয় প্রতিষ্ঠানটি।প্রথমদিকে তরুণ-তরুণি ও টিনএজারদের ভীড় থাকলেও এখন সব বয়সীরাই এখানে আসছেন সু-স্বাদু খাবার খেতে।তার স্বপ্ন, যদি ভাগ্যে থাকে তবে বস্ মাশরাফি কোনো একদিন এ প্রতিষ্ঠানে আসবেন।

আমরা খাবার খাওয়ার পাশাপাশি প্রাণোচ্ছ্বল বেলালের সাথে আড্ডায় মজে যাই।নায়োকচিত চেহারার বেলালের মুখে সবসময় হাসির ঝলকানি।কি কি খাবার এখানে পাওয়া যায়, এমন প্রশ্নের জবাবে সে জানায়, কন্টিনেন্টাল সব খাবারই এখানে পাওয়া যায়। এরমধ্যে, চিকেন নুডুলস, প্রণ রাইচ, চিকেন গ্রীল, কারী নুডুলস, ফ্রাইড নুডুলস্, চিকেন ফ্রাইড, রাইচ স্পেসাল, চিকেন বিরিয়ানী ও কাশমেরী চিকেন কারী উল্লেখযোগ্য।

শিক্ষিত তরুণদের উদ্দেশ্যে আপনার বক্তব্য কি?
বেলাল হোসেন জানায়, “কষ্ট ও সাধনায় বড় হতে হবে। চাকরির পেছনে শুধু না ছুটে,যার যার অবস্থান থেকে শুরু করতে হবে। কোনো কাজকে ছোট ভাবা যাবে না। চাকরিজীবির চেয়ে উদ্যোক্তা হওয়া গৌরবের।”
কথাগুলো প্রকৃতঅর্থে বেকার শিক্ষিতদের জন্য অনুপ্রেরণা জোগাবে।

আসলে চাকরির পেছনে ছুটতে ছুটতে যারা ক্লান্ত। তারপরও সোনার হরিণের দেখা মিলে না। একদিন সার্টিফিকেটের বয়সও শেষ! তাঁদের জন্য শিক্ষিত ও স্বপ্নচারি বেলাল অনন্য উদারণ। কর্মের মধ্যে মানুষ বেঁচে থাকে,কিন্তু সেই কর্মটি হতে হবে সৃজনশীল।পৃথিবীর কোন সফল ব্যক্তিই সফল হয়ে জন্মায়নি। তাদের প্রত্যেককেই শিখতে হয়েছে এবং তাদের কাজগুলো আয়ত্ত্ব করতে হয়েছে। বাকি সবার মতোই তাদেরও ব্যর্থতা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। চেষ্টা ও অবিরাম সাধনা কখনো বিফলে যায় না।যারা সহজে চালাকির মাধ্যমে বড় হতে চায়, তারা আসলে বড় হয় না! কারণ, তাদের কর্মের মাঝে সৃজনশীলতা নেই, নেই সফলতার গল্প।ক্যাফে মাশরাফি এন্ড জুসবার এখন যেই পরিসরে আছে সেটি একটি উদাহরণ মাত্র। কিন্তু, লক্ষ্য করলাম বেলাল হোসেনের চোখে স্বপ্নের সাতরং আকাশ ছুঁয়েছে। বিস্তৃত পরিসরে দেশ সেরা উদ্যোক্তা হতে চায় সে!তার জন্য অনুপ্রেরণা ও নিরন্তর ভালোবাসা জানিয়ে যখন আমরা বিল দেয়ার জন্য ক্যাশ টেবিলে আসলাম, তখন সে হাসিমুখে আমাদের কাছে এসে বললো স্যার, ক্যাফে মাশরাফিতে আপনাদের আগমনে আমি ধন্য।অবশেষে বিনয়ী আবদারে বেলালের সাথে কয়েকটি ছবি তুলে বিদায় নিলাম…… অনেকদুর এসেও পিছনে ফিরে দেখলাম ক্যাফে মাশরাফির বেলাল তখনো আমাদের দিকে হাস্যোজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে রয়েছে।মনে মনে ভাবলাম….আমরা আবারো আসবো ক্যাফে মাশরাফির লোভনীয় আড্ডায়, কোনো এক বেলা-অবেলায়।