বাবাকে হত্যা করার কথা স্বীকার করল ছেলে-মেয়ে

প্রকাশিত: ৫:১৪ অপরাহ্ণ , মার্চ ১০, ২০২১

পারিবারিক কলহের জেরে প্রায়শই মাকে মারধর করতেন। এক পর্যায়ে বিবাদ চরমে পৌঁছলে মাকে মৌখিকভাবে তালাক দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেন বাবা। আর এই কারণেই ক্ষিপ্ত হয়ে বাবা আব্দুল খালেককে (৫০) শ্বাসরোধ করে হত্যা করে ছেলে খায়রুল ইসলাম (২৮) ও মেয়ে নাজমা খাতুন (৩৩)। পরে বাবার লাশ বস্তাবন্দি করে মোটরসাইকেলে করে নওগাঁর পোরশা উপজেলার বালিয়াচান্দা গ্রাম থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি খালে ফেলে আসে খায়রুল।

হত্যার প্রায় এক মাস পরে এভাবেই ঘটনার বর্ণনা দেন বাবাকে হত্যার দায়ে নওগাঁর পোরশা থানা পুলিশের হাতে গ্রেফতার খায়রুল ইসলাম ও নাজমা খাতুন। খায়রুল ও নাজমা ছাড়াও এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে নিহত আব্দুল খালেকের স্ত্রী ফাইমা খাতুন (৪৮) ও মেয়ে জামাই মোদাচ্ছের হোসেনকেও (৩৫) গ্রেফতার করেছে পোরশা থানা পুলিশ।

আজ বুধবার দুপুরে নওগাঁর পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে আব্দুল খালেক হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) রকিবুল আক্তার। এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মামুন খান চিশতী, সাপাহার সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার বিনয় কুমার, সহকারী পুলিশ সুপার সুরাইয়া আখতার, পোরশা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিউল আজম খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

আব্দুল খালেক নওগাঁর পোরশা উপজেলার গাঙ্গুরিয়া ইউনিয়নের বালিয়াচান্দা গ্রামের বাসিন্দা। গত ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে নিখোঁজ ছিলেন আব্দুল খালেক।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এএসপি রকিবুল আক্তার বলেন, গত সোমবার খায়রুল ইসলাম পোরশা থানায় উপস্থিত হয়ে তাঁর বাবা আব্দুল খালেকের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। নিখোঁজ হওয়ার এক মাসের অধিক সময় পরে থানায় এসে জিডি করার বিষয়ে সন্দেহ হওয়ায় ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে পুলিশ। তদন্তে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল মঙ্গলবার সন্দেহভাজন আসামি নিখোঁজের ছেলে খায়রুলকে নওগাঁ পুলিশের সাপাহার সার্কেল অফিসে ডেকে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ।
জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে খায়রুল স্বীকার করে যে, তার বোন নাজমা খাতুনের সহযোগিতায় বাবা আব্দুল খালেককে শ্বাসরোধে হত্যা করেন তিনি। খায়রুলের দেওয়া তথ্যমতে আব্দুল খালেক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মঙ্গলবার রাতে ফাইমা খাতুন, নাজমা খাতুন ও তাঁর স্বামী মোদাচ্ছেরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

পুলিশের কাছে আসামি খায়রুলের দেওয়া স্বাীকারোক্তিমূলক বর্ণনার বরাত দিয়ে রকিবুল আক্তার বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে খায়রুলের বাবা আব্দুল খালেকের সঙ্গে তাঁর মা ফাইমা খাতুনের বনিবনা হচ্ছিল না। পারিবারিক কলহের জেরে গত ২৭ জানুয়ারি ফাইমা খাতুনকে মৌখিকভাবে তালাক দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেন আব্দুল খালেক। মাকে তালাক দেওয়ার কথা শুনে ছেলে খায়রুল ইসলাম তাঁর কর্মস্থল (চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার শ্রীরামপুর হাফিজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক) থেকে এবং মেয়ে নাজমা খাতুন শ্বশুরবাড়ী থেকে এসে বাবা-মায়ের মধ্যে বিবাদ মিমাংসার চেষ্টা করেন। স্থানীয়ভাবে আপোস-মিমাংসায় ব্যর্থ হয়ে ৪ ফেব্রুয়ারি খায়রুল মাকে উপজেলার পিছলডাঙ্গা গ্রামে তাঁর খালার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। ওই দিন রাতে খায়রুল ও নাজমা তাঁদের বাবা আব্দুল খালেককে মায়ের সঙ্গে বিবাদের মিমাংসা করার অনুরোধ করেন। কিন্তু খালেক তাঁদের অনুরোধ মানতে অস্বীকার করলে বোন নাজমা ও বোন জামাই মোদাচ্ছেরের সহযোগিতায় বাবাকে মাফলার গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে খায়রুল। পরে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে খায়রুল বাবার লাশ একটি বড় পাটের বস্তায় ভরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ উপজেলা সদরে তাঁর কর্মস্থল শ্রীরামপুর হাফেজিয়া মাদ্রাসার পিছনে একটি খালে ফেলে দিয়ে আসে।

তিনি আরও বলেন, খালে লাশ ফেলে দেওয়ার ১২ দিন পর বস্তাবন্দি ওই লাশ ভেসে উঠলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানা পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে এবং অজ্ঞাতনামা লাশ হিসেবে দাফন করে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি নিহতের ছোট ভাই জাকির আলম (৪৫) লাশের আলমত দেখে বাবা আব্দুল খালেককে শনাক্ত করেন এবং থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

পোরশা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিউল আজম খান বলেন, গ্রেফতারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে নিহতের ভাই জাকির আলম বাদী হয়ে তাদের নাম উল্লেখ করে আলাদা একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। আজ বুধবার বিকেলে এই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাঁদেরকে আদালতে নেওয়া হয়।