ডিসেম্বরের রণাঙ্গন

দিল্লির সিদ্ধান্তের অপেক্ষা, বহির্বিশ্বে উত্তাপ

প্রকাশিত: ১২:১২ অপরাহ্ণ , ডিসেম্বর ৫, ২০২১
শেখ সাদী


উত্তপ্ত রণাঙ্গন। ভারতীয় বোমারু বিমান তেজগাঁও এবং কুর্মিটোলা বিমানবন্দরের রানওয়ে ধ্বংস করে দেয়। মিত্রবাহিনীর বিমান দখল নেয় ঢাকার আকাশ। পাকিস্তানি নৌবাহিনীর অবস্থা আরো বিপন্ন। ১২ ঘণ্টায় ২৩২ বার তেজগাঁ ও কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে ৫০ টনের মতো বোমা ফেলেছে মিত্রবাহিনী। বোমার আঘাতে পাকিস্তানি বাহিনীর ৯০টি গাড়ি মাটির সাথে মিশে যায়।

ধ্বংস হয় পাকিস্তানের কয়েকটি লঞ্চ আর ষ্টিমার। ধ্বংস হয়ে যায় আমেরিকার ধার দেয়া পাকিস্তানের সবমেরিন গাজী। পাকিস্তানের বিভিন্ন ইউনিটের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন। সোজা নেই ইয়াহিয়ার সৈন্য দলের শিরদাঁড়া।

 

 

মিত্রবাহিনী ছয়-ডিভিশন সৈন্য জড়ো করে কৃষ্ণনগর, শিলিগুড়ি ও গুয়াহাটিতে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে প্রবেশ করে পশ্চিম, উত্তর-পশ্চিম, উত্তর, উত্তর-পূর্ব এবং পূর্ব সীমান্তে।

মুক্ত হয় মৌলভীবাজারের জুড়ী।  বিমান বাহিনীর আক্রমনে জুড়ীতে থাকা পাকিস্তানি সেনার পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব। তাই রণে ভঙ্গ। রাতেই পালিয়ে যায়। এথন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে লাল-সবুজের পতাকা। ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধ‘ শ্লোগানে মুখর চারপাশ।

যুদ্ধ চলছে লাকসামে। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে।

ভারতের ৫৭ মাউন্টেন ডিভিশন আখাউড়ার যুদ্ধে মিলিত হয় মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে।

পাকিস্তানি সেনাদের অবরোধ করা হলো দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে। কিছুক্ষণ গুলি। শহীদ হলেন সুবেদার আশরাফ আলী, সিপাহি সাহাব উদ্দিন ও সিপাহি মোস্তাফিজুর রহমান। এখানে ১৬০জন পাকিস্তনি সৈন্য খতম।

বীরবিক্রমে লড়ছে মুক্তিযোদ্ধারা। উপায় না দেখে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানি সেনা। কিছু পাকিস্তানি সৈন্য পালিয়ে যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া।  পুরোপুরি মুক্ত হলো আখাউড়া।

মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর নির্দেশে চার নম্বর সেক্টরের রানীবাড়ী সাব-সেক্টরের অধীনে থাকা সব ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধা একসঙ্গে দেশের ভেতরে প্রবেশ করেন।

তিন ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ভারতের বাগপাশা থেকে অগ্রসর হয়ে রাঘনা’য় ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তে জুড়ী নদীর ওপর মিত্রবাহিনী তৈরি করে অস্থায়ী সেতু। আর, এই সেতু দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনী।

সীমান্তবর্তী ফুলতলা ইউনিয়নের ফুলতলা বাজারটি বিনাবাধায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। রাতের মধ্যেই পাশের সাগরনাল ইউনিয়নে থাকা পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানটিও দখলে চলে আসে। এখানে মুক্তিবাহিনীর ক্যাপ্টেন সুখলাল’সহ কিছু সংখ্যক সৈন্য রয়ে যান। বাকিরা জুড়ীর দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।

রত্না চা বাগানের কাছে পৌঁছালে বাধা দেয় পাকিস্তানি সৈনা। দফায় দফায় গুলি। মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে টিকতে না পেরে পিছু হটতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি সেনা। লেজ গুটিয়ে চলে যায় কাপনাপাহাড় চা বাগানের দিকে। মিত্রবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারা এখানে অবস্থান নেয়। পরদিন চলে প্রচন্ড যুদ্ধ।

উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন হতাহত। পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি সেনা। এদিকে কাপনাপাহাড় থেকে মিত্রবাহিনীর সেনারা দুইভাগ হয়ে একদল কুলাউড়া শত্রুমুক্ত করার উদ্দেশ্যে গাজীপুর চা বাগানের রাস্তা ধরে এগিয়ে যতে থাকে।

