শুক্রবারের কতিপয় আমল

প্রকাশিত: ৬:০৪ অপরাহ্ণ , জুলাই ২১, ২০২০

মো. বাকী বিল্লাহ খান পলাশ

শুক্রবার মুসলমানদের জন্য অতি বরকতময় একটি দিন। এদিনটিকে মহান আল্লাহ তাআলা ইহুদী ও নাছারাদের উপর ফরয করেছিলেন। কিন্তু তারা মতবিরোধ করে দিনটিকে প্রত্যাখ্যান করে। অতঃপর ইহুদীরা শনিবার এবং খ্রিষ্টানরা রবিবারকে তাদের ইবাদতের দিন বানায়। অবশেষে আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য এক মহান ও ফযীলতের দিন হিসাবে শুক্রবার দিনটিকে দান করেন। যা উম্মতে মুহাম্মদী সাদরে গ্রহণ করে (বুখারী, হাদিস নং. : ৮৭৬, মুসলিম, হাদিস নং. : ৮৫৫)। অথচ কিছু অজ্ঞতা এবং অতি ধর্মীয় কিছু অনুভূতি থেকে আমরা এদিনে এমন কিছু আমল করি বা দিনটিকে নিয়ে আমরা এমন কিছু ভাবি যার সমর্থনে পবিত্র কোরআন এবং হাদিসে কোন দলীল খুঁজে পাওয়া যায় না। এমন কিছু ষিয়ষ নিয়ে নি¤েœ আলোচনা করা হলো।

ক. শুক্রবারেই কবর জিয়ারত করা :
কবর জিয়ারত করা জায়েয এবং সুন্নত। রাসূল (ছা.) এ ব্যাপারে আমাদের উৎসাহ প্রদান করেছেন। হাদিসে এসেছে, বুরাইদা আসলামী মহানবী (ছা.) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি তোমাদের করব জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু আমাকে আমার মাতার কবর জিয়ারতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। সুতরাং তোমরা তোমাদের মৃতদের কবর জিয়ারত কর। কেননা তা তোমাদের আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং. : ১০৭)।
সাধারণত শুক্রবার জুমু‘আর নামাজের পর মুসল্লিগণ গোরস্থানে কবর জিয়ারত করতে যান এবং সেখানে যথেষ্ট ভিড় লক্ষ করা যায়। এথেকে প্রশ্ন এসে যায় যে, শুক্রবারে করব জিয়ারত করাকি আবশ্যক এবং অধিক ছোয়াবের কাজ। এ সম্পর্কে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, শুক্রবার জুমু‘আর ছালাতের পর অবসর রয়েছে সুতরাং এ সময় কোন ব্যক্তি কখনো কখনো কবর জিয়ারত করতে পারেন কিন্তু এটাকে শুক্রবারের অবশ্য করণীয় কাজ বা এটাকে সুন্নত বানিয়ে ফেলার কোন সুযোগ নেই। কেননা কুরআন এবং হাদিসে করব জিয়ারতের জন্য শুক্রবারকে নির্ধারণ করা বা শুক্রবারের নির্দেশিত আমলগুলোর মধ্যে কোথাও করব জিয়ারতের কথা উল্লেখ নেই।
তাছাড়া শুধু শুক্রবার কবর জিয়ারত করা সম্পর্কে যে হাদীস বর্ণিত হয়েছে তা জাল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, উক্ত হাদিস এর সনদে মুহাম্মদ ইবনু নু’মান নামের যে রাবী রয়েছেন তিনি অপরিচিত এবং ইয়াহইয়া নামের রাবী মিথ্যুক (সিলসিলা যঈফাহ, হাদিস নং. : ৫৬০৫, মিশকাত, হাদিস নং. : ১৬৭৬)।

খ. নফল রোজা শুক্রবারে রাখা :
শুক্রবার হলো সাপ্তাহিক ঈদের দিন (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং. : ১০৯৮)। নফল রোজা রাখার জন্য শুক্রবারকে নির্ধারণ বা নিদিষ্ট করে নেয়া নিষেধ। তবে কেউ যদি বৃহষ্পতি এবং শুক্রবার অথবা শুক্র ও শনিবার রোয়া রাখেন অথবা আইয়ামুল বিজের অর্থাৎ প্রত্যেক আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোয়া পালন করতে গিয়ে যদি সেটা শুক্রবারে পড়ে যায় তবে তা যায়েজ। এ সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত রাসূল (ছা.) ইরশাদ করেন, তোমাদের কেউ জুমু‘আর আগে বা পরে একদিন মিলানো ব্যতিত শুধুমাত্র জুমু‘আর দিন রোয়া রেখো না (সহীহ বুখারী, হাদিস নং. : ১৮৮৪, মুসলিম, হাদিস নং. : ২৫৪৫)।

গ. শুক্রবারে মৃত্যু হলে জান্নাত :
অনেকেই এ কথা বলে থাকেন যে, শুক্রবারে জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয় সুতরাং এদিন কেউ মৃত্যু বরণ করলেই বিনা হিসাবে জান্নাতে চলে যাবে। কিন্তু উক্ত মর্মে কোন দলীল কোরআন বা হাদিস কোথাও খুজে পাওয়া যায় না। বরং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, যেকোন মুসলমান জুমু‘আর দিনে কিংবা জুমু‘আর রাতে মৃত্যুবরণ করবে। নিশ্চই আল্লাহ তাআলা তাকে কবরের ফেতনা থেকে বাঁচিয়ে রাখবেন (তিরমিজী, হাদিস নং. :১০৯৫, মিশকাত, হাদিস নং. :১৩৬৭)। উপর্যুক্ত হাদিসের আলোকে ইসলামি স্কলারগণ বলে থাকেন যে, শুক্রবারে মৃত্যুবরণ করলে বিনা হিসাবে জান্নাত বা কিয়ামত পর্যন্ত কবরের আযাব মাপ এ কথা বলার কোন সুযোগ নেই। এ সম্পর্কে মুল্লা আলী কারী (রহ.) তাঁর ‘মিনাহুর রওদিল আযহার ফি শরহে ফিকহুল আকবার’ (পৃষ্ঠা : ২৯৫-২৯৬) এ বলেন, জুমু‘আর দিনে জুমু‘আর রাতে যে মারা যাবে তার থেকে কবরের আজাব উঠিয়ে নেওয়া হবে এটা মোটামুটি প্রমানিত। তবে কিয়ামত পর্যন্ত আর আজাব ফিরে আসবে না এ কথার কোন ভিত্তি আমার জানা নেই।’

ঘ. জোহরের ছালাত জুমু‘্আর পরে :
অনেকেই এ কথা বলে থাকেন যে, বাড়ীতে মহিলাদের জোহরের ছালাত জুমু‘আর পরে পড়তে হবে। কিন্তু এনটিভি প্রচারিত আপনার জিজ্ঞাসা প্রশ্নোত্তর পর্বে ড. মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ বলেন, যেহেতু মহিলাদের জন্য জুমু‘্আর ছালাত ওয়াজিব নয় সুতরাং ওয়াক্ত হলেই তারা বাড়ীতে জোহরের ছালাত আদায় করতে পারবে। এর জন্য তাদের জুমু‘আর খুৎবা বা জুমু‘আর ছালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার কোন প্রয়োজন নেই। কেননা মহিলাদের জোহরের ছালাত জুমু‘আর পর পড়তে হবে মর্মে কোন দলিল কোরআন বা হাদিসে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রত্যেকটি আমল জেনে বুঝে করার তৌফিক দান করুন। আমীন।
সহায়ক গ্রন্থ ও উৎস সমূহ :
১. প্রশ্নোত্তরে জুমু‘আ ও খুৎবা – অধ্যাপক মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম
২. জিজ্ঞাসা ও জওয়াব, মাসিক আল-ইখলাছ, ডিসেম্বর ২০১৯ সংখ্যা
৩. শুক্রবারে মৃত্যু বরণ করলে কিয়ামত পর্যন্ত কবরের আযাব কি বন্ধ থাকে? – আল মাজলিসুল ইলমী
৪. আপনি জানেন কি ঈদের দিন বা জুমু‘আর দিন কবর জিয়ারত করা কি সুন্নত না বেদাত – শায়খ আহমাদুল্লাহ
লিংক 🙁https://www.youtube.com/watch?v=I6euayFF44c)

৫. মহিলারা শুক্রবারে জোহরের নামাজ কখন পড়বে – ড. মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ

: https://www.youtube.com/watch?v=j14-OL5J8MM