মারিনার গল্প এবং এক বিকেলের ড্রাইভ

প্রকাশিত: ৮:৩১ অপরাহ্ণ , মার্চ ৩, ২০২১

ডা. ফেরদৌস খন্দকার

মানুষ হিসেবে হয়তো আমি ছোট, তবে চেষ্টা করি।
মারিনা (ছদ্ব নাম) আমার প্রায় বিশ বছরের পুরনো রোগী। বয়স ৭২।একা থাকে।তাকে চিনি তার বয়স যখন পঞ্চাশ ,তখন থেকে।তার পরিবার সম্পর্কে ও জানি।এখন বেশ দুরে চলে গিয়েছে তবে যোগাযোগ আছে।আমাকেও বেশ স্নেহ করে।
কাল হঠাৎ কল দিলো।সে নড়াচড়া একেবারেই করতে পারছেনা।কোভিড টিকা নেওয়ার পর প্রায় অচল। মনে হচ্ছে বেশ নার্ভাস তবু সা্হস দিলাম। সে কিভাবে যেন আমার মোবাইল নাম্বার টি টুকে রাখলো।সে বুঝে গেল এটিই আমার মোবাইল নাম্বার। এই ভরসা পেয়ে সে প্রায় দাড়িয়ে গেল।আমিও বললাম সা্হস দেবার জন্য আগামী কাল তোমাকে আমরা ড্রাইভে নিয়ে যাব। পরদিন রবিবার। আমার ছুটি। সারাদিন পড়াশোনা করলাম।বিকেলে বের হলাম তাকে ড্রাইভে নেব।সে প্রথমে বিশ্বাস করেনি কিন্তু যখন সত্যি সত্যি শুনলো শক্ত হয়ে দাড়িয়ে গেল খুশিতে। যাহোক যেমন কথা তেমন কাজ। তাকে নিয়ে পুরো বিকাল টা আমরা ঘুরলাম এই শহর।সে এসেছে প্রায় ৪০ বছর আগে।প্রথম বিয়ে ত্রিনিদাদ এ করেছিল।তারপর দিতীয় বিয়ে আমেরিকা তে। এখন একাই থাকে একটি এপার্টমেন্টে। ড্রাইভ করতে করতে অনেক গল্প।
আসলে রোগীদের সাথে একসময় সম্পর্ক হয়ে যায়, সন্তান যেমন হয়,ঠিক তেমনটা ই সম্পর্ক। আজ বুঝতে পারলাম সে আমার রক্তের কেউ নয়।তবু তাকে একটু ভাল রাখার জন্য, ভাল করার জন্য এই সময় টুকু দিলাম। নিজের একটু সমালোচনা না করলে নয়।অনেক ডাক্তার অনেক বড় বড় বই লেখে,ইতিহাস লেখে,রিসার্চ পেপার লেখে।আবার অনেকে বড় বড় হাসপাতাল দিয়েও সমাজসেবা করে।আমার কেন জানি আবেগের জায়গা গুলো বেশী পছন্দ ।মানুষের কাছে যেতে পছন্দ করি।অন্যদের সাথে এইটুকুই পার্থক্য হয়তো। আমার জীবনের দুইটি ঘন্টা যদি কারো জীবন পাল্টে দেয় না হয় সেটি ই করলাম।পুরোনো একটিপোস্ট থেকে অনেকে ইনবক্সে বলছেন আমি কেন হাসপাতাল দেইনা দেবিদ্বারে।আমি তাদের বলেছি আমি আগে মানুষকে ছুয়ে দেখতে চাই। গ্রামের মানুষ গুলো তাদেরকে বুঝাতে চাই তাদের পাশেও একজন আছে। এইটুকুই শুধু তাদের বুঝাতে চাই।এইটুকু একাই যথেষ্ট মানুষের মনোবল কে বাড়াতে।তাদের বেসিক চিকিৎসা প্রদানে সাহায্য করবে।আর এই ছোট ছোট ভাবনা গুলো ভাবি বলেই আমি নিজেকে খুব বড় মানুষ ভাবতে পারিনা।না হয় ছোট হয়েই বাকি টা জীবন কাটিয়ে দিলাম মানুষের ভালবাসায়।
মারিনা তোমার উপস্থিতি, ভালোবাসা জীবনে ভুলবো না।তুমি যতবার ত্রিনিদাদ এ গিয়েছ ততবারই হয় মরিচের ভর্তা নয়তো জলপাই ভর্তা নিয়ে এসেছ আমার জন্য। ধন্যবাদ তোমাকে এত সুন্দর মেমোরি দেবার জন্য।
ডাক্তারির বাইরেও অনেক কিছু করতে হয় একজন রুগীকে সারিয়ে তুলতে, সেটিই আজ হলো।