নূরজাহানদের পা মচকায়, কিন্তু তারা ভাঙেন না

প্রকাশিত: ৩:৫২ অপরাহ্ণ , নভেম্বর ১২, ২০২২

এ বছর মে থেকে জুলাই পর্যন্ত উত্তরপূর্বাঞ্চলে দফায় দফায় বন্যা হয়৷ জুলাই মাসে ১০০ বছরের মধ্যে রেকর্ড বৃষ্টিপাতে ভেসে যায় পুরো অঞ্চল৷ পানি প্রায় নেমে যাবার পর আমার সুযোগ হয় সিলেট ও সুনামগঞ্জের কিছু এলাকায় যাবার৷

প্রথমে যাই সিলেটের কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায়৷ সেখানে দেখা হয় নূরজাহান বেগমের সঙ্গে৷ স্বামী নেই৷ থাকেন এক ছেলে ও তার পরিবারের সঙ্গে৷

আগেরদিনই নিজের ভিটেতে পা পিছলে পড়ে যান নূরজাহান৷ বয়স ৬৫৷ তবে শরীরে এখনো যথেষ্ট সামর্থ্য আছে৷ মচকে যাওয়া পা নিয়ে কলসি কাঁখে মাটির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে টিনের চালার ঘরে উঠছিলেন৷

নূরজাহানের ঘরটা মাটি থেকে ৬-৭ ফুট উঁচুতে৷ ঠিক ঘর বললে ভুল হবে, কতগুলো বাঁশের কঞ্চির মধ্যে ঢেউটিনের বেড়াগুলো কোনমতে সুতো দিয়ে বেধে রাখা৷

‘‘বন্যার পানি থেকে বাঁচতে আমরা ঘর উঁচু করে তৈরি করি,” নূরজাহান বললেন৷ ‘‘কিন্তু এইবার পানি ঐ পর্যন্ত উঠেছে,” ঘরের চালার দিকে আঙুল দিয়ে দেখালেন নূরজাহান৷

সীমান্তবর্তী কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায় যেখানে নূরজাহান থাকেন সেখান থেকে ভারতের চেরাপুঞ্জির পাহাড়গুলো স্পষ্ট দেখা যায়৷ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় এখানে৷ গত জুলাই মাসে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে শত বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়৷ সেই পানিতে ভেসে যায় ভারত ও বাংলাদেশের উত্তরাপূর্বাঞ্চল৷

‘‘বন্যার পানি যখন ঘরের দুয়ারে চলে আসে, তখন আমরা আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাই৷ দুই সপ্তাহ পর পানি নেমে গেলে ফিরে আসি,” নূরজাহান ইশারা করেন ঘরের পেছন দিকটার দিকে৷ ‘‘ওখানে খালি দু’টো টিন পড়ে ছিল৷ বাকি সব ভেসে গিয়েছিল,” বলেন তিনি৷

মাঝারি গড়নের এই নারী ও তার যুবক ছেলে আমাকে মূল রাস্তার দিকে নিয়ে যান৷ একটা খালি জায়গা দেখিয়ে বলেন যে, এখানে তার মেয়ে ও মেয়ের জামাইয়ের ঘর ছিল৷

‘‘আমরা বন্যার মধ্যেই তো থাকি৷ কিন্তু এই বন্যা আমি আমার জীবদ্দশায় আর দেখিনি,” বলেন নূরজাহাজন৷

ভারতের আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, একদিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের (৯৭০ মিলিমিটার বা ৩৮ ইঞ্চি) রেকর্ড হয়েছে এবার৷ দুই দেশের প্রায় ৯০ লাখ মানুষ কিছুটা সময় পানিবন্দি হয়ে পড়েন৷ দুই দেশ মিলিয়ে শতাধিক মানুষ মারা যান৷ নূরজাহানের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে ধলাই নদী৷ তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সেদিকটায় যাই৷ তীরবর্তী পুরো এলাকা পানির তলে চলে যায়৷ স্থানীয়রা বলেন, ঘরগুলোর চালার সমান পানি উঠেছিল এখানে৷ দেখা হয় ২১ বছর বয়সীিনাজিরুনের সঙ্গে৷ তার স্বামী বাকপ্রতিবন্ধী৷ দু’টি শিশুসন্তান আছে তার৷

‘‘আমরা খাটের ওপর ছিলাম৷ একটা বাচ্চা পানিতে পড়ে গিয়েছিল৷ আমি ওকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই পড়ে যাই পানিতে৷ পরে একটা নৌকা এসে আমাদের উদ্ধার করে,” বলেন তিনি৷

এই পরিবারটি কিছু খাদ্যসাহায্য পেয়েছে৷ কিন্তু এখনো ঘর তুলতে পারেনি৷ সরকারের পক্ষ থেকে চারটি টিনশিট মিলেছে৷ কিন্তু তখনও ঘর তুলতে পারেনি৷ ভাড়া থাকে স্থানীয় মেম্বারের বাড়িতে৷

আমাকে দেখে অনেকেই এগিয়ে এলেন৷ ভাবলেন কোন উপকার বা সাহায্য করতে পারব৷ সাংবাদিক পরিচয় এগিয়ে এলেন স্থানীয় দোকানদার মোহাম্মদ আলম৷ ‘‘এই যে ছাদগুলো দেখছেন এগুলো সব পানির নীচে চলে যায়৷ আমি নৌকা নিয়ে বের হয়েছিলাম৷ হায় রে! কত মানুষের কত জিনিস সব ভেসে ভেসে চলে গেছে৷”

দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল৷ বলাই নদীতে সূর্যের প্রতিবিম্ব চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে৷ আশপাশ তখনও কর্মচঞ্চল৷ কয়েকজনের কাছেই দেখলাম দু’চারটি করে নতুন ঢেউটিনের শিট৷ সরকারি অনুদান৷ যে ঘর ভেঙেছে তাকে হয়তো নতুন করে তৈরি করবেন এরা৷ কিন্তু যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে ঘুরে দাঁড়াবে কবে এরা?

পরদিন সিলেট ছাড়িয়ে এবার আমার গন্তব্য হাওড়৷ সুনামগঞ্জ৷ গাড়িতে করে সিলেট শহর হয়ে সুনামগঞ্জের পথ ধরলাম৷ গন্তব্য বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা৷

উপজেলা পরিষদের কাছে আসতেই দেখি হাওড়ের পাশটা বেশ ট্যুরিস্ট স্পট হয়ে উঠেছে৷ ভাসমান রেস্টুরেন্টও আছে৷ স্থানীয় চেয়ারম্যানেরও বেশ নামডাক৷ তিনি নাকি একটি ভাসমান ঘর বানিয়েছেন পরীক্ষামূলকভাবে৷ সেখানে সদ্যই একটি পরিবারকেও জায়গা দিয়েছেন৷ ঘরটি দেখতে যাওয়া দরকার৷ নৌকা ভাড়া করে রওনা হলাম৷

হাওড়ে দ্বীপের মত একটা জায়গায় বেশ কয়েকটা ঘর৷ কয়েক ডজন পরিবার থাকে থাকে৷ সেখানেই সেই ঘরটি৷

ঘরের বাসিন্দা সুখু রানি দাশ৷ চিকন গড়নের এই নারীর বয়সও ষাটের বেশি৷ ছেলে ও তার পরিবারসহ দুই রুমের এই ঘরটিতে উঠেছেন তিনি৷ ঘরটির নীচে বড় বড় পানির ড্রাম ও বাঁশ দেয়া, যেন পানি এলে ভেসে থাকে৷

