অসাম্প্রদায়িক ও মানবপ্রেমী সাধক অনুকূল চন্দ্র

প্রকাশিত: ৬:২৪ অপরাহ্ণ , ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২১

‘কত ভাগ্যে সোনার বাংলায় জন্মলাভ করেছি। … আমার মনে হয়, বাঙালির মহৎ কিছু দেবার আছে জগতে। বাংলা জাগলে ভারত জাগবে, ভারত জাগলে বিশ্ব জাগবে।’ কথাটি বলেছিলেন নিজের বাঙালি পরিচয় নিয়ে গর্বিত বাংলার মহান সাধক ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র চক্রবর্তী। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই বাংলা থেকেই একদিন ঘটবে আত্মিক ও নৈতিক পুনরুত্থান।

১৩১ বছর আগে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববাংলাধীন পাবনা জেলার হেমায়েতপুরে তার জন্ম। পেশায় তিনি ছিলেন একজন চিকিৎসক। কলকাতা থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর নিজ গ্রামে ফিরে তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শুরু করলেন।

চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘চিকিৎসাতে চাস্/ যদি তুই আত্মপ্রসাদ টাকা,/ টাকার পানে না তাকিয়ে/ রোগীর পানে তাকা।’ যার মর্মার্থ- রোগীর সেবায় ব্রতী হলেই একজন চিকিৎসক হতে পারেন পরিতৃপ্ত ও বিত্তবান।

চিকিৎসক থেকে মানবতাবাদী সাধক
চিকিৎসক হিসেবে অল্পদিনেই বেশ সুনাম অর্জন করেন অনুকূলচন্দ্র। তার হাতযশের কথা ছড়িয়ে পড়ে নানা দিকে। বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দিতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করলেন, বিচিত্র সমস্যায় পর্যুদস্ত মানুষের জীবন। মানুষকে যত দেখলেন, তাদের সাথে যত কথা বললেন, তত তিনি অনুভব করলেন- বেশিরভাগ রোগেরই উৎস হলো মূলত মানসিক বৈকল্য। মন যখন দূষিত হয় কোনো কারণে, তখনই  দেহ হয়ে ওঠে রোগের বিচরণক্ষেত্র। মনের দূষণ সারানো গেলে ব্যাধিকেও জয় করা সম্ভব।

তার মনে প্রশ্ন এলো- দৈনন্দিন জীবনে যারা সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ বলে পরিচিত অথচ  ইন্দ্রিয় ও রিপুর আগুনে জ্বলছে আর জ্বালাচ্ছে চারপাশের সবাইকে, গোটা পৃথিবীকে অশান্তির নরককুণ্ডে পরিণত করে তুলছে, তাদের চিকিৎসার উপায় কী?

তিনি ডুব দিলেন সমাধানের সন্ধানে এবং ডাক্তার থেকে হয়ে উঠলেন সাধক। ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। যে সত্যটি চিকিৎসকরা এই শতাব্দীতে এসে বলছেন- শতকরা ৭৫ ভাগ রোগ মনোদৈহিক, সে কথাটিই ১৯৪০-এর দশকে বলেছেন তিনি। আত্মিক ও নৈতিক পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেন। তার বাণী-সংকলন সত্যানুসরণ বাংলা ভাষার একটি কালজয়ী গ্রন্থ।

অসাম্প্রদায়িক জীবনদৃষ্টি ছিল তার সহজাত
একজন ব্রাহ্মণ হওয়া সত্ত্বেও নিজের বংশপদবি‘চক্রবর্তী’ ব্যবহার করতেন না এই সিদ্ধপুরুষ। তার অনুসারীদের মধ্যে হিন্দুর পাশাপাশি ছিল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলমানও। প্রকৃতই তিনি ছিলেন জাতপাত ও ভেদাভেদমূলক দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে।

বাংলাকে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনভূমিতে পরিণত করার লক্ষ্যে তিনি ছিলেন অবিচল, অবিশ্রান্ত। মজা করে বলতেন, আমার নাম অনুকূল বটে, কিন্তু জীবনে প্রায় প্রতি পদক্ষেপেই আমাকে এগোতে হয়েছে প্রতিকূলতার পাহাড় কেটে।

সেকালে ইংরেজরা পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধিয়ে দিত। বাংলাতেও তারা তা করিয়েছিল। ঠাকুর তখন বলেছিলেন, বৈশিষ্ট্যগত মৌলিক পার্থক্য সত্ত্বেও যদি নারী-পুরুষ মিলে সংসার করতে পারে, তবে শুধু ভিন্ন সম্প্রদায়ে জন্মগ্রহণ করেছে বলে কেন হিন্দু-মুসলমান নিজেদের জন্মভূমিতে পাশাপাশি বসবাস করতে পারবে না?

