ছোট গল্প

মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ’র ছোট গল্প ’মেন্টাল জাহাঙ্গীর’

প্রকাশিত: ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ , জুলাই ২১, ২০২০
মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ

মেন্টাল জাহাঙ্গীর 

              –মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ

জাহাঙ্গীর সাব তার অফিসে সুপরিচিত।ঝাড়ুদার থেকে বস পর্যন্ত সবগুলো মানুষ খুবই প্রীত। ছোট বড় কোনো ধরনের অপরাধ তার ধারে কাছে ঘেঁষতে পারে না।তার পাশের টেবিলের তোতা মিয়া,জালু ভাই,আদম আলী,বড় কাদূ,ছোট কাদু,মরিয়ম আন্টি সবার টেবিলেই নীচ দিয়ে একধরনের দুষিত প্রপোজাল আসা যাওয়া করে।ওদের দিনের চেহারাও রমরমা।শহরে জায়গাজমি,বাসার মালিক,সন্তানেরা প্রাইভেট ভার্সিটি তে, শালা সমন্দিরা অষ্ট্রেলিয়া, কেনাডা, পুনে, মুম্বাই, দুবাই,সি্ঙগাপুর—। এসব গল্প জাহাঙ্গীর সাব হা করে শোনেন।ওনার বৌ’টা আটপৌরে শাড়ি পড়া গৃহিণী। পাতালতা,ভর্তাভাজির রেসিপিতে আটকে থাকা।সেলাইকলে পড়ে থেকে,অন্যের বাচ্চাদের পড়িয়ে মাস শেষে জাহা্ঙ্গীর সাবের হাতে কিছু টাকা তুলে দিয়ে মিসেস তনিমা যখন বলে—যাও,আজই নতুন পেন্ট বানাবে।—তখন মনে হয় পৃথিবী আর পৃথিবী নেই।পুরোটাই স্বর্গ। মুক্তিযুদ্ধ করেও সনদের পেছনে ছোটেনি,এটা বুক ফুলিয়ে তাদের ছেলেরা বন্ধুদের সামনে নিশ্চিন্তে বলতে পারাটার মধ্যে শক্তি খুঁজে পায়। ছোট ছেলেটা বুয়েট থেকে বেরিয়ে বাইরে যাচ্ছে, খবরটা অফিসে ভাইরাল হয়ে গেলে বস আক্ষেপ করে বলেন –ব্রাভো জাহাঙ্গীর সাহেব। দুঃখও করেন উনি।উনার ছেলেটা নাকি কোন একটাা মেয়েকে—-! এখন হাজতে।বড় মেয়ে বখাটে একটার সাথে পালিয়েছে। সেই জাহাঙ্গীর সাহেব একটা ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসার জন্য তিন লাখ টাকা ডোনেট করছেন। অফিসে হেল্প চেয়েছিলেন।কলিগদের পার্সগুলো অনেকেরই খালি।দারুণ অভাব অনটন তখন সবার সংসারে।অথচ বসের ভাগ্নের বিয়েতে পারহেড পাঁচ হাজার টাকা অকাতরে সবাই দিয়েছে। বিদেশী একটা সংস্থার লোকজন জাহাঙ্গীর সাবকে খুঁজছে। কেন খুঁজছে—বস লোক লাগালেন। জানা গেল ক্যান্সার চিকিৎসায় শিশুটাকে হেলপ করার জন্য জাহাঙ্গীর সাবকে সংবর্ধনা দেবে। অফিসে দাওয়াত কার্ডটা পৌঁছুলে বস ওটা ছিঁড়ে ফেলতে চাইলেন।এক পর্যায়ে উনার রুমেই চলে এলেন বস।জানতে চাইলেন কীীভাবে ম্যানেজ করলেন? জাহা্ঙ্গীর সাব কেবল মুচকি হাসেন।এও প্রস্তাব করেন, পদকটা উনার অফিসের বস হিসেব উনি নিজে গ্রহন করতে চান। জাহাঙ্গীর সাব একবার মুখ তুলে তাকান। প্রোগ্রামের দিন আয়োজকদের গাড়ি ফিরিয়ে দিলেন জাহাঙ্গীর সাব।বললেন,আমি রিকশা করে যেতে পারব।গাড়ি লাগবে না।তারচে বরং বসকে নেয়ার ব্যবস্থা করুন। প্রোগ্রামে বসকে রিসিভ করে ভিআইপি রুমে নিয়ে গেল সুন্দরীরা।জাহাঙ্গীর সাহেব রিকশা করে পৌছেছেন আধঘন্টা আগে।কিন্তু বস পৌঁছার দেড় ঘন্টা লেইট।সবাই প্রোগ্রাম শুরু করতে চাইলে জাহাঙ্গীর সাব রিকোয়েস্ট করলেন বসের জন্য।বললেন,তারপরেও তো তিনি আমার বস। পদকটা বসই গ্রহন করলেন। একফাঁকে বস বললেন,ওরা আপনাকে কত টাকা দিলো? জানিনা তো। খুলে দেখুন তো। এখানেই?কিন্তু— আরে ওটা দিন তো আমার কাছে।আপনি না একটা—।মানুষ আর হলেন না। বস সম্মানী র প্যাকেটটা নিয়ে হাসতে হাসতে ভিআইপি রুমে চলে গেলেন।বলে গেলেন এখানেই থাকুন।টাকাটা আমার কাছেই থাক। সবাই লাঞ্চের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। জাহাঙ্গীর সাহেব কে পাওয়া যাচ্ছে না।তিনি একটা খাবারের প্যাকেট নিয়ে বেরিয়ে গেছেন। সংস্থার লোকজন দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছে।পাওয়া গেল পাশের পার্কটাতে তিনি টোকাইদের নিয়ে আজকের লাঞ্চের প্যাকেট শেয়ার করছেন।চারপাশে মানুষ জমে গেছে কেউ কেউ মুখ লুকিয়ে হাসছে,বলছে লোকটা পাগল টোকাইরা খাচ্ছে,হেসে কুটি কুটি। ভীড় ঠেলে বস ঢুকে গেছেন। এই যে আপনি কই হাওয়া হয়ে গেলেন? স্যার,ওরা ক্ষুধার্ত।ওদেরও মনে চায় এমন কিছু খাবার।চাইলে আপনিও—- বুঝতে পারছি, আপনি মেন্টাল হইয়া গেছেন।ওঠেন। টেনে হিঁচড়ে জাহাঙ্গীর সাবকে নিয়ে সবাই ছুটলো।বাসায় পৌছিয়ে দিলো ওরা। পরদিন অফিস আবার ভাইরাল হলো।হাসিঠাট্টার তুফান এবং ফান সমানতালে ছুটছে।বস বলে দিলেন আপনার মতো পাগল আমার অফিসের বারোটা বাজানোর আগেই বরং রিজাইন দিন। কিন্তু, স্যার আমার কোন কাজটা ——? বসকে ভালো করেই জানেন জাহা্ঙীর সাব।উনি যা বলেন,একবারই। বাসায় ফিরেছেন চাপা কষ্ট নিয়ে।মিসেস তনিমা, ছেলেরা সাহস দিলো।একটা কিছু সমাধান হবেই।সমস্যা চিরদিন থাকেনা।মেনে নিয়েই জাহাঙ্গীর সাব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেন।সময় কাটান,বাজারে যান,হাঁটেন,টিভির সামনে বসেন। অফিসের কলিগদের খোঁজখবর নেন।ওরাই জানালো,বস অসুস্থ। ক্লিনিকে ভর্তি।কিডনির সমস্যা।একটা ড্যামেজ।দেশে ম্যানেজ না হলে বাইরে যেতে হবে। কিন্তু যেতে হয়নি।ম্যানেজ হয়ে গেছে। বস কিছুটা সুস্থ হয়ে ফিরেছেন।অফিসে সবাই উনার সৌভাগ্য নিয়ে খোশগল্পে মেতেছেন। কেউ একজন জানালো,উনার কিডনী ট্রান্সপ্লান্টেশনে জাহাঙ্গীর সাব বিরাট ভুমিকা নিয়েছেন।উনার নিজের কিডনিটা ডোনেট করেছেন। উনি সবাইকে মানা করেছিলেন বিষয়টা কাউকে না জানাতে।কিন্তু চাপা থাকেনি। বস গাড়ি বের করতে বললেন। জাহাঙ্গীর সাবের বাসায়পৌছে দেখেন বড় একটা তালাা।একজন হকার জানালো,লোকটা বড় ভালা আছিলো।দুইদল হারামজাদায় গোলাগুলি শুরু করলো আর জাহাঙ্গীর বাই মদ্যিখানে পইড়া নাই——! নাই মানে? হ ‘ছার।নাই।আদা গনটা অইছে উনার লাশ লইয়া বেকতে গেরামে গেছে।উনি আমারে বিরাট আদর করতেন।গত ঈদে আমারে একটা লুঙ্গী আর বৌ রে শাড়ি কিন্যা দিছিলেন। হকার চোখ মুছতে মুছতে চলে যাচ্ছে। বস গাড়ি ঘোরালেন গন্তব্য হিরন পুর। ঢাকাতে আড়াই ঘন্টা লেগে গেল।গাজীপুরে দেড়,শম্ভুগঞ্জ ব্রীজে দেড়। যখন হীরনপুর তখন মাগরেব।আার জাহাঙ্গীর সাব মাটির গভীরতম ঘ্রাণ নিচ্ছেন। হয়তবা মুনকার নাকিরের ইন্টারভিউটাও শেষ হয়ে গেছে।কত মার্ক পেয়েছেন? বসের চোখ থেকে গড়ানো গরম জলে ভাঁপে মাটিটা উষ্ণ হতে শুরু করেছে মেন্টাল জাহাঙ্গীর টার জন্য।

লেখক: বাংলাদেশ জাতীয় কবি পরিষদের সম্মানিত উপদেষ্টা । বিশিষ্ট কবি, চিত্রশিল্পী ও হোমিও চিকিৎসক ।