বিটিভিতে সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে তালিকাভুক্ত হলেন ইউনুস আলী মোল্লা

প্রকাশিত: ১:২৯ পূর্বাহ্ণ , জানুয়ারি ১, ২০২১

বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) এর তালিকাভুক্ত সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন বরেণ্য গীতিকবি ও সংগীত প্রশিক্ষক মোঃ ইউনুস আলী মোল্লা ।

৩১ ডিসেম্বর, সংগীত গুরু ইউনুস আলী মোল্লার ঠিকানায়, বিটিভি কতৃপক্ষের প্রেরিত তালিকাভুক্তিকরন পত্র প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন ইউনুস আলী মোল্লা ।

বরেণ্য গীতিকবি ও সংগীত গুরু ইউনুস আলী মোল্লার সংক্ষিপ্ত আত্মজীবনী ।

নদীর নাম চিত্রা, এ নদীর পশ্চিম তীরে উত্তর-দক্ষিন লম্বালম্বি একটা গ্রাম জালালপুর । বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত । এ গ্রামের বাজারের পশ্চিম দিকে রক্ষণশীল পরিবার মোল্লাপাড়া । শমসদী মোল্লা ছিলেন তেজী ও বৃদ্ধিশীল ব্যক্তি, তিনি স্বদেশি আন্দোলনের সময় কবিতা লিখেছেন । তাঁরই দুই পুত্র গোলাম আলী মোল্লা ও আখের আলী মোল্লা । কৃষি পরিবারে বসবাস। জমাজমি চাষাবাদ করতো কাজের লোকে। আটচালা বৈঠকখানায় হুকা-গড়গড়ার ধুয়াতে ভরে যেত সন্ধ্যে বেলা পুঁথিপাঠ ও সাহিত্যের আসরে। আষ্টম শ্রেণী পাশ গোলাম আলী মোল্লার পরিবারে কন্যা রাবিয়া খাতুন, পুত্র আব্দুর রউফ মোল্লা ও ছোটপুত্র ইউনুস আলী মোল্লা। রাবিয়া খাতুনের বিবাহ হয় ১৯৬২ সালে। আব্দুর রউফ মোল্লা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলায় মাষ্টার ডিগ্রী গ্রহন করেন ১৯৭৬ সালে। ইউনুস আলী মোল্লা ১৯৫৪ সালে জন্ম গ্রহন করেন। গ্রামের স্কুলে পঞ্চম শ্রেণী পাশ করার পর নলডাঙ্গা ভূষণ হাইস্কুল থেকে এস,এস,সি, কে এম এইচ ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করেন। কে,সি কলেজ থেকে দুইবার ডিগ্রী পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করেন কিন্তু আদুভাইয়ের দলেই থেকে যান। সংগীতের সুর গল্প, কবিতা, যাত্রাগান তাকে আকৃষ্ট করে। স্কুলে পড়াকালীন সময়ে গ্রামের উস্তাদ দুলাল চন্দ্র পালের কাছে সারগামের তালিম গ্রহন করেন। পরবর্তীতে অজয় কুমার দাস, বিশ্বনাথ ভট্টাচার্যের নিকট তালিম নেন। লেখাপড়ার ফাঁকেফাঁকে সংগীতের ব্যাকরণগত বিষয়ে তালিম গ্রহন করেন। অষ্টম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ে স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহন করে প্রশংসা পান এবং চলতে থাকে সংগীত পাঠের অনুশিলন। মফিজউদ্দিন মাঝি নামের একজন যাঁর বাড়ী ছিল মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার প্রাণীমন্ডল গ্রামে। তিনি থালা বাসন বিক্রির সুত্রে এসেছিলেন জালালপুর গ্রামে । তিনি দোতারা আর মন্দিরা বাদ্যের সাথে প্রতি রাতেই আসর জমাতেন বৈঠকখানায়। তাঁর কাছে খালেক দেওয়ান, মালেক দেওয়ান, হাছন রাজার গান, মাইজ ভান্ডারী গানের কলাকৌশল শিখেন। আধুনিক গান শেখার টানে মাঝে মাঝে গান শিখতে যেতেন তখনকার বেতার শিল্পী জনাব শাহজাহান কবীরের কাছে। সেখান থেকেই বেতারে গান গাইবার আগ্রহ জাগে। ১৯৭৮ সালে রাজশাহী বেতারে কন্ঠস্বর পরীক্ষা দেন । বেতারের উপযোগী পরিপক্ত কন্ঠস্বর না হওয়ায় শিশুশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৭০ সালে এস এস সি পাশ করার পর কলেজে ভর্তি হন। তারপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুদের সাথে সর্বক্ষণ যোগাযোগ ছিল। জুলাই মাসে ঝিনাইদহ শহরে ফুফু বাড়ীতে বেড়াতে গেলে পাকবাহিনী পোষ্ট অফিস মোড় থেকে তুলে নিয়ে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের ক্যাম্পে নিয়ে লেবারের কাজ করাতো । অমানবিক আচরণ, নির্যাতনের তিন মাস পর মুষল ধারে বৃষ্টিঝরা এক রাতে চুপি চুপি পালিয়ে এসে প্রাণে বেঁচে যান। তারপর গ্রামের বাড়ীতে অবস্হান করেন, কিন্তু নিজেকে নিরাপদ নয় ভেবে ভারতের নদীয়া জেলার পুর্বনগর গ্রামে চলে যান, কিছুদিন থাকার পর আবার ফিরে আসেন নিজ গ্রামে। অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় হলো। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ, সবই ছিল এলোমেলো। নিজেদের জমিতে কৃষি কাজে মনোনিবেশ করেন। বড় ভাই তখন বি,এ ৩য় বর্ষে পড়তেন । বৃদ্ধ পিতার ইচ্ছা সন্তানদের লেখাপড়া শেখাবেন। অনেক প্রতিকূলতা কাটিয়ে লেখাপড়া আর গান শেখার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকেন। এস,এস,সি পাশ করে এইচ এস সি ভর্তির সময় মায়ের অসুস্হতার কারনে তার পিতা ছোট ছেলে ইউনুস আলী মোল্লাকে বিবাহ দেন, কোটচাঁদপুরের খ্যাতনামা ডাক্তার আবুল কাশেম সাহাবের বড় কন্যা আনজিরা বেগমের সাথে। বছর না যেতেই পিতার মৃত্যু হয়। সংসার জমা জমি বড় ভাইয়ের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার খরচ যোগাতে দারুণভাবে অর্থ কষ্টে দিন যাপন করতে হয়। তবুও হাল ছাড়েনি। বড় ভাই জনাব আব্দুর রউফ মোল্লা ( সদ্য প্রায়াত ) মোবারকগঞ্জ সুগার মিলে চাকুরী নিয়েছিলেন কিন্তু চাকুরী মনোপুতো না হওয়ায় চাকুরী ছেড়ে হাই স্কুলের চাকুরীতে যোগদান করেন। ইউনুস আলী মোল্লা সংগীতকে তখনো আঁকড়ে ধরে ছিলেন। নিয়োমিত অনুশিলন চালিয়ে যেতেন। তারপর ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনে চাকুরী প্রাপ্ত হন। এরই মধ্যে ১৯৮১ সালে খুলনা বেতারে কন্ঠস্বর পরীক্ষা দিয়ে সংগীতশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। নিয়মিতভাবে বেতারে পল্লীগীতি পরিবেশন করে শ্রোতাপ্রিয় হন । চাকুরীর বদলীর জন্য তিনি সাতক্ষীরা থাকেন দুই বছর। সাতক্ষীরার সংগীতাঙ্গনের কয়েক জনের সাথে নিবিড়ভাবে মিলিত হন । আমজাদ হোসেন, রোজবাবুর সাথে বেশ সখ্যতা গড়ে উঠে। এ সময় অনিমা অধিকারী ইউনুস আলী মোল্লার নিকট পল্লীগীতির তালিম নিয়ে খুলনা বেতারে তালিকাভুক্ত হন । আবার বদলী হয়ে চলে আসেন ঝিনাইদহে। একটু পিছনের কথা, চাকুরী প্রাপ্তির পর গ্রামের কিছুটা জমি বিক্রি করে কোটচাঁদপুর উপজেলা শহরে জমি ক্রয় করে বসত করতে থাকেন, যে কারনে নিজ বাড়ী থেকেই প্রতিদিন যাতায়াত করতেন ঝিনাইদহে। প্রতিদিন অফিস শেষে কালীগঞ্জের প্রীতি বিশ্বাসকে গানের তালিম দিতে থাকেন । এরই ফাঁকে ঝিনাইদহের তৌহিদা আক্তার রাত্রী ও প্রীতিলতা বিশ্বাসকেও তালিম দিতে থাকেেন । কিছুদিন পরে প্রীতি বিশ্বাস, রাত্রী ও প্রীতিলতা বিশ্বাস ( প্রীতি খেয়ালী) খুলনা বেতারে শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন । ১৯৮৫ সালে একদিন মনির খান ইউনুস আলী মোল্লা সাহেবের বাড়ীতে গান শেখার জন্য আসে, তিনি নিজের ছোটভাই হিসেবে গ্রহন করে নেন এবং অনুশীলনের পর অনুশীলন এবং চর্চার পর চর্চা করাতে থাকেন । চাকুরীর কারনে ১৯৮৭ ইউনুস আলী মোল্লা বাংলাদেশ সচিবালয়ের কৃষি মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন এবং ঢাকা বেতারের শিল্পী হিসেবে সংগীত পরিবেশন করে আসছেন। ইতিপূর্বে ১৯৮৬ সালে খুলনা বেতার কেন্দ্র হতে এবং ১৯৯৮ সালে বাংলাদের টেলিভিশনের গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন । এ ছাড়াও তিনি বাংলাদেশের ও ভারতের বহু দৈনিক, মাসিক, সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকায় গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা লিখেছেন। আকাশবাণী কলকাতার প্রাত্যহিকী অনুষ্ঠানে তাঁর বহু লেখা প্রচারিত হয়েছে । কলকাতার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে গান পরিবেশন করে প্রশংসা পেয়েছেন । ইউনুস আলী মোল্লার রচিত গান এ যাবত বেতার, টেলিভিশন, অডিও তে পরিবেশন করেছে নীনা হামিদ, বশির আহমেদ, দিলরুবা খান, মীনা বড়ুয়া, মমতাজ বেগম, কিরণ চন্দ্র রায়, মুজিব পরদেশী, বিপুল ভট্রাচার্য, জানে আলম, দীল আফরোজ রেবা, সুফিয়া মনোয়ার, গাজী মিজান, আনোয়ারা বেলী, মনি কিশোর, আবু বকর সিদ্দিক, মিতালী মল্লিক, মনির খান, মেরিনা পারভিন, চমচমি দেওয়ান, শিরিণ আক্তার চন্দনা, শাহনাজ বাবু , ইউনুছ আলী, মহুয়া লিপি, উপমা, শিরিণ সুলতানা, প্রীতি বিশ্বাস, কাজী কাকলী, রাশেদ জামান, প্রীতি লতা বিশ্বাস, অজয় দাস , শাহজাহান কবির, ইকবাল আনোয়ারুল ইসলাম, আব্দুল হালিম খান, শাহানা সুলতানা বিউটি, সন্ধ্যা পাল, তৌহিদা আক্তার রাত্রী এবং আরো বহু শিল্পী । কলকাতার শিল্পী মৌসুমী কর্মকার, সোমালী পান্ডা, মাধুরী ভট্টাচার্য , নয়ন সরকার, দেবযানী লাহিড়ী ও লিপিকা রায়।

