তাকে দাবায়ে রাখা যায়নি

প্রকাশিত: ১:৫৯ অপরাহ্ণ , আগস্ট ২, ২০২০

অজয় দাশগুপ্ত

শেখ মুজিব এমন এক ব্যক্তি যাকে ভয় ছুঁতে পারে না। যদি আপনি এক শব্দে শেখ মুজিবকে প্রকাশ করতে চান তাহলে আপনাকে বেছে নিতে হবে ‘সাহসী’ শব্দটা, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশের জন্ম’ গ্রন্থে এ কথা লিখেছেন কাজী আহমেদ কামাল। [পৃষ্ঠা ১৭-১৮]

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও কাজী আহমেদ কামাল দু’জন গত শতাব্দীর চলি­শের দশকের শুরুতে কলিকাতার পড়াশোনা করেছেন এবং বেকার হোস্টেলে একসঙ্গে কাটিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে লিখেছেন ‘দুনিয়ার ইতিহাসে দেখা গেছে যে কোনো ব্যক্তি জনগণের জন্য এবং তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য কোনো প্রোগ্রাম দিয়েছে, যাহা ন্যায্য বলে জনগণ মেনে নিয়েছে। অত্যাচার করে তাহা দমন করা যায় না। যদি সেই ব্যক্তিকে হত্যাও করা যায় কিন্তু দাবি মরে না এবং সে দাবি আদায়ও হয়। যারা ইতিহাসের ছাত্র বা রাজনীতিবিদ, তারা ভাল করে জানেন। জেলের ভেতর আমি মরে পারি যেতে তবে এ বিশ্বাস নিয়ে মরব। জনগণ তাদের ন্যায্য অধিকার একদিন আদায় করবে।’ [পৃষ্ঠা ২৩৯]

‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে এ কথা লিখেছেন তিনি ১৯৬৭ সালের ৩ মে থেকে ২৩ মে-এর মধ্যে। তখন স্বায়ত্তশাসনের ঐতিহাসিক ৬-দফা দাবি প্রদানের কারণে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু তিনি নিরুদ্বিগ্ন। বই ও পত্রিকা পড়ছেন। লিখছেন। ফুল চাষ করছেন। ফলের গাছের যতœ নিচ্ছেন। কারাগারে আশপাশে যে সব ছাত্রবন্দি আছে, তারা খিচুড়ি খেতে চায়। সে আয়োজন করছেন। স্ত্রী ও আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগে রাজনৈতিক নির্দেশনা পাঠাচ্ছেন সহকর্মীদের কাছে।

কৈশোর থেকেই তিনি তেজস্বী, দৃঢ়চেতা, অভিষ্টসাধনে কৃতসংকল্প। ক্যারিশমা তে ছিলই। ১৯৩৮ সালে, বয়স যখন ১৮ বছর, বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও শ্র্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি মহকুমা শহর গোপালগঞ্জে এলে তিনি নির্ভীকচিত্তে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বিদ্যালয়ের সমস্যা তুলে ধরেন, আদায় করেন দাবি। এ সফরের সময়েই ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগ গঠনের বিষয়ে সোহরাওয়ার্দি সাহেবের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়। কিছুদিনের মধ্যেই সরাসরি যোগাযোগ, চিঠিপত্রের আদানপ্রদানও চলতে থাকে। এই বয়সেই তাঁর প্রথম জেলজীবনের অভিজ্ঞতা ঘটে। কিন্তু কিছুতেই তিনি দমে যাননি।

ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করা এবং একইসঙ্গে জনকল্যাণ, এই লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি তিনি কলেজে পড়াশোনার জন্য যান কলিকাতা, ১৯৪২ সালে ভর্তি হন ইসলামিয়া কলেজে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তাকে আমরা দেখি ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় লঙ্গরখানা পরিচালনার কাজে। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে তিনি শান্তি স্থাপনের পাশাপাশি সক্রিয় রিলিফ ক্যাম্প পরিচালনায়।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাস খানেকের মধ্যেই তিনি কলিকাতাকে বিদায় জানিয়ে ঢাকায় চলে আসেন, ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগে। সেই বয়সেই বুঝতে সমস্যা হয়নি যে পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক পাকিস্তানি শাসকরা পূর্ব বাংলার বাঙালিদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দমিয়ে রাখতে সক্রিয়। এ জন্য মিথ্যাচার এবং ধর্মের অপব্যহার করতেও তারা দ্বিধা নেই। তিনি এ অন্যায় রুখে দাঁড়াতে উদ্যোগী হলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সাড়ে চার মাসের মধ্যে গড়ে তোলেন সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক হাতিয়ার, ছাত্রলীগ। এর দেড় বছরের কম সময়ের মধ্যে মওলানা আবদুল খান ভাসানিকে সভাপতি নির্বাচিত করে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগেরও তিনি প্রাণপুরুষ।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত ছাত্রলীগ মাত্র দুই মাস ৭ দিনের মাথায় নেতৃত্ব দেয় বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে ডাকা ১১ মার্চের হরতালে। এ দিন বিপুল সংখ্যক ছাত্র নেতা-কর্মীর সঙ্গে গ্রেফতার হন শেখ মুজিবুর রহমান, যা ছিল পাকিস্তান আমলে তাঁর প্রায় ১৩ বছর জেলজীবনের প্রথম।

পাকিস্তানে তাঁর দ্বিতীয় জেল ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল থেকে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিম্নবেতনভুক কর্মচারীদের আন্দোলন সমর্থন করলে ২৭ জন ছাত্রছাত্রীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। কর্তৃপক্ষ জানায়, সদাচরণের বন্ড ও আর্থিক জরিমানা দিলে শিক্ষা জীবন অব্যাহত রাখার অনুমতি দেওয়া হবে। কিন্তু তরুণ মুজিব অদম্য। তিনি জরিমানা প্রদানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। আরও কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর স্থান হয় কারাগারে। এই কারাগারেই তাঁর কাছে হাজির হন চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী, কলিকাতায় ছাত্র আন্দোলন করার সময় যার সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। ‘সিক্রেট ডকুমেনটস অব ইন্টালিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দি ন্যাশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’-এর প্রথম খন্ডে বলা হয়েছে, ‘ফজলুল কাদের চৌধুরী ৯ মে (১৯৪৯) ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের ছাত্র ও মুসলিম ছাত্রলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময়ে শেখ মুজিবকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আপস করার প্রস্তাব দিলে তিনি তা প্রত্যাখান করেন। ক্ষমা চাইতেও রাজী হননি। তাঁর মতে, ছাত্ররা এমন কোনো অন্যায় করেনি যে জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। তারপরও ফজলুল কাদের চৌধুরী আপসের জন্য পীড়াপীড়ি করলে শেখ মুজিব চারটি শর্ত উপস্থাপন করেন, সকল ছাত্রছাত্রীর শাস্তি প্রত্যাহার, এ ঘটনায় আটক সকল ছাত্রের মুক্তি, নতুন করে কারও বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া এবং সংবাদপত্রে খবর প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করায় তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনের অবসান ঘটে। কিন্তু জীবনের যে পাঠ তিনি গ্রহণ করেছেন মাতৃভূমির প্রতি, জনগণের প্রতি অপরিসীম ভালবাসা ও কর্তব্যবোধ থেকে, সেটাই তাকে সংকল্পবদ্ধ করে তোলে। তিনি শপথ নেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ছাত্র হিসেবে না হলেও আমি আবার ফিরে আসব।’

কী দূরদর্শীই না ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য ‘ষড়যন্ত্র’ করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের হয়। এ মামলা বাতিল ও অন্যান্য দাবিতে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে যে প্রবল ছাত্র-গণ আন্দোলন গড়ে ওঠে তার নেতৃত্বে ছিল এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ। এ প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের নির্বাচিত সংগঠন ডাকসু তাকে বঙ্গবন্ধু অভিধায় ভূষিত করে। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তাঁর আহ্বানে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই উত্তোলন করা হয় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা।

এভাবেই জাতির পিতার গৌরবময় ফিরে আসা!

কেমন অদম্য, দুঃসাহসী তিনি? ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে লিখেছেন, আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর ১১ অক্টোবর (১৯৪৯) ঢাকার আরমানিটোলা ময়দানে জনসভায় বক্তৃতা ও পরে মিছিল করার ‘অপরাধে’ তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। পুলিশ তাকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে। এ সময়েই দলের সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী নির্দেশ দেন, পাকিস্তানের লাহোর যাও। কী করে সেখানে যাওয়া যাবে? যেতে হবে ভারতের ওপর দিয়ে, যেখানে তখনও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলছে। অর্থের ব্যবস্থাই বা কীভাবে হবে? অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, এ সব প্রশ্ন করায় ‘ভাসানী সাহেব বললেন, তা আমি কি জানি! যেভাবে পার লাহোর যাও। সোহরাওয়ার্দি সাহেবের সাথে দেখা কর এবং তাঁকে সকল কিছু বল।’ [পৃষ্ঠা ১৩৫]

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি লাহোর গেছেন ১৫ অক্টোবর (১৯৪৯) রাতে। ফিরেছেন এক মাসের বেশি সময় পর, নভেম্বরের শেষ দিকে। গ্রেফতার হন ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৫০ তারিখ। এর পর একটানা দুই বছর দুই মাস কাটে কারাগারের অন্ধপ্রকোষ্ঠে। কিন্তু তিনি তো আগের মতোই ন্যায়ের জন্য দুর্দমনীয়, আপসহীন।

এই জেলজীবনের বেশিরভাগ কাটে নিরাপত্তা বন্দি হিসেবে। তিন বা ছয় মাসের আটকাদেশ প্রদান করে বিনাবিচারে রাখা হচ্ছিল পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে। সে সময়ে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শামসুল হকসহ কয়েকজন নেতাকেও কারাগারে কাটাতে হয়। কিন্তু তাঁর মতো একটানা দুই বছরের বেশি কারাজীবন কয়েকজন কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি ব্যতিরেকে কারও ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। এই বন্দিজীবনেই কিছুদিন পর পর গোয়েন্দারা কারাগারে দেখা করত এবং ফিরে গিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট দিত, ‘এ বন্দিকে কোনোভাবেই বাগ মানানো যায় না, নত করানো যায় না। অতএব, আটকাদেশ বাড়ানো হোক।’

১৯৪৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর গ্রেফতারের দিন শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে গোয়েন্দা নোটে বলা হয়, ‘তিনি হচ্ছেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সবচেয়ে মিলিট্যান্ট সদস্য এবং ছাত্রদের একটি অংশের মধ্যে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন।’ [প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২৮]

৭ জানুয়ারি, ১৯৫০ তারিখ ডিআইবি প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ক্ষতি বা অনিষ্ঠ সাধনে সে খুবই দক্ষ। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য তাকে ৬ মাস আটক রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা অপরিহার্য। [পৃষ্ঠা ৩৫৪]

এ বছরের ২৬ মে বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে জেপু নামে একজনকে চিঠি লিখেছেন, ‘তুমি আমাকে বন্ড দিতে বলেছ। আমি বুঝতে পারি না কেমন করে তুমি আমার কাছে ‘‘বন্ড’’ শব্দটি লিখতে সাহস পেলে। আমি সর্বশক্তিমান আল­াহ ছাড়া আর কারও কাছে মাথা নত করতে জানি না।’ [ পৃষ্ঠা ৪৩৯]

