পুরোনো স্মৃতির অ্যালবামে নিমাই ভট্টাচার্য- সাকিল আহমেদ,কলকাতা

প্রকাশিত: ১১:০২ অপরাহ্ণ , জুন ২৬, ২০২০
নিমাই ভট্টাচার্য
জীবন এই রকমই। চলতে চলতে থেমে যায়। প্রয়াত সাহিত্যিক সাংবাদিক নিমাই ভট্টাচার্য(৮৯) এই করোনাকালে হয়তো সাংবাদিক হিসেবে রিপোটিং করতে গেলেন স্বর্গে। পড়ে রইল ধূসর পাণ্ডুলিপি। লেখককে প্রণাম।
সময়ের অমৃত কলস যায় ভেসে। সেই কলসের ভাসমান স্রোতে আমরা যাঁরা না লেখক তাঁদেরও যেতে হবে অনন্ত যাত্রায়।
খুব বেশি তাঁর সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ কথা বার্তা হয়েছে তা নয়। তবে প্রথম দেখার সুযোগ হয়েছিল এক বিখ্যাত মানুষের বাড়িতে।
 
১৯৮৫ সালে। সেই বিখ্যাত মানুষটির নাম কবি, শিশু সাহিত্যিক ও বহুমাত্রিক লেখক অন্নদাশঙ্কর রায়। মেম সাহেবের লেখক তিনি। কোন এক রবিবারের সকালে আমার সম্পাদনায় ছড়া সংকলন বের হবে তার জন্যে লেখা আনতে গিয়েছিলাম।
স্বয়ং অন্নদাশঙ্কর রায় আলাপ করে দিয়েছিলেন কবি দাউদ হায়দার ও সাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্যের সঙ্গে।
বাংলাদেশ থেকে চলে আসেন কবি দাউদ হায়দার। সে প্রসঙ্গ থাক।
এক মেম সাহেব সেদিন আমাকে চা পানে আপ্যায়িত করেছিলেন তিনি হলেন কবি অন্নদাশঙ্কর রায় পত্নী লীলা রায়।
১৯৮৫ সালে তখন খুবই আলোচিত উপন্যাস ছিল নিমাই ভট্টাচার্যের মেম সাহেব। আমি তখন খুবই ছোট। খুব বেশি কথা হয়নি। পরিচয়টুকুই যথেষ্ট ছিল। আর আমার ছিল ঘরে ফেরার তাড়া।
কবি দাউদ হায়দারের সঙ্গে অনেক বার দেখা হয়েছিল এবং দুই তিনটে অনুষ্ঠানে নিমাই ভট্টাচার্য্যর সঙ্গে। আশির দশকে নিমাই ভট্টাচার্য্যর উপন্যাসের কাহিনী অবলম্বনে উত্তম কুমার ও অপর্ণা সেন অভিনীত চলচ্চিত্র মেম সাহেব তখনো সুপার হিট।
তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি। একটা অপ্রিয় সত্য গল্প বলে লেখা শেষ করব।
২০১২ সালে আমরা ডায়মন্ড হারবার প্রেস ক্লাব ও কুসুমের ফেরা সাহিত্য পত্রিকার তরফ থেকে শিলচর যাই। উনিশ আমাদের আত্মপরিচয় এই শ্লোগানকে সামনে রেখে।
শিলচর স্টেশনকে ভাষা শহীদ স্মারক স্টেশনের দাবিতে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আন্দোলন করছে। স্টেশনে ঢোকার মুখে সেদিন ভাষা শহীদ স্মারক উদ্বোধন হয়। ২০১৩ শালে অধীরকৃষ্ণ মন্ডল তাঁর সাহিত্য পত্রিকা বনানীর নামাঙ্কিত ‘বনানী’ পুরষ্কার দেন আমাকে।
আমার ছেলে মেয়ে, অধীরকৃষ্ণ মন্ডল, দীপেন ভাদুড়ী, প্রয়াত কবি বন্ধু তপন তিপাঠী , আমার পরিবার ও সাহিত্যিক জগদীশ মুখোপাধ্যায়ের পরিবার সহযোগে আমরা শিলচর যাই চোদ্দ জনের একটা টিম।
 
১৯ মে শিলচরে বাংলা ভাষার দাবিতে যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে। সে বছর শিলচর রেল স্টেশন মাস্টার অফিসের পিছনে স্টেশন চত্তরে ভাষা শহীদ স্মারক সেদিন উদ্বোধন হয়। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কর্মকর্তা রাজীব করের সঙ্গে শহীদ মঞ্চে ছিলাম আমরাও।
শিলচরে গিয়ে নাকি নিমাই ভট্টাচার্য বলেছিলেন শিলচরের বাঙালিরা কেউ এ দেশের নয় তাই ঊনিশের প্রতি নাকি তাঁর কোন আলাদা আবেগ নেই। সবাই নাকি সিলেট থেকে এসেছেন। সিলেটি বাঙাল।
তাঁর এই সিলেটি বাঙাল কথাটি শিলচর জুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং বাঙালিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।রীতিমত নিমাই ভট্টাচার্য কে আর শিলচরে ঢুকতে দেয়া হবে না হুঁশিয়ারি দেন স্থানীয় মানুষ।
আসলে বিখ্যাত লেখকদের কথা বা লেখা বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এটা হওয়াটাও স্বাভাবিক।
 
নিমাই ভট্টাচার্য ১৯৩১ অধুনা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেন। পরে কলকাতা ও বিদেশে বসবাস করেন। এই করোনা কালে তাঁর বার্ধক্য জনিত কারণে চলে যেতে হল কলকাতার টালিগঞ্জ এলাকা ছেড়ে।
 
১৯ মে আলাপ হয়েছিল কেন্দ্রের প্রাক্তন ইস্পাত মন্ত্রী সন্তোষমোহন দেবের সঙ্গে।আলাপ হয়েছিল দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গের সম্পাদক তৈমুর রাজা চৌধুরী ও দৈনিক যুগশঙ্খ পত্রিকার প্রতিনিধি ও লোকগায়ক শুভেন্দু মাইতির সঙ্গে।আলাপ করান শিলচরের তবলচি বন্ধু সন্তোষ চন্দ্র। কথা হয় কবি চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। সুন্দর আলপনা দিয়ে সেজেছিল শিলচর শহর। প্রতিটি বাড়িতে জ্বলেছিল এগারো শহীদ স্মরণে ১১টি প্রদীপ ও মোমবাতি। নয়নাভিরাম সে দৃশ্য।
 
‌নিমাইদার চলে যাওয়া অনেক পুরনো স্মৃতি উস্কে দিল। ২০১২ সালে শিলচরবাসীদের সেই ঢুকতে দেবনা হুমকি আজো বুকে বাজে। প্রণাম…

লেখক: কবি ও সাংবাদিক