আমাদের জঙ্গল জীবন...

জঙ্গলে ভাসমান রান্না বান্না… ভাসমান খাওয়া দাওয়া

প্রকাশিত: ১:৪৯ অপরাহ্ণ , মার্চ ১, ২০২১
চাকা চিংড়ি দিয়ে মজার একটা রান্না হয় আমাদের ট্রলারে। নাম ঘটি গরম। চিংড়ি মাছ ভালো করে ধুয়ে, মসলা-কাঁচা মরিচ-তেল-লবণ দিয়ে মাখিয়ে ছোট্ট হাঁড়ি বা মগে করে চুলার কয়লার ওপর বসিয়ে দেওয়া হয়।
এর আগে ভেজে ফেলা হয় টাটকা দাতিনা বা ভেটকি মাছ। আলু বেগুন দিয়ে তৈরি হয় মাছের ঝোল। বেলায়েত সরদারের হাতে বাটা মসলা দিয়ে জমে ওঠে রান্না। ওদিকে শুকনো মরিচ, পেঁয়াজ আর সরিষার তেল দিয়ে পলিন বানিয়ে ফেলে ঝাল ভর্তা। গরম ভাতের সঙ্গে ঝাল ভর্তা, মাছের ঝোল, চিংড়ির ঘটি গরম বা ভুনা, সঙ্গে কখনও পাতলা ডাল। জঙ্গলের ভেতর নদী-খালে ভাসতে ভাসতে এই আমাদের এক বেলার খাবার। কখনও তাড়িয়াল মাছ, কখনও বাগদা চিংড়ি, কখনও গলদা চিংড়ি, কখনও জাবা মাছ বা পারসে মাছ ধরা পড়ে আমাদের জালে। মাঝে মাঝেই খাই সুন্দরবনের দুর্দান্ত স্বাদের কাকড়া।
সাধারণত গ্যাসের চুলায় রান্না হয় আমার ট্রলারে। তবে দস্যুদের ট্রলারে রান্নাবান্না হতো লাকড়ির চুলায়। জেলেদের রান্নাও চলে কম বেশী লাকড়ির চুলায়। মাঝে মাঝে মন চাইলে নেমে গেছি সুন্দরবনের ভেতরে। কোনো চরে চুলা বানিয়ে রান্না করেছি। ভরা জোয়ারে ভাসমান চুলার ওপরও রান্না হয় মাঝে মাঝে। (ভাসমান চুলা এক দারুণ বিষয়। বিস্তারিত ছবি তুলে একদিন লিখব)। কখনও সুযোগ পেলে মাছ বা মাংসের বারবিকিউ ও চলে।
কখনও খিচুরি রান্না হয়, কখনও সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হাস বা মুরগি রান্না হয়। ডিম থাকে রিজার্ভ খাবার হিসেবে। মাঝে মাঝে আবার খাবারের ঘাটতি হয়ে যায়। হয়তো ট্রলারে বাজার সদা ছিলো ১০ জনের। কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে লোকজন বেড়ে যায়। কখনও ২৫/৩০ জনের রান্নাও হয় আমাদের ট্রলারে। তো, খাবারের ক্রাইসিসেও পড়েছি। কখনও শুধু ঝাল ভর্তা দিয়েও দুই এক বেলা চালিয়ে নেই আমরা। তখন বলি, ও কুনো বিপার না! সুন্দরবনে চলতে জানলে অবশ্য খাবার বা মিঠা পানির অভাব হয় না শেষ পর্যন্ত। কিছু একটা ব্যবস্থা হয়েই যায়।
সুন্দরবনের জেলেরা ভাত খায় দুই বেলা। সকালে একবার। আবার সন্ধ্যা নামার আগে একবার। সারাদিনের কাজ, নৌকা বাওয়া, মাছ ধরাসহ হাজারো কাজ। তার মধ্যেই রান্না বান্না। তাই দুই বেলা খেতে পারলেই তাদের চলে।
সাধারণত সুন্দরবনের জেলেরা আমার কাছে মাছের দাম নিতে চায় না। কিছুতেই না। তাই মাছের বিনিময়ে ট্রলারে রাখা মুরগি বা হাঁস দেই তাদের। এভাবেই চলে জঙ্গল জীবন