কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে মা – অধ্যক্ষ মোঃ গোলাম মোস্তফা

প্রকাশিত: ১:৪৪ অপরাহ্ণ , জুলাই ৭, ২০২৬

কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে মা
অধ্যক্ষ মোঃ গোলাম মোস্তফা

এক.
বাংলা সাহিত্যের এক বিস্ময়কর প্রতিভার নাম আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম| তাঁর সারাটা জীবন ছিল বন্ধনহীন, এলোমেলো আর খামখেয়ালীপনায় ভরা| হুট করে কিছু করা বা ত্যাগ করা ছিল তার জীবনে সহজ বিষয়| আর এসব কারণে কতো আঘাত পেয়েছেন তিনি, তবু সহ্য করেছেন বারবার| সে আঘাত ছিল নানান দিক থেকে তির্যক আর কটুক্তিতে ভরা| তৎকালের হিন্দু-মুসলমানের আঘাত, সাহিত্যিকদের আঘাত, দুঃখ-দারিদ্রতার আঘাত, দায়-দেনার লজ্জা| এই এতকিছুর পরও তার সৃষ্টি ও সাহিত্য আমাদেরকে শুধু অবাক নয়, হতবাক করে দেয়| তবে তাঁর জীবনের সব দিক হতো আমরা জানিনা| তার জীবনের এমন কিছু দিক আছে- যা আজো অজানা| তেমনি একটি বিষয় হলো কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে ‘মা’| গর্ভধারীনি মায়ের সাথে তার অভিমান| নিজের মাকে তিনি কত দিন ‘মা’ বলে ডেকেছেন- তা নিয়ে অনেকের অজানা প্রশ্ন আছে| তবে তিনি নিজের মা’কে ‘মা’ বলে না ডাকলেও তার জীবনে পাতানো ‘মা’ ছিলেন অনেকে|

‘মা’- এক অক্ষরের ছোট এই শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সব মমতা আর ভালোবাসা| মায়ের তুলনা শুধুই ‘মা’| ‘মা’ শুধু নিজের সন্তানের মধ্যেই নয়, সবার মাঝেই অকাতরে বিলাতে পারেন নিঃ¯^ার্থ ভালোবাসা| মায়ের মতো এতো মধুর ডাক পৃথিবীর কোনো অভিধানে দ্বিতীয়টি আর নেই| ‘মা’ যেন ভালোবাসার এক বিশাল আকাশ, অথৈ সাগর| তাই সভ্যতার উষালগ্ন থেকেই ‘মা’ সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত প্রেমময়ী এক নাম| যুগে-যুগে, দেশে-দেশে, কালে-কালে এই প্রিয় শব্দটি দোলা দিয়েছে সবার মনের গহীন বনে| তার প্রমাণ পাই নজরুলেই ‘মা কবিতা’য়-

‘মা’

যেখানেতে দেখি যাহা
মা-এর মতন আহা
একটি কথায় এত সুধা মেশা নাই,
মায়ের মতন এত
আদর সোহাগ সে তো
আর কোনোখানে কেহ পাইবে না ভাই|

হেরিলে মায়ের মুখ
দূরে যায় সব দুখ,
মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় পরান,
মায়ের শীতল কোলে
সকল যাতনা ভোলে
কত না সোহাগে মাতা বুকটি ভরান|
কত করি উৎপাত
আবদার দিন রাত,
সব সন হাসি মুখে, ওরে সে যে মা!
আমাদের মুখ চেয়ে
নিজে রন নাহি খেয়ে,
শত দোষে দোষী তবু মা তো ত্যজে না|

ছিনু খোকা এতটুকু,
একটুতে ছোটো বুক
যখন ভাঙিয়া যেত, মা-ই সে তখন
বুকে করে নিশিদিন
আরাম-বিরামহীন
দোলা দিয়ে শুধাতেন, ‘কী হল খোকন?’

আহা সে কতই রাতি
শিয়রে জ্বালায়ে বাতি
একটু অসুখ হলে জাগেন মাতা,
সবকিছু ভুলে গিয়ে
কেবল আমারে নিয়ে
কত আকুলতা যেন জগন্মাতা|

যখন জনম নিনু
কত অসহায় ছিনু,
কাঁদা ছাড়া নাহি জানিতাম কোনো কিছু,
ওঠা বসা দূরে যাকু
মুখে নাহি ছিল বাক,
চাহনি ফিরিত শুধু মা-র পিছু পিছু!

