চীন-ভারতের ভালোবাসায় বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ৮:২৬ পূর্বাহ্ণ , আগস্ট ৬, ২০২২

সাম্প্রতিককালে চীন-ভারতের বেশ সুনজরেই আছে বাংলাদেশ। তবে এই উপচেপড়া ভালোবাসা কখনো-কখনো বেশ বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দেয় কূটনৈতিক মহলে। বাংলাদেশ যখন নির্বাচনী বছরের দিকে এদিয়ে যাচ্ছে, তখন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ঢাকা সফরে আসছেন অনেকটা অযাচিতভাবে। যেহেতু বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন এগিয়ে আসছে, বাংলাদেশ চীন নয়, বরং ভারতমুখী হবে বলেই কূটনৈতিক মহলে মনে করছে।
চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই দুদিনের সফরে ঢাকা আসছেন। শনিবার (৬ আগস্ট) তার দুদিনের সফর শুরু হবে। এতে ভবিষ্যৎ দিনগুলোতে দুদেশের সম্পর্ক কী হবে, তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে তিনি বৈঠক করবেন।

আগামী বছরের শেষ দিকে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন। আবার সেপ্টেম্বরে ভারত সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যে কারণে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরের সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা করছেন অনেকে। চীন-ভারত দুই প্রতিবেশী বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারে মরিয়া।

বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখনো বঙ্গবন্ধুর ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলছে।

এমন এক সময় ওয়াং ই বাংলাদেশ সফরে আসছেন, যার কয়েক দিন আগেই তাইওয়ান সফরে যান মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যানসি পেলোসি। ‘তার এই সফরকে ‘এক চীন নীতির’ ওপর বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরেও চলছে উত্তেজনা। যে কারণে চীনা স্টেট কাউন্সিলরের ঢাকা সফর বিভিন্নভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

গেল জুলাইয়ে মিয়ানমার সফরে যান চীনের এই শীর্ষ কূটনীতিক। সেখানে জান্তা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উন্না মুয়াং লিউইনের সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছে। মিয়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের ল্যানক্যাং-মেকং সহযোগিতা গ্রুপের বৈঠকে যোগ দেন তিনি। মিয়ানমারের পুরনো মিত্র ও সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার চীন।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন কতটা গুরুত্ব পাবে?

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে গেল কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করে এখনও কাজের-কাজ কিছুই হয়নি। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি বদলেছে। রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে গাম্বিয়ার করা মামলায় মিয়ানমারের আপত্তি খারিজ করে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক আদালত। এতে দেশটির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যার বিচার গতি পেয়েছে।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর গণহত্যা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এসব রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে ওয়াং ইর ঢাকা সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সাবেক কূটনীতিক ও বিশ্লেষকেরা এমনটাই মনে করছেন। শুক্রবার সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, আমার ধারণা চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনো বার্তা পেয়েছেন, যা বাংলাদেশের সামনে উপস্থাপন করবেন। আবার হতে পারে, চীন নিজেই উদ্যোগী হয়েছে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে।

মিয়ানমার রোহিঙ্গা সংকট তৈরি করেছে জানিয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন বলেন, চীন যেহেতু উভয় দেশেরই বন্ধু। সুতরাং এ সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব তাদের নিতে হবে। এই বার্তাটা চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিতে হবে।

গেল বছরের জানুয়ারিতেও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোর ওপর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নিপীড়ন সত্ত্বেও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশটির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন ওয়াং ইং। তখন তিনি বলেন, মিয়ানমারের নৃতাত্ত্বিক সংঘাত বন্ধে চীন সহায়তা করবে। আর তাইওয়ান, তিব্বত ও জিনজিয়াং সংকটে চীনের অবস্থানকে সমর্থন দেয়ার কথা জানায় মিয়ানমার।

যদিও ২০১৭ সালের নভেম্বরে ঢাকা সফরে এসে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার সংলাপে সহায়তার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন ওয়াং ই। কিন্তু এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিজভূমিতে ফেরত পাঠানো যায়নি।

আগ্রাসী সফর

অনেকটা অতি আগ্রহী হয়ে বাংলাদেশ সফরে আসেন চীনা স্টেট কাউন্সিলর। যে কারণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে না-জানিয়েই তার ঢাকা সফরের দিনক্ষণ ঠিক করেছে চীনা দূতাবাস। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো আগাম অনুমতি কিংবা সম্মতি নেয়া হয়নি।

গেল ২৮ জুলাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, তারা ডেসপারেটলি সফরটি চেয়েছে। চীনা দূতাবাস আমাদের সঙ্গে আলাপ না-করেই সফরের দিনক্ষণ ঠিক করেছে। তারপর তারা জানাতে এসেছিল। আমরা তাদের বলেছি, এ সময়ে আমি দেশে থাকছি না।

যে কারণে বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) ওয়াং ইর ঢাকা সফর করার কথা থাকলেও তা একদিন পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সহযোগিতা সংস্থার (আসিয়ান) পাঁচ দেশ, মঙ্গোলিয়া ও বাংলাদেশসহ বন্ধুপ্রতিম দেশ সফরের অংশ হিসেবে ঢাকায় আসছেন তিনি।

চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর পরিকল্পনাকে ‘আগ্রাসী’ বলে মন্তব্য করেন আবদুল মোমেন। তিনি জানান, বেইজং-এর এ ধরনের পরিকল্পনায় বিব্রত ঢাকা।

এখনই ঢাকা সফরে কেন?

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় বিষয়ের পাশাপাশি চীনের দিক থেকে ভূরাজনীতি ও কৌশলগত সহযোগিতার বিষয়গুলোতে নজর থাকবে। বাংলাদেশের তরফে বাণিজ্য বৃদ্ধি, প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া হবে।

রোববার এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে প্রাতঃরাশ সভায় যোগ দেবেন। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনা শেষে অন্তত গোটা পাঁচেক চুক্তি ও সমঝোতা স্বারকে সই হতে পারে। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে ঢাকা ছেড়ে যাবেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের আগে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর পরিকল্পনা বৈশ্বিক রাজনীতির অংশ হিসেবেই ধারণা করা হচ্ছে। এরআগে ২০১৭ সালের নভেম্বরে আফ্রিকা যাওয়ার পথে উড়োজাহাজে জ্বালানি নেয়ার জন্য ঢাকায় কয়েক ঘণ্টার যাত্রাবিরতি করেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তখনকার পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হকের সঙ্গে উড়োজাহাজে বসেই বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন তিনি। পরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিভিআইপি লাউঞ্জে কিছু সময় কাটান ওয়াং ই।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যানসি পেলোসির তাইওয়ান সফরের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক রাজনীতির জন্য তার সফর বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন চার দেশীয় অনানুষ্ঠানিক জোট কোয়াডে যোগ না-দিতে বাংলাদেশকে অনুরোধ জানাতে পারেন ওয়াং ই। বিপরীতে ঢাকা-বেইজিং সহযোগিতা বাড়াতে প্রস্তাব দিতে পারেন তিনি। এসব জোটে ঢাকার অংশগ্রহণ নিয়ে বেইজিং আগে থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছে।

এছাড়া ‘এক চীন নীতিতে’ বাংলাদেশের সমর্থনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ সফরের আগে দুই দেশের সম্পাদিত ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনায় আসার কথা রয়েছে। ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এসব প্রকল্পে দুই হাজার ৪০০ কোটি ডলার দেয়ার কথা চীনের।

বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেক গভীর। এ সফরে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক ও পুরনো চুক্তি নবায়ন হতে পারে। নিজের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগে বাংলাদেশকে পাশে চায় চীন। তিনি বলেন, চীন বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্র, তাদের অনেক পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশ।

‘এক চীন নীতিতে’ বাংলাদেশ বিশ্বাস করে বলে জানিয়ে শাহরিয়ার আলম বলেন, আমরা চাই না যে তাইওয়ান পরিস্থিতি খারাপ হোক। বিশ্ব এখন যথেষ্ট বৈরী সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সবপক্ষ যেন সংযত থাকে।

খবরে বলা হয়, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও ভূরাজনীতি নিয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনা হতে পারে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটও আলাপে থাকবে।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগ জিএসআই ও বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ জিডিআইয়ের মতো বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন ওয়াং ই। সারা বিশ্বের ‘অবিচ্ছেদ্য নিরাপত্তা’ এই মূলনীতিকে সামনে রেখে গত এপ্রিলে জিএসআই ঘোষণা করেন চীনা প্রেসিডেন্ট।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জিএসআই ঘোষণার মধ্য দিয়ে চীন সারা বিশ্বে ‘বন্ধুপ্রতীম পরাশক্তির’ ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আর জিডিআইকে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজির পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ সফরে কি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের প্রভাব পড়বে?

২০২৩ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের পার্লামেন্ট নির্বাচন। আবার বাংলাদেশকে চার জাতির নিরাপত্তা জোট কোয়াডে চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত। সেক্ষেত্রে ওয়াং ইর সফরে কতটা প্রভাব ফেলবে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে? বলা হয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশী ভারত।

স্বাধীন দেশ হিসেবে ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল প্রতিবেশী ভারত। সেই স্বীকৃতির ৫০ বছর উপলক্ষ্যে গেল বছর দুদেশ মৈত্রী দিবসও উদ্‌যাপনও করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এক কোটিরও বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল ভারত। যুদ্ধেও সরাসরি সহায়তা করেছে।

শরণার্থীদের আশ্রয় ও খাদ্য সরবরাহ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ, কূটনৈতিকভাবে আন্তর্জাতিক বিশ্বের সমর্থন আদায়সহ প্রবাসী সরকারকে যাবতীয় সহায়তা প্রদান করে। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অকুণ্ঠ সমর্থনকে আজও শ্রদ্ধাভরে সমর্থন করে বাংলাদেশের জনগণ। এতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে আলাদা এক বিশেষত্ব তৈরি হয়েছে।

যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন সত্তাকে স্বীকার করে নিতে দেরি করেনি ভারত। তবে বাংলাদেশও তার প্রতিদান দিতে কার্পণ্য করেনি। ভারতও আঞ্চলিক স্বার্থের সহযোগী হিসেবে দেখছে গণতান্ত্রিক ও বন্ধুপ্রতীম বাংলাদেশকে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমলে নিয়ে ১৯৭২ সালে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্ব ও নিরাপত্তা চুক্তি হয়েছে।

এসব কিছুর মধ্যেও স্বাধীনভাবে চলার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা মানেনি বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বিভিন্ন ইস্যুতে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে দেখা গেছে বাংলাদেশকে। ২০০৮ সালের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কোন্নয়নে নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি হয় এবং সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় চলে যায়।

বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ দমনে সফল হয়েছে ক্ষমতাসীন সরকার। এতে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। আর বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান কাজে লাগিয়ে ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পেয়ে যায়। এ ছাড়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে করিডর বা ট্রানজিটের সুবিধাও ভারতের স্বার্থের অনুকূল বলে বিবেচিত হয়। সব মিলিয়ে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক একটি স্থায়ী বিশ্বাসের জায়গায় দাঁড়িয়েছে।

২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে যান। তা আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় তৈরি করে। তখন দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অনেক বিষয়ে দুদেশের মতৈক্য দেখা দেয়। ভারতকে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুবিধা দিতেও রাজি হয় বাংলাদেশ। কূটনৈতিকভাবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে এগোলেও বর্তমানে একটি আস্থার জায়গায় পৌঁছেছে।

আঞ্চলিক শক্তি ও অর্থনৈতিক অংশীদার—যা-ই বলা হোক না কেন; ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দুই দেশই গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সম্পূরক। একই সঙ্গে দুই দেশই প্রাকৃতিক সম্পদের, বিশেষ করে পানি, জ্বালানি ও জলবায়ুর অংশীদার। এই সম্পদের সুষম বণ্টন ও ব্যবহারের মাধ্যমে পারস্পরিকভাবে লাভবান হতে পারে।

অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ভারতের উত্থান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি সুসংবাদ। এই প্রক্রিয়ায় ইতিবাচকভাবে সব প্রতিবেশী দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশকেও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। এতে করে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ সংরক্ষিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে আগামী সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ভারত সফরের কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তখন ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের মৈত্রী সুপার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধন করবেন শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বাণিজ্যে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার বিষয়ক চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নে ৪টি ট্রায়াল রানের প্রথমটি শুরু করেছে ভারতের কলকাতা বন্দর। গেল শনিবার এ ট্রায়াল রান শুরু হয়।

ভারত-বাংলা প্রোটোকল রুটে অভ্যন্তরীণ জলপথ ব্যবহার করে ব্যবসায়িক গতি বাড়ানোর লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মোংলা থেকে তামাবিল, তামাবিল থেকে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে শেওলা (স্থল সীমান্ত) এবং মোংলা থেকে বিবিরবাজার রুটে এসব ট্রায়াল চলবে।

ভারত-বাংলাদেশ প্রোটোকল রুটের মাধ্যমে কলকাতা বন্দর থেকে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে কার্গো চলাচল ট্রানজিট শুধু ব্যয় ও সময়ই কমাবে না, অর্থনীতির বিকাশেও সাহায্য করবে। ভারত থেকে পণ্য পরিবহনের জন্য চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার সংক্রান্ত একটি চুক্তি এবং স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং পদ্ধতি দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে।

সবমিলিয়ে দুদেশের সম্পর্ক যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, তাতে বাংলাদেশকে ভারতের প্রভাববলয়ের বাইরে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব হবে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখেই এই বলয় টিকে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক

গেল বছর বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেন, কোয়াড কিংবা আইপিএসে বাংলাদেশ যোগ দিলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদিও এ ধরনের বক্তব্য দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত আখ্যায়িত করে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন। তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের নীতি স্বাধীনভাবেই রচিত।

পরে ভাষা প্রয়োগে ভুল করার কথা স্বীকার করলেও বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেননি লি জিমিং। এখন পর্যন্ত দুবার বাংলাদেশ সফর করেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বাংলাদেশকে তিনি এক অদ্ভুত সুন্দর ও মনোরম স্থান বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, প্রাচীনকাল থেকেই চীন-বাংলাদেশের মানুষ পরস্পরের ভালো প্রতিবেশী ও বন্ধু। প্রাচীনকালে দক্ষিণ রেশমপথ ও সামুদ্রিক রেশমপথ ছিল দুপক্ষের যোগাযোগ ও বোঝাপড়ার মূল মাধ্যম। এ নিয়ে হাজার বছর ধরে প্রচলিত অনেক গল্প-কাহিনীও রয়েছে।

চীনের ফাহিয়েন ও হিউয়েন সাং বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের সন্ধানে এ অঞ্চলে আসেন। আর বাংলাদেশের অতীশ দীপঙ্কর চীনে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেন। চীনের মিং রাজবংশ আমলের সমুদ্রচারী চাং হো দুবার বাংলা সফর করেন। তিনি লিখেছেন, এ অঞ্চলের রীতিনীতি সরল। এলাকাটি জনবহুল ও শস্যসমৃদ্ধ। এখানকার জমি উর্বর ও প্রচুর ফলন হয়। চীনের মিং রাজবংশ আমলের সম্রাটকে একটি জিরাফ উপহার দেন বঙ্গদেশের তৎকালীন রাজা।

চীন-বাংলাদেশ মৈত্রীর ইতিহাসও কয়েক দশকের। গেল শতাব্দির পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই দুবার ঢাকা সফর করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও সে সময়ে দুবার বেইজিং সফর করেন। কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর দুই দেশ আন্তরিক ও উন্নয়নের অংশীদার।

১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে চীন-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপর ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক বিকশিত হতে হতে নতুন উচ্চতায় চলে যায়। চীন-বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক প্রতিবেশী ভারতের জন্যও দুশ্চিন্তার কারণ।

বৃহস্পতিবার কূটনীতিক লি জিমিং বলেন, বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার অব্যাহতভাবে ‘এক চীন মতাদর্শ’ মেনে চলবে বলে প্রত্যাশা করছি। তাইওয়ান প্রশ্নে চীনের আইনসম্মত ও ন্যায্য অবস্থান সমর্থন করবে বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি রক্ষায় চীনের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ।

চীন ও বাংলাদেশ একে অন্যের ভালো প্রতিবেশী উল্লেখ করে লি জিমিং বলেন, দুই দেশই একে অপরের বিশ্বস্ত বন্ধু এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার। দুই দেশ সব সময় নিজেদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতাসংক্রান্ত মৌলিক স্বার্থের বিষয়ে একে অপরকে বুঝেছে এবং সমর্থন করেছে।

এক চীন নীতির প্রতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার ও ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতার’ প্রতি বাংলাদেশের জোরালো বিরোধিতার প্রশংসা করেছেন ঢাকায় দেশটির শীর্ষ এই কূটনীতিক।

চীনের রাষ্ট্রদূত বলেন, বিশ্বে শুধু একটিই চীন আছে, তাইওয়ান চীনের ভূখণ্ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সরকার সমগ্র চীনের প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র বৈধ সরকার।

বাংলাদেশের মোট আমদানি বাণিজ্যের ২৫ শতাংশই আসে চীন থেকে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ আমদানি করেছে এক হাজার ৩০০ কোটি ডলারের পণ্য। বিপরীতে রফতানি করেছে মাত্র ৬৮ কোটি ডলার।

দুদেশের মধ্যে বাণিজ্যে ২০১৮ সালেই চীনা মুদ্রা ইউয়ান ব্যবহারের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে তা রয়েছে একেবারেই সীমিত পর্যায়ে। ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানো গেলে চাপ কমতো ডলারের ওপর।

আলোচনায় এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া যেতে পারে বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ। দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি দুদেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাসুদ বিন মোমেন বলেন, আমরা এখন করোনা পরবর্তী পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা ও রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের মোকাবিলার মতো বিষয়গুলোতে বেশি জোর দিচ্ছি। ফলে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে জিডিআিই, জিএসআইয়ের মতো বিষয়গুলো এলেও বিভিন্ন পরাশক্তির মধ্যে যে বিষয়গুলোতে বৈরিতা আছে, তাতে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই।

একটি সূত্র বলেছে, আলোচনায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক জোট ইন্দো প্যাসিফিক ইকনোমিক ফোরামের (আইপিইএফ) বিষয়টিও চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী তুলতে পারেন। গত মে মাসে আইপিইএফ ঘোষণার পরপরই ঢাকা ও বেইজিংয়ে বসে চীনের কূটনীতিকেরা বাংলাদেশকে ওই জোটে যোগ দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক করেছিল।

চীন-ভারত সম্পর্ক

চীনবিরোধী জোট কোয়াডে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ ভারত। এ অঞ্চলের অন্য কোনো দেশ এখন পর্যন্ত চার জাতির এ জোটে যুক্ত হয়নি। চীনের পরেই ভারতে নৌ ও সামরিক শক্তি। জোটের অন্য সদস্য অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমান উদীয়মান চীনা শক্তির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই সরব। আর চীনা প্রভাব ঠেকাতে ভারতকে সামনে রাখতে চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ভূকৌশলগতভাবে চীন-ভারত সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে।

১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের পর নেহেরু রচিত ‘পঞ্চশীল’ নীতি ভেঙে পড়ে। চীনের তিব্বত দখল ও ভারতে দালাই লামার আশ্রয় নেয়ার পর সংকট বড় আকার নিয়েছে। ২০২০ সালের মে মাসে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় চীন-ভারতের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ হয়েছে। এতে দুপক্ষের কয়েক ডজন সেনা নিহত হয়েছে। ১৯৯১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলে ভারত। তারা সম্মিলিত সামরিক মহড়ায়ও যুক্ত হয়েছে।

পাকিস্তান বাদে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোকে কোয়াডে যুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত। অন্য দেশগুলোতেও চীনের প্রভাব কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। আঞ্চলিকভাবে বাংলাদেশও কোয়াড সদস্যদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড। তবে চার দেশ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোনো দেশ কোয়াডে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেনি।