একাত্তরের দলের ৭১ বছর

প্রকাশিত: ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ , জুন ২৩, ২০২০

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দলটি ২০২০ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠার ৭১ বছর পালন করছে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে পূর্ব বাংলার বঞ্চনা এবং বিশেষ করে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উপেক্ষার পটভূমিতে দলটির জন্ম। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট করাচি-লাহোরকে কেন্দ্র করে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়, তার শাসকরা পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানকে (বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ড) উপনিবেশ হিসেবেই গণ্য করতে শুরু করে।

তারা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াতে থাকে এবং এটাকেই মুশকিল আছানের দাওয়াই হিসেবে গণ্য করতে থাকে। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ১৯৪৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর কেবল উর্দুতে ডাকটিকিট প্রকাশ ও সরকারি চাকরিতে আবেদন করার যোগ্যতা হিসেবে উর্দু জানা বাধ্যতামূলক করার অপচেষ্টা শুরু হলে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি কর্মচারীরা ধর্মঘট করে বসবে, এটা তারা ভাবতে পারেনি।

এ ঘটনার তিন সপ্তাহ যেতে না যেতেই কলিকাতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পাঠ ঘুচিয়ে অচেনা শহর ঢাকায় চলে আসা তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। আমরা জানি, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের। কিন্তু বিস্ময়কর দূরদৃষ্টি যে ছিল তাঁর! পাকিস্তান হতে না হতেই তিনি বুঝে যান বাঙালিদের দমিয়ে রাখার অপচেষ্টা শুরু হয়েছে।

এটা মোকাবেলায় চাই বলিষ্ঠ সংগঠন। ছাত্ররা এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। তিনি ক্ষমতাসীন দল মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন থেকে বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থক নিয়ে বের হয়ে এসে গঠন করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। সাম্প্রদায়িকতা তাঁর পছন্দ ছিল না। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে। তাই ‘আপস’ করেছেন।

অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে লিখেছেন, ‘অলি আহাদ এর (মুসলিম ছাত্রলীগের) সভ্য হতে আপত্তি করল। কারণ সে আর সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান করবে না। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ নাম দিলে সে থাকতে রাজী আছে। আমরা তাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম এবং বললাম, এখনও সময় আসে নাই। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দেশের আবহাওয়া চিন্তা করতে হবে। নামে কিছুই আসে যায় না। আদর্শ যদি ঠিক থাকে, তবে নাম পরিবর্তন হতে বেশি সময় লাগবে না।’ [পৃষ্ঠা ৮৯]

রাজনীতির পথ কী বিচিত্র, আঁকাবাকা! অলি আহাদ ১৯৭১ সালে অসাম্প্রদায়িক আদর্শের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পছন্দ করেননি। যে ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে, মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা তাঁর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের সম্মান প্রদর্শনের জন্য নিয়ে আসতে রাজী হয়নি। কারণ অমর একুশের স্মৃতিতে গড়ে ওঠা এ স্থানটি তাদের বিবেচনায় অনৈসলামিক!

আরও পরিহাসের বিষয়, যে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানি আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, দলকে আম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার অন্যতম উদ্যোক্তা, যিনি ১৯৫৭ সালে দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানকে শর্ত দিয়েছিলেন প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার সদস্যপদ ও দলের সাধারণ সম্পাদকের পদের একটি অবশ্যই ছাড়তে হবে, যিনি ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন ইস্যুতে দ্বিমত পোষণ করে আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে ন্যাপ গঠন করেন তিনি ১৯৬৬ সালে ৬ দফা কর্মসূচিকে ‘সিআইএ প্রণীত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

অথচ শেখ মুজিবুর রহমান ওই বছরের ফেব্র“য়ারিতে যখন এ কর্মসূচি পাকিস্তানের ক্ষমতার কেন্দ্র লাহোর নগরীতে উপস্থাপন করেন, প্রেসিডেন্ট আইয়ুুব খান, তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান এবং এই চক্রের উপদেষ্টা-পরামর্শদাতারা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে যায় এ তো পাকিস্তান ভাঙার কর্মসূচি! তারা এটাও বলেন ১৯৪০ সালে এক বাঙালি শেরে বাংলা একে ফজলুল হক পাকিস্তান গঠনের জন্য লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন, আরেক বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান সেই লাহোর নগরীকেই বেছে নিয়েছিলেন পাকিস্তান ভাঙার কর্মসূচি উপস্থাপনের জন্য।

বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র চাই এ স্থির লক্ষ বঙ্গবন্ধু নির্ধারণ করেন সেই পঞ্চাশের দশকেই। খ্যাতিমান রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী সান্জীদা খাতুন আমাকে বলেছেন, ১৯৫৬ সালে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু তাকে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি..’ গাওয়ার অনুরোধ করেন। ওই অনুষ্ঠানে পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক বিশিষ্টজন এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমাদের মনে যে ‘সোনার বাংলা’ সেটা ওদের প্রতিটি সুযোগে জানিয়ে দিতে হবে।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি যতদিন বেঁচেছিলেন, পাকিস্তানভিত্তিক আওয়ামী লীগ ছিল। তিনি স্বল্প সময়ের জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রওি হয়েছিলেন। ন্যাপও পাকিস্তাভিত্তিক দল। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একটি কমিটি ছিল পাকিস্তানভিত্তিক বঙ্গবন্ধু সভাপতি, এ এইচ এম কামারুজ্জামান সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু নির্বাচনে দলটি লড়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য। দলটি পূর্ব পাকিস্তানের জন্যই কাজ করছিল।

যেহেতু বাঙালিরা পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ, জাতীয় পরিষদের ৩১৩ টি আসনের মধ্যে ১৬৯ টি পূর্ব পাকিস্তান থেকে, বঙ্গবন্ধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ১৫৭ টি আসন নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। বাংলাদেশের জনগণ এটা বুঝতে পেরেছিল। বঙ্গবন্ধুই যে বাঙালির স্বার্থের প্রতিনিধি, সে বিষয়ে তারা নিঃসংশয় ছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর দল ১৬৭ টি আসন পেয়ে যায় (এর মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসন ছিল ৭টি)। জাতীয় পরিষদ অধিবেশন বসলে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে, কিংবা ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে এ সংখ্যা থেকে ১১ জনকে পক্ষ ত্যাগ করানোর অপচেষ্টা হতেই পারে।

এ শঙ্কা থেকেই ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি রেস কোর্স ময়দানে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন ‘নির্বাচিত সদস্যদের কেউ যদি ৬-দফার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, জ্যান্ত কবর দেবেন।’

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চেও পর জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ থেকে ৪০ জনের মতো সদস্যকে তাদের পক্ষে টানতে পেরেছিল। তাদের আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কার করা হয়। স্বাধীনতার পর অনেকের স্থান হয় কারাগারে।

বঙ্গবন্ধু ১৯৫৩ সাল থেকেই আওয়ামী লীগের প্রাণপুরুষ। ৩৩ বছর বয়সেই দলের পূর্ব পাকিস্তান কমিটির সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু বাংলার তিন প্রবাদপ্রতিম রাজনীতিক শেরে বাংলা এ. কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর কাছে তিনি অপরিহার্য রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। মওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি ছিলেন ভিন্ন ধারার রাজনীতিক নেতা। সোহরাওয়ার্দি সাহেব অভিজাত পরিবার থেকে এসেছেন। উচ্চ শিক্ষিত। আইন পেশায় দক্ষ। জীবনযাপনে পাশ্চাত্যের বিপুল প্রভাব।

অন্যদিকে, মওলানা ভাসানী ‘ভাসানচরের পীর বংশের’ সন্তান। আনুষ্ঠানিক লেখাপড়া তেমন নেই। কৃষক-মজুরদের স্বার্থে আপসহীন, মজলুম জননেতা হিসেবে অভিহিত হন। তাঁর একান্ত অনুগামী ও গুণমুগ্ধদের মধ্যে অভিজাত পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন। তবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সভাপতি পদে থাকলেও বেশিরভাগ সময় থাকতেন টাঙ্গাইলের কাগমারি-সন্তোষ বা জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে। ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু যখন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠনের জন্য পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের ভেতরে এবং একইসঙ্গে রাজপথের সংগ্রাম গড়ে তোলায় প্রবলভাবে সক্রিয়, ভাসানি সাহেব সেই কঠিন রাজনৈতিক সময়েও অনেকটা সময় অবস্থান করেন টাঙ্গাইলের গ্রামের আবাসস্থলে।

বঙ্গবন্ধুকে বার বার তার কাছে ছুটে যেতে হচ্ছে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে। তিনি নিজেই লিখেছেন, সে সময় ভাল জিপ গাড়িতে যেতেও সময় লাগে ছয় ঘণ্টা। অন্যদিকে, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির বসবাস প্রধানত করাচি ও লাহোরে। তার কাছেও বার বার যেতে হচ্ছে পরামর্শের জন্য।