তখন সে মা আমার
চুমু খেয়ে বারবার
চাপিতেন বুকে, শুধু একটি চাওয়ায়
বুঝিয়া নিতেন যত
আমার কী ব্যথা হত,
বলো কে এমন স্নেহে বুকটি ছাওয়ায়!

তারপর কত দুখে
আমারে ধরিয়া বুকে
করিয়া তুলেছে মাতা দেখো কত বড়ো,
কত না সুন্দর
এ দেহ এ অন্তর
সব মোরা ভাই বোন হেথা যত পড়|

পাঠশালা হতে যবে
ঘরে ফিরি যাব সবে,
কত না আদরে কোলে তুলি নেবে মাতা,
খাবার ধরিয়া মুখে
শুধাবেন কত সুখে
‘কত আজ লেখা হল, পড়া কত পাতা?’

পড়ে লেখা ভালো হলে
দেখেছ সে কত ছলে
ঘরে ঘরে মা আমার কত নাম করে!
বলে, ‘মোর খোকামণি|
হিরা-মানিকের খনি,
এমনটি নাই কারও!’ শুনে বুক ভরে!

গা-টি গরম হলে
মা সে চোখের জলে
ভেসে বলে, ‘ওরে জাদু কী হয়েচে বল!’
কত দেবতার ‘থানে’
পিরে মা মানত মানে,
মাতা ছাড়া নাই কারও চোখে এত জল|

যখন ঘুমায় থাকি
জাগে রে কাহার আঁখি
আমার শিয়রে, আহা কীসে হবে ঘুম!
তাই কত ছড়া গানে
ঘুম-পাড়ানিরে আনে,
বলে, ‘ঘুম! দিয়ে যা রে খুকু-চোখে চুম!’

দিবানিশি ভাবনা
কীসে ক্লেশ পাব না,
কীসে সে মানুষ হব, বড়ো হব কীসে;
বুক ভরে ওঠে মার
ছেলেরই গরবে তাঁর,
সব দুখ সুখ হয় মায়ের আশিসে|

আয় তবে ভাই বোন,
আয় সবে আয় শোন
গাই গান, পদধূলি শিরে লয়ে মা-র;
মার বড়ো কেউ নাই,
কেউ নাই কেউ নাই!
নত করি বল সবে ‘মা আমার! মা আমার!’
(কাজী নজরুল ইসলামের ছড়া কবিতা)

কবি নজরুল ইসলাম বিখ্যাত ছড়া কবিতা ‘‘আবিস্কার’’-এ লিখেছেন
‘‘মা গো আমায় দেখাসনে আর জুজুু বুড়ির ভয়,
আজকাল আমি তোমার ছোট্ট খোকা নই|’’(সংক্ষেপিত)

মা’কে নিয়ে ছোটদের জন্য এমন ছড়া আরো অনেক লিখেছেন যে কবি নজরুল, তিনি কীভাবে গর্ভধারীনি মায়ের সাথে এমন আচরণ করতে পারেন, ভেবে আজো আমরা বিস্মিত হই| অনেকের মনে প্রশ্ন- এমন কী করে হলো নজরুলের জীবনে; যিনি মায়ের মৃত্যুর সময় মৃত মায়ের মুখটি পর্যন্ত দেখতে যান নি!

দুই.
কবি কাজী নজরুল ইসলামের পিতার নাম কাজী ফকির আহামদ আরও মায়ের নাম জাহেদ খাতুন| তাঁর পিতা বাংলা ১৩১৪ সালের ৭ চৈত্র ইংরেজি ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে ষাট বছর বয়সে পরলোক গমন করেন| কাজী ফকির আহামদ আরবি, ফারসি ভালো জানতেন- তবে তাঁর বাংলা ও উর্দু ভাষার ওপর রীতিমতো দখল ছিল| তাঁর হাতের লেখা ছিল খুবই সুন্দর| চুরুলিয়া অঞ্চলের নামকরা দলিল লেখক ছিলেন তিনি| উচ্চাঙ্গের মিলাদ পাঠক বলেও তাঁর সুনাম ছিল| কাজী ফকির আহমদ দেখতেও সুপুরুষ| কাজী ফকির আহমদ পিতার ওয়ারিশ সূত্রে প্রায় চল্লিশ বিঘার মতো চাষের জমি পেয়েছিলেন| কিন্তু শেষ বয়সে এক বসতবাড়ি ছাড়া তাঁর বিষয় সম্পত্তি কিছুই ছিল না| তবে বিষয়-সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল পাশাখেলা| এই খেলা তাঁকে প্রবলভাবে পেয়ে বসেছিল| তাঁর এই পাশা খেলার অন্যতম জুড়ি ছিলেন মহানন্দ আশ নামক এক বণিক, তার কাছেই কাজী ফকির আহমদ তাঁর বেশির ভাগ সম্পত্তি হেরেছেন পাশা খেলায়|

কাজী ফকির আহমেদ দু’টি বিয়ে করেছিলেন| প্রথম স্ত্রীর নাম কাজী সৈয়দা খাতুন| তিনি চুরুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন| তাঁর গর্ভে একমাত্র কন্যা সাজেদা খাতুন জন্ম| সৈয়দা খাতুনের মৃত্যুর পর ফকির আহমদ বিবাহ করেন জাহেদা খাতুনকে| তিনি চুরুলিয়ার পার্শ্ববর্তী ভূড়ি গ্রামের উচ্চ বংশের মহিলা ছিলেন| তিনি অতি দয়াবতী এবং সুন্দরী রমণী ছিলেন| জাহেদা খাতুনের গর্ভে তিন পুত্র এবং এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়| তাঁরা হলেন কাজী সাহেব জান, কাজী নজরুল ইসলাম, কাজী আলি হোসেন ও বোন উম্মে কুলসুম| কাজী সাহেব জান পিতার দারিদ্রতার জন্য উচ্চশিক্ষা নিতে পারেননি| পিতার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরেন এবং রানীগঞ্জের কয়লা খনিতে চাকরি নেন| দীর্ঘদিন কয়লা খনিতে নিযুক্ত থাকায় তার ¯^াস্থ্য ভঙ্গ হয় এবং অসুখে ভুগে পঞ্চাশ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন| কাজী সাহেব জানও অবসরে দলিল লেখকের কাজ করতেন| কাজী আলি হোসেন পড়াশুনা করেন কাজী পাড়ায় মক্তবে| পারিবারিক সূত্রে দলিল লেখকের কাজে পরবর্তীকালে নিযুক্ত হন এবং আইন আদালত বিষয়ে পাকাপোক্ত হয়ে ওঠেন| এলাকার কৃষক- শ্রমিকদের হয়ে সমাজ সেবকের কাজ করতে গিয়ে গ্রামের তৎকালীন জমিদার জোতদারদের রোষানলে পড়েন এবং ১৯৫১ সালের ৭ জানুয়ারি নিজ গ্রামে প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হন|

তিন.
আমরা জানি কাজী নজরুল কিশোর বয়সে ঘরছাড়া হন| প্রথম বিশ^যুদ্ধ (১৯১৪) শুরু হওয়ার পর কিশোর নজরুল সিয়ারসোল স্কুলে থাকাকালে ১৯১৭ খ্রি. ৪৯ ন¤^র বাঙ্গলী পল্টনে সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন, পরে হাবিলদার পদে উন্নীত হন| ১৯১৯ খ্রি. শেষদিকে পল্টন ভেঙ্গে দেয়ার কয়েকমাস আগে সাতদিনের ছুটি পেয়ে তিনি গিয়েছিলেন তার গ্রামের বাড়ি চুরুলিয়ায়| ১৯২০ খ্রি. পল্টন ভেঙ্গে দেয়ার পর কলকাতায় কয়েকদিন থেকে আবার চুরুলিয়ায় যান| একবার চুরুলিয়ায় গেলে সেখানে সপ্তাহকাল ধরে অবস্থান করেন তিনি| এ সময় মায়ের সঙ্গে তার নানান বিষয়ে অনেক আলাপ হয়| শেষে কথায় কথায় ভীষণ ঝগড়া বেঁধে যায়| এই ঝগড়ার কারণ জানা যায়নি| নজরুল ও পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলেননি| ঝগড়ার পর তিনি বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন| এরপর তার মা যতদিন জীবিত ছিলেন কত অনুরোধ করেছেন কত আবদার ধরেছেন ছেলেকে এক নজর দেখার জন্য, কিন্তু নজরুলের জেদ আর অভিমান এতটা তীব্র ছিল যে- মায়ের অনুরোধ তিনি আর রাখেননি| ইহকালে মায়েরও আর ছেলের মুখ দেখা হয়নি| কবির অন্যতম বন্ধু মুজাফ&ফর আহাম্মদ বলেন,‘‘ ১৯২১ সালে কবি যখন আমার সাথে তালতলার একটি বাসায় থাকতেন, তখন একদিন তার বড়ভাই কাজী সাহেবজান ও তার চাচা কাজী বজলে করীম নজরুলের বাড়ি থেকে এলেন| তারা দু’জনে মিলে নজরুলকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য কত অনুনয় আর সাধাসাধি করেছিলেন, কিন্তু অভিমান করে আর নিজ গ্রামে ফিরে গেলেন না|’’

পূর্বেই বলেছি, কবি কাজী নজরুলের ‘মা’ জাহেদা খাতুন ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী| ¯^ামীর মৃত্যুর সময় তাঁর বয়সও ছিল কম| একজন কমবয়সী সুন্দরী বিধবা মহিলা সম্মানের সঙ্গে নিজের ইজ্জত-সম্মান রক্ষা এবং নিজের ও সন্তানদের ভরণপোষণের নিশ্চয়তার দেখা দেয়| সে জন্য পরিবারের লোকজন নজরুলের আপন চাচার সাথে বিয়ে করিয়ে দেন| এই বিয়ে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে এবং সামাজিকভাবে বৈধ ছিল| এছাড়া ধরনের বিয়েকে তখনো এবং বর্তমানেও উৎসাহিত করা হয়| তবে একথাও ঠিক যে, উভয় বঙ্গের গ্রামীণ পরিবেশের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় এ ধরনের বিয়ে সম্পূর্ণ বৈধ হলেও সকল সময়ে অনেকে কিছুটা হেয় চোখেই দেখে থাকে| সম্ভবত, নজরুল সেই মানসিকতার উর্ধ্বে উঠে মায়ের দ্বিতীয় বিয়েকে মেনে নিতে পারেননি| এমনও হতে পারে নজরুলকে তার মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে কেউ হাসি-মসকরা করেছিল- যা তার মনে গেঁথে গিয়েছিল এবং যা তিনিই কখনোই ভুলতে পারেননি| আবার কোনো কোনো গবেষক মনে করেন,‘‘হয়ত মুসলিম সমাজের প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নজরুলের বিদ্রোহ, সৈনিক ক্যাম্পে যোগদান, হিন্দু মেয়েকে বিবাহ করা এমন কিছু ব্যাপারে গ্রামবাসী তার পরিবারকে নানানভাবে হেস্তনা করতো| এসব লাঞ্চনা ও কটুক্তির কারণে তার মা তার ছেলেকে হয়তো প্রকাশ্যে তেমন সমর্থন ও স্নেহ করতে পারেননি|’’ কবি কাজী নজরুল ইসলামের ছেলে কাজী সব্যসাচীর মৃত্যু হয় ১৯৭৯ খ্রি. ২ মার্চ| মৃত্যুর কয়েকদিন আগে মায়ের সাথে কবির অভিমান নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন কলকাতার ড. সুশীল কুমার গুপ্ত| কবির ছেলে বলেছিলেন,‘‘গ্রামের রক্ষণশীল পরিবেশ মূলত কবিকে গ্রাম ও ¯^জন থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল| নজরুলের এমন আরো কিছু কার্যকলাপ রয়েছে যা সমাজে যা সমাজে এমনভাবে বুঝা যায় না|”

তবে মায়ের সঙ্গে নজররুলের ঝগড়া এবং অভিমানের কারণ জানা না গেলেও অনুমান করা শক্ত নয় যে, মায়ের কোনো আচরণের নজরুল একটা প্রচন্ড মানসিক আঘাত পেয়েছিলেন- যার দরুন আর কোনো দিন চুরুলিয়া ফিরে যেতে রাজি হননি| এমন কি ১৯২৮খ্রি. ৩০ মে চুরুলিয়ায় মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়েও নজরুল গ্রামের বাড়িতে যাননি| শেষবারের মতো মায়ের মুখ খানি দেখেননি| অবশেষে একবুক কষ্ট নিয়ে জাহেদা খাতুন এ পৃথিবী থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করেছেন| মা জাহেদা খাতুন পুত্র নজরুলকে এক নজর দেখার জন্য অন্তিম বাসনা প্রকাশ করেছিলেন| জাহেদা খাতুনের মাতৃ হৃদয়ের এই অতৃপ্ত হাহাকার কি নজরুল জীবনে কোনোই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি? কে জানে নজরুলের ৩৪ বছরের জীবন্ত-মৃত অবস্থার জন্য তার মায়ের অতৃপ্ত আত্মার অভিশাপই দায়ী কিনা| মায়ের জীবদ্দশায় কবি কখনোই এ সম্পর্কে মুখ খোলেননি| ফলে নজরুলের জীবনে এটি আজো অমীমাংসতি অধ্যায় হিসেবেই রয়ে গেছে|