সৎসঙ্ঘ : সব মানুষের মিলনক্ষেত্র
শুধু ‘ঈশ্বর ঈশ্বর’, ‘ভগবান ভগবান’, ‘আল্লাহ আল্লাহ’জপলে হবে না, সৎকর্ম করতে হবে-এ বিশ্বাস থেকেই‘সৎসঙ্ঘ’ গড়েছিলেন ঠাকুর অনুকূল। তার আশ্রমে ছিল স্কুল, ছিল তাঁত-কারখানা। পড়াশোনার পাশাপাশি সৎভাবে উপার্জন করার ব্যবস্থাও ছিল সেখানে।

পাবনায় বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সৎসঙ্ঘ। দেশভাগের পর ১৯৪৭-এ পাকিস্তান সরকার এ জায়গা অধিগ্রহণ করে। ঠাকুর তখন সরকারের কাছে আবেদন জানান- সৎসঙ্ঘ একটি সার্বজনীন প্রতিষ্ঠান, তাই সব সম্প্রদায়ের মানুষের এখানে প্রবেশাধিকার থাকা বাঞ্ছনীয়। সব সংস্কৃতির মানুষের ধর্ম, কৃষ্টি, সদাচারে এ জায়গা একদিন সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে। অতএব, এটা সেভাবেই রাখা হোক। কিন্তু পাকিস্তান সরকার সেখানে প্রথমে যক্ষ্মা হাসপাতাল এবং পরে মানসিক রোগের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে।

ইতিপূর্বে ১৯৪৬ সালে ঠাকুর অসুস্থ হয়ে বিহারের দেওঘরে যান। সেখানকার নির্মল বাতাসে তিনি সুস্থ হলেন। দেশভাগ হওয়ার পর তিনি মাতৃভূমিতে ফিরে আসার উদ্যোগ নেন। কিন্তু তাকে অনুমতি দেয়া হয়নি। ফলে তিনি দেওঘরেই থেকে যান এবং সেটাই কালক্রমে তার মূল কর্মক্ষেত্রে রূপান্তরিত হয়।

সৎসঙ্ঘ নিয়ে তিনি বলেন, ‘সৎসঙ্ঘ চায় মানুষ। ঈশ্বরই বলো, খোদাই বলো, ভগবান বা অস্তিত্বই বলো; ভূ ও মহেশ্বরে যিনি এক- তাঁরই নামে, … সে বোঝে প্রত্যেকেই তাঁর সন্তান। সে পাকিস্তান বোঝে না, হিন্দুস্তান বোঝে না, রাশিয়া বোঝে না, চায়না বোঝে না, ইউরোপ-আমেরিকাও বোঝে না। সে চায় মানুষ। সে চায় প্রত্যেক লোক। সে হিন্দু হোক মুসলমান হোক খ্রিষ্টান হোক বৌদ্ধ হোক বা যে-ই হোক না কেন, যেন সমবেত হয় তাঁরই নামে।’

বিভেদ নয়, ধর্ম মানে ঐক্য
ধর্ম সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘প্রেমের সহিত খোদার পথে চলাই আমাদের ধর্ম। এর চাইতে বড় নীতি আর কী হতে পারে জানি না।’

‘তোমার ধর্ম যদি জীবের বিশেষত মানুষের মুখে এক মুঠো অন্ন তুলে বাঁচার সমর্থ করে তুলতে না পারল; সপারিপার্শ্বিক সে যাতে বাঁচতে পারে, বাড়তে পারে এমনতর না করে; তুমি কি মনে করো ধর্ম তোমার কাছে জ্যান্ত? আর তাতে তোমার সার্থকতাই কতটুকু?’

সাম্প্রদায়িক বিভেদ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ধর্ম থেকে চ্যুত হলেই সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে বিভেদ-বিরোধ সৃষ্টি হয়। হিন্দু যদি প্রকৃত হিন্দু হয়, মুসলমান যদি প্রকৃত মুসলমান হয়, তারা বান্ধব-বন্ধনে আবদ্ধ হতে বাধ্য। বাপকে যে ভালবাসে সে কখনো ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ হতে পারে না। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের উপাস্যই এক ও অদ্বিতীয়। তাই সম্প্রদায়গুলো ভাই ভাই ছাড়া আর কী?’

তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘ধর্ম যদি বিপন্ন হয়ে থাকে, তবে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হয়েছে (ধর্মের) দুরভিসন্ধিপ্রসূত ব্যাখ্যাদানকারী ও যাজকদের হাতে। প্রত্যেক ধর্মমতের আসল রূপটি তুলে ধরতে হবে সাধারণ লোকের কাছে, তাহলে দুষ্ট লোকের জারিজুরি খাটবে না। প্রত্যেকে চেষ্টা করবে বাস্তব আচরণে স্ব-ধর্মনিষ্ঠ হতে এবং অন্যকেও সাহায্য করবে, প্রেরণা জোগাবে অমনতর  হয়ে উঠতে।

এমনতর হতে থাকলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ্য গড়ে তুলতে কত দিন লাগবে? আমি তো বুঝি হিন্দুদের প্রতিষ্ঠা যেমন আমার দায়, ইসলাম ও খ্রিষ্টধর্ম প্রভৃতি প্রতিষ্ঠাও তেমনি আমারই দায়। আমার পরিবেশের প্রত্যেকে তার মতো করে যদি ঈশ্বরপরায়ণ না হয়ে উঠে, আদর্শপ্রেমী না হয়ে উঠে, ধর্মনিষ্ঠ হয়ে না উঠে, তাহলে তো আমারই সমূহ বিপদ।’

একজন মানুষ যে কতটা অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী হতে পারেন, তারই প্রকৃত দৃষ্টান্ত ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জীবন। জাতিধর্ম নির্বিশেষে আমৃত্যু মানুষের জন্যে কাজ করে গেছেন এই মহান সাধক।