পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলেছে

প্রকাশিত: ২:০৪ অপরাহ্ণ , আগস্ট ২৬, ২০২২

শংকর কুমার দে

পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। বিচার চেয়েও কোন প্রতিকার পাচ্ছে না ভুক্তভোগী পরিবার। অনেক ক্ষেত্রে বিচার চেয়ে মামলা দায়ের করার পর পরিবারকে দেয়া হচ্ছে হুমকি। এ কারণে পুলিশের নির্যাতনের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বিচার প্রত্যাশা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। পুলিশী নির্যাতনে আহত হলেও ভুক্তভোগীরা মামলা করেন না। তবে এসব ঘটনায় পুলিশের বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি অনেক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে বলে পুলিশ সদর দফতর জানিয়েছে। অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের চাকরিচ্যুত, পদোন্নতি স্থগিত ও পদাবনতির মতো শাস্তি দেয়া হচ্ছে। পুলিশ সদর দফতর ও মানবাধিকার সংগঠন সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের গত সাত মাসে অন্তত ১১টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে পুলিশ হেফাজতে। ২০২১ সালে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ২৯ জনের। গত ৫ বছরে অন্তত ১৫৮ জনের পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় একজনের শাস্তি হয়েছে। পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় ১৪ মামলা ত্রæটিপূর্ণ হওয়ায় শাস্তি থেকে রেহাই দেয়া হয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর ক্রসফায়ার কমে গেলেও পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা চলছে বলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেয়া তথ্যে দাবি করা হয়েছে।

রাজধানী ঢাকার হাতিরঝিল থানা হেফাজতে যুবক সুমন শেখের মৃত্যুর ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই মৃত্যুর দায় .এড়াতে পুলিশ নিজেই সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সাংবাদিকদের মধ্যে বিলি করছে। তারা এটাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে চাইছে। কিন্তু দেশের প্রচলিত আইনে হেফাজতে যে কোন ধরনের মৃত্যু এবং নির্যাতনই অপরাধ। এর জন্য প্রথমেই মামলা নিতে হবে। মামলা না নেয়াও একটি অপরাধ বলে জানান আইন বিশ্লেষকরা। সুমনের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, সুমনকে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সুমন রামপুরার যে প্রতিষ্ঠানের শোরুমে ভ্যান চালকের কাজ করতেন সেই প্রতিষ্ঠানের চুরি যাওয়া ৫৩ লাখ টাকার দায় এড়াতে ওই শোরুমের ম্যানেজার পুলিশকে দিয়ে সুমনকে হত্যা করিয়েছে বলে তার পরিবারের অভিযোগ।

চুরির মামলাটি হয় ১৫ আগস্ট। সেই মামলার এজাহারে সুমনের নাম নেই। মামলার পর শোরুমের ক্যাশিয়ারসহ তিনজনকে আটক করে হাতিরঝিল থানা পুলিশ। থানার ওসি আবদুর রশিদ দাবি করেন, তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৯ আগস্ট সুমনকে আটক করা হয়। রাতে তাকে নিয়ে অভিযান চালিয়ে তার বাসা থেকে তিন লাখ টাকাও উদ্ধার করা হয়। দিবাগত রাত তিনটার দিকে তিনি থানা হাজতে নিজের ট্রাউজার খুলে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। পুলিশ রবিবার এ সংক্রান্ত সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সাংবাদিকদের দিয়েছে আত্মহত্যা প্রমাণের জন্য। পরিবারের অভিযোগ, মৃত্যুর পর আমরা হাসপাতাল মর্গ থেকে লাশ নিতে গেলে আমাদের শর্ত দেয়া হয়- লাশ ঢাকায় নয়, গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করতে হবে। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নেই, মামলা ও বিচার ছাড়া আমরা লাশ নেব না। তাকে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সে চুরি করেনি। এটা একটা ষড়যন্ত্র। তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে হত্যা করা হয়েছে।

অবশেষে গত ২২ আগস্ট তার পরিবার লাশ গ্রহণ করেছে। রাতে পুলিশের উপস্থিতিতে রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে। মৃত্যুর প্রায় ৪৪ ঘণ্টা পর সোমবার বিকেলে সুমনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে, সোমবার বিকেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উর্ধতন কর্মকর্তা ও সুমনের পরিবারের সদস্যরা হাতিরঝিল থানায় লাশ হস্তান্তর ও কিছু আইনী বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে। পুলিশ বা সুমনের পরিবারের কেউই এই আলোচনার বিষয়ে গণমাধ্যমকে কিছু জানায়নি। সুমনের স্ত্রী জান্নাত আক্তার আজিমপুর কবরস্থানে শেষবারের মতো স্বামীর লাশ দেখতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে তাকে নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসেবে চলতি বছরের প্রথম ৭ মাসে পুলিশ হেফাজাতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ১১টি। গত বছর ২০২১ সালে পুলিশ হেফাজতে ২৯টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ২০২০ সালে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু ২৪টি, ২০১৯ সালে ১৬টি। ২০১৮ সালে ৫৪টি ও ২০১৭ সালে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ৩৫টি। ২০১৩ সালে মৃত্যু নিবারণ আইন হওয়ার পর এখন পর্যন্ত মামলা হয়েছে মাত্র ১৯টি। একটি মামলায় আসামিদের শাস্তি হয়েছে। ১৪টি মামলায় মামলা ত্রæটিপূর্ণ বলে চ‚ড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর বাংলাদেশে ক্রসফায়ার কমলেও পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু বাড়ছে, এমনটাই মানবাধিকার সংগঠন আসকের দাবি।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু ২০১৯ সালেই সারাদেশে পুলিশের হেফাজতে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এদের মধ্যে গ্রেফতারের আগে নির্যাতনে চার জনের মৃত্যু হয়েছে। গ্রেফতারের পর শারীরিক নির্যাতনে ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে। থানার হাজতখানায় দুই জন আত্মহত্যা করেন। দুই জন অসুস্থ হয়ে মারা যান। বাকি দুই জন নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন মারা গেছেন।
পুলিশ সদর দফতরের এক কর্মকর্তা বলেছেন, সম্প্রতি উত্তরা পশ্চিম থানা ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশের হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনা দুটি তদন্তেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মৃত্যুর অভিযোগটি হচ্ছে আত্মহত্যা।

তবে তার আত্মহত্যায় কারো প্ররোচনা রয়েছে কিনা সে বিষয়টিও আমি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি। তদন্ত রিপোর্ট পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। হেফাজতে মৃত্যু নানা কারণে হতে পারে। নির্যাতনের অভিযোগ যেমন উঠে আসে, তেমনি অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যুর উদাহরণও রয়েছে। হেফাজতে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে কখনও কখনও। পুলিশী হেফাজতে যে কারণেই মৃত্যু ঘটুক না কেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা পুলিশ সদস্যদের কোন গাফিলতি, বিচ্যুতি বা অপরাধ প্রমাণিত হলে তার বা তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই উপযুক্ত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

গত ১৯ জানুয়ারি রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার হাজতে আবু বক্কর সিদ্দিক বাবু (৩৫) নামে একজন আসামি মারা যান। পুলিশ বলছে, ঐ আসামি হাজতের গ্রিলের সঙ্গে চাদর পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে গ্রিলের সঙ্গে চাদর পেঁচিয়ে আত্মহত্যার বিষয়টি মানতে রাজি নন নিহত বাবুর সহকর্মীরা। বাবু বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএফডিসি) ফ্লোর ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে এক নারী ডিজিটাল নিরাপত্তা ও নারী নির্যাতন আইনে মামলা করেছিলেন। ঐ মামলাতেই গত ১৮ জানুয়ারি রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। বাবুর মৃত্যুর ঘটনার বিচার চেয়ে এফডিসির সহকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। ঘটনাটি তদন্তে পুলিশের পক্ষ থেকে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