ত্রিশ বছর বয়সে নির্জন কারা প্রকোষ্ঠ থেকে যখন তিনি এ দৃঢ়সংকল্প প্রকাশ করেন, প্রিয়তম স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব তখন দুঃখ-কষ্টের জীবন কাটাচ্ছেন বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে, সঙ্গে তিন বছরের মেয়ে শেখ হাসিনা ও এক বছরের ছেলে শেখ কামাল।

এ বছরেরই ১৪ জুন এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘১ জুন ও ১০ জুন দু’জন গোয়েন্দা অফিসার শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তাঁর মনোভাবে কোনো পরিবর্তন নেই। এমনকি বন্ড দিয়ে জেল থেকে মুক্তিলাভে তিনি ইচ্ছুক নন।’ [পৃষ্ঠা ৪৪৮]

১৬ জুন আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘শর্ত মেনে মুক্তিলাভের চেয়ে তিনি কারাগারের অভ্যন্তরে থাকা এবং মৃত্যুবরণকেও শ্রেয় মনে করেন। [পৃষ্ঠা ৪৫১]

এমন দুঃসাহস ও আত্মপ্রত্যয় সেই যৌবনেই দেখিয়েছেন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১১ জুলাই (১৯৫০) এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কারাগারে কয়েকজন আত্মীয়সহ বড় বোন আসিয়া বেগম দেখা করেছেন। পারিবারিক বিষয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে তাকে বন্ড দিয়ে মুক্তিলাভের পরামর্শ দিলে তিনি সেটা করতে অস্বীকৃতি জানান।

২৭ সেপ্টেম্বর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯ সেপ্টেম্বর একজন পুলিশ অফিসার শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। ১২ সেপ্টেম্বর এক মামলায় তাঁর তিন মাস সশ্রম জেল হয়েছে। বিচারক বলেছেন, ‘এ মামলায় মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও শামসুল হককে খালাস দেওয়া হলো। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান মিছিলে শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করেননি, বরং তিনি গুলির মুখে দাঁড়াতে সংকল্প ব্যক্ত করেন। তাকে শর্তহীনভাবে ও অনুতপ্ত হওয়ার পূর্বে মুক্তি দিলে ঝামেলা পাকাবে।’

কীভাবে তিনি অনুপ্রাণিত হতেন? মনোবল দৃঢ় রাখতেন? এর উত্তর মিলবে বঙ্গবন্ধুর কাছে লেখা একটি চিঠিতে, যা ১৯৫১ সালে আইএ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হওয়া এক শিক্ষার্থী টুঙ্গিপাড়া থেকে লিখেছেন ১৯৫০ সালের ৬ অক্টোবর। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের প্রথম খণ্ডের ৫১০-৫১১ পৃষ্ঠায় চিঠিটি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে ছত্রে ছত্রে প্রকাশ পেয়েছে গ্রামের ‘খোকার’ জন্য গর্ব, উচ্ছাস। চিঠিতে লেখা হয়েছে, কতদিন কারাগারে বন্দি থাকবেন জানি না। কত কষ্ট সহ্য করতে হবে আপনাকে। কিন্তু আদর্শের জন্য আপনার আত্মত্যাগ দেশের কৃষক ও দরিদ্র মানুষ স্মরণ রাখবে।

৫ অক্টোবর ফরিদপুর কারাগারে থাকার সময় এক গোয়েন্দা অফিসার সাক্ষাৎ করেন। তাকে বঙ্গবন্ধু জানিয়ে দিয়েছেন, জেলে মরব তবু বন্ড দেব না। মুক্ত হলে রাজনীতি করব।
এভাবেই আমরা দেখতে পাই, বার বার তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছিল, যা তিনি অসম্মানজনক বিবেচনা করেছেন। তাকে বলা হচ্ছিল, চাকরি করুন কিংবা ব্যবসায়ে যোগ দিন। সরকারি দলে যোগ দিলে লাইসেন্স-পারমিট পেতে সমস্যা নেই। সংসারের প্রতি মনোযোগ দিন। স্ত্রী-কন্যা-পুত্রকে সময় দিন।

কিন্তু ভোগবিলাস বা নির্ঝঞ্ঝাট সংসার জীবন নয়, জনগণের কল্যাণে কাজ করাই তাঁর কাছে রাজনীতি। এটা তিনি কীভাবে ত্যাগ করবেন?

২১ ডিসেম্বর (১৯৫০) হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি সাহেবকে ফরিদপুর জেল থেকে চিঠিতে বঙ্গবন্ধু লেখেন, ‘মামলা কতদিন চলবে জানি না, আমি পরোয়া করি না। … আমি জানি যারা কোনো আদর্শের জন্য উৎসর্গীকৃত থাকে তারা কমই পরাজিত হয়। মহৎ লক্ষ্য মহৎ আত্মত্যাগের মাধ্যমেই অর্জিত হয়।… গত অক্টোবরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাক্ষাতের সময় আপনি কয়েকটি বই পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখনও কোনো বই পাই নাই। ভুলে যাবেন না আমি নির্জন কারাগারে রয়েছি এবং বই-ই আমার একমাত্র সঙ্গী।

কেন তিনি অদম্য, বুঝতে সমস্যা হয় না আমাদের।

১৯৫১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমান খুলনা জেল আটক রয়েছেন। ২২ ফেব্রুয়ারি তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি নিশ্চিত, সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে আওয়ামী মুসলিম লীগ ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পরাজিত করবে। ডিটেনশনে আটক থেকে মৃত্যু হলেও তিনি বন্ড দিতে রাজী নন। তাঁর মনোভাব অনমনীয়।

১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৫১ তারিখ বঙ্গবন্ধু ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে হক সাহেবকে (সম্ভবত আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক) লিখেছেন, ‘ভয়ের কারণ নেই। আমি জানি, আমি মরতে পারি না বহু কাজ আমাকে করতে হবে। খোদা যাহাকে না মারে মানুষ তাহাকে মারতে পারে না। নানা কারণে সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। আমার কোন কিছুর দরকার নাই। যদি ২/১ খানা ভাল ইতিহাস অথবা গল্পের বই পাঠাতে পারেন তবে খুশি হব।’

এ বছরেরই ১২ নভেম্বর পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সাবেক অফিসার আকতার আহাদ করাচি থেকে বঙ্গবন্ধুকে লিখেছেন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি সাহেব সবসময় আপনার প্রশংসা করেন। গত সপ্তাহে তিনি এক কর্মী সভায় বলেছেন, ‘মুজিবুর রহমানের মতো ৫ জন থাকলে গোটা দেশ তাঁর পাশে থাকত।’

১৯৫১ সালের শেষ দিকে বন্দি থাকার সময় অসুস্থ হয়ে পড়লে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সে সময়টি নতুন করে ভাষা আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করেছে। হাসপাতালে থাকার সুযোগ নিয়ে বঙ্গবন্ধু আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পরামর্শ করছেন কর্মসূচি সফল করার বিষয়ে। ১ জানুয়ারি (১৯৫২) এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরাপত্তি বন্দি মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক তৎপরতা পরিচালনার জন্য ঢাকায় দেওয়া চিকিৎসা সুবিধার অপব্যবহার করছেন।

এ সময়ে তাঁর সঙ্গে কে কে দেখা করেছেন, কী আলোচনা হয়েছে তার বিবরণ রয়েছে অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে। বিস্ময়ের যে, গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিবরণের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর বিবরণ হুবহু মিলে যায়। অথচ বঙ্গবন্ধু এ গ্রন্থ রচনা করেন ১৯৬৭ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক থাকার সময়। আর গোয়েন্দা প্রতিবেদন দশকের পর দশক চাপা পড়ে ছিল পুলিশের হেফাজত খানায়, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তা প্রকাশ শুরু করেছেন।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে আমরা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ডাকা হরতাল কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বঙ্গব›ন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী মহিউদ্দিন আহমদের অনশন কর্মসূচির সিদ্ধান্ত জানতে পারি। ফরিদপুর জেলে অনশনের সময় তাদের প্রাণসংশয় হয়েছিল। কিন্তু উভয়ে ছিলেন অদম্য। সালাম-বরকত-রফিকের আত্মদানে ২১ ফেব্রয়ারির অমর গাঁথা রচিত হওয়ার ২৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে মুসলিম লীগ সরকার বাধ্য হয়। মুক্তি দেওয়া হলেও ১ মার্চ (১৯৫২) সরকারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়, ‘তাঁর ওপর সর্বক্ষণ নজর রাখতে হবে এবং যদি তিনি বেআইনি কাজে লিপ্ত থাকেন তাকে গ্রেফতার করতে হবে।’

টানা দুই বছরের বেশি জেলজীবন, অনশনের দুঃসহ শারীরিক কষ্ট। এর মধ্যেই মুক্তিলাভের ঠিক দু’মাস পর ২৬ এপ্রিল তাঁর হাতে অর্পিত হয় আওয়ামী মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের গুরুদায়িত্ব। এ সময়ে দলের সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে জেলে নেওয়া হয়। জেলে যাওয়ার আগে ১২ এপ্রিল শেখ মুজিবুর রহমানকে তিনি লেখেন, ‘পূর্ব্ব বাংলার ৪।। (সাড়ে চার কোটি) কোটী মজলুমের সহায় একমাত্র আল্লাহ্ আর তোমরা কতিপয় যুবক ছাড়া আর কেহ নাই।’ [গোয়েন্দা প্রতিবেদন, প্রথম খণ্ড’ পৃষ্ঠা ১৫৯]

পূর্ব বাংলায় তখন মুসলিম লীগের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেছে। জনগণ আস্থা রাখতে শুরু করেছে আওয়ামী মুসলিম লীগের ওপর। দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান এ সুযোগ পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগান। তিনি জেলা-মহকুমায় ব্যাপকভাবে সংগঠনিক সফর করতে থাকেন। গোয়েন্দা তার পেছনে সর্বক্ষণ লেগে থাকছিল। সিনেমা দেখতে কিংবা সেলুনে গেলেও তারা সঙ্গী! ওয়াচারদের ওপর কঠোর নির্দেশ, তাঁর গতিবিধির প্রতি মুহূর্তের বিবরণ পাঠাতে হবে।

জননেত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের প্রতি আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতা যে পুলিশ সদর দফতরের সহায়তায় এ সব গোয়েন্দা প্রতিবেদন দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তৃতীয় খণ্ড থেকে আমরা জানতে পারি, ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রয়ারি তিনি ও আতাউর রহমান খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৫-২০ হাজার ছাত্রজনতার মিছিলের নেতৃত্ব দেন। আরমানিটোলা ময়দানের জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, পূর্ব বাংলার প্রতিটি মানুষ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি আদায়ের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। [পৃষ্ঠা ৮৭-৮৮]

এ সময়ে বঙ্গবন্ধু দলকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য কতটা সংকল্পবদ্ধ ছিলেন, তার প্রমাণ মেলে ৫ মে স্ত্রী বেগম ফলিাতুন্নেছা মুজিবকে লেখা চিঠিতে। তৃতীয় সন্তান শেখ জামালের জন্মের খবর পেয়ে তিনি লিখেছেন, ‘স্নেহের রেণু। আজ খবর পেলাম তোমার একটি ছেলে হয়েছে। তোমাকে ধন্যবাদ। খুব ব্যস্ত, একটু পরে ট্রেনে উঠব। ইতি তোমার মুজিব।’

গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারি, বঙ্গবন্ধু পাবনার এডওয়ার্ড কলেজের জনসভায় যোগদানের জন্য ৫ মে ট্রেনে উঠেছিলেন। সে সময়ে ফুলবাড়িয়ায় ছিল কেন্দ্রীয় রেল স্টেশন।

এমন অতুলন আত্মত্যাগ!

তিনি নিরলস শ্রম-সাধনায় দলকে প্রস্তুত করেছিলেন, ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসের সাধারণ নির্বাচনের জন্য। এ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল বিজয় অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রের রাজনীতির কারণে বাঙালিদের জন্য আরেক দফা বিপর্যয় নেমে আসে। যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেওয়া হয়। কিন্তু বিস্ময়ের যে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানকেই গ্রেফতার করা হয়, যিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তাদের জানা ছিল, দলের নেতা-কর্মী ও জনগণকে প্রতিবাদমুখর করে তোলার মতো সাহসী ব্যক্তি এই একজনই রয়েছেন। বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে দুঃখ করে লিখেছেন, ‘অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনোদিন একসাথে হয়ে দেশের কোনো কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়। [পৃষ্ঠা ২৭৩]

আগের জেলজীবনের সঙ্গে পার্থক্য ছিল, তিনি সদ্যবিদায়ী মন্ত্রিসভার সদস্য। বহাল রয়েছেন পূর্ব পাকিস্তান আইন সভার নির্বাচিত সদস্য হিসেবে। বৃহত্তর রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সাধারণ সম্পাদক। বয়স মাত্রই ৩৪ বছর। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী মনোভাবে পরিবর্তন নেই। ৯ জুলাই (১৯৫৪) তারিখ ডিআইবির অতিরিক্ত এসপি এস রহমান লিখেছেন, ‘এই ব্যক্তি সবচেয়ে ভয়ানক অশান্তি সৃষ্টিকারীদের একজন এবং রাষ্ট্রে ঝঞ্ঝাট ও ক্ষতিসাধনে পারঙ্গম। সক্ষমতা ও বেআইনি কর্মকাণ্ডের জন্য ৬ মাস বিনাবিচারে আটক রাখা অপরিহার্য এবং জননিরাপত্তার স্বার্থে এ সুপারিশ করছি।

১৯ অক্টোবর এক গোয়েন্দা অফিসার দেখা করে সেই ‘গৎবাঁধা’ মন্তব্য করেছেন, ‘তাঁর মনোভাব দৃঢ় ও অপরিবর্তনীয়। তিনি শর্তাধীন মুক্তির বিরুদ্ধে। হি ইজ এ গ্রেট ট্রাবলশুটার।’ [চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৯]

১৯৫৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন। ২৫ জানুয়ারি (১৯৫৫) মাওলানা ভাসানী হামিদাবাদ, গোয়ালপাড়া, আসাম (তখন তিনি সেখানে অবস্থান করছিলেন) থেকে বঙ্গবন্ধুকে চিঠি লেখেন, ‘আশা করি জনগণ তোমার মতো নির্ভীক কর্মীদের কারণে উপকৃত হবে। [ গোয়েন্দা প্রতিবেদন, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২২]

মুক্তিলাভের পর ফের তিনি জনতার দরবারে। এ সময়ে নিরলসভাবে কাজ করেন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠনের লক্ষ্য সামনে রেখে। ১৯৫৫ সালের ৫ মে ময়মনসিংহ টাউন হলের জনসভায় তিনি বলেন, ৯২-ক ধারা জারি করে ৫০ জন আইনসভা সদস্যসহ আওয়ামী লীগের ১৫ শ’ নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। মোহাম্মদ আলী সাহেব ফজলুল হককে বিশ্বাসঘাতক বলে গালি দেন। তিনি আমাদের জেল পাঠাতে পারেন। কিন্তু আমরা অদম্য। আমরা জেলে পচে মরব না, আমরা আত্মসমর্পণ করব না। [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৬৭]

১৮ জুলাই, ১৯৫৫ আওয়ামী লীগ নেত্রী বেগম বদরুন্নেছা আহমেদ বঙ্গবন্ধুকে এক চিঠিতে লেখেন, ‘সত্যিই আপনার জন্য আমরা গর্ব্ব অনুভব করছি… এবং কামনা করছি একদিন যেন দেশ আপনাকে নিয়ে গর্ব্ব করতে পারে।’

কী চমৎকার ভবিষ্যদ্বাণী!

১৯৫৬ সালের প্রথম থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে খাদ্য সঙ্কট দেখা দেয়। আওয়ামী লীগ জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য আমদানির দাবি জানায়। ৯ মে বঙ্গবন্ধু এক বিবৃতিতে বলেন, আমরা আমরণ সংগ্রাম চালাইয়া যাইব। কিছুতেই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির নিকট নতিস্বীকার করিব না। তিনি স্লোগান তোলেন, সস্তা দরে চাউল চাই, সর্বত্র রেশনিং চাই। ১২ জুলাই করাচিতে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাসনী চক্র পূর্ব পাকিস্তানকে প্রায় একটি কলোনীর মতো করিয়া রাখিয়াছে।