চার.
অভিমানের বশে হউক বা অন্যকোন কারণেই হউক মায়ের সঙ্গে নজরুল সম্পর্ক ছিন্ন ছিল একথা সত্য| তবে পরবর্তী সময়ে নজরুলের বুভুক্ষু মন কিন্তু সবর্দা কাঙ্গালের মতো কেঁদে ফিরেছে মাতৃস্নেহের সামান্যতম পরশ পাওয়ার জন্য| তাই আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন সময়ে কতিপয় মহীয়সী নারীকে তিনি প্রাণ ভরে “মা” বলে সম্মোধন করেছেন| তাদের কবি যেমন মায়ের মতোই অন্তর দিয়ে ভক্তি শ্রদ্ধা করেছেন| তেমনি তারাও তাকে পুত্রের মতো স্নেহ করেছেন| নজরুলের ‘মা’ সম্মোধনে যারা ধন্যা হয়েছিলেন তাদের মধ্যে কুমিল্লার দৌলতপুরের আলী আকবর খানের মেজো বোন নার্গিসের খালা আম্মা এখতারুন্নেসা খানম, বিপ্নবী হেমপ্রভা দেবী, হুগলীর মিসেস এম রহমান, কুমিল্লার বিরজা সুন্দরী দেবী এবং দেশ বন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের স্ত্রী বাসন্তী দেবী অন্যতমা প্রমূখ| নজরুল নার্গিসের বিয়ের ব্যাপারে যখন খাঁ পরিবারের সবাই ছিলেন গররাজি তখন এই এখতারুন্নেসাই সবার ওপরে প্রভাব বিস্তার করে সেই বিয়েকে সম্ভব করে তুলেছিলেন| ১৯২১ খ্রি. ১৭ জুন নজরুলের সঙ্গে নার্গিস বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন (বিয়ে নিয়ে অনেক মতানৈক্য আছে)| এ সময় এখতারুন্নেসা খানম মায়ের মতোই নজরুলের সব আবদার পূরণ করতেন| এখতারুন্নেসা ছাড়া আর কাউকে কবি পাত্তাই দিতেন না| নজরুলকে তিনি এতটা আপন করে নিয়েছিলেন যে, ভাইদের কাছে প্রাপ্য তিনি তার পৈত্রিক সম্পত্তি নজরুলের নামে লিখে দেওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন| তিনি ছিলেন নিঃসন্তান|

বহুনারীর মাতৃস্নেহ আদর, মমতা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়েছেন কবি| এমনি ধরনের আরেক অগ্নিকন্যা হেমপ্রভা দেবীকে নজরুল ‘মা’ বলে ডাকতেন| এই হেমপ্রভা দেবীকে নিয়ে কবি রচনা করেন ‘হৈমপ্রভা’ কবিতাটি| ১৩৩২ বঙ্গাব্দের ২৯ ফাল&গুন কবি মাদারীপুরে মৎস্যজীবী সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন| প্রগতিশীল শান্তি আন্দোলন ও নারী জাগরণের অগ্রসেনানী হেমপ্রভাও ওই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন| কবি এই মহীয়সী নারীকে নিয়ে ১৯২৬ খ্রি. রচনা করেন হৈমপ্রভা কবিতাটি|

কোন অতীতের আঁধার ভেদিয়া
আসিলো আলোক জননী|/প্রভায় তোর উদিল প্রভাত
হেমপ্রভা হল ধরণী/এসো বাংলার চাঁদ সুলতানা
বীর মাতা বীর জায়া গো|/তোমাতে পড়েছে সকল কালের
বীর নারীদের ছায়াগো/শিব সাথে সতী শিবানী সাজিয়া
ফিরছি শ্মশানে জীবন মাগিয়া,/তব আগমনে নব বাঙালীর
কাটুক আঁধার রজনী (সংক্ষেপিত)

