নানা সংকটে বিলুপ্ত ত্রিশালের সবক’টি সিনেমা হল

ময়মনসিংহ

প্রকাশিত: ১:৩৩ অপরাহ্ণ , মার্চ ৪, ২০২১

মেহেদি জামান লিজনঃঃ বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে একসময় সিনেমা হলের জনপ্রিয়তা ছিল। কালের বিবর্তনে টেলিভিশন, মোবাইল, কম্পিউটার আসায় সিনেমা হলের গুরুত্ব কমছে। তবে সিনেমা হলে পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবি দেখার যে তৃপ্তি তা অন্য কোন মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব না।

ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলায় এক সময় ছিল চারটি সিনেমা হল। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় দুইটি সিনেমা হলের একটি গুলশান সিনেমা হল আরেকটি নূপুর সিনেমা হল।

এ দুইটি সিনেমা হলই এক সময় ত্রিশালের মানুষের হৃদয়ে ঝংকার তুলতো। এখন সেই সিনেমা হলের একটিও আর নেই। সেখানে নির্মিত হয়েছে অট্টালিকা কিংবা পরিত্যক্ত বিল্ডিং। ২০০২ সালের দিকে দেশব্যাপী সিনেমা হলে বোমা হামলা হলে মূলত সিনেমা হলগুলো দর্শক সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেতে থাকে। এছাড়া মাঝখানে অশ্লীল ছবির বেপরোয়া নির্মান ও প্রদর্শনে মানুষের মাঝে এক ধরনের হল বিমুখতা দেখা দেয়। দেশে ভালো ছবি নির্মাণ না হওয়ায়ও সিনেমা হলে দর্শক খরা শুরু হয়। দর্শক সংখ্যা কমে যাওয়ায় ছবির ব্যয় ওঠানোই হল মালিকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে গুলশান ও নূপুর সিনেমা হলের মালিক সহ অন্যরা এ ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন।

সিনেমা হলের ব্যবসা ছেড়ে দেয়া মালিকরা জানান, ‘সিনেমা হলের ব্যবসা করে ঠিকমতো কর্মচারীদের বেতন দেয়াই কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাছাড়া দর্শক চাহিদা কমে যাওয়ার ফলে হল বন্ধ করে দিতে আমরা বাধ্য হই। সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ত্রিশাল উপজেলা সদরের বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন গুলশান সিনেমা হল এখন গোডাউন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দরগা মহল্লা রোড সংলগ্ন নূপুর সিনেমা হলের জায়গাও এখন খালি পরে রয়েছে। অথচ এক সময় বাংলা ছবি দেখতে এই হল দুটোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় থাকতো।

ত্রিশালের নূপুর সিনেমাহলের সাবেক কর্মচারী আশরাফুল ইসলাম জানান, ‘ভয় আর লোকসান দিয়ে কোনোভাবেই সিনেমা হলের ব্যবসা চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। তাই বাধ্য হয়েই মালিক পক্ষ সিনেমা হলের ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। আমরাও অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছি।

ত্রিশালের সাবেক গুলশান হল সংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দা কামরুল হাসান জানান , ‘হলের ব্যবসা করে তেমন লাভ হয় না। দর্শকরাও আগের মতো সিনেমা হলমুখী নয়। এর চেয়ে মালিকরা অন্য কাজ করে বেশি বেনিফিট পাচ্ছে।

ত্রিশালের সিনেমা হলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে স্থানীয় নাট্যকার ডাঃ শহীদুল ইসলাম বলেন, দেশীয় ছবির পাশাপাশি এ প্রেক্ষাগৃহে ভারতীয় বাংলা, হিন্দি ছবি খুব চলতো। উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত ছবি খুব দেখত মানুষ। মর্নিং শোতে ইংরেজি ছবি ছাড়াও বিকেল ৩টা, সন্ধ্যা ৬টা ও রাত ৯টার শো-তে দর্শকরা টাকা দিয়েও টিকিট পেতেন না অনেক সময়। অতিরিক্ত চাহিদার কারণে টিকিট বিক্রি হতো ব্ল্যাকে। সেদিন আর ফিরবে না। তবে এখনও ইচ্ছা হয় লাইট হলে গিয়ে ছবি দেখতে।

সিনেমা হলে দর্শক বিমুখ হওয়া প্রসঙ্গে কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আকাশ চৌধুরী জানান, ১৫ থেকে ২০ বছর আগে প্রেক্ষাগৃহগুলো ছিলো দর্শকে ভরপুর। ওই সময় সাধারণ মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে সিনেমা হলে যেতেন ছবি দেখার জন্য। কিন্তু এখন আর তা দেখা যায় না। হলগুলোর অব্যবস্থাপনা আর ভেতরকার অপকর্মের কারণে সিনেমা হলে যাওয়াকে এখন নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। কেউ এটাকে এখন ভালো চোখে দেখে না। এ ছাড়া হলের আসন, পর্দা ও শব্দব্যবস্থাপনার বেহাল দশা তো আছেই।

কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তুহিন অবন্ত জানান, রুচিশীল সিনেমা তৈরি হলে অবশ্যই দর্শক সিনেমা হলে আসবে। যেমন- ‘মনপুরা’, ‘আগুনের পরশমনি’, ‘মনের মানুষ’ ছবিগুলো দেখার জন্য মানুষ সিনেমা হলে হুমরী খেয়ে পড়তো। তিনি মনে করছেন, সিনেমা হলগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে নির্মাতাদের ভালো ছবি নির্মাণ করতে হবে। সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা উচিত, যেন দর্শক আবার সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখার উৎসাহ পায়।

ত্রিশালের স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা জানান, সিনেমা হল বন্ধের কারণে ত্রিশাল এখন সিনেমা হল শূণ্য। দর্শকরা নির্মল আনন্দের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এ অবস্থায় তারা দাবি জানিয়েছেন ঢাকার পান্থপথের স্টার সিনেপ্লেক্সের আদলে ত্রিশালে সিনেপ্লেক্স নির্মাণের। সবার মতে, চলচ্চিত্রাঙ্গনের স্বার্থেই ত্রিশালে অন্তত একটি সিনেপ্লেক্স নির্মাণ করা উচিত।