‘‘আগের ঘরটি তো ভেঙ্গে গেছে৷ এখন এখানে থাকছি ভালোই লাগছে,” বললেন সুখু রানি দাশ৷ ‘‘তারা তো বলেন যে এই ঘর ডুববে না কখনো৷”এ সময় পাশের বাড়ি থেকে দুই নারী এলেন৷ নাম উষা রানি দাশ ও নিওতি রানি দাশ৷ আমাকে বললেন, ‘‘আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য প্রতিদিন গিয়ে বসে থাকি৷ কর্মচারীরা বলে, আপনি ব্যস্ত৷” প্রথমে বুঝতে পারিনি৷ পরে একজন বলল যে, তারা আমাকে উপজেলা চেয়ারম্যান ভেবেছেন৷ পরে তাদের বুঝিয়ে বলা হল যে আমি সাংবাদিক৷ তা শুনে ঊষা রানি দাশের সোজাসাপটা কথা, ‘‘চেয়ারম্যানকে বলেন আমাদেরও এমন ঘর দেবার জন্য৷ প্রতি বছর আমরা ঘর বানাই, বন্যায় সে ঘর ভেসে যায়৷ আমাদের আয় খুবই সীমিত৷ সেই টাকা দিয়ে আমরা খাব, না কাপড় পড়ব, না বন্যায় ভাঙ্গা ঘর আবার ঠিক করব৷”

শুনে চিন্তায় পড়ে গেলাম৷ আমি থাকি জার্মানিতে৷ এক বছর আগে বন্যায় সেখানে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হল৷ তখন তারা তুলনা করল বাংলাদেশের সঙ্গে৷ বাংলাদেশের মানুষ কতটা বন্যাসহিষ্ণু এবং বাংলাদেশ থেকে জার্মানির শেখা দরকার, এসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল৷ কিন্তু এবারের বন্যায় আসলে সহিষ্ণুতার সীমা ভেঙ্গেছে৷ পরিবেশবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের বৃষ্টি আরো হবে, ভয়াবহ বন্যার হার আরো বাড়বে৷ তাহলে এই মানুষগুলোর সহিষ্ণুতার হার আরো বাড়াতে হবে৷

এসব যখন ভাবছি তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা প্রায়৷ ৫৭ বছর বয়সি মাঝি সাইদুর রহমান এলেন৷ হাসিমুখে বললেন, চলুন নৌকায় বেরিয়ে আসি৷ নৌকায় উঠলাম আমি আর সাইদুর৷ ‘‘আমাদের জীবন হল বন্যা আসবে ঘরে, আমরা যাব আশ্রয়কেন্দ্রে৷ আবার পানি নামবে৷ আমরা ফেরত আসব৷ কিন্তু এবার পানি এত ওপরেই উঠেছে যে, সামনে হয়তো আরো উঁচু করতে হবে ঘর,” বলেন তিনি৷

‘‘কত উঁচু করবেন?” আমার প্রশ্ন৷

‘‘ছয় ফুট৷ এর চেয়ে বেশি করার সামর্থ্য নাই,” তার জবাব৷

‘‘যদি পানি এর চেয়ে বেশি উঁচু হয়? এবার যেমন হল অনেক জায়গায়?” আমার পালটা প্রশ্ন৷

‘‘জানি না,” সাইদুরের সরল স্বীকারোক্তি৷

সাইদুরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরলাম৷ এর ভেতর উপজেলা চেয়ারম্যান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা এদের সঙ্গেও দেখা হল৷ এসব সমস্যা নিয়ে কথাও হল৷ কারো কাছেই টেকসই সমাধানের খোঁজ পেলাম না৷ কিন্তু স্থানীয় অসহায় মানুষগুলোর মধ্যে যা পেলাম তা হল টিকে থাকার লড়াইয়ের অসীম শক্তি৷

সিলেট ও সুনামগঞ্জে অবস্থাপন্ন অনেককে দেখলাম, বাড়ি যেন ধসে না পড়ে সে জন্য মাটির বস্তা দিয়ে বাড়িকে ঠেস দেয়া হয়েছে৷ জলবায়ু বিজ্ঞানে এসব সমাধানের কিছু কেতাবি ভাষা আছে৷ কিন্তু এসব কেতাবি ভাষা জানেন না এই মানুষগুলো৷ কিন্তু তাদের এই অবস্থার জন্য প্রকৃতি যতটা দায়ী, পৃথিবীতে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা মানুষেরাও ততটাই দায়ী৷ আজকের বিজ্ঞান সেটি প্রমাণও করেছে৷ ডয়চে ভেলে