ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে কমলা চাষে স্বালম্বী জুয়েল

এন এন রানা এন এন রানা

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৫:৪০ অপরাহ্ণ , জানুয়ারি ৩০, ২০২১

কমলা বাগানে হাটতে হাটতে ভুলেই গিয়েছিলাম যায়গাটি দার্জিলিং নয়, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার বীরহলী গ্রাম। স্বপ্নের কমলা এতো কাছে এতো সহজে দেখা মিলবে বা পাওয়ার সুযোগ হবে ভাবিনি। স্বাদে, আকারে ও রঙে অতুলনীয় দার্জিলিং জাতের এই কমলা । গোটা বাগান জুড়ে প্রতিটি গাছে ২-৪ মন করে কমলা শোভা পাচ্ছে জুয়েল ভাইয়ের বাগানে। বড় বড় সাইজের হলুদ কমলা দেখে চোখ জুড়িয়ে যায় । স্বাদে মিলছে পুরো মিষ্টত্ব এবং কমলার আসল ঘ্রাণ । ইতিমধ্যে জুয়েল ভাইয়ের কমলা চাষের সাফল্যের কথা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। বিভিন্ন যায়গা থেকে প্রতিদিন মানুষ দেখতে আসছেন কমলা বাগান। সেই সাথে কিনছেন সরাসরি গাছ থেকে তোলা কমলা। এরুপ কয়েক জনের সাথে কথা হয়, পঞ্চগড় থেকে আসা নাজিম উদ্দীনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ভাবাই যায় না এতো সুন্দর কমলা আমাদের দেশে হতে পারে । দিনাজপুর থেকে আসা সাগর বলেন, কমলা দেখে, খেয়ে খুব ভাল লাগছে, সোনার বাংলায় সব কিছু সম্ভব। চিটাগাং এবং ঢাকা থেকে বিভিন্ন ফড়িয়া আসছেন কমলা নেওয়ার জন্য । ইতি মধ্যে নিয়েও গেছেন শত মনেরত্ত উপর। ঠাকুরগাঁও এবং আশেপাশের ফলের দোকানগুলোতে শোভা পাচ্ছে পীরগঞ্জের কমলা। উৎসাহিত হয়েছেন অনেকে কমলা চাষে এমন একজন এস এম আনোয়ার আলী বলেন, মাল্টা লাগানোর জন্য চার বিঘা জমি প্রস্তুত করেছিলাম। একদিন জুয়েল ভাইয়ের বাগানে যাই, গাছ গুলোতে কমলা দেখে এবং গাছ থেকে পেরে কমলা খেয়ে অবাক হয়েছি। এতো সুন্দর কমলা হতে পারে সিদ্ধান্ত নেই কমলা বাগান করব। জুয়েল ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ রাখি উনি আমাকে ৭৫০ টি কমলার চারা দিয়ে বাগান সাজিয়ে দিয়েছেন। এরুপ অনেকেই তার কাছে আসছেন চারার খোঁজে।

