নিউইয়র্ক প্রবাসী প্রমোদ রঞ্জন সরকার এর অসাধারণ লিখা ‘বরান্তরের বান্নি’

সুস্থির সরকার সুস্থির সরকার

বিভাগীয় প্রধান ময়মনসিংহ

প্রকাশিত: ১২:৩২ অপরাহ্ণ , এপ্রিল ২০, ২০২১

বরান্তর নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। এটি ধনু নদীর তীরে অবস্থিত। বিশাল বিশাল নদীর বাঁক সোজা করতে গিয়ে নতুন নদী খনন করার ফলে বর্তমানে মরা ধনু নদীর তীরে গ্রামের অবস্থান। প্রতি বছর চৈত্র মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে এখানে বারুণী মেলা ( বান্নি) বা অষ্টমী মেলা/ অষ্টমী স্নান হয়ে আসছে। এই বান্নি কখন থেকে শুরু হয়েছে তার কোন দিন তারিখ জানা নেই। কেউ এই বান্নি মেলার উৎপত্তি সম্পর্কে সঠিক ভাবে বলতে পারে না। সম্ভবত বারুণী স্নান থেকেই এই মেলার উৎপত্তি। তা কমপক্ষে আনুমানিক এই মেলার বয়স দেড়শত বছর বা আরো বেশী হবে । কারণ আমি নিজেই 57/58 বছর যাবত এই মেলাটি দেখছি। প্রতি বছর বাসন্তী পূজার অষ্টমী তিথিতে চৈত্র মাসে অষ্টমী স্নান উপলক্ষে এই মেলা হলে ও এবার তিথির কারণে আজ 20 শে এপ্রিল 06 ই বৈশাখ 1428 বঙ্গাব্দে এই অষ্টমী স্নান ও মেলা হচ্ছে । বরান্তরের এই বান্নি নিয়ে রয়েছে আমার কতো আনন্দঘন মধুর স্মৃতি। তাই এই বান্নি নিয়ে আমার দেখা ও স্মৃতি থেকে সামান্য কিছু লেখার প্রয়াস। মূল লেখায় যাওয়ার আগেই বারুণী সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করছি।

বারুণীঃ- বরুনাণী এবং এক জলদেবীর নাম বারুণী । বারুণী অর্থ বরুণের স্ত্রী কন্যা,বরুণের পূজা বা জলদেবতা গঙ্গা পূজা সংক্রান্ত। জলের দেবতা বরুণ। বরুণ থেকেই বারুণী শব্দের উৎপত্তি। আবার মেঘের দেবতা ও বরুণ- বারুণী স্নানের মেলা হিসাবে রূপ গ্রহণ করে। আবার বারুণী থেকে এর নাম হয়েছে বান্নি। বরুণ এক প্রকার জলজ উদ্ভিদ ও। দেবতার নামে বৃক্ষ তাই ব্রাহ্মণ ব্যতীত হিন্দু সম্প্রদায় এই গাছ লাকড়ি হিসাবে ব্যবহার করে না। বরুণ গাছ হিন্দুদের শ্রাদ্ধাদি ও অন্যান্য মাঙ্গলিক কাজে শুধুমাত্র ব্যবহার হয়। বরুণানী হলেন এক হিন্দু পৌরাণিক দেবী। দেবতা বরুণ তাঁর পতি। হিমালয় কন্যা গঙ্গার অপর নাম ও বারুণী। তাই বারুণী স্নান গঙ্গা স্নানের প্রতিরূপ। স্কন্দপুরাণ ও অন্যান্য পুরাণে বরুণের আরো অধিক বিশদ ব্যাখ্যা আছে।
অনেক বান্নি মেলার প্রাচীনত্ব হাজার বছরের ও বেশী। বান্নির উৎপত্তি হয়েছে মূলতঃ গ্রামীণ সংস্কৃতি থেকে। নানা ধরণের ধর্মীয় কৃত্য অনুষ্ঠান ও উৎসবের সুত্র ধরেই বান্নির উৎপত্তি হয়েছে। শাস্ত্র মতে কোন বছর অষ্টমী স্নানটি যদি বুধবারে হয় তবে ঐ বারুণী স্নান অসাধারণত্ব লাভ করে মহা বারুণী স্নান রূপ লাভ করে। যাকে বলে বুধা অষ্টমী। অষ্টমী স্নান মুলত হিন্দু ধর্মীয় একটি পুণ্য স্নান উৎসব। পাপাচারে পূর্ণ ক্লেদাক্ত মনুষ্যকুল এই স্নানের মাধ্যমে পাপ মুক্ত হয় বলে লোকায়ত বিশ্বাস প্রচলিত আছে। গঙ্গা হলো পূণ্যদায়িনী। আবার চৈত্র মাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে শতভিষা নক্ষত্র যোগ হলে সেই তিথি বারুণী নামে পরিচিত হয়। দেবের কন্যা বারুণী দেবী। আমাদের এ অঞ্চলে বরান্তর,মোহনগঞ্জের নাগড়রা বিল ও ময়মনসিংহে ব্রম্মপুত্র নদে অষ্টমী স্নান হয়। গৌরিপুরের কালীপুরের জমিদার সুরেন্দ্র কুমার লাহিড়ী চৌধুরী নাগড়রা বিল সহ অষ্টমী স্নানের জন্য বেশ কয়েক একর জমি দান করেন বলে জানা যায়।
শৈশব মধুর স্মৃতিতে বরান্তরের বান্নিঃ- বরান্তর অষ্টমী মেলার 15/20 দিন আগে থেকেই আমার বয়সীদের দিন গননা শুরু হয়ে যেতো। যেনো আর তর সয় না। অষ্টমীকে ঘিরে এর কয়েক দিন আগে থেকেই সাজ সাজ রব শুরু হয়ে যেতো। সেই সময়ে ছিল বোর শাইল ( টেপি) ধান। তাই চৈত্র মাসের 8/10 তারিখেই দাওয়া লেগে যেত। আমরা মেলার দিন এক দুপুর ধান মাড়াই করে দুপুরের পর বাবা আমাদের সব ভাই বোনকে নিয়ে মেলায় রওয়ানা হতেন। তবে প্রথম কত বছর বয়সে মেলায় গেছি তা আজ আর মনে করতে পারছি না। আমার ঠাকুর দুদু ও মা বাড়ির গরুর রাখাল সহ আমাদের সবাইকে দুই থেকে পাঁচ টাকা করে দিতেন। এই টাকা তখন অনেক। চার থেকে আট আনা দিয়ে তখন একটি বাঁশের বাঁশি,দুই আনায় হাত ঘড়ি, চার আনায় রঙিন চশমা, এক দুই টাকার মধ্যেই যা যা কেনা দরকার তা সব হয়ে যেতো।
আমরা যখন মেলায় রওয়ানা হয়েছি তখন মধ্য দুপুর। চারিদিকে চিক চিক করছে রোদ্দুর। কেউ কেউ বান্নি করে ফিরে আসছে। আমার বয়সীদের হাতে ঘড়ি,চোখে রঙিন চশমা,বাঁশির শব্দ,বেলুন বাঁশি,পাতা বাঁশি,কেচকেইচ্চ্যা বাঁশি,টমটম গাড়ীর শব্দ,খেলনা ঢোল বাজানোর শব্দ শুনতে শুনতে মেলার দিকে যাত্রা। চারিদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু মানুষ আর মানুষ। বানের পানির মতো মেলার দিকে মানুষ আসছে তো শুধু আসছেই। এই জন স্রোতের যেন শেষ নেই। সব পথ এসে মেলায় এক বিন্দুতে মিলেছে। শিশু কিশোর যুবক যুবতী আবাল বৃদ্ধ বনিতা হিন্দু মুসলিম কে নেই এখানে যেন মানুষের মিলন মেলা। বরান্তরের খাঁ বাড়ির দক্ষিণে ছিল একটি বড় খেলার মাঠ। এর দক্ষিণ পাশে নদীর পাড়ে ছিল একটি বিশাল বট গাছ ( নদী গর্ভে বিলীন)। শত শত তীর্থ যাত্রী প্রচন্ড গরমে এর ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছে। আবার যাত্রীদের একটা বড় অংশ তথা শত শত সহস্র মানুষ সুরেন্দ্র পাল চৌধুরী ও শিবপাল চৌধুরী ভাতৃদ্বয়ের পুকুরের চার পাড়ে আম বাগান ও অন্যান্য বৃক্ষের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছে। সে দৃশ্য আজো চোখে ভাসে।
মেলায় স্হানীয়রা তাদের কৃষি পন্য খিড়া মিষ্টি আলু,তরমুজ বাঙ্গি সহ নৌকা ভর্তি করে এসব পন্য মেলায় নিয়ে যাচ্ছে। দুই চারবার আমরা ও নৌকা ভর্তি করে মিষ্টি আলু নিয়ে গেছি। প্রচন্ড গরমে খিড়া তরমুজের ভাল দাম থাকতো। বরান্তর বাজারের পূর্ব পাশে ধনু নদীর উত্তর পাড়ে পূর্ব পশ্চিমে অনেকটা জায়গা জুড়ে মেলা বসতো। মেলায় কি পাওয়া যেত সে প্রশ্ন না করে মেলায় কি পাওয়া যায় না সে প্রশ্ন করা যেতে পারে। গরমে কেউ খাচ্ছে খিড়া তরমুজ,কেউ হাওয়ার মিঠাই,কেউ তুতমার শরবত কেউ ডাবের পানি কেউ দই চিড়া। গৃহস্থালি সামগ্রী সহ কত কিছু মেলায় পাওয়া যায় তার ইয়ত্তা নেই। কৃষির সামগ্রী দা,বটি, কাচি,দাইরা,লোহা লক্কর,কুড়াল খুন্তি,ছেনি কোদাল, মাটির হাড়ি পাতিল কলসী,কলকি,আইল্ল্যা ঠুলি মুচি, থালা বাসন,দেব দেবীর মূর্তি,মাটির পুতুল,প্লাস্টিকের বড় বড় পুতুল,মাটির পালকি,ষাড়,ঘোড়া,মাটির ব্যাংক, পিতলের হাড়ি,বাসন কোসন,পূজার সামগ্রী,রঙিন কাগজের ফুল,গরুুর গলার ঘুঙুর,কুটির শিল্প জাত পণ্য,বাঁশের খলই,ঢোল,মাটি ও বেতের তৈরি শিল্প,বাঁশ ও তালের পাখা,বাঁশি,ভেপু,তেলেঙ্গা গুড্ডি সহ কয়েক প্রকারের ঘুড্ডি,লাটিম,মার্বেল,একতারা,দোতারা, ঢোলক,ডুগডুগি,রঙিন বেলুন,চরকি,বাঁশের তৈরি পাখি, কাচের চুরি,ফিতা,ঝিনুকের মালা,ঝিনুকের অলংকার, রুপা তামা পিতলের গহনা,পিড়ি জলচৌকি,কাপড় চোপড়,পাটি,মাদুর,মিষ্টি,মিটাই,জিলাপী,চিনির তৈরি খেলনা,পাখি দেবদেবীর আকৃতি সহ বিভিন্ন খেলনা,কদমা বাতাসা,বিন্নি ধানের খৈ,শাপলা ঢেপের খৈ,দই চিড়া,উকরা,টমটম,চশমা,ঘড়ি,মুখ বাঁশি,বেলুন বাঁশি,হারমোনি বাঁশি,ঝনঝইন্যা,হুইশেল বাঁশি,ফুটবল, সাবান সিদুর,কসমেটিক্স,ভাগালুর পিয়াজ রসুন ডাল তেতুল আরো কত কিছু। কেনা ঘড়ি বাড়ি আসার সময় কখন হাত থেকে খুলে পড়ে গেছে টের ও পাইনি। বান্নির মাল দোকানীরা খুব কম দামে কেনে। এতে কয়েক গুন বেশী লাভ হয়। সামান্য খেলনা সামগ্রী,ঘুড়ি,মাটির ষাঁড় ইত্যাদি পেয়ে যে আনন্দ পেয়েছি এখন বিশ্বের সেরা নগরী নিউইয়র্কে বসে অনেক দামী জিনিস কিনে ও সে আনন্দ পাই না। আসলে আমাদের সে সময়টা ছিল একেবারে অন্যরকম। একটা নির্ভেজাল সমাজে আমাদের জন্ম ও বেড়ে ওটা। তাই সামান্যতেই ছিল আমাদের আনন্দ ।
তখন ভাল সাবানের মধ্যে ছিল তিব্বত রেক্সোনা ইত্যাদি। সাবান সিদূর গ্রামের হিন্দু মহিলারা একে অপরকে উপহার দিতেন। সারা বছর রসগোল্লা না খেলে ও মেলার দিন রসগোল্লা,চিনির খেলনা,উখরা আনা হতো। সন্ধ্যার পর বাড়ির কাজের মানুষ সহ সবাইকে ভাগ করে দেওয়া হতো। বান্নির মেলায় থাকতো বাইস্কোপ আর জুয়া খেলা। সন্ধ্যার পর গ্রামের জুয়াড়িরা আবার মেলায় যেতো। 1970 সাল ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি। শালদীঘা হাইস্কুল সংলগ্ন বাড়ির দাগু সরকার নামে আমাদের একজন কাজের লোক ছিল। তাকে আমরা মামা ডাকতাম। মেলায় গেছি বাবা কিছু একটা কেনার জন্য আমাকে পাঠিয়েছেন। গিয়ে দেখি দাগু মামা চকড়িতে জুয়া খেলছে। আমাকে দেখে বলছে ভাগ্নে দান ধরো। আমি ইতস্তত করছি। এদিকে আমার দেরী দেখে বাবা আমাকে খুঁজতে বের হয়েছেন। হঠাৎ পিঠে ধপাশ ধপাশ ছাতার বারি। মানুষ জন বলছে আরে ভাই এসব কি করছেন ছেলেটাকে কেন মারছেন। সেবার মার খেয়ে মেলার আনন্দ শেষ বাড়ি চলে আসি। বাবা ছিলেন কড়া মানুষ ভয়ে আছি মেলা থেকে ফিরে এসে আবার কখন ডাকেন। আমাকে ডাকলেন না দাগু মামাকে ডেকে তিরস্কার করলেন। আজ সবেই স্মৃতি। আপনজন সহ গ্রামের কত পরিচিত মুখ পরপারে চলে গেছে।
আমাদের এলাকার নারী পুরুষ সহ খুব বেশী মানুষ অষ্টমী স্নান করতো না। কথায় আছে না গাঁয়ের গরু গায়ে ঘাস খায় না। দূর দূরান্তের মহিলারা অষ্টমী স্নান করতে আসতো। আমাদের অঞ্চলে সব চেয়ে বড় অষ্টমী স্নান ব্রম্মপুত্র স্নান। যখন ময়মনসিংহ মোহনগঞ্জ রেললাইন চালু হয় নাই তখন মানুষ হেঁটে যেতো। আমার ঠাকুর দুদু ও বাবার কাছে শোনেছি। ফেরার পথে হাজার হাজার তীর্থ যাত্রী গৌরিপুরের রাজ বাড়িতে অতিথিশালায় কাটাতো। গৌরিপুরের জমিদার সবাইকে অতিথি সেবা হিসাবে খাবারের ব্যবস্থা করতেন। বরান্তরের অষ্টমী মেলাটি টিকে থাকুক অনন্তকাল। দিন দিন এর কলেবর বৃদ্ধি পেয়ে এটি বাঙ্গালি কৃষ্টি সংস্কৃতির মিলন মেলায় পরিণত হোক। সেই আশাবাদ ব্যক্ত করছি। সবাই কে বান্নির শুভেচ্ছা।
প্রমোদ রঞ্জন সরকার
নিউইয়র্ক/ এপ্রিল/20/21।