সুদ বিলোপে মহানবী (সা.)

প্রকাশিত: ১২:২৪ অপরাহ্ণ , জুন ৮, ২০২০

মুহাম্মাদ হেদায়াতুল্লহ
ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সুদ অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘সুদ ভক্ষণকারীরা এমনভাবে (কবর থেকে) দাঁড়াবে যেন সে শয়তানের স্পর্শে উন্মাদ হয়েছে, কারণ তারা বলে বেড়ায় যে সুদ তো ব্যবসার মতো, অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭৫)।

মক্কায় সুদের লেনদেন : পূর্বকাল থেকে ইহুদিদের মাধ্যমে আরবে সুদের প্রচলন ছিল। সবচেয়ে প্রচলিত পন্থা হলো, ঋণ পরিশোধ বিলম্ব হওয়ায় সুদের হার বাড়তে থাকা। তখন সমাজের প্রায় সবাই সুদি কারবারে যুক্ত থাকত। তবে সুদের লেনদেন সমাজে ভালো চোখে দেখা হতো না। তাই পবিত্র কাবা পুনর্নির্মাণের সময় বৈধ অর্থের শর্তারোপ করা হয়। (আল কারজুল মাসরাফি দিরাসাতুন তারিখিয়্যাতুন মুকারানাতুন, পৃষ্ঠা : ৫৮)।

তায়েফে সুদের প্রচলন : তৎকালীন আরবে সুদের যেসব জায়গায় সবচেয়ে বেশি সুদি লেনদেন হতো তায়েফ ছিল তার অন্যতম। তায়েফের সাকিফ গোত্রের বনু আমর সুদের ভিত্তিতে বনু মাখজুমকে ঋণ দিত। ইসলাম গ্রহণের পর বনু আমর আগের সুদ দাবি করলে বনু মাখজুম তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তখন মক্কার গভর্নর আততাব বিন উসাইদ (রা.)-এর কাছে বিচারের জন্য যায়। কিছুদিন পর তাঁর কাছে রাসুল (সা.) তাদের বিশাল অঙ্কের সুদ রহিত করে পত্রযোগে সুরা বাকারার ২৭৮ ও ২৭৯ নম্বর আয়াত লিখে পাঠান।

ইহুদিরা ছিল আরবের সুদি মহাজন : মূলত মদিনার ইহুদিরা পুরো আরবে ব্যবসা-বাণিজ্যে একচেটিয়া প্রভাবের মাধ্যমে সুদের বিস্তার করেছিল। তবে হিজরতের পর থেকে লেনদেনে সুদ ও শঠতার সুযোগ কমে যায়। সুদভিত্তিক লেনদেন তাদের জন্য নিষিদ্ধ হলেও তারা এতে জড়িত ছিল। পবিত্র কোরআনে তাদের মন্দ স্বভাব বর্ণনার সময় এটিও উল্লিখিত হয়েছে, ‘আর তারা সুদ নিত, অথচ তা তাদের জন্য নিষিদ্ধ, অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ খেত, আমি কাফেরদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করেছি।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১৬১)

সুদ বিলোপে মহানবী (সা.)-এর প্রচেষ্টা

সমাজের ন্যায়পন্থা প্রতিষ্ঠার জন্য রাসুল (সা.) সবাইকে সুদ পরিহারের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। নাজরানের খ্রিস্টানরাও অন্যদের মতো সুদের মধ্যে যুক্ত ছিল। রাসুল (সা.) এক চিঠিতে লিখেছেন, ‘আরো শর্ত হলো, তোমরা সুদ খেতে পারবে না। কেউ তা খেলে আমি তার থেকে দায়মুক্ত রইব।’ (আহকামুল কোরআন : ৪৭২/১)

সুদগ্রহীতার কঠিন শাস্তি : সামুরা বিন জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, এক রাতে দুজন লোক আমাকে পবিত্র ভূমিতে নিয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে আমরা এক রক্তের নদীর তীরে আসি। নদীতে এক লোক দাঁড়িয়ে আছে। নদীর কিনারে আরেক লোক দাঁড়ানো। তার চারপাশে পাথর। নদীতে থাকা লোকটি আসতে চাইলে কিনারের লোকটি তার মুখে পাথর নিক্ষেপ করে। লোকটি আবার আগের স্থানে চলে যায়। যতবারই লোকটি বের হতে চায় কিনারের লোকটি পাথর নিক্ষেপ করে। আর সে আগের স্থানে ফিরে যায়। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কে? সে বলল, নদীতে যাকে দেখছেন সে সুদখোর।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৩৩১)

বিদায় হজে সুদের নিষেধাজ্ঞা : সালমান বিন আমর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, আমি বিদায় হজে রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘শুনে রাখো, জাহেলি যুগের সব রকম সুদ রহিত করা হলো। সর্বপ্রথম আমি আমাদের আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিবের পাওনা সুদ রহিত করছি। তোমরা কেবল মূলধন পাবে। অন্যদের জুলুম করো না। তোমাদেরও জুলুম করা হবে না। জাহেলি যুগের সব রক্তপণ পরিত্যাজ্য। সর্বপ্রথম আমি হারিস বিন আবদুল মুত্তালিবের রক্তপণ রহিত করছি। সে বনু লাইসে দুধ পান করত। তাকে হুজাইল হত্যা করেছে।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৩৩১৮)

সুদে জড়িতদের ওপর অভিসম্পাত : জাবের (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.) অভিসম্পাত করেছেন সুদখোর, সহযোগিতাকারী, সুদের লেখক ও সাক্ষ্যদাতাদ্বয়কে। আর তারা সবাই সমান পাপী।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩০৯৬)