প্রমীলা নজরুলের বিয়ে হয় ১৯২৪ খ্রি. ২৫ এপ্রিল, তাদের যখন বিয়ে হয় তখন প্রমীলার বয়স ১৪ আর নজরুলের ২৩| মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার ঐতিহ্য বাহী তেওতা গ্রামে প্রমীলা সেন গুপ্তার জন্ম| পিতার নাম বসন্ত কুমার সেন গুপ্ত| নজরুলের শাশুড়ির নাম গিরিবালা দেবী| তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণের মেয়ে| নজরুল তার নিজের শাশুড়ি গিরিবালা দেবীকে কোনো দিন ‘মা’ বলে ডাকেননি| তাকে ডাকতেন ‘মাসিমা’ বলে| তিনি নজরুলকে সম্মোধন করতেন ‘নুরু’ বলে| শ্রীযুক্ত গিরিরবালা দেবী তার ¯^ামী বসন্ত কুমার সেন গুপ্তের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী ছিলেন এবং একটি মাত্র সন্তান প্রমীলা জন্মাবার পরেই তিনি বিধবা হয়েছিলেন| তার ¯^ামী বসন্ত কুমার সেন গুপ্তের প্রথমা স্ত্রী বর্তমান থাকা অবস্থাতেই তিনি গিরিবালা দেবীকে বিয়ে করেছিলেন| গিরিবালা দেবীর ‘জা’ ছিলেন বিরজা সুন্দরা দেবী|

হুগলী জেলে নজরুল ৩৯ দিনের অনশনে ছিলেন| সেই অনশন ভাঙ্গনোর চেষ্টা করেছেন- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র, চিত্তরঞ্জন দাসসহ অনেকে| কিন্তু তারা কেউ অনশন ভাগাতে পারেননি| এমনকি নজরুলের মা জোবেদা খাতুন এই অনশন ভাঙ্গানোর চেষ্টা করেছিলেন, বহু আকুতি করেছিলেন| কিন্তু মায়ের সাথে দেখাও করেননি| ফলে সেদিন একবুক কষ্ট নিয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল দুর্ভাগা মা’কে| কিন্তু প্রমীলার জেঠী বিরজা সুন্দরী দেবীকে যে নজরুল ‘মা’ বলে সম্মোধন করতেন; তিনিই নজরুলকে হুগলী জেলে নিজ হাতে লেবুর রস পান করিয়ে দীর্ঘ ৩৯ দিনের অনশন ভঙ্গ করিয়ে ছিলেন| সেদিন নজরুলের অনশন ভাঙিয়ে জেল থেকে বাইরে এসে অপেক্ষামান জনতার উদ্দেশে বিরজা সুন্দরী দেবী বলেছিলেন- ‘‘খাইয়েছি পাগলকে, কথা কি শোনে| বলে না, অন্যায় আমি সইব না’ শেষ পর্যন্ত আমি হুকুম দিলাম, আমি ‘মা’| মা’র আদেশ সব ন্যায় অন্যায় বোধের ওপরে| লেবুর রস খাইয়ে এসেছি|’’ ১৯২৬ খ্রি. অক্টো¤^র মাসে প্রকাশিত হয় কবির বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সর্বহারা’| কবি এই গ্রন্থটি বিরজা সুন্দরী দেবীকে উৎসর্গ করেন| উৎসর্গ কবিতাটিতে নজরুল লিখেন-

‘মা (বিরজা সুন্দরী দেবী)র শ্রী চরণার বিন্দে’
সর্বসহা সর্বহারা জননী আমার|
তুমি কোনো দিন কারো করনি বিচার|
কারেও দাওনি দোষ, ব্যথা বারিধির
কুলে বসে কাঁদো মৌনা কন্যা ধরণীর|
হয়তো ভুলেছো মাগো, কোন একদিন,
এমনি চলিতে পথে মরু-বেদুইন|
শিশু এক এসেছিল, শ্রান্ত কণ্ঠে তার
বলেছিল গলা ধরে ‘মা হবে আমার?’

