ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য ডিজিটাল মানুষ চাই

প্রকাশিত: ৯:০২ অপরাহ্ণ , জুন ৮, ২০২০

মোস্তাফা জব্বার তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও কলাম লেখক

এবার করোনাকালে আমরা অনুভব করলাম যে স্বাস্থ্য খাতে আমাদের ডিজিটালাইজেশনের অবস্থা মোটেই উল্লেখ করার মতো নয়। আমাদের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, প্যাসেন্ট ডাটাবেজ, ডক্টরস ডাটাবেজ ও হাসপাতালসমূহের তথ্যের সমন্বয়ের অভাব প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহারে আমরা যে পিছিয়ে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের জন্য একটি বড় কামনা ছিল বিচার বিভাগকে ডিজিটালাইজ করা।যদি বলা হয় ২০০৯ সাল থেকেই একটি ডিজিটাল সরকার গড়ে তোলার জন্য কোনো পর্যায়েই কোনো প্রচেষ্টার কমতি রাখা হয়নি তবে ভুল বলা হবে না। এক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন ও বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সঙ্গে সম্পৃক্ত এটুআই নিরলসভাবে সরকারের সর্বাঙ্গ ডিজিটাল করার প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে এবং এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। সংস্থাটির জন্মের পর তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মতামত দেয়া থেকে অংশগ্রহণ করা কোনোটাতেই আমি পিছিয়ে ছিলাম না। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে এক মাস বিরতি ব্যতীত ২০১৯ সালের ১৯ মে পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার ফলে আমি খুব স্পষ্ট করেই বলতে পারি যে অন্তত ২০০৯ সাল থেকে সরকার তার সব কর্মকাণ্ডকে ডিজিটাল করার জন্য তার পক্ষে সম্ভব সব কাজই করেছে। এই করোনাকালে সরকারি অফিসগুলো সবচেয়ে বড় যে সমর্থনটা পেয়েছে সেটি হচ্ছে ই-নথি। ২০২০ সালে সরকারের যে কোনো প্রতিষ্ঠান ই-নথির সহায়তায় কাগজের জগৎ থেকে বের হয়ে আসতে পারার সক্ষমতা অর্জন করেছে। আমি ২০১৮ সালে যখন আমার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিই তখন আমার কাছে শতকরা ৯৫ ভাগ কাগজের ফাইল আসত। এখন কাগজের কোনো ফাইল আসে না। এর ফলে করোনাকালে ঘরে বসে আমি আমার বিভাগের সব কাজ সম্পন্ন করতে পেরেছি। আমার হাতে একটি ফাইলও পেন্ডিং নেই। খুব সঙ্গত কারণেই কাগজের ব্যাপআপ থাকলেও সরকারের সব ডাটা ডিজিটাল হতে বাধ্য হয়েছে। চিঠিপত্র থেকে ফাইলের নোট সবই ডিজিটাল হয়েছে। এই সময়ের মাঝে জাতীয় পরিচয়পত্র, মেশিন রিডেবল পাসপোর্টসহ সব কাজেই ডিজিটাল ছোঁয়া লেগেছে। ব্যাংক-বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে ডিজিটাল অর্থব্যবস্থা পৌঁছানোর জন্য মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবা ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়েছে। দেশের ৫০ লাখ উপকারভোগী মানুষের নিজের মোবাইল ফোনে সরকারের প্রণোদনা পৌঁছে দেয়ার মতো অসাধারণ একটি কাজ আমাদের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

অন্যদিকে সরকারের শিক্ষাব্যবস্থার ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রয়োগ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আমরা আমাদের ক্লাসরুম সেইভাবে ডিজিটাল করতে পারিনি। প্রাথমিক স্তর ছাড়া অন্য পর্যায়ে ডিজিটাল কনটেন্ট দিতে পারিনি আমরা। আমাদের পাঠক্রম বদলায়নি-পাঠদান পদ্ধতিও বদলায়নি। দেশের শিক্ষককুলকে ডিজিটাল শিক্ষার উপযোগী করা সম্ভব হয়নি। প্রাথমিক-মাধ্যমিক তো দূরের কথা উচ্চ শিক্ষার শিক্ষকরা ডিজিটাল পদ্ধতির শিক্ষাদানে অক্ষম। বহু বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন টিভিভিত্তিক শিক্ষা চালু করতে পারেনি। শিক্ষকদের বিরোধিতা, প্রশাসনের বা মালিকদের বিরোধিতা ছাড়াও এমনকি ছাত্রছাত্রীদের বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছি আমরা। একটি দূরদর্শী পরিকল্পনায় শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর ঘটানো যায়নি। কিছু কম্পিউটার ল্যাব বা ডিজিটাল ক্লাসরুম করে আমরা যা করেছি তা যে প্রয়োজনের সময় অপ্রতুল সেটি এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

এই সুদীর্ঘ সময়ে আমরা খুবই গুরুত্ব দিয়ে ভূমিব্যবস্থা ডিজিটাল করার চেষ্টা করেছি। আমার মনে আছে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বছরের পর বছর চেষ্টা করেও ভূমিব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন করার উদ্যোগই নিতে পারেননি। যতবারই তিনি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে চেয়েছেন ততবারই ভূমি মন্ত্রণালয়ে সেটি আটকে গেছে। বলা যায় আমরা ভূমি মন্ত্রণালয়ের আমলাতন্ত্রের কাছে হেরে গেছি।
এভাবে প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কথাই বলা যাবে যে সরকারের ডিজিটালাইজেশন পরিকল্পনা কেমন করে ঘাটে ঘাটে আটকে রাখতে হয়েছে। সর্বশেষ যে উদ্যোগটি আমি চালু করে এসেছিলাম সেটি ছিল এটুআইয়ের ডিজিটাল সার্ভিস এক্সিলেরাটর নামক একটি কর্মসূচির আওতায় সরকারের সব মন্ত্রণালয়ের ডিজিটালাইজেশন এবং সেইসব মন্ত্রণালয়ের সেবাগুলো তার পরিকল্পনা ও বাজেট তৈরির কাজ শুরু করেছিলাম। আমি থাকাকাল পর্যন্ত ১৯৬০টি সেবাকে ডিজিটাল করার জন্য চিহ্নিত করতে সক্ষম হই। আমাদের তখনই ধারণা ছিল যে প্রায় ৩ হাজার সেবা ডিজিটাল করা যাবে। এটি একদিকে সরকারকে ডিজিটাল করবে অন্যদিকে দেশের সফটওয়্যার শিল্পকে একটি বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি করতে সহায়ক হবে। এবার করোনা-পরবর্তীকালে সরকারের এই সেবাগুলো আমাদের ডিজিটাল শিল্প খাতকে ব্যাপকভাবে সহায়তা করবে। অন্যদিকে সরকারকে সত্যিকারের একটি ডিজিটাল সরকারে পরিণত করবে।
এবার করোনাকালে আমরা অনুভব করলাম যে স্বাস্থ্য খাতে আমাদের ডিজিটালাইজেশনের অবস্থা মোটেই উল্লেখ করার মতো নয়। আমাদের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, প্যাসেন্ট ডাটাবেজ, ডক্টরস ডাটাবেজ ও হাসপাতালসমূহের তথ্যের সমন্বয়ের অভাব প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহারে আমরা যে পিছিয়ে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।

আমাদের জন্য একটি বড় কামনা ছিল বিচার বিভাগকে ডিজিটালাইজ করা। এজন্য পুলিশ, আইন বিভাগ, উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালতকে ডিজিটাল করতে হবে। এবার যখন আমরা দীর্ঘ সময় আদালত চালাতে পারলাম না তখন সরকার তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে আদালত পরিচালনার জন্য অধ্যাদেশ জারি করল। সেই অনুপাতে জরুরি মামলার ডিজিটাল শুনানি চলছে। কিন্তু দুঃখজনক দুটি ঘটনা আমাদের আশার প্রদীপটা নিভিয়ে দিয়েছে। আমরা ২০০৯ সাল থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ আন্দোলন করতে গিয়ে কোনোকালে ভাবতেই পারি না যে, উকিলদের মতো কোনো জনগোষ্ঠী ডিজিটালাইজেশনের জন্য মোটেই প্রস্তুত নয়। ১১ বছর পার করার পর যদি আমাদের উচ্চশিক্ষিত মানুষেরা ডিজিটাল প্রযুক্তির কাছে অসহায়ত্ব অনুভব করেন তখন আশার প্রদীপটি জ্বালিয়ে রাখতে পারি না।
আরো একটি ভয়ঙ্কর খবর দেখলাম আমরা, ভার্চুয়াল কোর্টে মামলা পরিচালনা করায় ১৭ জন আইনজীবীকে বহিষ্কার করেছে গাইবান্ধা বার। ০২-০৬-২০২০ তারিখে বারের সভাপতি ও সেক্রেটারির স্বাক্ষরিত এক নোটিসে ১৭ জন আইনজীবীর নাম উল্লেখ করে তাদের বার থেকে বহিষ্কার করার আদেশ প্রদান করা হয়েছে এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের সদস্যপদ স্থগিত থাকবে বলে নোটিসে বলা হয়েছে। ওই ১৭ জনের মধ্যে কার্যনির্বাহী পরিষদের দুজন সহসভাপতি ও একজন সাহিত্য সম্পাদক ও সহসম্পাদক রয়েছে। বর্জনের নোটিস তাদের সরবরাহ করেনি। বারের বর্তমান কমিটির সহসমাজকল্যাণ সম্পাদক পীযূষ কান্তি পাল বলেন, ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমরা।

জেলা বারের প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি গত ১২-০৫-২০২০ তারিখে কার্যনির্বাহী পরিষদের মিটিং ডেকে সিদ্ধান্ত নেন এবং আমাদের মৌখিকভাবে ভার্চুয়াল কোর্টে মামলা পরিচালনা করতে নিষেধ করেন। তৎপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের মাননীয় রাষ্ট্রপতি এর জারিকৃত অধ্যাদেশ এবং মাননীয় প্রধান বিচারপতির কর্তৃক প্র্যাক্টিস ডিরেকশন অনুযায়ী ভার্চুয়াল কোর্ট সিস্টেমকে সমর্থন দিয়ে আমরা মামলা পরিচালনা করি।
এতে বারের প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি ক্ষুব্ধ হয়ে গত ১৭-০৫-২০২০ তারিখে জেনারেল মিটিং ডাকেন এবং এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন যারা ভার্চুয়াল কোর্টে শুনানিতে অংশগ্রহণ করবে তাদের বার থেকে বহিষ্কার করা হবে। পরবর্তী সময় ০২-০৬-২০২০ তারিখে এই বহিষ্কার নোটিস জারি করেছেন।
বহিষ্কার আদেশপ্রাপ্ত আইনজীবীরা আরো বলেন, সম্পূর্ণ অবৈধ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জেলা বার। তারা প্রধান বিচারপতির আদেশ অমান্য করেছেন। আমাদের বিরুদ্ধে বারের এহেন আদেশের বিষয়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নেতারা এবং সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি ও সম্পাদক মহোদয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

আমার নিজের কাছে দুটি খবরই এত হতাশার যে, বাংলাদেশের ডিজিটাল যাত্রার যে অসাধারণ স্বপ্নটা আমরা দেখছি সেটিতে কালিমা লেপন করে দিচ্ছে। আমি আশা করব উকিল মহোদয়রা যা করেছেন অন্য খাতের মানুষেরা কোনোভাবেই তাকে সমর্থন করবেন না বা তাদের পথে পা বাড়াবেন না। দুনিয়াতে যখন যন্ত্র চালু হয় তখন হরতাল ভাঙচুর হয়েছে, কম্পিউটার চালু হওয়ার পর হরতাল আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময় দেখা গেছে যারা নেতিবাচক পথে হেঁটেছে তারাই হেরেছে। আমরা তো তিনটি শিল্পবিপ্লব পায়ে মাড়িয়ে এলাম। এখন যদি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে শরিক হতে না পারি তবে এই জাতির সামনে চলা থেমে যাবে। এটি একেবারেই বাস্তবতা যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে মানুষকে ডিজিটাল হতে হবে। করোনা চলাকালে বা তারপরে আমাদের জনগণ এই বিষয়ে সতর্ক থাকবে সেটিই আমাদের কামনা। আসুন আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলি।

মোস্তাফা জব্বার : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও কলাম লেখক। ## ভোরের কাগজ থেকে নেয়া