নিয়মনীতি না থাকায় হাওরে বাড়ছে নৌ-দুর্ঘটনা

প্রকাশিত: ৬:৩১ অপরাহ্ণ , সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২০

সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনা হাওরে চলতি বছর জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে নৌ দুর্ঘটনায় ৩৪ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানীর ঘটনা ঘটছে। এলাকাবাসী মনে করেন, নৌ যোগাযোগে অব্যবস্থাপনার কারণেই নৌকা ডুবে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।

চলতি বছরের জুলাই-আগষ্ট মাসে সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা, তাহিরপুর ও ছাতক উপজেলায় নৌকা ডুবির ঘটনায় প্রায় ৫ জনের প্রাণহানি ঘটে। এদের মধ্যে ৩ জন তাহিরপুর উপজেলার। এছাড়া গত ৫ আগস্ট নেত্রকোনার মদন উপজেলার হাওরে নৌকা ডুবে ১৭ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানী ঘটে। চলতি মাসের ৯ তারিখ সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনার মধ্যবর্তী গুমাই নদীতে নৌকা ডুবির ঘটনায় ১২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার মধ্যবর্তী গুমাই নদীতে ফিটনেসবিহীন ট্রলারে যাত্রী পরিবহনের কারণে গুমাই নদীতে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে এলাকাবাসীর ধারণা। এ কারণে গত বুধবার সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর থেকে ঠাকুরাকোণার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া যাত্রীবাহী ট্রলারের সাথে একটি বাল্কহেড নৌকার মুখোমুখী সংঘর্ষে মর্মান্তিক প্রাণহানীর ঘটনা ঘটে। প্রথমে ১০ জনের লাশ উদ্ধার করে পরে শুক্রবার বিকেলে আরও ২টি লাশ উদ্ধার করা হয়।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনার হাওর এলাকার বিভিন্ন উপজেলায় সারা বছর চলাচলের জন্য উন্নত সড়কপথ নেই। যেগুলো রয়েছে সেগুলোতেও নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। বেশিরভাগ সড়ক ৬-৭ মাস পানির নীচে তলিয়ে থাকে। এসব কারণে বর্ষাকালে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় কাজে, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে, বিয়েশাদী, হাট-বাজার ইত্যাদি ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলার দিয়ে সেরে থাকে।

হাওরে বসবাসকারী লোকজন মনে করেন, সড়কপথে পরিবহন চলাচল করার জন্য নির্দিষ্ট নিয়মনীতি থাকলেও নৌপথে চলাচলে কোন নিয়মনীতি নেই। এ কারণে ট্রলার বা নৌকাচালকরা নিজের ইচ্ছামত অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে চলাচল করে। এ কারণেও নৌ দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে। নৌপথে এরকম দুর্ঘটনারোধ করতে ট্রলার বা নৌকার ফিটনেস যাচাই, যাত্রী ধারণ ক্ষমতা, যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য লাইফ জ্যাকেট নিশ্চত করা প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক নৌঘাট থেকে রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি যাত্রী সুরক্ষার জন্য নিয়মনীতি প্রণয়ন করাও জরুরি। তা না হলে নৌপথে প্রাণহানীর ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়।

জামালগঞ্জ উপজেলার স্থানীয়রা বলেন, আমরা একেবারেই হাওর এলাকার মানুষ। হাওরের বৈরী আবহাওয়ার সাথে যুদ্ধ করেই বড় হয়েছি। নৌ পথে চলাচলে কোন নিয়ম নীতি মানা হয়না। চালক ও যাত্রীরা সচেতন হলেই নৌদুর্ঘটনা অনেকটা রোধ করা সম্ভব। নৌ দুর্ঘটনা বন্ধ করতে চাইলে মেরিন নীতিমালায় হাওরের চলচলকারী সকল ধরনের নৌকা-ট্রলার যানকে নিয়ে আসতে হবে। সেই সাথে সচেতনতাও বাড়াতে হবে। সড়ক পথের মত নৌপথে নিয়ম-নীতির দরকার। যেসকল নৌকা চালক এসব মানবেন না তাদেরকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

এদিকে, সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নৌপথে চলাচলকারী নৌযানসমূহ এবং সংশ্লিষ্ট সর্বসাধারণকে অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে প্রচলিত আইন ও বিধি বিধানসহ বিভিন্ন নির্দেশাবলী দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে- অভ্যন্তরীণ নৌযানসমূহকে সার্ভে এবং নিবন্ধন করতে হবে; সার্ভে সার্টিফিকেট (ফিটনেস) নৌযানের প্রকাশ্য স্থানে ঝুলিয়ে রাখতে হবে; নিবন্ধন সনদপত্র নৌযানে রাখতে হবে; রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্রকাশ্য স্থানে উৎকীর্ণ থাকবে; প্রতিটি নৌযানে আসন সংখ্যা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংখ্যক লাইফ জ্যাকেট/ভয়া যাত্রী সাধারণের হাতের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে; আসন সংখ্যার চেয়ে অধিক যাত্রী বহন করা যাবে না; দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক এবং সহকারী দ্বারা নৌযান চালানো নিশ্চিত করতে হবে; সাইরেন ও সার্চ লাইট/সিগন্যাল লাইট ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে; মালবাহী নৌযানে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত মালামাল পরিবহন করা যাবেনা; নৌযান চালকের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার সনদ গ্রহণ করতে এবং তা নৌযান চালনাকালে সংরক্ষণ করতে হবে।

এছাড়া আবহাওয়া পূর্বাভাস মেনে নৌযান চালাতে হবে; দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নৌযান চালানো থেকে বিরত থাকতে হবে; সকল প্রকার সংঘর্ষ ও দুর্ঘটনা এড়িয়ে নৌযান চালাতে হবে; কোনভাবেই ধারণ ক্ষমতার অধিক যাত্রী/মালামাল বা পণ্য পরিবহন করা যাবেনা।

এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদ জানান, নৌ দুর্ঘটনা রোধে আমরা বিভিন্ন নির্দেশনা প্রদান করেছি। যারা এসব নির্দেশনা অমান্য করবে তাদের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ ও বাংলাদেশ বাণিজ্যিক নৌ-চলাচল অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ এবং প্রচলিত আইন ও বিধি মোতাবেক মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।