সুমী সিকানদার এর ছোটগল্প ‘কফিকথা’

প্রকাশিত: ১:১৪ পূর্বাহ্ণ , জুলাই ১৬, ২০২০
সুমী সিকানদার এর ছোটগল্প
  ‘কফিকথা’
 
ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছি না। আমি আগেই এসে পৌছেছি। এই নিয়ে তৃতীয় বছর। নির্ধারিত সময়ের আগেই এসে পৌছাই। সামনে ব্ল্যাক কফি । ল্যাপ্টপ অন করে স্ক্রিনের চারদিকে চোখ বুলাই।
সে আমার আগে চলে আসুক আমি চাই না। তার ঢোকার মুহূর্তটা কেমন আলো হয়ে আসে চারপাশ থেকে । মৃদু শব্দ করতে শুরু করে জানালার পাশে ছটফটে উইন্ডচ্যাম। আমি এ সমস্ত আলো আর শব্দের যৌথরঙ কে একত্রে দেখতে চাই। চকোলেট রঙ এর বেতের আসন সেজে গুজে তৈরী, সে আসুক ।
 
কাল থেকে শুরু করে আজ সারাদিন কোন কাজ রাখিনি। পরশুদিন ফিরে যাবার ফ্লাইট । আজকের দিনক্ষণ তাকে দেয়া তাও কেবল এক ঘন্টার জন্য। একঘন্টাকে কি করে টেনে দুই ঘন্টা করা যায় সেই বুদ্ধি করছি। কেন যেন মনে হয় সে আপত্তি করবে না। কিন্তু আমি কিভাবে বলি তাই বুঝতে পারছি না।
 
গতবছরটা এই সময়ে কেটেছিলো হাল ছাড়া ভঙ্গিমায়। আমি যখন ডাক পাঠিয়েছিলাম সে নিজেই উড়ছিলো জটলারত এক পাখি সমাবেশে । চেনা অচেনা পাখিরা খাঁচায় নানা কথা বার্তা চালাচ্ছিলো। তাদের চোখমুখের চোখা ভাষা, উড়ে উড়ে গাছের ডাল থেকে অন্য খানে বসার ঢং ছিলো দেখার মত। ফলে আমার তরফ থেকে পাঠানো শব্দেরা কিছুতেই তার ইন্দ্রিয় অব্দি যেতে পারেনি।
 
দুপুরের পরও তাকে পেলাম না। কেবল ভাবছি এবারই ফোন ধরবে। চঞ্চলতা থেমে গেলে একা একাই অল্পদূরে দাঁড়ানো বটগাছের বেদীতে বসে পড়লো। চুপচাপ ‘সি- স’ তে খেলারত বাচ্চাদের দিকে মুগ্ধ তাকিয়ে রইল।
 
শিশুদের দিকে চেয়ে থাকার মত আনন্দ আর কিছুতে নেই। স্লিপারেও অনেক বাচ্চা কলকল করে কিউ দিয়ে সিড়ির মাথায় উঠছে আবার ধাঁ করে ছুটে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। এই ছুটন্ত মজাটা এই বয়সেই তুমুল পাওয়া যায়। পরে সময়ের সাথে বাকি জীবনে চেনা অচেনা কত পড়ার মুহুর্তকে যে সামলাতে হয় আর আর লেখাজোঁকা নেই। কেউ যদি জানে সে পড়ে যাচ্ছে তখন পড়ার জন্য যত না ভীত না পড়ার সিন্ধান্তে ততো বেশী আনন্দিত।
 
বর্ষবরণের প্রস্তুতির সময়টা অকারণে ভালো লাগায় । মন ছেয়ে থাকে থরে থরে সাজিয়ে রাখা হাতে আঁকা মুখোশ , যাত্রায় শোভিত মাঙ্গলিক চিহ্ণে, পটারিতে অঙ্কিত চরিত্রগুলোর কারসাজিতে । মনে হয় আমিও সৃষ্টিতে মুগ্ধ , দুর্বৃত্তদের প্রতি ক্ষুব্ধ আচরণ দেখাতে নির্ভিক। ওরা যখন হাঁটে আমি টান টান সোজা হয়ে জানালায় বসে থাকি , মন চাইছে অথচ যেতে পারিনি সে সময়।
 
আজ একটা মুখোশ নিলাম । কার জন্য , তার নাম এখানে জরুরী না। ধাঁধা থাকবে এটা কার মুখোশ বা কিসের মুখোশ বলো। সে কিছুই বলতে পারবে না । হাঁদা গঙ্গারামের মত ফ্যাল ফ্যাল তাকিয়ে থাকবে। তার এই বোকা বোকা চেহারাটা এত সুন্দর ছিলো । চেহারা বদলানো , না বদলানো তে কিছ যায় আসে না । মানুষটাও বদলে যায়নি তেমন। শুধু সময় বদলে গেছে।
 
‘’তুমি এসেছো সুহা ? ‘’
তার গলায় আনন্দ, সে দ্রুত মেনু দেখে অর্ডার দিচ্ছে। তাড়া হুড়ায় তার হাতের মোবাইল হাত ফস্কে পানিভর্তি গ্লাসে গিয়ে পড়ছে। আমি চুপচাপ দেখি।
 
মহা খুশী হয়ে সুহার জন্য কোন্ডকফি অর্ডার দিলাম বেশী করে ক্রিম দিয়ে।সাথে ক্রাশকরা চকলেট। তাকে বুঝতে চাওয়া মুহূর্ত গুলো একে অন্যকে জ্বালিয়ে ওঠে ,যেন নাকছাবির উপর ঠিকরে পড়া আলোর ঝলক। আমি তার অভিমান ভাঙ্গাতে গিয়ে, যা কিছু বুঝাতে চাই অনেক ক্ষেত্রেই আমি নিজেই তার মানে বুঝি না। সুহা’র সাথে সম্পর্ক বেশীটা গড়ায় নি আমার অদূরদর্শিতার ফলে। কিন্তু এমন একজন সহজ মানুষ কে পাওয়ার মতো সহজ মানুষ আমি ছিলাম কি?
 
এত বছর পর স্পর্শ করলে টের পেতাম সম্পর্কের অলিগলি। অস্থিরতাকে লুকানো যায় না তুরন্ত। ফিরে যাবার আগে আঙ্গুলে থাকে অনির্দিষ্ট সময় । ক্রমশঃ ভুলে যাই তুমুল বৃষ্টির মধ্যে আমরা সে বার কতটা পথ হেঁটেছিলাম ? বৃষ্টিতে চুপচুপে ভেজা ড্রেস কতটা সময় পেয়ে গিয়ে শরীরেই শুকিয়েছিলো? বহুবছরে সে সব পথের বুক থেকে আমাদের পায়ের ছাপগুলো বিলীন হয়ে গেছে।
 
চমকে দিয়ে তার ডানগালে আঙ্গুল দিয়ে ‘সুহা’ লিখি। বলো তো, আমি তোমার গালে লিখলাম, নাকি গালের ওপর প্রবল আঁকড়ে থাকা মুখোশে?
 
সামনের বছরের ধোঁয়া ওঠা হেজেলনাট দু’টি মগে রে্ডি হবে একই গন্তব্যে। সেও আসবে আধা ঘন্টা দেরীর কৈফিয়তে। আমি কেন দেখা দেবো না সেটা তখন নিজের কন্ঠে জানিয়ে দেবো , এখন থাক।