খাদ্য সঙ্কট সমাধানের দাবিতে আওয়ামী লীগ হরতাল-মিছিলসহ একের পর এক কর্মসূচি প্রদান করতে থাকে। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ভুখা মিছিল বের হয়। ৪ সেপ্টেম্বর এ ধরনের মিছিলে গুলি হয়। ৫ সেপ্টেম্বর হরতাল পালিত হয়। ৬ সেপ্টেম্বর আতাউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয় মন্ত্রীসভা, পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম বারের মতো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। বঙ্গবন্ধু স্থান পান মন্ত্রিসভায়। কিন্তু দলের সভাপতি মওলানা ভাসানী গঠনতন্ত্র অনুযায়ী মন্ত্রীত্ব ও দলের পদের একটি বেছে নিতে আহ্বান জানালে তিনি মন্ত্রীত্ব ছাড়েন। সর্বক্ষণ সময় দেন দলের কাজে। ১৯৫৭ সালের ৩১ মে তিনি পদত্যাগ করেন, যদিও তা গৃহীত হয় দুই মাস ৮ দিন পর, ৮ আগস্ট। পদত্যাগপত্র বিবেচনাধীন থাকার সময়েই দলের সভাপতি জনপ্রিয় নেতা মাওলানা ভাসানী বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মী নিয়ে আওয়ামী লীগ ত্যাগ কওে গঠন করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপ। এই দুঃসময়ে বঙ্গবন্ধু গোটা পূর্ব পাকিস্তান চষে বেড়ান দলকে ধরে রাখার জন্য। এতে সুফল মেলে। ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারির পর বাঙালিদের ওপর শোষণ-বঞ্চনা এবং রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক নিপীড়ন নতুন মাত্রালাভ করে। কিন্তু দল সুসংগঠিত এবং বিশেষভাবে ছাত্রদের মধ্যে বিপুল প্রভাব থাকায় দ্রুতই তিনি সামরিক জান্তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন।

১৯৫৮ সালের ২৫ জুলাই মর্নিং নিউজ পত্রিকা বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎকার প্রচার করে। ওই সময়ে পাকিস্তান ও ইরানকে নিয়ে একটি কনফেডারেশন গঠনের চেষ্টা চলছিল। বঙ্গবন্ধুর কাছে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট উত্তর দেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ এ চক্রান্ত প্রতিহত করবেই। এটা হচ্ছে পাকিস্তানে বাঙালিদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করার আরেকটি হীন পরিকল্পনা। [ গোয়েন্দা প্রতিবেদন, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯]

৭ অক্টোবর সামরিক শাসন জারি হয়। বঙ্গবন্ধু সেদিন ছিলেন রাজধানী করাচিতে। পরদিন তিনি ঢাকা চলে আসেন। তাকে গ্রেফতার করা হয় ১০ অক্টোবর। জেলার ১২ অক্টোবর গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন, ‘এ বন্দিকে মোটেই বিচলিত মনে হয়নি। তিনি অন্য বন্দিদের উৎসাহ দিয়ে বলেন, সামরিক শাসন দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং রাজবন্দিরা সকলে আবার জনগণের কাছে ফিরে যাবে।’

বেঙ্গল প্রাদেশিক মুসলিম লীগের এক সময়ের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম পূর্ব পাকিস্তান আইন সভার সকল সদস্যদের কাছে একটি আবেদন প্রকাশ করেছিলেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পঞ্চম খণ্ডের ৪৬-৪৯ পৃষ্ঠায় এটি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে তারিখ দেওয়া রয়েছে ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২। সে সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান বন্দি ছিলেন। আবুল হাশিম লিখেছেন, ‘ব্রেভেস্ট অব দি ব্রেভ অব দি ক্রুসেডারস অব পাকিস্তান এবং মুসলিম লীগের প্রথম শ্রেণির কর্মী শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে বিনাবিচারে আটক রয়েছেন।’

কলিকাতায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সময় আবুল হাশিমের সংস্পর্শে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তরুণ এ কর্মীর সম্ভাবনা তিনি যথার্থভাবেই উপলব্ধি করেন। পাকিন্তান শুরুর পর মুসলিম লীগকে যারা কোটারি বা পকেট সংগঠনে পরিণত করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে শেখ মুজিবের সংগ্রামকে তিনি সমর্থন করেছিলেন। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর এক সময়ের সহকর্মীর সংগ্রাম হচ্ছে পাকিস্তানে একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা। পরবর্তী জীবনে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগকে সেভাবে গড়ে তুলতে পেরেছিলেন।
১৯৫৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর গোয়েন্দা বিভাগের এক অফিসার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বঙ্গবন্ধু তাকে বলেন, ২০ বছর রাজনীতি করছি। দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করছি। পরিবার ও সন্তানদের অবহেলা করেছি। কিন্তু সামরিক শাসন জারির পর দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। এর চেয়ে লজ্জার আর কিছু হতে পারে না। তিনি হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মুক্তি পেলে মানিক ভাইকে বলব, ইত্তেফাক পত্রিকার ম্যানেজার পদে নিয়োগ দিতে। লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়তে যাওয়ারও চেষ্টা করতে পারি। এর কোনোটি না হলে ব্যবসা শুরু করতে পারি। এমনকি চায়ের দোকানও দিতে পারি। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, পাকিস্তানে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র চালু হতে পারে। আইয়ুব খান নির্বাচন দেবেন না। গণভোট হবে। দেশবাসীকে কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলার সুযোগ দেওয়া হবে। [পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯৭-৯৮]

কী নির্ভুল উচ্চারণ, কী অপার দূরদৃষ্টি!

১৯৫৯ সালের ২ জানুয়ারি এক গোয়েন্দা অফিসার কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। বরাবরের মতো তাকে বন্ড দিয়ে মুক্তিলাভের প্রস্তাব দেওয়া হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের মনোভাব আগের চেয়ে নমনীয়, এটা উলে­খ করে গোয়েন্দার সেই একই বয়ান, রাষ্ট্র্রের নিরাপত্তা ও জনজীবনে শান্তির জন্য তাকে আরও ৬ মাস আটক রাখার সুপারিশ করছি।
২৮ মার্চ (১৯৫৯) বন্দিদের মামলা পর্যালোচনার জন্য গঠিত উপদেষ্টা কমিটির সুপারিশে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় দেখা যায় তিনি আইন বহির্ভুত কাজে যুক্ত ছিলেন এবং বর্তমান সময়ে মুক্তির সুপারিশ ঝুঁকিপূর্ণ হবে। তাকে আটক রাখা হউক। [পৃষ্ঠা ৩২৪]