পঞ্চাশের দশকে শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে না থাকলে ঢাকায় বসবাস করতেন। কিংবা ছুটে যেতে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে দলের কাজে। কারাগারে তাঁর কতদিন কেটেছে, সে তথ্য রয়েছে ১৯৫৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বরের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়, ১৯৪৯ সালের ২৯ এপ্রিল তিনি গ্রেফতার হন এবং একই বছরের ১৭ জুন মুক্তি পান (প্রকৃতপক্ষে গ্রেফতার হয়েছিলেন ১৯ এপ্রিল এবং মুক্তি পান ২৬ জুন)। এরপর গ্রেফতার হন ১৯ জুলাই, ১৯৪৯ (প্রকৃতপক্ষে গ্রেফতার হয়েছিলেন ১৯৪৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর) এবং মুক্তি পান ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। এরপর গ্রেফতার হন ১৯৫৪ সালের ১৬ মে এবং মুক্তি পান একই বছরের ১৮ ডিসেম্বর। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সামরিক শাসন জারির পর ১২ অক্টোবর তাকে গ্রেফতার পর এবং ১৪ মাস পর ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৫৯ তারিখ মুক্তি দেওয়া হয়।

এর বাইরেও ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ প্রথম রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে হরতাল পালন করতে গিয়ে তিনি কয়েকদিনের জন্য গ্রেফতার হয়েছিলেন। অর্থাৎ পাকিস্তানের প্রথম ১২ বছরের মধ্যে ৪ বছরের বেশি সময় তিনি ছিলেন কারাগারে। ষাটের দশকেও বার বার তাকে কারাগারে কাটাতে হয়। সবচেয়ে দীর্ঘ কারাবাস ছিল ১৯৬৬ সালের ৮ মে থেকে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত। এ সময়ের বড় অংশ কেটেছে ক্যান্টনমেন্টে। এর পর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত তাকে রাখা হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে।

কারাগারের বাইরে থাকার সময় বঙ্গবন্ধু ঢাকাকে কেন্দ্র করে দলের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। পাশাপাশি নিয়মিত জেলা-মহকুমা সফর করেছেন। দলের দুই প্রবীণ ও জননন্দিত নেতার সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সব বিষয়ে তিনি একমত ছিলেন, সেটা বলার উপায় নেই। কখনও কখনও দ্বিমত প্রকাশ্য হয়েছে। কিন্তু দু’জনের কাছেই তিনি সমান প্রিয়। দু’জনেই নানা কাজে তাঁর ওপর পূর্ণ আস্থা ও ভরসা রাখেন। আবার মওলানা ভাসানি ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির মধ্যেও বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য ছিল বিস্তর।

বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দি সাহেবকে রাজনৈতিক মেন্টর মানতেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীর শুরুতেই রয়েছে ‘কারাগারের ছোট্ট কোঠায় বসে বসে জানালা দিয়ে আকাশের দিয়ে চেয়ে চেয়ে ভাবছি, সোহরাওয়ার্দি সাহেবের কথা। কেমন করে তাঁর সাথে আসার পরিচয় হল। কেমন করে তাঁর সান্নিধ্য আমি পেয়েছিলাম। কিভাবে তিনি আমাকে কাজ করতে শিখিয়েছিলেন এবং কেমন করে তাঁর স্নেহ আমি পেয়েছিলাম।’

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ গঠনের পর অক্টোবর মাসে মওলানা ভাসানি শেখ মুজিবুর রহমানকে পশ্চিম পাকিস্তান পাঠান সোহরাওয়ার্দি সাহেবকে এ দলের সঙ্গে যুক্ত হতে সম্মত হওয়ার জন্য। ২৯ বছর বয়স তাঁর। যেতে হয়েছে গোপন পথে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিধ্বস্ত ভারতের ওপর দিয়ে। সেখানের মিশন সম্পন্ন করে পূর্ব পাকিস্তানে ফেরত আসার পর টানা দুই বছরের বেশি কারাগারে, মুক্তি পান ১৯৫২ সালের একুশের ফেব্র“য়ারির সফল আন্দোলনের পর।

সোহরাওয়ার্দি সাহেব বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনের প্রতি প্রথম দিকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে দ্বিধা করছিলেন। তাঁর শঙ্কা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক-বেসামরিক চক্র ও সেনাবাহিনী এটা মেনে নেবে না। তরুণ বঙ্গবন্ধু তাকে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেরে ফেলতে সম্মত করাতে পারেন। কিন্তু ১৯৫৩ সালের ২৯ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান যখন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘মুসলিম লীগ সরকার প্রদেশের বিদ্যালয়সমূহে উর্দুকে বাধ্যতামূলকভাবে চালু করার হীন প্রচেষ্টা হতে বিরত না হলে পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু বর্জন করা হবে। এ জন্য প্রত্যক্ষ আন্দোলনও শুরু করা হবে।’ এর উত্তর কী ছিল?

১১ সেপ্টেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি শেখ মুজিবুর রহমানকে লেখা চিঠিতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কিছু কাজ নিয়ে স্পষ্ট অসন্তোষ ব্যক্ত করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু বয়কটের জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষণার সমালোচনা করে বলেন, এ ধরনের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ ঘোষণার কোনো অধিকার তোমাকে কেউ দেয়নি। তোমরা বাংলার জন্য দাবি জানাতেই পার, কিন্তু উর্দুকে আক্রমণ করবে না।

তিনি ১১ সেপ্টেম্বর পূর্ব পাকিস্তানে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দিবস পালনের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি আরও একটি বিপদের কথা বলেন পাকিস্তান খণ্ড খণ্ড হয়ে যাওয়া। তিনি পাকিস্তানের সংহতির ওপর জোর দেন।

শেখ মুজিবুর রহমান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দিকে নেতা মেনে এসেছেন সেই চল্লিশের দশক থেকে। কিন্তু ১৯৫৩ সালেই তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে এমন মতবিরোধ! তরুণ মুজিবের কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট যে তিনি ‘বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে চলেছেন’। তাঁর রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির সেটা বুঝতে সমস্যা হয়নি।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সামনে রেখে আওয়ামী লীগ দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ ছিল বলেই আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানের নিষ্ঠুর সামরিক শাসনামলে তারাই ছিল প্রধান ও বলা যায় একক প্রতিপক্ষ। কিন্তু এই প্রতিপক্ষ যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহসী ও সৃজনশীল নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বর্বর হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার জন্য জনগণকে প্রস্তুত করে তুলবে, সেটা তারা ভাবতে পারেনি। স্বাধীনতার জন্য বাঙালিরা এবং তাদের দল আওয়ামী লীগ কতটা প্রস্তুত হয়ে উঠেছিল সেটা প্রথম স্পষ্ট হয় ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সময়ে।

নিষ্ঠুর সামরিক শাসনের কবলে এ ভূখণ্ড। বাঙালিদের দমন করার জন্য বেলুচিস্তানের কসাই টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন জারি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ডের হুমকি দিয়ে সামরিক ফরমান। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাসভবনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছে বিকল্প প্রশাসন। ইয়াহিয়া খান-টিক্কা খানের হুকুম নয়, জনগণ পালন করেছে ৩২ নম্বরের নির্দেশ। মহাত্মা গান্ধী শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলন পরিচালনা করেছেন। কিন্তু বিকল্প প্রশাসন চালু করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু একসঙ্গে দুটি কাজই করেছেন।

প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা বিভাগ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সক্রিয় বিভিন্ন মহল সব কিছু চলেছে বঙ্গবন্ধুর কথায়। ২৬ মার্চ স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই আমাদের জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকা চূড়ান্ত। ২৫ মার্চ নিষ্ঠুর গণহত্যার তিন সপ্তাহ যেতে না যেতেই আমাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা মুজিব নগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন ও শপথ গ্রহণ করে। স্বল্প সময়ে এ সরকার লাখ লাখ তরুণকে মুক্তিবাহিনীর সদস্য হিসেবে প্রশিক্ষণ প্রদান ও অস্ত্রসজ্জিত করে। তারা নাস্তানাবুদ করতে থাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে। একইসঙ্গে এ সরকার ভারতে আশ্রয় নেওয়া এক কোটি শরনার্থীর আশ্রয়-খাদ্য-চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে সর্বতোভাবে সহায়তা করে।

সরকার গঠনের দেড় মাস যেতে না যেতেই বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব শিল্প-কলাকুশলী দিয়ে চালু করে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্র। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিকল্পনা প্রণয়নে কাজ করে পরিকল্পনা সেল।

মুক্তিযুদ্ধকালে কূটনৈতিক অভিযান পরিচালনাতেও বাংলাদেশ সরকার ছিল সফল। ভারতের সঙ্গে মিলিতভাবে গঠিত হয় মিত্র বাহিনী, যাদের প্রবল আক্রমণে দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের সহযোগী ১৬ ডিসেম্বর নিঃশর্ত আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক ছিল, সন্দেহ নেই। এ বছরটি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ হিসেবে পালিত হচ্ছে। আগামী বছর স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। আওয়ামী লীগ উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য সামনে রেখেছে। এটা বড় চ্যালেঞ্জ। করোনার ভয়ঙ্কর থাবা এ চ্যালেঞ্জে জয়ী হওয়ার পথে কতটা বিঘ্ন সৃষ্টি করবে?

নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। কোনো স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ এভাবে বিশ্বব্যাংক বা পশ্চিমা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক মহল এবং কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় নেতা-কর্মীরা নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কতটা সফল হবে, সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট