এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধার বিজয়ের গৌরব গাঁথা

প্রকাশিত: ১১:১৬ অপরাহ্ণ , মে ৭, ২০২২

উত্তম কুমার স্যানাল, রতন কান্দি ॥

বীর মুক্তিযোদ্ধা দেবেশ চন্দ্র স্যান্যাল একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার রতন কান্দি গ্রামের বীর সন্তান তিনি। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচনী প্রচারণাকারীদের কাছ থেকে জানতে পারেন যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ বিজয়ী হলে বাঙালিরা পাকিস্তানি অবাঙালি শাসনের নিপীড়ণ আর বৈষম্যের শিকার হওয়া থেকে রক্ষা পাবে। দেশের সম্পদ দেশে থাকবে। দেশ ধর্ম নিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক নীতিতে পরিচালিত হবে।
সব জেনে শুনে তিনি আওয়ামীলীগ মনোনীত এমএনএ ও এমপিএ প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণা দলের সাথে কাজ করতে থাকেন। এই সাধারণ নির্বাচনে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি গণপরিষদ (জাতীয় পরিষদ) পদের ১৬৭টির অধিকারী হয়ে আওয়ামীলীগ সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।

কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসক বাঙালিদের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে না। পাকিস্তানি শাসকেরা বিভিন্ন ষড়যন্ত্র শুরু করে, সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে। এ প্রেক্ষিতে আওয়ামীলীগ সারাদেশে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু গর্জে ওঠেন— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” তিনি জাতিকে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিতে থাকেন।

পরবর্তীতে ২৫ মার্চ ’৭১ তারিখে কালরাত্রিতে পাকিস্তানী বাহিনী ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামক নারকীয় গণহত্যা ও অন্যান্য মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড শুরু করলে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ ’৭১-এ রাত ১২.২০ মিনিটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতা ঘোষণার পর পর পাকিস্তানী হায়েনারা জাতির পিতাকে বন্দী করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। জাতির পিতার পূর্ব ঘোষিত আহ্বানে বাঙালিরা প্রতিরোধ যুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে। সাধারণ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলাম ও অন্যান্য ইসলামী দলের মনোনীত পরাজিত প্রার্থী, তাদের সমর্থকেরা ও এদেশের বিহারীরা পাকিস্তানি সৈন্যদের পক্ষ নেয়। ফলে অকুতোভয় হওয়া সত্ত্বেও বাঙালিদের পক্ষে বিজয় অর্জন কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। মুক্তিযোদ্ধা দেবেশ চন্দ্র স্যান্যাল মনে করেন, এদেশের কিছু কুলাঙ্গার সন্তান মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা না করলে, পাকিস্তানের পক্ষ না নিলে, নিজ দেশের ভাইদের বিরুদ্ধে অস্ত্র না ধরলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়াই মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় অর্জন করতে পারত।

সারাদেশের মতো বীর এই মুক্তিযোদ্ধার এলাকাতেও পাকিস্তানি বাহিনী এবং রাজাকারেরা গণহত্যা সংগঠিত করে। ডেমরা ও করঞ্জা গণহত্যায় এই কিশোর মুক্তিযোদ্ধা তার সাত জন নিকট আত্মীয় হারান। এরপর তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আরো ২২ জনের সাথে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে যান। তখন তিনি রতন কান্দি আদর্শ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। বয়সের কারণে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটমেন্ট দল তাকে ভর্তি করতে চাইছিলো না। পরে সকলের অনুরোধে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। প্রথমে ভারতে কামারপাড়া যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হন। এরপর কামারপাড়া, কুড় মাইল, মালঞ্চ, প্রতিরামপুর ও শিলিগুড়ির পানিঘাটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তার ভারতীয় প্রশিক্ষণ এফ.এফ. নং-৪৭৪২। তিনি ৭নং সেক্টরের হেড কোয়ার্টার— ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তরঙ্গপুর থেকে অস্ত্র নিয়ে একটি গ্রুপের সদস্য হিসেবে মানিকার চর, রৌমারী হয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আসেন। ৭নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন লেঃ কর্ণেল (অবঃ) কাজী নূরুজ্জামান। তার গ্রুপের গ্রুপ কমান্ডার ছিলেন এমএ মান্নান। তার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের কারণে রাজাকারদের আলটিমেটামে জীবনের নিরাপত্তার জন্য গোটা পরিবারকেই বাড়িঘর সব ফেলে ভারতের আসামের মানিকার চর শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। গ্রুপের সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে তিনি বিভিন্ন গেরিলা ও সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তার অংশগ্রহণ করা ভয়াবহ যুদ্ধ গুলোর মধ্যে (১) বেলকুচি থানা আক্রমণ যুদ্ধ, (২) কালিয়া হরিপুর রেলওয়ে স্টেশন ব্রিজ সংলগ্ন রাজাকার ক্যাম্প এ্যাম্বুস, (৩) কল্যাণপুর যুদ্ধ ও (৪) শাহজাদপুর উপজেলার ধীতপুর নামক স্থানে পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধ অন্যতম। তিনি ছিলেন এক অকুতোভয় দুঃসাহসী কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি অসম সাহসী এক মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার নাম শুনলে পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকারেরা আঁতকে উঠতো। তার অসমসাহসিকতার জন্য স্থানীয় লোকেরা তাকে ‘বিচ্ছু বাহিনী’ বলে সম্বোধন করতো। তার কোনো মৃত্যু ভয় ছিলো না। তিনি “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” ধ্বনি দিয়ে পাকিস্তানি হায়েনা সৈন্য ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন।