খেলাধুলার সুযোগ বঞ্চিত মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা

প্রকাশিত: ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ , সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২০

বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোতে খেলাধুলা হয় না বললেই চলে৷ সরকারি বরাদ্দ নেই৷ খেলাধুলার প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগও নেই৷বাংলাদেশে সরকারি মাদ্রাসা মাত্র তিনটি৷ এর বাইরে এমপিভুক্ত, বেসরকারি ও কওমি মাদ্রাসা আছে অনেক৷ আছে মহিলা মাদ্রাসাও৷ কিন্তু সামান্য ব্যতিক্রম বাদে মাদ্রাসাগুলোতে খেলাধুলার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই৷ নেই শরীরচর্চা শিক্ষকও৷ শহরের কিছু মাদ্রাসা নিজেদের উদ্যোগে সেই ব্যবস্থা করে৷ আর গ্রামে যেসব মাদ্রাসার সামনে মাঠ আছে, সেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে স্কুল শুরুর আগে ও ছুটির পরে খেলাধুলার সুযোগ পায়৷ কিন্তু খেলাধুলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কোনো উদ্যোগ নেই৷ বাৎসরিক কোনো ক্রীড়া প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয় না৷

ফেঞ্চুগঞ্জের মদিনাতুল উলুম শাহ মালুম মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘‘আমাদের ছেলেরা সময় পেলে সামনের মাঠে খেলাধুলা করে৷ কিন্তু ওদের জন্য আলাদা কোনো শরীরচর্চা শিক্ষক নেই৷ সরকারও এ ব্যাপারে কোনো সহায়তা করে না৷ খালি করোনার সময় সরকার আমাদের ৯ হাজার টাকা দিয়েছিল৷’’খেলাধুলার জন্য কোনো সরঞ্জাম মাদ্রাসা থেকে দেয়া হয় না৷সরকারের পক্ষ থেকেও কখনো দেয়া হয়নি৷ ছেলেরা নিজেরাই ব্যাট-বল নিয়ে আসে বলে জানান তিনি৷ তিনি বলেন, ‘‘খেলাধুলার জন্য সরকারের সহায়তা পেলে ভালো হয়৷ কারণ, এটা ছাত্রদের জন্য প্রয়োজন৷’’

ঢাকার তেজগাঁও মদিনাতুল উলুম কামিল মহিলা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা তাজুল ইসলাম খেলাধুলা বলতে বোঝেন শুধু পিটি-প্যারেড৷ তিনি জানান, ক্লাস শুরুর আগে পিটি- প্যারেড হয়৷ তারপর জাতীয় সংগীত গায় ছাত্রীরা৷ এর বাইরে তাদের জন্য আর কোনো শরীরচর্চা বা খেলাধুলার ব্যবস্থা নেই৷ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘১০ বছর আগে সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকটি ক্যারম বোর্ড দেয়া হয়েছিল৷ সরকারি সহযোগিতা বলতে ওইটুকুই৷’’

তবে তিনি জানান, এমপিওভুক্ত মাদ্রসাগুলোতে শরীর চর্চা শিক্ষকের একটি পদ আছে৷ অনেক মাদ্রাসাকেই ওই পদে নিয়োগ দেয়া হয় না৷ঢাকার যাত্রাবাড়ির তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা এক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম৷ সেখানে ছাত্রদের জন্য শরীরচর্চাসহ নানা ধরনের খেলাধুলার ব্যবস্থা আছে৷ বাৎসরিক প্রতিযোগিতাও হয়৷ স্কাউটিংয়ের ব্যবস্থাও আছে৷ এজন্য তারা কোনো সরকারি সহযোগিতা পায় না৷ অধ্যক্ষ মাওলানা ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, ‘‘সাধারণ শিক্ষার মতো খেলাধুলা ছাত্রদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ তাই আমরা এর ব্যবস্থা করি৷’’ সরকারি উদ্যোগে প্রতিবছর উপজেলা থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্রীড়া প্রতিযেগিতার আয়োজন হয়৷ কিন্তু তাতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় না৷ তিনি আরো বলেন, ‘‘আমাদের কাছেও বছরে একবার একটা চিঠি আসে৷ কিন্তু এর জন্য কোনো বরাদ্দ না থাকায় আমাদের শিক্ষার্থীদের পাঠাই না৷ খরচ কে দেবে?’’

তিনি মনে করেন, মাদ্রাসায়ও অনেক প্রতিভাবান ছেলে-মেয়ে আছে, সুযোগ পেলে তারা খেলাধুলায় অনেক ভালো করতে পারবে৷

মাদ্রাসাছাত্রের ক্রীড়প্রেমী মা

ছেলে শেখ ইয়ামিন সিনানের সাথে পল্টন মাঠে ক্রিকেট খেলে ঝর্ণা আক্তার সারা দেশেই এখন খুব আলোচিত নাম৷ তিনি মনে করেন, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য খেলাধুলার ব্যবস্থা থাকা উচিত৷ এটা সবার জন্যই প্রয়োজন৷ তার ছেলে আরামবাগ আল কারিম ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার ছাত্র৷ সেখানে খেলাধুলার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তিনি ছেলেকে কবি নজরুল ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি করেছেন৷ তার ছেলের ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ আছে৷তিনি নিজেও খেলাধুলা পছন্দ করেন৷

তিনি বলেন, ‘‘প্রতিদিন বিকেলে একটা ক্লাস বাদ দিয়ে আমি নিজে তাকে ক্রিকেট খেলতে নিয়ে যাই৷ আগে আমার ছেলে আইডিয়াল স্কুলে পড়তো৷ সেখানে খেলার সুযোগ ছিল৷ কিন্তু এখানে নেই৷ তাই বলে তো খেলাধুলা বাদ দেয়া যাবে না৷’’ঝর্ণা আক্তারের বাড়ি মুন্সিগঞ্জে৷ এইচএসসি পাস করার পর আর লেখাপড়া করতে পারেননি বিয়ে হয়ে যাওয়ার কারণে৷ বিয়ের আগে অ্যাথলেট ছিলেন ঝর্ণা৷ লং-জাম্পে পারদর্শছিলেন৷ তিনি মনে করেন, ‘‘মেয়েদেরও খেলাধুলা করা প্রয়োজন৷ একজন মুসলিম নারী পর্দা মেনে সব কিছুই করতে পারে৷ আমিও পর্দা মেনেই সব সময় খেলাধুলা করেছি৷’’

তিনি জানান, ‘‘বাংলাদেশের কিছু মাদ্রাসায় বড় বড় মাঠ আছে৷ সেখানে খেলাধুলা হয়৷ কিন্তু সব মাদ্রাসায় ব্যবস্থা নেই৷ আমার ছেলেটিকে মাদ্রাসায় ভর্তির সময় যখন দেখলাম মাঠ নেই, খেলাধুলার সুযোগ নেই তখন আমার মন খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল৷’’

ঝর্ণা আক্তার সুযোগ পেলে এখনো বোরকা পরেই খেলাধুলা করতে চান৷ তার কথা, ‘‘অনেক মহিলা মাদ্রাসা আছে৷ সেখানে যে মেয়েরা পড়াশুনা করেন তাদেরও খেলাধুলার সুযোগ করে দেয়া উচিত৷ তাদের জন্য মাঠের ব্যবস্থা করা উচিত৷’’

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচব মো. আমিনুল ইসলাম খান জানান, ‘‘দেশের সরকারি তিনটি আলিয়া মাদ্রাসায় খেলাধুলার জন্য বছরে কিছু বরাদ্দ দেয়া হয় ৷ কিন্তু এমপিওভুক্ত বা অন্য কোনো মাদ্রাসার জন্য সরকারের কোনো বরাদ্দ নেই৷’’