বিবাহিত ব্যাচেলর এবং আটপৌরে একটি সুখী পরিবারের গল্প

প্রকাশিত: ৯:৫০ অপরাহ্ণ , আগস্ট ২২, ২০২১

জালাল উদ্দিন সাগর

মাহমুদা বেগম সোনিয়া। আমার একমাত্র বউ। আমার শ্বাস-বিশ্বাস। তাকে যখন ঘরে তুলি তখন অলরেডি ৫ বছরের বিবাহিত ব্যাচেলর লাইফ কেটে গেছে আমার। তার আগে অবশ্য ব্যাচেলর ছিলাম অনেক বছর। সেই ৯৫ থেকে।

ঘরে তোলার পরও বাস্তবতা ও ব্যস্ততা খুব একটা ফুসরত দেয়নি আমি কিংবা তাকে। আমাকে ঘুমে রেখেই সে ধরেছে সাটল। ছুটেছে বিশ^বিদ্যালয়ে।

সে পড়তে চেয়েছিলো, উড়তে চেয়েছিলো। ধরতে চেয়েছিলো স্বপ্ন। আমি তার সেই পড়া,উড়া আর ধরার মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াইনি কখনো। আমি শুধুমাত্র তার সারথি হতে চেয়েছিলাম। তাই হয়েছি।

বিকেলে ভার্সিটি থেকে ফিরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে সে। সে যাতে না খেয়ে না থাকে এই জন্য ঘুম থেকে ওঠে প্রায়শঃ আমাকেই দুপুর এবং রাতের রান্নাও বসাতে হতো চুলাতে। তারপর নাস্তা—অফিস।

রান্নার সময় মাছ ভাজতে গিয়ে হাজারবার নিজের বুক ভেজেছি গরম তেলে—সে হিসেব বাস্তবিক জীবনে খুব বেশি গুরুত্ব রাখে না এখন আর। তবুও তেজে ওঠা গরম তেলের সেই পোড়া দাগগুলো এখনো পাহাড়া দেয় আমার পেট আর বুকে। মাঝেমাঝে সে দাগগুলোতে আলতো করে হাত বুলিয়ে ফিরে যাই সে সময়ে।

ছোট একটা চাকরি করতাম তখন। বেতন যা ছিলো তাতে ভালোই চলতো দুজনের সংসার। তারপরও তার যেনো কোনো কিছুতে ঘাটতি না পড়ে সেকারণে পয়সা বাঁচাতে মেয়র গলির বাসা থেকে হেঁটে হেঁটে অফিসে যেতাম। আসতামও। এভাবে হেঁটেই দিনে চারবার আসা—যাওয়া হতো । মেয়রগলি থেকে পাঁচলাইশ—পাঁচলাইশ থেকে মেয়র গলি।

চবিতে পড়ার সময় সোনিয়া বেশিরভাগ সময় থাকতো শশুরবাড়িতে—মায়ের আদরে। আর মা—বাবা হীন দুই রুমের ছোট একটা ঘরে আমি।

২০০১ থেকে ২০০৯— নয় বছর! খুব কী কম সময়! তবুও অভিযোগহীন এই সময়গুলোকে উপভোগ করেছি দুজনেই।

প্রেম করে বিয়ে করেছি বলেই শুধু নয়— আমার মধ্যে এই দায়িত্ববোধের দায়টা সেই ছোটবেলা থেকেই। ঘরের প্রতি, বউয়ের প্রতি এবং স্বজনদের প্রতিও।

অতিবাহিত বছরগুলোতে শত—শত দুপুর—রাত না খেয়ে ছিলাম—শুধুমাত্র আমার আশেপাশের মানুষগুলোকে ভালো রাখবো বলে। যে যা চেয়েছে—যতটুকু চেয়েছে দিয়েছি তার চেয়েও বেশি। পারবো না কিংবা দেখি পারি কিনা, এই বাক্যগুলোর সাথে পুরোপুরি অপরিচিত এই আমি শতশত রাত বারান্দাতে বসে কাটিয়ে দিয়েছি নির্ঘুম—একা। তবুও অভিযোগের ইশারায় আহত হতে দেইনি কাউকে।

২০১০—এ বউয়ের যখন সরকারি চাকরি হলো, এক বছরের ট্রেনিংয়ে যেতে হবে সারদা। তখন আদির বয়স মাত্র সাড়ে তিন কী চার। আদিকে নানার বাসায় রেখে ১ বছরের জন্য সারদা গেলো সে। আবারও আমার ব্যাচেলর জীবন শুরু।

সেখান থেকে ফিরে শিক্ষানবীশ হিসেবে ৬ মাসের জন্য তার পোস্টিং হলো সিলেটে। এরপর চট্টগ্রাম ফিরলেও ট্রেনিংয়ে বিদেশ ভ্রমণ ও মিশনের জন্য প্রায় বছর দেড়েক তাকে কাটাতে হয়েছে দেশের বাইরে।

গত বছর হঠাৎ করেই বললো, পড়তে যাবো দেশের বাইরে। এক বছরের জন্য। এর মাত্র কিছু দিন আগেই আমার শ^শুর মারা গেলেন হঠাৎ করেই। আমার শ^শুর মানে আদির ছাঁয়া—মায়া সব। শ^শুর যতক্ষণ ছিলেন আদিকে নিয়ে ভাবতে হয়নি খুব একটা।

ভাবাভাবির আগেই খুব দ্রুত ভিসা হয়ে গেলো সোনিয়ার, সে উড়াল দিলো অস্ট্রেলিয়া। ঘরে পড়ে রইলাম আমি আর আদি।

করোনাকাল শুরু না হলে পুরোটা সময় তাকে থাকতে হতো অস্ট্রেলিয়াতেই। পুরো এক বছর। করোনার কারণে তিন মাস পর দেশে ফিরলো সোনিয়া।

২১ বছরের বিবাহিত জীবনের প্রায় ১৫ বছরই ব্যাচেলর কাটানো এই আমি বউয়ের নতুন পোস্টিংয়ের খবরে কেন জানি আৎকে ওঠলাম খুব। বুকটা চিনচিন করে ওঠলো। প্রকৃতি ও অবস্থার সাথে সব সময় মানিয়ে নেওয়া এই আমার চোখের কোণটা ভিজে ওঠলো জলে।

এ মাসে তার পোস্টিং হলো রাঙামাটি। কদিন বাদেই জয়েন করবে সেখানে। কত দিন বা বছরের জন্য জানি না।

সারাদিন অন্যের অফিসের কাজ করে বাসায় এসে রান্না করে খাওয়া—খুব বেশি কষ্ট হয়তো হবে না। মাছ ভাজতে গিয়ে বুক—পেট পোড়ানোটাও হয়তো সয়ে যাবে আগেরই মতো। মধ্য রাতে একা একা লাগাটাও হয়তো মায়ার জালে আটকে থাকবে বুকে।

কিন্তু আদি টা ? সারাদিন একলা ঘরে কী করবে সে? তারও কী আমার মতো সয়ে যাবে সব। কষ্ট—যন্ত্রণা। পাওয়া—না পাওয়ার আক্ষেপ?

চাকরি, পোস্টিং, বিদেশ যাওয়া—এই নিয়ে কখনোই খুব ব্যাকুল ছিলাম না আমি। কিন্তু এবার খুব আনচান করছে মনটা। কষ্ট লাগছে বুকে। এবার মনে প্রাণে চেয়েছিলাম সে চট্টগ্রামে থাক। ছেলেটার কাছে থাক। ছেলেটাকে বুকে নিয়ে ঘুমাক।

এই কষ্ট লাগাটা আমার মধ্য বয়সের কারণে নাকি কৈশর পেরিয়ে যৌবনে পা দেয়া ছেলেটার একাকিত্বের কারণে—ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।