পহেলা বৈশাখ ও বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সুস্থির সরকার সুস্থির সরকার বিভাগীয় প্রধান ময়মনসিংহ প্রকাশিত: ৩:২২ অপরাহ্ণ , এপ্রিল ১৩, ২০২৩ লেখক, সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরীর অসাধারণ প্রবন্ধ:“ঐ নতুনের কেতন ওড়ে কাল বৈশাখী ঝড়, তোরা সব জয়ধ্বনি কর।” বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই কবিতা নতুন স্বপ্ন, উদ্যম ও প্রত্যাশার আলো ছড়িয়ে আবহমান কাল ধরে নতুন আঙ্গিকে রূপ, বর্ণ ও বৈচিত্র্য নিয়ে বাঙালি জাতির জীবনে বারবার ঘুরে আসে পহেলা বৈশাখ।অনন্তকাল ধরে গড়ে ওঠা আমাদের ভাষা এবং সংস্কৃতি ঐতিহ্যের সৃজনশীলতা অহঙ্কার মিশে থাকে নতুন বছরের শুভাগমন। আমাদের হৃদয়ে উদ্ভাসিত হয়ে দেশ মাতৃকার অতিত গৌরব ও ঐশ্বর্য। আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বিশালত্ব শাশ্বত প্রাচীনতায় পবিত্র এক অবিচ্ছেদ্য বন্দ্বনে আবদ্ব। তাই পহেলা বৈশাখের এই দিনে উদ্দীপ্ত প্রেরণায় জেগে ওঠে জাতির আত্মপরিচয়। পহেলা বৈশাখ নববর্ষের হিরন্ময় অতিত বাঙালি জাতিকে আত্মপরিচয়ের মাধ্যমে নতুন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পহেলা বৈশাখ নববর্ষের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বাঙালি জাতির অন্যতম অনুষঙ্গ। বাংলার নববর্ষ কি? বাঙালি মাত্রই আমাদেরকে জানতে হবে এবং বুঝতে হবে, কোন প্রেক্ষাপটে এই উৎসব মুখর দিবস সৃষ্টি হয়েছিল।এসম্পর্কে জানতে হলে আমাদেরকে প্রায় পাঁচশত বছর পিছনে ফিরে যেতে হবে, মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলের দিকে। বাঙালির মুসলিম শাসনের রাজ কায্যর্ পরিচালনা হতো হিজরী সন তারিখ অনুযায়ী।এসময়ে ভারত বর্ষে শকাব্দ, গুপ্তাদ্ব, জালালীভারত, লক্ষন, বিক্রম ইত্যাদি নানা নামে সন তারিখ প্রচলিত ছিল।এসব সনের ভিত্তিতেই ভারতীয় প্রজা সাধারণত দৈনন্দিন কায্যর্ক্রম পরিচালনা করতেন। ফলে কর খাজনা আদায়ে দেখা দিত নানাবিধ জটিলতা। এসব বিবেচনা করে মোগল সম্রাট আকবর তার সভাসদদেরকে একটি নতুন সন উদ্ভাবনের নির্দেশ দেন। তার নির্দেশে তার সিংহাসন আরোহনের ২৯বছর পর তার অন্যতম সভাসদ পন্ডিত আমির ফতেউল্লা সিরাজি হিজরী ৯৯২, ইংরেজি ১৫৮৫ সালে বহু গবেষণা ও পরিক্ষা নিরিক্ষা করে হিজরী সনের চন্দ্র মাস হিসাবের স্থলে সৌর হিসাবকে ভিত্তি করে নতুন তারিখ—ই—ইলাহী ফসলী সনের উদ্ভাবন করেন, যা বর্তমানে বাঙলা সন হিসাবে পরিচিত। কর খাজনা আদায়ের জন্য সেদিন মোগল সম্রাট আকবর যে বাংলা সনের উদ্ভাবন করেছিলেন তার পেছনে রয়েছে আকবরের বাংলা বিজয়ের ঘটনা। ১৫৭৫সনে রাজমহলের যুদ্বে বাঙলার পাঠান সুলতান দাউদ খান কররানী ও তার ভাই তাজ খান কররানী কে পরাজিত করে, বাঙলা বিজয় করেন। বাঙ্গলা বিজয়ের পর অর্থ মন্ত্রি রাজা টোডরমলকে বাঙলার সুবেদার করে পাঠানো হয়। বাঙলায় এসে রাজা টোডরমল খাজনা আদায়ে ভীষণ জটিলতায় তাকে পড়তে হয়েছে। বাঙলার মানুষ ফসলের সাথে খাজনার সম্পর্ক থাকায় ফসল উৎপাদনের মাস চৈত্রের শেষ ও বৈশাখের প্রথম দিকে বাঙলার মানুষের ঘরে ফসল ওঠে, তাই পহেলা বৈশাখ খাজনা উত্তোলনের দিন ধায্যর্ করে। মোগল ভুস্বামীরা প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করার সিদ্ধান্ত নেয়। পহেলা বৈশাখ বছরের প্রথম দিন বা নওরোজ হিসাবে ধরে নিয়ে খাজনা আদায় সহ নানাবিধ আয়োজনের মাধ্যমে প্রজাদের কে খাজনা আদায় কারি ভুস্বামীরা মিষ্টিমুখ করাতেন এবং মেলা সহ অনান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। সেই থেকে উৎসবমুখর পরিবেশে বাঙলা নববর্ষের দিনে ব্যবসা বাণিজ্য তথা সরকারি কর খাজনা আদায় হয়ে আসছে।উপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসন ও শোষণের হাত থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগোষ্টিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চিন্তা চেতনায় সমৃদ্ধ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলন কে শানিত করার লক্ষে পহেলা বৈশাখ নববর্ষ ও বাঙ্গালি সভ্যতা বিকাশ ঘটিয়ে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটানোই ছিল এর উদ্দেশ্য। এর পিছনে মূল কারন ছিল ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তি ধর্মীয় আবরণে দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটি বাঙালি অধ্যুসিত পূর্ব বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তান বানিয়ে বৃটিশ দের মতোই স্বায়ত্বশাসন বিহীন প্রদেশের মর্যাদা দিয়ে শাসন ও শোষণ করতে শুরু করে। বাঙালীর ভাষা সাহিত্য, সংস্কৃতি পাকিস্তানীরা ধ্বংস করতে চেয়েছিল, যাতে করে বাঙালির মেধা ও মননশীলতার ধ্বংস হয়ে যায়, সেই সাথে বুদ্ধি বৃত্তি ও সচেতনতা বিকাশ না ঘটে। পরবর্তীতে ৫২য়ের ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে মর্যাদা লাভ করে আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলা। এই ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই পাকিস্তানিদের সাথে বাঙালিদের সংঘাত ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তীতে সোহরাওয়াার্দ,ী মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পাকিস্তান মুসলিম লীগের ফ্যাসিষ্ট রাজনীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠে। এখানে উল্লেখ্য যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় বাঙালি দের অবদান ছিল সব চেয়ে বেশী, পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষীরা ছিল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ অথচ অবাঙালি পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্রে বাঙালিরা ২য় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়। বাঙালীর মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়ার জন্য প্রথমেই আঘাত হানে বাঙালি জনগোষ্ঠির ভাষা ও সংস্কৃতির উপর। এই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলার বাঙালি জনগোষ্ঠির সুদৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ের সঞ্চার করে, রাজনৈতিক আন্দোলনের যে গতি সৃষ্টি হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ৫৪য়ের নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটিয়ে হক, ভাসানী, সোহরাওয়াার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে পূর্ব বাংলায় সরকার গঠন করেছিল। পরবর্তীতে পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসক ও কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রে প্রাদেশিক সরকার থাকতে পারেনি।এই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ঠ সরকারের আমলেই পূর্ব বাঙলার তথা বাংলাদেশের বাঙালি জনগোষ্ঠির আপন স্বতন্ত্র, কৃষ্টি, ঐতিহ্যে,ভাষা, সংস্কৃতি ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক অবস্হানের ভিত্তিতে বাঙালীর নিজস্ব স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংষ্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজনেই বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দের সুদুর প্রসারী চিন্তা চেতনা ভিত্তিতেই ১৯৫৬ সালে সাহসিকা জননী কবি বেগম সুফিয়া কামালের ঢাকার তারাবাগের বাসায় রুকুনুজ্জামান দাদাভাইয়ের পরিচালনায় কচিকাঁচা মেলা নামে একটি শিশু কিশোর সংগঠনের জন্ম নেয়। এর স্বপ্নদ্রষ্ঠা সেদিন সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেননি। ষাটের দশকে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুুব খানের বিরুদ্ধে যে ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কচিকাঁচা মেলা দেশীয় সংষ্কৃতি চর্চার মাধ্যমে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি করে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস চালায়। কচিকাঁচা মেলা সাধারনত দেশীয় সঙষ্কৃতি ও খেলা ধুলার প্রাধান্য ছিল বেশি। হা ডু ডু, দাড়িয়াবান্দা, বৌচি, কুস্তি খেলা, ব্রতচারী, লাঠিখেলা বিশেষ করে গ্রামবাঙলাার ঐতিহ্যেবাহী সব ধরনের খেলাধূলার প্রচলন ছিল। পাশাপাশি দেশাত্মবোধক সঙ্গীত,নৃত্যকলা,নাটক,আবৃত্তি সহ জারী,সারি, বাউল, ভাটিয়ালি গানের মুর্ছনা ছিল মেলার ভাইবোনদের প্রাণের স্পন্দন, আর এই স্পদনেই এ অঞ্চলের মানুষ কে জাগরিত করেছে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। উল্লেখিত অনুষ্ঠানাদি প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ তিন—চার দিন ব্যাপী বৈশাখী মেলার মাধ্যমে উদযাপন করা হতো।রাজনৈতিক সঙষ্কৃতিক ব্যাক্তি বর্গের ছত্রছায়ায় সারা দেশ জুড়ে এধরনের অনুষ্ঠানাদির মাধ্যম বাংলা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ পাকিস্তানের বাঙালি অদ্যসিত পূর্ব বাংলা (বাংলাদশ)কে স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার মানুষের মুক্তি সনদ ৬ দফা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠা ৬৯য়ের ছাত্র গণ আন্দোলন গণ অভ্যুত্থান সৃষ্টি করে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পতন ঘটিয়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মূলক রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা থেকে শেখ মুজিবকে মুক্ত করে, সেই সাথে সকল রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে স্বৈরাচারী সরকারকে বাধ্য করা হয়। বাংলাদেশ সহ সারা পাকিস্তানে প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা দিয়ে, পাকিস্তানের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে। ইয়াহিয়া খান জনগণের আন্দোলন প্রসমিত করতে জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী বাঙালিরা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাবে এবং সরকার গঠন করবে এটা পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী কোন অবস্থাতেই মেনে নিতে পারছেনা, উল্টো বাঙালি জনগোষ্ঠির উপর নেমে আসে অমানুসিক নির্যাতন এমতাবস্থায় বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন স্বাধীনতার। পরবর্তীতে নয় মাস রক্তক্ষয়ী সশ¯্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সোনালী সূর্যটাকে ছিনিয়ে এনেছে। শেয়ার সারা দেশবিষয়: