একটি স্বপ্নের সমাপ্তি!

প্রকাশিত: ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ , জুন ১৪, ২০২০

সুখে-শান্তিতেই থাকতে চেয়েছিলেন মেয়েটি। ঘরও বেঁধেছিলেন। ঘর আলোকিত করে ফুটফুটে এক কন্যা সন্তানেরও আগমন হয়। শান্তি-স্বস্থিতেই কাটতে থাকে শারমিনের দিনগুলো। তার স্বপ্ন ছিলো বাকি দিনগুলো এভাবেই পার করার।

কিন্তু শান্তির সুবাতাস উল্টো দিকে বইতে শুরু করলে জীবন কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে শারমিন নীরবে নিভৃতে তা আমাদের দেখিয়ে দিলেন। মাঝে মাঝে এমন হয় যখন যাপিত জীবনের সরলরেখার মতো আলোক রশ্মি উৎস থেকে এঁকেবেকে এক পর্যায়ে অন্ধকার কানা গলিতে গিয়ে থিতু হয়? শারমিনের ক্ষেত্রে সেটা হয়েছিলো।

গল্পটি শোনার জন্য শরণাপন্না হলাম ডিএমপির একজন উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার কাছে। অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি-দক্ষিনখান জোন) হাফিজুর রহমান জানান, রাজধানীর উত্তরখানের সিদ্ধিরটেক এলাকার হাজী মাহাতবের ভাড়া বাড়িতে পাশাপাশি রুমে চারটি পরিবার ভাড়া থাকেন। বাবা মা আর একমাত্র শিশু কন্যা কুলসুমকে নিয়ে ওখানে বসবাস করতেন তিনি। চাকরি করতেন স্থানীয় একটি মাস্ক তৈরীর কারখানায়।

জুন মাসের ০৮ তারিখ, শনিবার সকাল। রাজধানীর দক্ষিনখানের বৈকাল রোডের নির্জন জায়গায় অজ্ঞাত পরিচয় এক তরুনীর মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন এলাকাবাসী। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌছে মরদেহ উদ্ধার করে।

মরদেহ উদ্ধার করার পরে প্রথমই যে কাজটি করতে হয় তা হলো মৃতের পরিচয় বের করা। পরিচয় বের করতে পারলে ঘটনার সাথে জড়িতদেরও খুঁজে বের করার পথ খুলে যায়। উত্তরা ডিভিশনও মেয়েটির পরিচয় বের করতে তৎপর হলো।

খবর দেওয়া হয় সিআইডির ক্রাইম সিনকে। সুরতহাল সম্পন্ন করে লাশ পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলের মর্গে। বিকেলেই উত্তরা বিভাগের ডিসি নাবিদ কামাল শৈবাল মহোদয়ের পরামর্শে পিবিআইর মাধ্যমেও আঙুলের ছাপ নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

অবশেষে লাশের পরিচয় মেলে। মেয়েটির বাবা খবর পেয়ে মর্গে যান এবং মেয়ের লাশ সনাক্ত করেন।

পুলিশ এবার হত্যাকারীদের ধরতে এ্যাকশনে নামেন।
রাত-দিন পরিশ্রম করে ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে জামালপুরের বকশিগঞ্জ থেকে ফুরকান ও উত্তরখানের বিভিন্ন জায়গা থেকে মাসুদ, সাইফুল ও আনোয়ার নামের চারজনকে গ্রেফতার করা হয়।

দক্ষিনখান জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার হাফিজুর রহমান আরো জানান দু’জন আসামী ইতোমধ্যে ঘটনার সাথে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দিয়েছেন।

শ্যামল বরণ মেয়েটির শ্যামল ঘেরা কুটিরে শত স্বপ্নের আনাগোনা থাকা স্বত্ত্বেও জীবনের মধুমাসের কুসুম ছিঁড়ে কোন এক গাঁয়ের বধূর যে গান হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গেয়েছিলেন, সেই মেয়েটির কাহিনী ছিল শিশিরে ভেজা কিন্তু শারমিন নামের মেয়েটির যে উপাখ্যান এতক্ষণ পড়লেন তা শিশিরে নয়, ছিলো রক্তে ভেজা। অথবা সারারাত বৃষ্টিতে ভিজে হিম হয়ে যাওয়া একটা পরিচয়হীন লাশের গল্পই আজ শারমিনের গল্প।

পুলিশ জানিয়েছেন আটক ফুরকান শারমিনের পূর্বপরিচিত ও তার পাশের বাসায় ভাড়া থাকতেন। ফুরকানের সহকর্মী মাসুদ একজন মারাত্মক অপরাধী। এদের সাথে যুক্ত হন আরো দুজন–আনোয়ার ও সাইফুল।

আসামীদের স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে ডিএমপির উত্তরা বিভাগের এই কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তার আসামীরা শারমিনকে কৌশলে বাসা থেকে সন্ধ্যার পরে গেটের বাইরে নিয়ে আসেন। পরে তাকে জিম্মি করে দক্ষিনখানের বৈকাল রোডের নির্জন জায়গায় নিয়ে যান এবং রাতের অন্ধকারে শারমিনকে পাশবিক নির্যাতন করেন। শারমিন এই ঘটনা সবাইকে বলে দেওয়ার হুমকি দিলে আসামীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।

পুলিশ জানান মাসুদের হুকুমে এক পর্যায়ে ফুরকান শারমিনের হাত, মুখ চেপে ধরেন এবং সাইফুল ও আনোয়ার শক্ত করে ধরেন পা দু’টো। পরে কোমর থেকে ধারালো চাপাতি চালিয়ে দেন শারমিনের গলায়। রক্ত যাতে ছিটকে না পড়ে সেজন্য সালোয়ার দিয়ে গলার ক্ষতস্থানে বেশ কয়েকটি প্যাঁচ দেন। আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে আসে শারমিনের দেহ। চাপাতির আঘাতে শারমিনের নতুন করে বাঁচতে চাওয়ার স্বপ্ন, মেয়ে কুলসুমের হাসিভরা মুখ–সবকিছুই উড়ে যায় নিমিষেই।

প্রায় প্রতিটি অপরাধের মাস্টারমাইন্ডরা টিকই ধরা পড়ছে পুলিশের জালে। শারমিনের ঘটনায়ও অল্প সময়ে অভিযুক্তরা গ্রেফতার হয়েছেন। আশা করা যায় এদের সর্বোচ্চ শাস্তিও হবে। এই হত্যা মামলার তদন্ত শেষে হয়তো আরো তথ্য আপনাদের জানাতে পারবো। আপাতত এখানেই শেষ করতে চাই।

তবে একটি কথা। পুলিশ অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারে অভ্যস্ত হলেও এসব ঘটনা পুলিশকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। পুলিশ শারমিনদের মরদেহ উদ্ধার নয়, হাসি-গানে মুখরা কর্মচাঞ্চল্য শারমিনদের দেখতেই বেশি ভালোবাসেন।

এই যে একটা বাচ্চা মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হলো তার মানে তো একটা স্বপ্নকেও শেষ করে দেওয়া হলো স্বপ্নগুলো ডানা মেলার আগেই। এমন স্বপ্নের সমাপ্তি কাম্য নয়। আমরা চাই নিরাপদে বেঁচে থাকুক আমাদের শারমিনরা, আমাদের কন্যারা, আমাদের স্বপ্নেরা।

আপনার বিপদে ডিএমপি আপনার পাশে রয়েছে। ডিএমপি