পীরগঞ্জের সুনামধন্য পরিবার ইকরামুল এম সি এর বড় সন্তান শিক্ষিত,সমাজ সেবক, রাজনৈতিক আবু সাইদ জুয়েল ভাইয়ের কাছে কমলা চাষের সাফল্যের গল্পটি শুনা যাক। ফলমুলের গাছ লাগাতে, পরিচর্যা করতে ভালই লাগে । তাইতো যখন যেখানে যাই বিশেষ করে নতুন প্রজাতির কোন গাছ পেলে সেটা সংগ্রহ করে পরিচর্যা করে বড় করতাম । ফল মুল না আসা পর্যন্ত লেগেই থাকতাম, এক প্রকার গাছ পাগলা মানুষ আমি । গাছের সন্ধানে কত যায়গায় যে গিয়েছি তার শেষ নেই। সময়টা ২০১১ সালের দিকে হবে আমি ঠাকুরগাঁও বি এ ডি সি অফিসে যাই বীজের চেক নেওয়ার জন্য। পাশে হার্টিকালচার সেন্টার থেকে আমার আসার পথে ২৪ টি দার্জিলিং প্রজাতির চারা সংগ্রহ করে নিয়ে আসি। চারা গুলি যত্ন সহ কারে আমার একটি খালি যায়গায় রোপন করি । গাছ গুলি দুই বছরের মাথায় বড় সড় হয়ে ফুল আসা শুরু করে । দেখে আমার অনেক আগ্রহ তৈরি হয় । আবারো চেকের জন্য বিএডিসি আফিসে গেলে হার্টিকালচার সেন্টারের এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় কমলার গাছ গুলো তুলে ফেলা হচ্ছিলো । ডিডি সাহেব আমাকে সে সময় বেশ কিছু গাছ প্রদান করে বলেন আপনি তো গাছ অনেক পছন্দ করেন তাই এ গাছ গুলো আপনার সংগ্রহে রেখে চেষ্টা করে দেখেন যদি সফল হতে পারেন । আমার একটা বিশ্বাস তৈরি হয় আমি পারব । এর সাথে আমি দাজিলিং যাই একাধিকবার । যেহেতু কমলার চারা গুলো দাজিলিং থেকে নিয়ে আসা যাকে দাজিলিং জাতের কমলা বলছি । সেখানকার শীত, মাটি ,আবহাওয়া খুব পর্যবেক্ষন করি এবং করনীয় ঠিক করে ফেলি। অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং আমেরিকার গেলে আমি সেখানকার কমলা বাগান দেখতে যাই এবং খুটি নাটি জ্ঞান নেওয়ার চেষ্টা করি । দেশে ফিরে আরো দুই জাতের কমলার চারা ঢাকা থেকে সংগ্রহ করি । যার একটি আষ্ট্রেলিয়ার অপরটি চাইনিজ কমলার চারা । একনাগারে ৮/৯ বছর ধরে এর পিছনে লেগে থেকে আমি কমলা চাষের পদ্ধতি ভালভাবে রপ্ত করে ফেলেছি। এই বিষয়ে আমাকে যথেষ্ঠ সহযোগিতা করেছেন দিনাজপুর হার্টিকালচার সেন্টারের উপ সহকারী উদ্যান কর্মকর্তা কামরুজ্জামান ভাই । তিন জাতের কমলা গাছে এখন পুরো দমে ফল আসছে। আমার কমলা গাছের কমলার রং, আকার এবং মিষ্টত্ব যে কোন দেশ থেকে আমদানি করা কমলার চেয়ে উন্নত বলে আমি মনে করি। দার্জিলিং এর মাটির সাথে এ অঞ্চলের মাটির বেশ মিল রয়েছে সেই সাথে এ অঞ্চল একই অববাহিকায় হওয়ার দার্জিলিং জাতের এই কমলা চাষাবাদে এ ভূমি উর্বর । এই অঞ্চলে কমলা চাষ কৃষি অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
উওরাঞ্চলে লেবু জাতীয় ফসলের সম্পসারন বিশেষ করে কমলা চাষে যে সফলতা তা আমরা জুয়েল ভাইয়ের কমলা বাগান দেখেই বুঝতে পারছি। যে সময় এ অঞ্চলে কেহই আম লিচু চাষের বাহিরে আসছিলেন না তখন জুয়েল ভাইয়ের মত শিক্ষিত সাহসী মানুষ এই কমলা চাষে এগিয়ে এসেছিলেন । কথা হয় দিনাজপুর হর্টিকালচার সেন্টারের উপ পরিচালক প্রদীপ কুমার গুহ‘র সাথে । তিনি বলেন আশাতীত সফলতা, একটি গাছে ৩ থেকে ৪শ কমলা প্রায় ২ থেকে ৩ মন কমলা যার বাজার মূল্য অনেক। আশাকরি দিনাজপুর অঞ্চলের শিক্ষিত তরুনরা এগিয়ে আসবে জুয়েল ভাইয়ের কমলা চাষের সফলতা দেখে। এ অঞ্চলে কমলা চাষে কৃষি অর্থনীতিতে বিরাট অবদানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কৃষি বাণিজ্যিকী করনে যুগান্তকারী পরিবতর্ন আসবে ।