যুদ্ধ চলে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের কামুদপুরে। সম্মুখ যুদ্ধে ৮ম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের চার সদস্য শহিদ হন।

ভানুগাছ বাজারের নিকর্টবর্তী ধলাই ব্রিজের সম্মুখযুদ্ধে তিনজন ও কমলগঞ্জ থানার সামনে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর সময় অষ্টম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন সদস্য পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। তারা হলেন ল্যান্স নায়েক জিল্লুর রহমান, সিপাহী মিজানুর রহমান, আব্দুর রসিদ, সিপাহী শাহাজান মিয়া। চার বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রাতেই কমলগঞ্জ আলীনগরের কামুদপুরে সমাহিত করা হয়।

জামালপুরে ভারতীয় বিমান হামলায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কয়েকশো সৈন্য খতম। বিধ্বস্ত হয় বহু সামরিক যানবাহন।

চট্টগ্রামে পাকিস্তান নৌবাহিনী ও যৌথ নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজগুলোর মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়। বখশীগঞ্জে মিত্রবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। শত্রুমুক্ত হয় পীরগঞ্জ, হাতিবান্ধা, পচাগড়, বোদা, ফুলবাড়ী, বীরগঞ্জ ও নবাবগঞ্জ। আর, জীবননগর, দর্শনা ও কোটচাঁদপুরে পাকিস্তানি সেনারা যুদ্ধে টিকতে না পেরে আত্মসমর্পণ করে।


উত্তপ্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গন। চলছে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ নিয়ে বিতর্ক।

মার্কিন সরকারের বিশেষ উদ্যোগে জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন বসে। যুদ্ধ বিরতির দাবি নিয়ে মার্কিন প্রতিনিধি সিনিয়র বুশের প্রচেষ্টায় ‘পানি’ ঢেলে দিলো সোভিয়েত প্রতিনিধি। দ্বিতীয় ‘ভেটো’ প্রয়োগ। ‘ভেটো’ প্রয়োগের আগে সোভিয়েত প্রতিনিধি জানিয়ে দেন, ‘পাক সামরিক জান্তার নিষ্ঠুর কার্যকলাপের ফলেই পূর্ব বাংলার বর্তমান পরিস্থিতি উদ্ভব হয়েছে।’

সোভিয়েত সংসাদ মাধ্যম ‘তাস’-এ বিবৃতি প্রকাশ করলো সোভিয়েত সরকার। বলা হয়, ‘পূর্ব বাংলার জনগণের আইনগত অধিকার ও স্বার্থের স্বীকৃতির ভিত্তিতে সংকটের রাজনৈতিক সমাধান চায় সোভিয়েত ইউনিয়ন।’ বাংলাদেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মূল লড়াইটা ছিল দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল বাংলাদেশের। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের।

বাংলাদেশ সম্পর্কে পরিষদে তৃতীয় প্রস্তাবটি পেশ করে বেলজিয়াম, ইতালি ও জাপান।

জাতিসংঘে চীনের প্রতিনিধিরা বলেন, কোনো শর্ত ছাড়াই পাকিস্তান থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে।

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে এ উত্তপ্ত অবস্থাতে যাতে মুক্তিযোদ্ধারা মনোবল হারিয়ে না ফেলেন সেজন্য মুক্তিবাহিনীর সেনাপতি জেনারেল ওসমানী জাতির উদ্দেশে বেতারে ভাষণ দেন।


’বিশেষ সিদ্ধান্ত’ নিতে যাচ্ছে দিল্লী। ইন্দিরা গান্ধীর কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। চিঠিতে ছিল আবেদন, ‘আমাদের দেশ ও সরকারকে ভারত সরকারের স্বীকৃতির জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।’

আবেদনের জবাব দিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। লিখেছেন, ‘ভারত সরকার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

এদিকে পূর্ব পাকিস্তানের পুতুল শাসক গভর্নর মালিক দেশবাসীর কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়ে বললেন, দেশ আক্রান্ত। ভারতীয়দের সহযোগিতায় কিছু বিশ্বাসঘাতক দেশ আক্রমণ করেছে। এ দেশের সেনাবাহিনী তাদের প্রতিরোধ করছে। তাদের সাহায্য করার জন্য প্রতিরক্ষা তহবিল করা হয়েছে। সে তহবিলে মুক্তহস্তে সাহায্য করুন ‘

কেউ সাড়া দিল না গভর্নর মালিকের আহবানে। কারণ, দেশে যে এখন মুক্তির যুদ্ধ চলছে বঙ্গবন্ধুর নামে ‘জয় বাংলা‘ শ্লোগানে।

শেখ সাদীঃ লেখক ও গবেষক