‘এ ঘটনার জন্য থানার ওসিও দায়ী’

প্রকাশিত: ৭:২১ অপরাহ্ণ , অক্টোবর ৫, ২০২০

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনায় তিন জনকে আটক করা হয়েছে৷ তবে ঘটনার একমাস পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও দেখে উদ্যোগী হওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে৷গত ২ সেপ্টেম্বরের ঘটনা হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্যাতনের ভিডিওটি ভাইরাল হয় গত শনি-রবিবারে৷ এরপরই বর্বরোচিত ঘটনাটি জানতে পারে পুলিশ৷ তা-ও বেগমগঞ্জ থানা পুলিশ জানতে পারেনি, কোনো ব্যবস্থাও নেয়নি, নোয়াখালী জেলার এসপির নজরে এলে তিনি দুর্বত্তদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন এবং তারপর তৎপর হয় পুলিশ৷

এ পর্যন্ত যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ দেশের বিভিন্ন এলকা থেকে প্রত্যেককেই গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব৷

স্থানীয় ঘটনা একমাসেও কেন তারা জানতে পারলেন না- এই প্রশ্নের জবাবে বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হারুন অর রশীদ বলেন, ‘‘আমাদের কেউ জানায়নি৷ কেউ অভিযোগও করেনি৷ ফলে আমরা জানতে পারিনি৷ ফেসবুকে ভিডিও ভাইরাল হলে আমরা জানতে পারি৷’’ওসির এই জবাবটি গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন পুলিশের সাবেক এআইজি এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান সৈয়দ বজলুল করিম৷ তিন বলেন, ‘‘কেউ জানাবে সেজন্য পুলিশের বসে থাকার সুযোগ নেই৷ অনেক সময় প্রভাবশালীদের কারণে অসহায় মানুষ মুখ খোলে না৷ কিন্তু পুলিশের তো তথ্য সংগ্রহের নিজস্ব চেইন থাকে৷ গ্রামের চৌকিদারও তাদের তথ্য দিতে বাধ্য৷ আর এখন থানা পর্যায় পর্যন্ত গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করে৷’’

তার মতে, ‘‘এর জন্য ওই থানার ওসি দায়ী৷ হয় তিনি জেনেও ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্য গোপন করেছেন অথবা তিনি থানায় কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে কাটান৷ তার দায়িত্ববোধ বলে কিছু নেই৷’’

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নে এক মাস আগে এই মধ্যযুগীয় বর্বরতার ঘটনা ঘটে নির্যাতিতার নিজের ঘরে৷ দুবৃত্তরা নারীর ঘরে ঢুকে তাকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করে৷ তিনি তাদের পা ধরে ‘বাবা’ ডেকেও রেহাই পাননি৷ নির্যাতকরা নির্যাতনের ঘটনা মোবাইল ফোনের ক্যামেরায়ও ধারণ করে উল্লাস প্রকাশ করে৷

ওই এলাকার ‘দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার ও বাদল, কালাম এবং আবদুর রহিমসহ তার সহযোগীরা এই বর্বরোচিত ঘটনা ঘটনায়৷ স্থানীয় সূত্র জানায়, এলাকার সবাই ঘটনা জানতো৷ এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও জানতেন৷ কিন্তু কেউ তা প্রকাশ করেনি৷

নির্যাতিতা জীবনের ভয়ে থানায় অভিযোগ করেননি৷ ঘটনার একমাস পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হলে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে৷

বেগমগঞ্জ থানার ওসি জানান, একমাস নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করার মতো ঘটনা কেউ জানতে না পারলেও অবশেষে মোট দুটি মামলা হয়েছে৷ একটি নারী নির্যাতনের এবং আরেকটি পর্নোগ্রাফি আইনে৷ দুটি মামলাতেই ৯ জনকে আসামি করা হয়েছে৷
নির্যাতিত নারী পারিবারিক সমস্যার কারণে বাবার বাড়িতে এসেছিলেন৷ সেখানেই ‘দেলোয়ার বাহিনি’ এ ঘটনা ঘটায়৷ তবে বেগমগঞ্জ থানার ওসি বলছেন নতুন কথা৷ তার দাবি ঘটনার সঙ্গে নির্যাতিতার স্বামীও জড়িত, ‘‘তার স্বামীই এই ঘটনার ইন্ধনদাতা৷ তাদের মধ্যে খারাপ সম্পর্কের জেরে এই ঘটনা ঘটেছে৷’’ দেলোয়ার বাহিনী সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘তারা স্থানীয় একটি বখাটে গ্রুপ৷’’

ঘটনার একমাস পর ভাইরাল হওয়া ভিডিও দেখে পুলিশের নড়েচড়ে বসা এবং শুরুতেই ভুক্তভোগীর পরিবারকে জড়ানোর চেষ্টাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না মানবাধিকার কর্মীরা৷ তারা মনে করেন, আসলে এটা অপরাধীদের সাথে পুলিশের যোগাযোগ থাকার কারণেও ঘটনাটি এতদিন চাপা থাকতে পারে৷ মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক শিপা হাফিজ বলেন, ‘‘২০১৫ সালে শিশু রাজন হত্যার ঘটনায়ও আগে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি৷ ফেসবুকে আসার পর তারা তৎপর হয়৷ তারা আগে জানলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি৷’’

তার মতে, ‘‘পুলিশ একটি অকার্যকর এবং রাজনৈতিক বাহিনীতে পরিণত হয়েছে৷ যাদের ক্ষমতা আছে, প্রভাব আছে তাদের পিছনে ছুটে বেড়াচ্ছে৷ সাধারণ মানুষের জন্য পুলিশ নয়৷ রাস্তায় ১০টা ধর্ষণ হলেও তারা ফিরে তাকাবে না৷ আমাদের মন্ত্রীরা, জনপ্রতিনিধিদের কেউ কি এখন পর্যন্ত বলেছেন প্রতিদিন ধর্ষণ হচ্ছে, আমরা লজ্জিত?’’

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান সৈয়দ বজলুল করিম বলেন, ‘‘পুলিশ তার দায়িত্ব থেকে অনেকটাই সরে যাচ্ছে৷ তারা মানুষের জন্য কাজ না করে ক্ষমতার দিকে তাকিয়ে থাকে যার ফল এই ভয়াবহ পরিস্থিতি৷’’ DW