একটি মন বিষাদতারার নদী: সাকিল আহমেদ,কলকাতা

প্রকাশিত: ২:৪৬ অপরাহ্ণ , জুলাই ১৩, ২০২০
আলম তালুকদার থাকতেন যদি, বুকটা বিষাদময়, আজ কোন পোস্ট নয়।
 
গতকাল একটু ব্যস্ত ছিলাম ফেসবুকে আসিনি। রাত দেড়টার সময় হঠাৎ ফেসবুক খুলতে গিয়ে আনজির লিটন ভাইয়ের একটা পোস্ট পড়তে গিয়ে পাশে শুয়ে থাকা গিন্নির গায়ে গিয়ে পড়ল হাত থেকে ছিটকে মোবাইল। আলম তালুকদার ভাই আর নেই।
বাংলাদেশ গেলে যে কজন প্রিয় মুখের সারি চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাঁদের একজন ছড়াকার প্রিয় বন্ধু দাদা আলম তাকুলদার।
কত স্মৃতি কত আড্ডা জুড়ে আলম তালুকদার আছেন বলে বোঝানো যাবে না।
আমি লক ডাউন কালে মন ভাল থাকার কারণ খুঁজতে গিয়ে এক লাইনের কবিতা সিরিজ শুরু করি। তাতে সবার এক লাইনের কবিতা একবার পোস্ট দিয়েছি।ব্যতিক্রম শুধু আলম তালুকদার। মুখে মুখে ছড়া কাটতেন। সদা হাসিমুখ। মুখে জর্দা পান।তাঁর নানা পানজেন্ট মুগ্ধ করত।
এক লাইনের শেষ যে কবিতা লিখে আমাকে বারবার তাড়া দিতেন খোঁজ নিতেন আমার সেই কবিতার কী হল ?
তিনি লিখলেন,
এক লাইনের কবিতা
মানুষের সর্বশেষ ডাক নাম লাশ!
আলম তালুকদার
করোনা কেড়ে নিল তাঁর প্রাণ।কলকাতার একটি দৈনিকের সহ সম্পাদকের তাড়ায় লক ডাউনকালে
করোনা নিয়ে একটা ছড়া লিখেছিলাম। ম্যাসেঞ্জারে তাঁকে পাঠালাম। ছড়াটি ছিল এরকম
ভয় পেওনা ভয় পেওনা
শাকিল আহমেদ
 
ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো
করোনা কামড় বিষে,
মুখে মাস্ক আর বুক ধুকপুক
সামাল দেবো কিসে?
 
বিষ ছিল না শিস ছিল তার
ছোট্ট পাখি ময়না,
ঘরের ভিতর বেঁধে রাখি
কোন কথা কয়না।
 
ক্ষেতের ফসল শুকিয়ে যায়
খাজনা দেবো কিসে?
ছোট্ট শিশু ফেলফেলায়
ভয়ে কোভিড উনিশে।
 
ভয় পেও না ভয় পেও না
আসছে রোগের টিকা
গবেষকরা তালাশ করেন
সুদূর আন্টারটিকা।
তিনি আমার এই লেখা পড়ে মন্তব্য করলেন
 
ইতিহাসের লিখা। থাকুক ছড়া টিকা।(আলম তালুকদার)।
গত চোদ্দ জুন২০২০একটা ছড়া লিখে পাঠালেন।
একজন লেখক কী ইঙ্গিত দিচ্ছেন পড়ে দেখুন
মাত্র কয়টা মাস
আলম তালুকদার
 
মাত্র কয়টা মাস –
কয় মাসেতেই বিশ্বব্যাপী
জ্যান্ত মানুষ লাশ
লক্ষ হাজার পরিবারে
শোকের দীর্ঘ শ্বাস
আশার বাণী সব আয়োজন
বেদম পরিহাস!
 
মাত্র কয়টা মাস –
মানবতা উধা এবং
ভালোবাসাও নাশ
এই পৃথিবী এক করোনার
খাস তালুকের খাস
মানবজাতি সেই করোনার
ইচ্ছা মাফিক দাস!
 
কোথায় গেল এটম বোমা
কোথায় বোমা ত্রাস
রকেট বিমান যুদ্ধ জাহাজ
কোথায় কামান ব্রাস?
সকল কিছু অচল এখন
শুধু সচল বাঁশ!
 
মাত্র কয়টা মাস
দেখছি আমরা কালের পুতুল
নিজের সর্বনাশ!
 
চৌদ্দ জুন, ২০২০
হ্যাঁ তিনি মহাকালের কালের পুতুল হয়ে গেলেন।সরকারি দফতরে অতিরিক্ত সচিব হয়ে অবসর নেবার পর ছিলেন একটু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার।
জীবনের সব ছড়া হয়তো ট্রেজার হয়না।তিনি ট্রেজার রেখে গেলেন আমাদের বুকে।কী দরকার ছিল ভাই এত তাড়াতাড়ি চলে যাবার ?
বিদ্যাসাগরের উপর আমরা দুই বাংলার ছড়া উৎসব করছি অন লাইনে।তিনি আমার অনুরোধে একটা লেখা পাঠান বিদ্যাসাগরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে।
জ্বালায় আকাশ তারা
 
আলম তালুকদার
 
বিদ্যা নিয়ে মিথ্যাচারের
বেসাত করে যারা
একটু ভাবুন কেমন সাহস
কেমন চিন্তাধারা!
 
কে বলেছে বিদ্যাসাগর
আগেই স্বদেশ হারা
সাগর হতে ঢেউয়ের তালে
গজায় বিদ্যা চারা
এসব যেজন বুঝতে নারে
তারাই গেছে মারা।
 
বিদ্যা নিয়ে অত্যাচারের
আসন গাড়ে যারা
নামটি বলুন কারা?
কারা? কারা? কারা?
আজকে হতে তাদের ধরে
জ্যান্ত হবে গাড়া
কোনোভাবেই এই মাটিতে
আর হবে না খাঁড়া
আমার মতে কে কে আছ
হাত তুলে দাও সাড়া
 
কে বলেছে বিদ্যাসাগর
আগেই গেছেন মারা
আমার বুকে আকাশ হয়ে
জ্বালায় সূর্য তারা!
আমাদের বুকে তিনিও যেন আকাশ হয়ে জ্বালাচ্ছেন বুকে সূর্য তারা হয়ে।
কবির পরিবার তালুকদার পরিবারের এক তালুকের চির বিদায় আমরা মানতে পাচ্ছি না।কত অনুষ্ঠানে এক সাথে আড্ডা দেওয়া কবিতা পড়ার স্মৃতি বুকটা ফেটে যাচ্ছে কষ্টে।তালুকদার ভাই আপনার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
 
লেখক: কবি ও সাংবাদিক