নদনদী বাঁচলে, বাচঁবে বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১০:৪৪ অপরাহ্ণ , ডিসেম্বর ৮, ২০২০

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। সারা দেশে জালের মতো জড়িয়ে আছে নদনদী গুলো। নদনদী এবং বাংলাদেশের মধ্যে নিবিড় ও অঙ্গ জুড়ানো সম্পর্ক। দেশ আমাদের মাতৃতুল্যা হলে, নদনদী গুলো হলো আমাদের মায়ের প্রবাহিত রক্ত শিরা- উপশিরা। রক্ত প্রবাহে যেমন বাধা পড়লে শরীরের অশুভ সংকেত আসে, তেমনি নদী দখল ও দূষণ হলে বাংলাদেশের জলবায়ু ও পরিবেশে অশুভ ছায়া প্রকৃতির রক্ত চক্ষুর বহিঃপ্রকাশ।
প্রাচীন সংস্কৃতি, সভ্যতা, ব্যবসা- বাণিজ্য গড়ে উঠেছিল নদনদী কেন্দ্রীক। বর্তমানে আধুনিক সভ্যতা গড়ে উঠতেছে নদীর বুকে ধ্বংস লিলা খেলে। নদনদীর প্রবাহবান ধারায় গিটগিটির মতো দখলবাজরা পরিবর্তিত রূপে নদনদী দখলে বেসামাল। কেউ দলীয় পরিচয়ে, কেউ ক্ষমতার দাপটে, কেউ কালো টাকার গরমে, আবার কেউ আবাসন বা নগরায়ের নামে বিল-ঝিল, জলাশয় দখল করে কাগজ কলমে। ঢাকা কিংবা বিভাগীয় শহরের আশেপাশের বিল-ঝিল, জলাশয় ভরাট করে বিক্রির নজরকারা বিজ্ঞাপনও দায়িত্বশীল মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিগোচরে পড়ে না!
নদনদী দখলকারীদের আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছে, আর পরিবেশ হারাচ্ছে ভারসাম্য। অভিশপ্ত হচ্ছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল। বাংলার হাজারের বছরের ঐতিহ্য বিপন্ন হচ্ছে, বিপন্ন হচ্ছে প্রাণীকুল। নদনদী তার স্বাধীনতা হারিয়ে শ্রীহীন হয়ে পড়েছে । নদীর বিষাক্ত পানির ছোবলে পাল তুলা নৌকা আর ভাটিয়ারী সূর পরাস্হ ও নিস্তেজ।

নদনদীর স্বাধীনতাকে যারা পদদলিত করছে তারা দেশ ও জাতির শত্রু। স্বাধীনতার কাল জয়ী স্লোগান “তোমার আমার ঠিকানা পদ্ম, মেঘনা, যমুনা। ” আজ বাকরোদ্ধ ও নির্বাক। যে স্লোগানের দেশত্ববোধের মধুরটানে দেশের মানুষ হাসিমুখে জীবন দিয়েছিল। সেই স্লোগানের নদনদীগুলোকে খাবলে খাবলে দখল করছে শুকুনের দলেরা! শহীদদের প্রেতাত্মা আজ অবাক ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। স্লোগানের মর্মকথা কেন বাঙালী জাতির মর্ম ধ্বনিতে জলোচ্ছ্বাস তুলে না? নদীর স্বাধীনতা রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও রুটিন কাজ।

নদনদী রক্ষার জন্য সাথে ২৭ টি মন্রণালয় ও বিভাগ জড়িত। আছে নদীরক্ষা কমিশন, আছে সরকারী জেলা নদী রক্ষা কমিটি, উপজেলা নদী রক্ষা কমিটি। এত মন্ত্রণালয়! এত কমিটি! তারপরও গত সাড়ে চার দশকে অর্ধেক নদীর অস্তিত্ব নাই। আনন্দ বাজার পত্রিকার তথ্যমতে বাংলাদেশে নদী প্রায় ১৩০০ টি। বর্তমানে নদী আছে প্রায় ৭০০ টি। মাধ্যমিক ভূগোল ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুসারে নদনদী আছে এখন ৩০০টি। প্রায় সাড়ে চার হাজার কিঃ মিঃ নদনদী নাব্যতা হারিয়েছে। বর্তমানে প্রবাহবান নদনদী গুলো স্রোতস্বিনী ও উচ্ছ্বলতা হারিয়ে দিনে দিনে মৃতপ্রায় হয়ে যাচ্ছে নদী গুলোর গতিধারা। ভূমি দস্যুদের লোলুপ দৃষ্টির জন্য নির্যাতিত হচ্ছে নদনদীগুলো । এ ভাবে চলতে থাকলে হয়তোবা নদীমাতৃক দেশ আর খোঁজে পাবনা!

নদনদী রক্ষায় রাষ্ট্র আছে, মন্রণালয় আছে, আইন আছে। আইনের প্রয়োগ কালো চশমার বেড়াজালে আটকাও পড়ে আছে। কিছু সাহসি অফিসাররা নদনদী দখলদারদের বিরুদ্ধে সাহসি উদ্যোগ নেন। কিন্তু বদলী আর হয়রানী তাঁদের জন্য অবধারিত।নদনদী দখলদাররা যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের ছত্রছায়ার চলে যায়। সরকার বা রাষ্ট্রকে নদী রক্ষার আরও মনোযোগী হতে হবে।২০১৯ সালে নদীকে ” জীবন্ত সত্তা ” হিসাবে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। নদীর অবৈধ দখলদার ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষমতাধর। আইনের বাণী তাদের কাছে কচু পাতার পানি।বর্তমান সরকার নদনদীর অবৈধ স্হাপনা উচ্ছেদ অভিযান স্বল্পকালীন হলেও প্রশংসার দাবীদার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নদনদী দখল মুক্ত করার জন্য অনেকবার নির্দেশ দিয়েছেন কিন্তু সমন্বয়হীনতার জন্য নদীগুলো আজ পরাধীন। নদী রক্ষায় আইনের প্রয়োগ স্বজনপ্রীতির উর্ধ্বে রাখতে হবে।

নদী কমিশন, কমিটি, হাইকোর্টের রায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা। এ অর্থবছরে নদনদী রক্ষায় বিভিন্ন মন্রণালয়ে বাজেটে অনুদানের কমতি ছিল না। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এর প্রতিফলন কতটুকু ছড়াবে তা দেখার বিষয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরেও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৭ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪ হাজার ২১৫ কোটি টাকা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জন্য ১ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তারপরও নদনদী রক্ষা পাচ্ছে দখলবাজদের হাত থেকে। নদনদী দখলের জন্য ফেলা হচ্ছে পরিবেশের অবাঞ্ছিত বর্জ্য, পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, পৌর- কর্পোরেশনের ময়লা। নদনদীর দুপাড়ের গাছ কেটে উজার করছে বনভূমি।নদনদীতে অপরিকল্পিত ভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে বাধ। শিল্প কারখানার তরল রাসায়নিক পদার্থ নদনদীতে ফেলার ফলে, নদনদীর পানি হচ্ছে বিষাক্ত। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, প্রতিদিন শুধু বুড়ীগঙ্গাতেই ২২ হাজার ঘনমিটার তরল এবং ১০ মেট্রিকটন কঠিন বর্জ্য ফেলা হয়। নদনদীতে বাধ, নদনদীর গতিরোধ, বর্জ্য ফেলার ফলে নদীতে পলি জমা হচ্ছে এবং নদনদী বুকে দেখা যাচ্ছে বিস্তৃত চর।সামনে শুকনা মৌসুম আসতেছে নদনদীর উপর চলবে মৌসুমি দখলবাজদের দৌরাত্ম্য।

কবি গুরু লিখেছিলেন,
” আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।” সবগুলো নদীই এখন অর্ধমৃত। বেপরোয়া নদী দখল ও দূষণ সহ হাজারও সমস্যায় জর্জরিত আমাদের নদীমাতৃক দেশের নদনদী গুলো।
আমাদের নদনদী গুলো প্রাকৃতিক সম্পদের অমূল্য ভান্ডার। নদী বাঁচলে কৃষি বাচঁবে, উদ্ভিদ বাঁচবে, পরিবেশের ভারসাম্য ফিরে পাবে, দেশের প্রাণীকুল বিলুপ্তির পথ থেকে রক্ষা পাবে আর অতি খরা,অতি প্লাবন থেকে বাচঁবে দেশের সমতল ভূমি।

নদনদী রক্ষার জন্য সুপারিশের কোন ঘাটতি ছিল না, শুধু অন্ধ ছিল বাস্তবায়ন শব্দটি। নদনদী রক্ষার জন্য বিভিন্ন মেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে।
নদনদী রক্ষার জন্য দেশব্যাপী একটা বড় ধরনের সামাজিক আন্দোলন চাই। নদনদীর সীমানা রক্ষায় সীমানা পিলার নির্মাণ করতে হবে। নদী কমিশনকে দুদকের মতো স্বাধীন করে দিতে হবে।নদনদী রক্ষায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। জনসচেতনতা মূলক প্রচার জোড়দার করতে হবে। নদনদীতে যে কোন ধরনের ময়লা-আবর্জনা ফেলা আইনগত ভাবে বন্ধ করতে হবে। নদনদী বান্ধব অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্হা চালুর জন্য নদনদীগুলোকে পুনঃখনন, সংস্কার ও পুনগঠন করতে হবে। শিল্পকারখানায় ২৪ ঘন্টা ইটিপি চালু রাখতে হবে। অবৈধ স্হাপনা উচ্ছেদ করতে হবে এবং নতুন করে দখল রোধে মনিটরিং জোড়দার করতে হবে।

” আমাদের নদনদী আমরাই হবো রক্ষক। ”

সাইদুর রহমান
আহ্বায়ক
নান্দাইল উপজেলা নদী রক্ষা কমিটি।