এর আগে ২০১৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ গাড়িচালক আলমগীর হোসেনকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যায়। থানায় রেখে রাতভর মারধর করা হয় তাকে। থানা থেকে মুক্তি পেতে তার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ করেছে তার পরিবার। পরে তার কাছ থেকে ৮০ পিস ইয়াবা উদ্ধার দেখিয়ে মাদক আইনে একটি মামলা দায়ের করে পুলিশ। ঐ মামলায় পুলিশ তাকে আদালতে পাঠায়। আদালতে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর সময় তিনি পড়ে যান। তার দুই পায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। কারাগারে আলমগীর অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৯ ডিসেম্বর তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় গত ১৬ জানুয়ারি ঢাকার আদালতে মৃতের স্ত্রী আলেয়া বেগম বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহা, এসআই মোঃ মিজানুর রহমান, এএসআই নামজুল ও মোঃ সোহাগকে আসামি করে মামলা করেছেন।

পুলিশের হেফাজতে ২০১৪ সালে জনি নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ৫ আসামির মধ্যে তিন জনের যাবজ্জীবন কারাদÐ দিয়েছে আদালত। অপর দুই জনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। দুপুরে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েস এ রায় ঘোষণা করেন।

২০১৩ সালে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন প্রণয়নের পর পুলিশী হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় কোন মামলার রায় হওয়ার পর তোলপাড় সৃষ্টি হয়। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন পল্লবী থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক জাহিদুর রহমান জাহিদ, এসআই রশিদুল ইসলাম এবং এএসআই কামরুজ্জামান মিন্টু। যাবজ্জীবন ছাড়াও এক লাখ টাকা করে জরিমানা এবং দুই লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার আদেশ দেয়া হয়। জরিমানা ও ক্ষতিপূরণের অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে আরও ৬ মাস করে কারাদÐ ভোগ করতে হবে।

সুপ্রীমকোর্টের একজন আইনজীবী বলেছেন, রাজধানীর হাতিরঝিল থানা হেফাজতে যুবক সুমন শেখের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা না নেয়াটাও একটা অপরাধ। ২০১৩ সালের হেফাজতে নির্যাতন এবং মৃত্যু নিবারণ আইন অনুযায়ী অবশ্যই মামলা নিতে হবে। এই মামলা থানা না নিলে এসপিকে নিতে হবে অথবা আদালত নেবেন। মৃত্যু কীভাবে হয়েছে সেটা তদন্তের বিষয়। আগে মামলা নিয়ে তারপর তদন্ত করে দেখতে হবে। যদি আত্মহত্যা হয় তাহলে কারোর প্ররোচনা ছিল কিনা, আত্মহত্যার মতো অবস্থা তৈরি করা হয়েছিল কিনা এসব তদন্তের বিষয়। এমনকি হেফাজতে মানসিক নির্যাতনও অপরাধ। এই আইন শুধু পুলিশ হেফাজত নয়, যে কোন সরকারী কর্মকর্তার হেফাজতের বেলায়ও প্রযোজ্য।

অপরাধ বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন, পুলিশ হেফাজতে যখন কেউ থাকেন তখন তার সব ধরনের নিরাপত্তার দায়িত্ব পুলিশের। থানা হাজতে আসামি থাকলে ২৪ ঘণ্টা কমপক্ষে দুজন পুলিশ সদস্যকে পাহারায় থাকতে হবে। আর ওই থানায় সিসি ক্যামেরাও আছে। সেটাও তো মনিটরিং হয়। তাহলে সুমন কীভাবে আত্মহত্যা করল। যদি সে আত্মহত্যা করেও থাকে তাহলে পুলিশের অবহেলার কারণেই সে আত্মহত্যা করেছে। এর দায় পুলিশকেই নিতে হবে। – জনকন্ঠ

Loading