৭ এপ্রিল অতিরিক্ত পুলিশ এ. খালেক লিখেছেন, শেখ মুজবুর রহমানকে বিশ্বাস করা যায় না। রাষ্ট্রের ক্ষতি করতে তাঁর সক্ষমতা উচ্চ মাত্রায় এবং মুক্তি দিলে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা দুর্নীতির মামলা তদন্তে সমস্যা হবে। এ কারণে আরও ৬ মাস আটক রাখার সুপারিশ করা হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু ১৯৫৯ সালের ৩ জুন ঢাকার সদর মহকুমা হাকিমের আদালত থেকে দুর্নীতির মামলায় অব্যাহতি পেয়েছিলেন। রায়ে বলা হয়, দুর্নীতি দমন ব্যুরো তার বিরুদ্ধে অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জনের কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি।

মামলা থেকে নিষ্কৃতি পেলেও বঙ্গবন্ধুকে সামরিক শাসকরা বিনাবিচারে আটক রাখে।

৭ আগস্ট এক গোয়েন্দা অফিসার কেন্দ্রীয় কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আবারও বন্ড দিয়ে মুক্তির প্রস্তাব করেন। উত্তরে তিনি বলেন, বন্ড দেব না। ১৯ সেপ্টেম্বর তাকে জনস্বার্থে আরও ৬ মাসের জন্য আটক রাখার সুপারিশ করা হয়। উপদেষ্টা বোর্ডও একই সুপারিশ করে।

১৯৫৯ সালের ১০ ডিসেম্বর ঢাকার একটি আদালত বঙ্গবন্ধুকে চিটিং করার অভিযোগের মামলা থেকে মুক্তি দেয়। ১৭ ডিসেম্বর তিনি কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন। তবে তাঁর চলাচল ও কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সামরিক কর্তৃপক্ষ বহুবিধ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।

বঙ্গবন্ধুর মুক্ত জীবন ও রাজনৈতিক হয়রানি পাশাপাশি চলে। একের পর এক মিথ্যা মামলা আদালতে তোলা হয়। ১৯৬০ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তাকে এক মামলায় দুই বছরের জেল ও ৫ হাজার টাকা জরিমানার দণ্ড দেওয়া হয়। ২২ সেপ্টেম্বর তিনি জামিনে মুক্ত হন।

এ সময় তিনি সামরিক কর্তৃপক্ষকে ধোকা দিতে আলফা ইন্সুরেন্সে চাকরি নেন। বর্তমান গুলিস্তান এলাকায় তাঁর অফিসটি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মিলন কেন্দ্র। ১৯৬২ সালের শুরুতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির মুক্তির দাবিতে যে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার পেছনে প্রেরণা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এ কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ জেলজীবন স্থায়ী হয় চার মাসের মতো। জেল থেকে মুক্ত হয়েই তিনি সামরিক শাসনকে চ্যালেঞ্জ করে আরও ৮ জন নেতার সঙ্গে যৌথভাবে বিবৃতি প্রদান করেন। ‘নয় নেতার বিবৃতি’ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরতে পারে। এ বছরের সেপ্টেম্বরে শিক্ষা বিষয়ে শরিফ কমিশনের রিপোর্ট বাতিলের দাবিতে প্রবল ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৭ সেপ্টেম্বর পালিত হয় হরতাল। আইয়ুব খান ছাত্রদের দাবি মেনে পিছু হটতে বাধ্য হন।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং পূর্ব পাকিস্তানে তাকে সর্বক্ষণ তোষামোদ করে চলা গভর্নর মোনায়েম খানের বঙ্গবন্ধুকে দমিয়ে রাখার জন্য যাবতীয় চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জনপ্রিয় মুখ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠা অসম্ভব, এ মনোভাব তিনি নানা পর্যায়ে ব্যক্ত করতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রদান করেন ঐতিহাসিক ৬-দফা কর্মসূচি। স্বায়ত্তশাসনের এ দাবি আদায়ে প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক শক্তি। বঙ্গবন্ধু এ কর্মসূচি উপস্থাপনের জন্য বেছে নেন লাহোর নগরীকে, যেখানে ২৬ বছর আগে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল পাকিস্তান গঠনের জন্য উত্থাপন করেছিলেন লাহোর প্রস্তাব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যথার্থভাবেই বলছেন যে এক বাঙালি পাকিস্তান গঠনের প্রস্তাব তোলেন লাহোরে, আরেক বাঙালি সেই লাহোরকেই বেছে নেন পাকিস্তান ভাঙার কর্মসূচি উপস্থাপনের জন্য। শত্রুর ডেরায় শত্রুকে চ্যালেঞ্জ জানানো, এমনটি কেবল বঙ্গবন্ধুই করতে পেরেছেন। ৬-দফা পেশের দেড় মাসের মাথায় ১৬ মার্চ রাজশাহীতে এক জনসভায় প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বলেন, শেখ মুজিবের কর্মসূচির লক্ষ্য অখণ্ড বাংলা কায়েম। এ দাবি প্রতিরোধ আমাদের দায়িত্ব। পাকিস্তান শত্রুদের দ্বারা পরিবেষ্টিত। ১৮ মার্চ খুলনার জনসভায় আইয়ুব খান বলেন, বিরোধীদল বৃহত্তর সার্বভৌম বাংলা চায়।

এ ভূখণ্ডের কল্যাণ যারা চায় না, সে সময়েও তাদের ভারতবিরোধী জিগির, এখনও!

