বঙ্গমাতাকে ছাড়া বঙ্গবন্ধু অসম্পূর্ণ

প্রকাশিত: ৯:৫৭ পূর্বাহ্ণ , আগস্ট ৮, ২০২১

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রেরণা ও আত্মবিশ্বাসের উৎস। বঙ্গমাতার সমর্থন ও সহায়তা পেয়েই বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তাঁর গোটা জীবনে জাতির জন্য সাহসী ভূমিকা পালন সম্ভব হয়েছে। এ কথা বলেন দেশ বরেণ্য শিক্ষাবিদরা।

বঙ্গমাতার ৯১তম জন্ম-বার্ষিকীর প্রাক্কালে জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বঙ্গমাতাকে ছাড়া বঙ্গবন্ধু অসম্পূর্ণ। বঙ্গমাতাকে পাশে পেয়েই বঙ্গবন্ধু পূর্ণতা পান।’

তিনি বলেন, বঙ্গমাতা তাঁর স্বামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে এবং আওয়ামী লীগ ও এ দেশের সুদীর্ঘ সংগ্রামের ফসল আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অনন্য ভূমিকা রেখেছেন।

জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুর জীবনে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর পর, আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশের সুদীর্ঘ সংগ্রামের ফসল আমাদের স্বাধীনতার পেছনে বঙ্গমাতার অবদান সর্বাধিক। কিন্তু তিনি আড়াল থেকেই নীরবে তাঁর এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গেছেন। কারণ, তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বঙ্গবন্ধুর অসামান্য কর্মময় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বঙ্গমাতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর জীবনে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেন।

তিনি আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা পরস্পরের পরিপূরক ছিলেন। তাঁরা পরস্পর আজীবন একে অপরের পাশে ছিলেন। আমরা বলতে পারি যে- তাঁরা একে অপরের জন্যই জন্মেছিলেন।’

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বাল্যকাল থেকেই বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা একই পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। বাল্যকালে বঙ্গমাতা তাঁর বাবা-মাকে হারালে, বঙ্গবন্ধুর বাবা-মা’ই বঙ্গমাতাকে লালন-পালন করেন। তাই, বাল্যকাল থেকেই তাঁদের মধ্যে চিন্তাধারা ও মনের মিল ছিল এবং আমৃত্যু তাদের মধ্যে এটা একই রকম ছিল।

তিনি বলেন, ‘১৫ আগস্টের কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরপরই বঙ্গমাতাকে হত্যা করা হয়। তাই, আমরা বলতে পারি যে- তাঁরা পরস্পরের জন্য জন্মেছিলেন, আজীবন এক সাথে বেঁচেছিলেন এবং এক সাথেই শাহাদাৎ বরণ করেন। ঘটনাদৃষ্টে মনে হয় যে, বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর স্ত্রী বেগম মুজিবের সহমরণ হয়েছে।’

বঙ্গবন্ধু রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে তিনি বারংবার বঙ্গমাতার অবদান তুলে ধরেছেন যে- কিভাবে বঙ্গমাতা সব সময় তাঁর পাশে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে আরও লিখেন যে- বঙ্গবন্ধু যখন ছাত্র ছিলেন, তখন থেকেই বঙ্গমাতা তাঁর স্বামীর জন্য সব সময়ই কিছু টাকা বাঁচিয়ে রাখতেন এবং বঙ্গবন্ধু যখন ঢাকা বা কোলকাতা থেকে গোপালগঞ্জ যেতেন তখন বঙ্গমাতা তাঁকে সেই টাকা দিতেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু ধূমপান করতেন এবং তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে এ কথা উল্লেখ করে লিখেছেন যে- “আমার একটি অভ্যাস ছিল ধূমপান করা এবং এ জন্য অপ্রয়োজনে আমার কিছু অর্থ ব্যয় করতে হতো। বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুর এই ধূমপানের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বাঁচিয়ে রাখতেন।’

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার বোর্ড অব ডিরেক্টর্স-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক আরেফিন বলেন, বঙ্গবন্ধু রচিত তিনটি বইয়ের খসড়া পরিকল্পনায় বঙ্গমাতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যা বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য একটি অমূল্য সম্পদ হয়েই থাকবে।

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে কথা বলেছি। তাঁর বক্তব্য ও বক্তৃতা বিভিন্ন উপায়ে সংরক্ষিত হয়েছে। এগুলোকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু তাঁর নিজের ভাষায় তাঁর নিজের স্মৃতি বিবরণ একটি বিরল সম্পদ এবং বঙ্গমাতার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে।’

তিনি বলেন, বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে এই অমূল্য বইগুলো লিখতে অনুপ্রেরণা দেন ও অনুরোধ করেন। যদি বঙ্গমাতা এই পদক্ষেপ গ্রহণ না করতেন, তবে নতুন প্রজন্মের কাছে এই মহান নেতার জীবন ও কর্ম এবং দেশ ও জাতির সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরা সম্ভব হতো না।

বিশিষ্ট যোগাযোগ-বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আরেফিন বলেন, বঙ্গবন্ধু তাঁর রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে বঙ্গমাতা কিভাবে তাঁকে এই বইগুলো লিখতে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন- তা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর- বঙ্গমাতাই প্রথম বীরাঙ্গনাদের (বাংলাদেশের যেসব নারী মুক্তিযুদ্ধের সময়ে দখলদার পাকিস্তানী ও তাদের এ দেশীয় সহযোগীদের দ্বারা বর্বরোচিতভাবে নির্যাতিত হয়েছিলেন) পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বেগম মুজিবের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাসভবনে নির্যাতিত এই নারীদের পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হয়।

তিনি বলেন, বঙ্গমাতা সমাজের কিছু বিচ্ছিন্ন নারীকে নিয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাসভবনে একটি বৈঠক করেন। সে বৈঠকে কিভাবে এই নারীদের পুনর্বাসনে সরকার ও বঙ্গবন্ধুর সহযোগিতা করা যায়- সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।

বঙ্গমাতার সহনশীলতা ও ধৈর্যের উদাহরণ দিয়ে অধ্যাপক আরেফিন বলেন, ১৯৪৬ সালে কলকাতা হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময় বঙ্গবন্ধু ছিলেন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের ছাত্রনেতা এবং তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে দাঙ্গা প্রশমনে কাজ করছিলেন। কিন্তু বেগম মুজিব তখন সন্তান-সম্ভবা এবং অসুস্থ। বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জ যাওয়ার কথা ভাবছিলেন। বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে একটি চিঠি লিখে উল্লেখ করেছিলেন যে ‘এখন তোমার একটা বড় দায়িত্ব আছে। সমাজে তোমাকে প্রয়োজন। সমাজ তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। তোমার এখন সমাজের জন্য কাজ করা উচিত। আমাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হবে না। আমি আমার বিষয়গুলো সামলাতে পারবো।’

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বিষয়টি সোহরাওয়ার্দীকে বলেন। তখন সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ‘আপনি একজন ভাগ্যবান ব্যক্তি। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাকে আপনার জীবনে উপহার দিয়েছেন।’

তিনি উল্লেখ করেন, ‘একজন রাজনীতিকের স্ত্রী সম্পর্কে আরেকজন রাজনীতিকের এই মন্তব্য থেকে আমরা বেগম মুজিব কতটা সহনশীল ও ধৈর্যশীল ছিলেন এবং মানুষের জন্য তার হৃদয়ে কতটা ভালোবাসা ছিল তা বুঝতে পারি। তিনি সবসময় তার স্বামীকে, এমনকি যখন তাকে তার পাশে প্রয়োজন ছিল তখনও তিনি তাকে সমাজের জন্য কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।’

বাংলা একাডেমির সভাপতি প্রফেসর রফিকুল ইসলাম বলেন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধসহ এই মাটির প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বঙ্গমাতার অত্যন্ত জোরালো অবদান ছিল। কেননা, তিনি সবসময় বঙ্গবন্ধুকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিতেন।
উদাহরণস্বরূপ, ঐতিহাসিক ৭ মার্চের  ভাষণের আগে বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে কী বলবেন তা নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয় এবং সেই সময় বঙ্গমাতা সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এবং অন্যরা বঙ্গবন্ধুকে বিভিন্ন পরামর্শ ও মতামত দিলেন। কিন্তু বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে বললেন, ‘তুমি সারা জীবন মানুষের জন্য লড়াই করেছ। কী বলতে হবে তা তুমি ভালো জানো। তোমার হৃদয়ে যা আছে তা-ই বলো।’  বঙ্গবন্ধু ঠিক তা-ই করেছিলেন আর এখন এটি বিশ্বের অন্যতম সেরা ভাষণ।

বঙ্গমাতার দূরদর্শিতার উদাহরণ দিয়ে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও গবেষক প্রফেসর ইসলাম বলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যখন বঙ্গবন্ধু এবং অন্য ৩৪ জনকে গ্রেফতার করা হলো, তখন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব দেন। কিন্তু বঙ্গমাতা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

তিনি বলেন, ‘বঙ্গমাতা এ প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন কারণ তিনি প্যারোলে মুক্তির মাধ্যমে জাতির জন্য বঙ্গবন্ধুর বিশাল ত্যাগ বিনষ্ট করতে চাননি। বঙ্গবন্ধু প্যারোলে মুক্তি না চাওয়ায় পাকিস্তানি শাসকরা তাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।’

তার মন্তব্যের পরিপূরক হিসেবে অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক বলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় প্যারোলে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার বঙ্গমাতার সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তির জন্য তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে গোলটেবিল আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বঙ্গমাতা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত পাকিস্তানি শাসকদের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুকে নিঃশির্ত মুক্তি দিতে বাধ্য করে এবং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথও পাল্টে দেয়। সূত্র: বাসস