কবি নজরুলের প্রেমের গান

প্রকাশিত: ৪:৫১ অপরাহ্ণ , মে ২৪, ২০২০

কাজী নজরুল ইসলাম শুধু বিদ্রোহী কবি নন, ছিলেন প্রেমেরও কবি। তাঁর কবিতা ও গানে বারেবার ফুটেছে প্রেমের ফুল। আর প্রেমের গানে নজরুল জয় করেছেন অজস্র প্রেমিকের মন। 

চিরায়ত আদর্শ ভাব রোমান্টিকতা অতিক্রম করে নজরুল প্রেম ভাবনায় আনলেন বাস্তবতা। যে কারণে বাংলা গান তার স্পর্শে হয়ে ওঠে আধুনিক। প্রেমকে তিনি অনুভব করেন কর্মের প্রেরণায় শোকের সান্ত্বনাতেও। তেমনি বলা যেতে পারে- ‘তুমি হাতখানি যবে রাখো মোর হাতের পরে, মোর কণ্ঠ হতে সুরের গঙ্গা ঝরে।’

গান রচনার ক্ষেত্রে রাগরুপের সাথে নজরুলের এতোবেশি সখ্যতা ছিলো যে, তিনি সহজেই মিশ্রিত রাগে বা রাগ ভেঙে গান রচনা করতে পারতেন।

যদিও প্রেম ও বিদ্রোহ বৈপরিত্যপূর্ণ, কিন্তু কবির কাছে বুঝি তা হার মেনেছে। তিনি এই দুটো বিষয় সন্তরালে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। আর এ কারণেই তাঁর কবিতা ও গানে আমরা একই সঙ্গে পাই প্রেমিক ও বিদ্রোহী সত্তাকে।
বিদ্রোহী কবিতায় আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাশরী আর হাতে রণতূর্য’।

প্রেমিক কবি নজরুলের লেখা প্রেমের গানের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলোর প্রথম পঙক্তি এখানে উপস্থাপন করছি।

‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী,
দেব খোঁপায় তারার ফুল’, 

আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন-,
প্রিয় যাই যাই বলো না-, 

প্রিয় এমন রাত যেন যায় না বৃথায়,
আজ নিশীথে অভিসার তোমার পথে, 

নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল
ফুল নেব না অশ্রু নেব ভেবে হই আকুল,

নিশি না পোহাতে যেয়ো না যেয়ো না,
তব যাবার বেলা বলে যাও মনের কথা,

আমি ময়নামতির শাড়ি দেবো,
তোমার হাতের সোনা রাখি আমার হাতে, 

যাবার বেলায় ফেলে যেয়ো একটি খোঁপার ফুল, মিলন-রাতের মালা হব তোমার অলকে, ভালোবাসার ছলে আমায়,
কে নিবি ফুল কে নিবি ফুল,
পেয়ে আমি হারিয়েছি গো,
সখি বাঁধো লো বাঁধো লো ঝুলনিয়া,
এলে কি বধুঁ ফুল-ভবনে,
বুলবুলি নীরব নার্গিস-বনে,
মোরা আর জনমে হংস-মিথুন,
গভীর নিশীথে ঘুম ভেঙে যায়,
গভীর রাতে জাগি খুঁজি তোমারে,
পরো পরো চৈতালী-সাঁঝে কুসমী শাড়ি,
পিয়া পাপিয়া পিয়া বোলে,
বুকে তোমায় যৌবন-সিন্ধু টলমল টলমল, 

এই গানগুলো ছাড়াও তাঁর লেখা অসংথ্য প্রেমের গানের কথা বলা যায়।

এভাবে নজরুলের অসংখ্য কবিতা ও গানে প্রেম ও বিরহ প্রকাশ পেয়েছে। হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে কবি একা ঝরাফুল কুড়িয়ে গেছেন। প্রেমিক কবি নজরুলের গান ও কবিতা আজকের প্রেমিক প্রেমিকাদের হৃদয়তন্ত্রীকে প্রেম ভালবাসা এবং বিরহ বেদনায় অনুরণন ঘটায়।