বিরজা সুন্দরী দেবী সপরিবারে কলকাতা চলে আসার পর কবি নিয়মিত তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন| ১৯৩৮ খ্রি. কলকাতায় এই মহীয়সী নারী দেহ ত্যাগ করেন| নজরুল এ সময় তার শয্যাপাশে উপস্থিত ছিলেন|

বহরমপুর জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর যে পরিবারের সঙ্গে কবির পরিচয় হয়, সে পরিবারের কর্ত্রী সুনীতি বালাকেও কবি মায়ের আসনে রাখেন| নজরুল জীবনে সাহিত্য যেমন ছিল, ঠিক তেমনটি ছিল নারীর অবদান| কবি তার সুখ-দুঃখ অভিমান মুখে প্রকাশ না করে সাহিত্যের মাঝে তুলে ধরেছেন| মায়েদের নিয়ে লিখেছেন একের পর এক কবিতা| এই কবির সাহিত্য মানেই নারীর অবদান| এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না|

হুগলীর এক মহীয়সী নারী বিশিষ্ট সমাজ সেবিকা এবং লেখিকা মিসেস এম রহমানকেও নজরুল অপরিসীম শ্রদ্ধা ভক্তি করতেন| তাকেও ‘মা’ বলে ডাকতেন| তার প্রকৃত নাম মোছাম্মদ মাসুদা খাতুন| জন্ম ১৮৮৪ সালে| হুগলীর সরকারি উকিল খান বাহাদুর মজহারুল আনওয়ার চৌধুরীর কন্যা এই মিসেস এম রহমান নজরুর ইসলামকে বিশেষ স্নেহ করতেন| তার ¯^ামী ছিলেন ¯^নামধন্য বিখ্যাত সাংবাদিক ও সাহ্যিতিক মুজিবর রহমান| সেকালে যা ছিল অ¯^াভাবিক চিন্তা হিন্দু মেয়ে প্রমীলা ও মুসলমান ছেলে নজরুলের মধ্যে বিয়ে| বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে নজরুল প্রমীলার ক্ষেত্রে তিনি তাই বাস্তাবায়ন করেন| কলকাতায় নজরুল-প্রমীলার বিয়ে হয় ১৯২৪ খ্রি. ২৫ এপ্রিল| বিয়ের পর নব দম্পত্তির বসবাসের জন্য তিনিই হুগলীতে নজরুলকে বাসাভাড়া করে দেন| তিনি কাজী নজরুলের প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা ‘‘ধূমকেত’র’’ যে নারী বিভাগের ‘সন্ধ্যাপ্রদীপ’ এর নিয়মিত লেখিকা ছিলেন- মিসেস এফ. রহমান| এই বিদুষী মহিলা ১৯২৬ খ্রি. ২০ ডিসে¤^র ইন্তেকাল করেন| তার মৃত্যুতে শোকাহত নজরুল রচনা করেন ‘মিসেস এম রহমান’ নামের বিখ্যাত কবিতাটি| কবিতাটির শেষ পদের ৬টি চরণ এখানে তুলে ধরা হলো-

তোমার মমতা মানিক আলোকে চিনিনু তোমারে মাতা,
তুমি লাঞ্ছিতা বিশ্ব-জননী! তোমার আঁচল পাতা|
নিখিল দুঃখী নিপীড়িত তরে, বিষ শুধু তোমা দহে,
ফনা তব মাগো পীড়িত নিখিল ধরণির ভার বহে|
আমারে যে তুমি বাসিয়াছ ভালো ধরেছ অভয়-ক্রোড়ে,
সপ্ত রাজার রাজৈশ্বর্য মানিক দিয়াছ মোরে|

এই কবিতার প্রতিটি ছত্রে যেন মাতৃশোকে বিহ&বল কবির কান্না উথলে উঠেছে| এ সময় নজরুল ইসলাম সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনকে একটি পত্রে লিখেছিলেন মা’র (মিসেস এম. রহমান) মৃত্যু সংবাদ পেয়ে আমার সবকিছু গুলিয়ে গেল| বাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে গিয়েছিল| আপন পেটের ছেলে চেয়েও বেশি স্নেহ করতেন আমায়| আমি তার প্রতিদানে কিছুই দিতে পারিনি| আমি আজ দেউলিয়া যেন জীবনের জোয়ার-ভাটা দেখছি শুধু| এখানে উল্লেখ্য, নজরুল যখন একজন পাতানো মায়ের মৃত্যুতে শোকের বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন তখন গর্ভধারিণী মায়ের কোনো খোঁজখবর রাখারও প্রয়োজন মনে করছেন না| এ সময়ে কবির নিজের ‘মা’ জীবিত ছিলেন| নজরুলের ‘মা’ জাহেদা খাতুন মারা যান ১৯২৮ সালের ৩০ মে|