এর দাঁতভাঙা জবাব আসে ২০ মার্চ। ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি ও তাজউদ্দিন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু বলেন, ৬-দফা আমাদের অস্তিত্বের দাবি। নির্যাতন হবে। কারাগারে নেবে। কিন্তু ক্ষান্ত দিলে চলবে না। পল্টন ময়দানের জনসভায় তিনি বলেন, পাকিস্তানে দুই অর্থনীতি প্রবর্তন করতে হবে। একই দিনে আইয়ুব খান ঢাকায় মুসলিম লীগ নেতাদের সম্মেলনে গৃহযুদ্ধের হুমকি দেন।

এটা যে কথার কথা ছিল না, অচিরেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগের প্রায় সকল কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় যে প্রতিরক্ষা আইন ও জরুরি অবস্থা জারি করা হয়, সেটাই প্রয়োগ করা হতে থাকে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। কিন্তু অদম্য শেখ মুজিব কোনো বাধা মানেননি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে তাকে ফাঁসিতে হত্যার সব আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি রেখে চলতে থাকে প্রহসনের মামলা। এ মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ও বন্দিশালার রুমমেট মেজর শামসুল আলম এ লেখকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বঙ্গবন্ধুকে একদিনের জন্যও হতাশ-হতোদ্যম হতে দেখিনি। রুমে কিংবা আদালতে যাওয়ার পথে এবং আদালতের ভেতরে তিনি ছিলেন ছিলেন নির্ভয়। সকলকে উৎসাহ দিতেন। ধন ধান্য পুষ্পে ভরা… গানে কণ্ঠ মেলাতেন। বলতেন ছাত্র-জনতার আন্দোলন গড়ে উঠবে এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং সকলকে তারা মুক্ত করবেই।

বাস্তবে এটাই ঘটেছিল। জনগণ ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তাকে মুক্ত করে বঙ্গবন্ধু হিসেবে বরণ করে নেয়। মামলা চলাকালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট লাহোরে রাজনৈতিক নেতাদের গোলটেবিল বৈঠক ডেকেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে এ বৈঠকে অংশগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু তিনি নিঃশর্তভাবে মামলা প্রত্যাহার ও সকল বন্দির মুক্তির দাবিতে অটল ছিলেন এবং তা আদায় করে ছাড়েন।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনেও তিনি অটল, ছয় দফার প্রশ্নে আপস নেই। ১৯৭১ সালে তিনি জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করানোর সময় লাখ লাখ মানুষকে স্বাক্ষী রেখে বলেন, ‘যদি কেউ ৬-দফার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাকে জ্যান্ত কবর দেবেন।’

এই অদম্য মনোভাব নিয়েই তিনি ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার মুখোমুখি হন। ইয়াহিয়া খান-টিক্কা খানের হুমকি উপেক্ষা করেই পরিচালনা করেন বিকল্প সরকার। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ধ্বনিত হয় তাঁর অবিস্মরণীয় আহ্বান, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এ সমাবেশেই তাঁর অবিনাশী উচ্চারণ, সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।

বাস্তবেই সেটা পারেনি। ২৫ মার্চ মধ্য রাতে স্বাধীনতা ঘোষণার পর তাকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় ‘শত্রু রাষ্ট্র’ পাকিস্তানে। এ সময় তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা যেমন চলে, তেমনি ‘আপস প্রস্তাব’ দেওয়াও অসম্ভব নয়। স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার জন্য খোন্দকার মোস্তাক আহমদের ষড়যন্ত্রের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ছিল, পাকিস্তানও ছিল। কিন্তু হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন ভূখণ্ডের মহত্তম আকাংক্ষা পূরণে নিবেদিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বরাবরের মতোই ছিলেন সংকল্পবদ্ধ। তাঁর নামেই পরিচালিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বিনাশর্তে মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, নিঃসঙ্গ বন্দি জীবনে এ সব জানার সুযোগ তাঁর ছিল না। কিন্তু ১৯৭২ সালের জানুয়ারি প্রথম সপ্তাহে মুক্তির বিষয়ে পাকিস্তানের শাসকরা সঙ্গে যখন তাঁর সঙ্গে আলোচনায় বসে, সব কিছু যেন ছবির মতো ভেসে থাকে চোখের সামনে। স্বাধীন, সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি ফিরে আসেন ১০ জানুয়ারি, লাখ লাখ মানুষের সংবর্ধনায় সিক্ত হয়ে।

তাঁর শক্তির উৎস কী, এ প্রশ্নে বার বার তিনি বলেছেন, জনগণের ভালবাসা। এই ভালবাসার ওপরেই গভীর আস্থা রেখে তিনি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দিকটি উপেক্ষা করেন। ঘাতকরা যখন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রত্যুষে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িটি ঘিরে ফেলে এবং তাকে হত্যার জন্য ভয়ঙ্কর স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র তাক করে, তখনও তিনি নির্ভীক, দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিল্লুর রহমান খান ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মোহনী নেতৃত্ব ও স্বাধীনতা সংগ্রাম’ গ্রন্থে লিখেছেন, উদ্যত ঘাতকদের বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘যদি বাঙালিরা তাদের জাতির পিতাকে হত্যা করতে চায়, তিনি জীবন দিতে প্রস্তুত রয়েছেন। কিন্তু এর পরিণতি বাঙালিদের জন্য শুভ হবে না। তাদের জীবন কখনোই আগের মতো হবে না এবং তাঁকে হত্যার সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্রকেও তারা হত্যা করবে এবং মানবিকতা বিদায় নেবে।’ [পৃষ্ঠা ২৬১]

কী অমোঘ সত্য ধ্বনিত হয়েছিল জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠে!

বাংলাদেশের আত্মপ্রত্যয়ী জনগণ ঘুরে দাঁড়ায়। তারা গণতন্ত্রের জন্য আত্মদান করে। একাত্তরের চেতনা ফিরিয়ে আনার জন্য সক্রিয় হয়। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন সোনার বাংলা কায়েমের জন্য রাজপথে নামে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার সম্পন্ন ও দণ্ড কার্যকর করে।

বঙ্গবন্ধুকে যেমন দমিয়ে রাখা যায় নি, তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের জনগণকেও যে দমিয়ে রাখা যায় না!