নজরুল ঐতিহাসিক প্রেমের গানেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। যেমন- লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ, শাহাজাহান-মমতাজ, সেলিম-নুরজাহানকে নিয়ে লেখা গান।

নজরুলের জীবনে কয়েকজন নারী বিশেষ ভাবে প্রভাব ফেলেছিল। তাদের সঙ্গে প্রেম ভালবাসা সম্পর্ক গড়ে উঠলেও সেই সব প্রেম ভালবাসা পূর্ণাঙ্গতা লাভ করেনি।

নজরুলের অপেক্ষায় ১৬টি বছর কাটিয়ে দিয়েছিলেন নার্গিস। কবিকে একটি চিঠিও লিখেছিলেন। সেই চিঠির উত্তরে কবি লিখেছিলেন-

‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পারো নাই, কেন মনে
রাখো তারে, ভুলে যাও ভুলে যাও তারে একেবারে।’

নজরুলের প্রেমের গান কাব্য গীতিধর্মী, প্রেমের সঙ্গে বিরহ এবং আনন্দ বেদনার সমন্বয়ে রচিত। যেমন- ‘বঁধু মিটিল না সাধ ভালোবাসিয়া তোমায়, তাই আবার ভালোবাসিব ধরায়, মোর মনের প্রথম মুকুল, এসো প্রিয় মন রাঙায়ে, অঞ্জলী লহ মোর সংগীতে।’

মিলনের রোমান্টিক আকাক্সক্ষার প্রতিফলনও দেখা যায় তার গানে। যেমন- ‘মোরা আর জনমে হংস মিথুন ছিলাম’, ‘তোমারেই আমি বাসিয়াছি ভালো শতরূপে শতবার’।

নজরুলের প্রেমের গানে নানাভাবে প্রাধান্য পেয়েছে নারীর প্রেম ভাবনা। ‘তুমি আরেকটি দিন থাকো’, ‘বঁধু আমি ছিনু বুঝি বৃন্দাবনের রাধিকার আঁখি জলে’, ‘সই ভালো করে বিনোদবাণী বাঁধিয়া দে’, ‘আমার ভুবন কান পেতে রয় প্রিয়তম তব লাগি’ ‘ওগো রাণী, তোমার কাছে হার মানি আজি শেষে’- এসব গানে সেই চিত্রই ফুটে ওঠে।

গানে গানে প্রেমের স্মৃতিচারণও করতেন নজরুল- ‘মনে পড়ে আজ সে কোন জনমে বিদায় সন্ধ্যা বেলা, আমি দাঁড়ায়ে রহিনু এপারে, তুমি ওপারে ভাসালে ভেলা।’

নজরুলের প্রথম প্রেম সৈয়দা খানম (নজরুল তাকে নাম দেন নার্গিস, ফারসি ভাষায় যার অর্থ গুল্ম)। তবে নজরুলের জীবনে প্রেম এসেছিল বারবার, প্রিয়ার বিরহে হয়েছেন বেদনাভারাতুর।

“বুকে তোমায় নাই বা পেলাম, রইবে আমার চোখের জলে। ওগো বধূ তোমার আসন গভীর ব্যথার হিয়ার তলে।”

প্রথম নার্গিস খানম, দ্বিতীয় স্ত্রী প্রমীলা দেবী এবং তৃতীয় বেগম ফজিলাতুন্নেসা। এর মাঝে ফজিলাতুন্নেসার প্রতি কবির অনুরাগ কিংবদন্তীতুল্য। এ ছাড়াও রানী সোমসহ আরও দু-একজনের নাম এলেও সেগুলো উল্লেখ করার মতো নয়।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান ও কবিতায় প্রেম ভালবাসা উজ্জ্বল মহিমায় দীপ্যমান।

তথ্য সূত্রঃ 
কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা – মোজাফফর আহমদ
নজরুল ইসলাম – প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়ের
বহুমাত্রিক নজরুল- অনুপম হায়াৎ
নজরুল জীবনী- সৈয়দ আবুল মকসুদ

লেখক : দিলু আলী, সমাজকর্মী