একটি না কওয়া কথা

প্রকাশিত: ৯:৫১ পূর্বাহ্ণ , ডিসেম্বর ১১, ২০২০

সেলিম জাহান

আমার তেতাল্লিশ বছরের কর্মজীবনে আমার কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত ছিল দেশে-বিদেশে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জাতিসংঘে, বিশ্বের নানান আন্তর্জাতিক সংস্হার স্বল্পকালীন উপদেষ্টা থেকে স্হায়ী পেশাজীবি পদে।এই বর্ণাঢ্য বিবিধ কাজের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ বছরের শিক্ষকতার জীবনকে আমি সবচেয়ে গৌরবের এবং সুখকর বলে মনে করি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষকতা জীবনে আমার সবচেয়ে বড় অর্জন আমার শিক্ষার্থীরা, যাঁরা আজ বিশ্বের নানান জায়গায় ছড়িয়ে আছে। কোথায় নেই তাঁরা- বিশ্ববিদ্যালয়ে, গবেষণাগারে, সরকারে, আন্তর্জাতিক সংস্হায়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে, ব্যবসা-বাণিজ্যে? তাঁদের এতো সব বিশাল অধিষ্ঠানে আমি চরম গর্বিত, কিন্তু সবচেয়ে প্রশান্তির জায়গা হচ্ছে তাঁদের স্মৃতিতে, মননে, হৃদয়ে একটি মায়াময় স্হান আমার জন্যে তাঁরা রেখে দিয়েছে।

আমার শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষকতূল্য অধ্যাপকদের সন্তানেরা। এই যেমন, প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কন্যা রুচিতা জামান (রুচি)।

বেনুকে তুমি বললেও আমি তাঁর কন্যার শিক্ষক বিধায় আমাকে তিনি ‘আপনি’ বলতেন দু’বছর আগেও। অধ্যাপক শমসের আলীর পুত্র জীশান আলীকেও (সুষম) আমি পেয়েছি অর্থনীতি বিভাগে। এই মাত্র সেদিন জানলাম যে আমার এক শিক্ষার্থী কাবেরী মোস্তফা (শিখা) আমার খুব প্রিয় একজন শিক্ষকতূল্য মানুষ প্রয়াত অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা কামালের কন্যা। ‘কেন আগে বলনি?’ – আমার এ অনুযোগের জবাবে সে বলেছে, ‘এগুলো না বলতেই তো আমাদের শেখানো হয়েছে, স্যার’। ইসলামিক ইতিহাসের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামের পুত্রকেও আমি শিক্ষার্থী হিসেবে পেয়েছি বিভাগে। খুব বিব্রত হয়ে বলি, ওর নামটা কিছুতেই মনে করতে পারছি না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে যাদেরকে শিক্ষার্থী হিসেবে পাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে, তাদের মধ্যে আমার হৃদয়ে একটি বিশেষ স্হান আছে ১৯৭১’র শহীদ বুদ্ধিজীবিদের সন্তানদের জন্যে। আশির দশকে এদের অনেককেই আমার শ্রেণীকক্ষে পেয়েছি। এ আমার পরম প্রাপ্তি। শহীদ অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর পুত্রদ্বয় তানভীর হায়দার চৌধুরী (শোভন) ও প্রয়াত সুমন হায়দার চৌধুরী (সুমন), শহীদ চিকিৎসক মোহাম্মদ মর্তুজার কন্যা দ্যুতি অরণি (মিতি), শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের পুত্র তৌহীদ রেজা নূরকে (তৌহীদ)। শিক্ষার্থী হিসেবে পাই নি, কিন্তু অনুজসম হিসেবে পেয়েছিলাম ও পেয়েছি শহীদ মুনীর চৌধুরীর সন্তান প্রয়াত আশফাক মুনীর (মিশুক) ও আসিফ মুনীরকে (তন্ময়)। স্বল্পকালের জন্যে মিশু আমার সহকর্মীও ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী হিসেবে শহীদ অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার কন্যা ড: মেঘনা গুহঠাকুরতাকেও পেয়েছি। মাত্র ক’দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস থেকে মাহমুদ হাসান যোগাযোগ করেছে – পরিচয় দিয়েছে যে, সে শহীদ অধ্যাপক রাশীদুল হাসানের পুত্র।

প্রতি বছর ডিসেম্বর মাস এলেই আমাদের সবার শহীদ শিক্ষকদের কথা মনে পড়ে যায়। পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি তাঁদের। আমি কিন্তু সেই সঙ্গে পরম মমতায় স্মরণ করি সেই সব শহীদ শিক্ষকদের সন্তানদের, যাঁদের আমি সহকর্মী ও শিক্ষার্থী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পেয়েছিলাম। মিশুক ও মেঘনার কথা মনে হয়।

চোখের সামনে ভেসে ওঠে শোভন, সুমন, মিতি ও তৌহীদের চেহারাটা। ওরা হয়তো জানেও না, আশির দশকে শ্রেনীকক্ষে ঢুকে ওদের দিকে তাকালে আমার মনটা হু হু করে উঠতো, বহুবার এমন হয়েছে যে, আমি ওদের মুখের দিকে তাকাতে পারিনি। কোনদিন হয়তো বলা হয় নি, আজ এই ডিসেম্বর মাসে ওদের এই কথাটুকুই শুধু বলে যাই – আর কিছু নয়।

বিজয়ফুল লন্ডন আয়োজিত দু’টো অনুষ্ঠানে – ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সময়ে রাত দশটায় এক অনুষ্ঠানে কথা বলবো মিতি আর মাহমুদের সঙ্গে আর ১৫ তারিখে একই সময়ে তন্ময়, শোভন আর তৌহীদের সঙ্গে।