এই সময় আরেকজন মহীয়সী নারীকে তিনি প্রাণ ভরে ‘মা’ বলে সম্মোধন করতেন| তিনি হচ্ছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সহধর্মিণী বাসন্তী দেবী| তিনিও তাকে সন্তানতুল্য স্নেহ করতেন| দেশ বন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের (জন্ম ১৮৭০ খ্রি. মৃত্যু ১৬ জুন ১৯২৫ খ্রি.) বাড়িতে গেলে বাসন্তী দেবী নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করে কাছে বসে কবিকে খাওয়াতেন| দেশ বন্ধুর মৃত্যুর পরে কবি নজরুল শোকগাথামূলক যে চিত্তনামা কাব্যগ্রন্থটি রচনা করেন সেটিও উৎসর্গ করেছিলেন বাসন্তী দেবীর নামে ‘ইন্দ্র পতন’ কবিতায় নজরুল চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যুকে স্মরণ করে লিখেলেন-
জন্মিলে তুমি মোহাম্মদের আগে, হে পুরুষ বর!
কোরানে ঘোষিত তোমার মহিমা, হতে পয়গা¤^র!
যে জ্যোতি পারেনি সহিতে ¯^য়ং মুসা ও কোহ-ই তুরে,
সেই জ্যোতিঃ তুমি রেখেছিলে তব নয়ন মণিতে পুরে| (সংক্ষেপিত)

যাই হোক, আমরা দেখতে পাচ্ছি মায়ের মৃত্যু সংবাদ শুনে, যিনি গ্রামের বাড়িতে যাননি, তিনিই আবার পাতানো মায়ের মৃত্যুতে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন| অদ্ভুত রহস্য ভরা এই মানুষের মন| খেয়ালী কবি নজরুলের খামখেয়ালি তো আর কম ছিল না| কে জানে মায়ের সঙ্গে বিরোধ জিইয়ে রেখে মাকে কষ্ট দিয়ে নিজে কষ্ট পেয়ে অন্য মহিলাদের প্রাণ ভরে ‘মা’ ডেকে তার বুভুক্ষু হৃদয়ের মাতৃস্নেহের তৃষ্ণা মেটানোর বিষয়টিও তেমনি খেয়ালিপনা ছিল কি-না|

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে একথাই প্রমাণিত হয় যে, চির ক্ষুব্ধ, চির অভিমানী, খেয়ালি নজরুল নিজের মায়ের থেকে দূরে সরে গিয়ে মাতৃস্নেহ পাওয়ার জন্য উন্মাদের মতো ছুটে বেরিয়েছেন এবং যার কাছেই সে স্নেহটুকু পেয়েছেন তাকেই হৃদয়ের সবটুকু শ্রদ্ধা, ভালোবাসা উজাড় করে দিয়ে প্রবল আবেগে আঁকড়ে ধরেছেন| কিন্তু এতদসত্ত্বেও এই পাতানো নকল মায়েরা কি মাতৃস্নেহের কাঙাল কবির মায়ের অভাব সবটুকু পূরণ করতে পেরেছেন কী ?

তথ্য সূত্র ঃ
১. কবি নজরুল বিচিত্র পথের পথিক : সম্পাদিত আফরিনা হোসেন হোসেন রিমু|
২. নজরুল জীবনের নারী ও প্রেম ঃ ড. আবুল আজাদ|
৩. নজরুল জীবনের ট্রাজেডি ঃ শেখ মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম|
৪. নজরুল প্রতিভার নানা দিগন্ত ঃ আফতাব চৌধুরী|
৫. নজরুল জীবনের শেষ অধ্যায় ঃ সুফী জুলফিকার হায়দার|
৬.নজরুল ও নাসির উদ্দিন (স্মারক গ্রন্থ) ঃ সম্পাদিত মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ |
৭. কাজী নজরুল ইসলাম : তিন অধ্যায় ঃ আব্দুল মান্নœান ˆসয়দ|
৮. বিদ্রোহী রণক্লান্ত (নজরুল-জীবনী) ঃ গোলাম মুরশিদ|

Loading