তাঁর রচিত গান শিক্ষার বই “সুর ধারা” প্রকাশিত হয়েছে । চাকুরীর পাশাপাশি সংগীতের তালিম গ্রহন করেন অবিনাশ চন্দ্র শীলের নিকট। সংগীতের বিশদ ব্যাকরণ জানার আগ্রহে তিনি ভারতেও গুণী সংগীতজ্ঞের নিকটও তালিম গ্রহন করেন। ঢাকাতে ইউনুস আলী মোল্লার নিকট তালিম নিয়েছে এ প্রজন্মের অনেক শিল্পী। আপন উদাসীনতার কারনে কখনই তিনি অর্থের দিকে লালায়িত হননি। ২০০৮ সালে মায়ের ইন্তেকালের পর স্ত্রী, দুই কন্যা আর এক পুত্র নিয়ে সাধারণভাবে সংসারের হাল ধরে আছেন। স্কুল শিক্ষক বড় ভাই আর বড় বোনের নির্দেশ তিনি কখনই অমান্য করেননি, গত ৯ সেপ্টেম্বর বড় ভাই আর ১০সেপ্টেম্বর বড় বোন দুজনই ইন্তেকাল করেন ফলে বর্তমানে তিনি মুুষড়ে পড়েছেন।

বহু গান রচনা করেছেন এবং নিজে সুরারোপ করেছেন ইউনুস আলী মোল্লা । সংগীত জগতে ইউনুস আলী মোল্লা অনেক তিরস্কার আর পুরস্কার পেয়েছেন । তিরস্কারের কথা বাদ দিয়ে পুরস্কারের তালিকায় রয়েছে ঝিনাইদহ জেলা শিল্পকলা একাডেমি গুণীজন সম্মাননা ।