শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ নিয়ে যত বিভ্রান্তি -অধ্যক্ষ মোঃ গোলাম মোস্তফা

প্রকাশিত: ১০:১৩ অপরাহ্ণ , ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২১

মানুষের মত প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরও একটি নাম দেয়া হয়। আর প্রতিষ্ঠানের এই নাম থেকে বোঝা যায় এটি কোন স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশ অনেক সময় যে নাম দেয়া হয়; তা দেখে বোঝার ক্ষমতা নাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি কোন স্তরের। যেমন- অতীত থেকে শুরু করে বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয়েছে “কলেজিয়েট স্কুল” বা ” কলেজিয়েট স্কুল এন্ড কলেজ।” এই প্রসঙ্গে বলা যায়, এই ধরনের নামকরণে প্রথমটি সঠিক দ্বিতীয়টি ভুল। অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুসারে collegiate (কলেজিয়েট) শব্দটির বাংলা অর্থ করা হয়,” কলেজ সম্বন্ধীয় বা কলেজ সাদৃশ্য বা কলেজের সাথে সংশ্লিষ্ট। ” এখন কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি তার স্কুল স্তরের সাথে কলেজ স্তর যুক্ত করতে চায় তখন এর নামকরণ “কলেজিয়েট স্কুল” বা “স্কুল এন্ড কলেজ” করলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু বাংলাদেশে দেখা যায়, কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলেজিয়েট স্কুল এন্ড কলেজ; এই নামকরণ করেছে এবং আমাদের সংশ্লিষ্ট বোর্ডগুলো এই নামেই উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে অনুমোদন দিয়েছে। অথচ উক্ত নামাকরণের ফলে কলেজ শব্দটি দুইবার ব্যবহার করা হয়েছে। আমাদের সমাজে ভুল করে এধরনের আরো অনেক শব্দ আমরা চয়ন করি। যেমন- রেইনট্রি গাছ, সোনার গোল্ড মেডেল ইত্যাদি। তবে যে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এধরনের ভুল নামকরণ অনাকাঙ্ক্ষিত অনভিপ্রেত ; যা সমাজে বহুল বার্তা দেয়। তা ছাড়া বাংলাদেশে এমন অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে যার নাম “”কলেজিয়েট স্কুল”, কিন্তু কলেজ শাখা যুক্ত নেই – শুধু দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়।

বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার চারটি স্তর রয়েছে ; প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা। প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম / অষ্টম পর্যন্ত প্রাথমিক স্তর, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তর, একাদশ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উচ্চ মাধ্যমিক স্তর এবং পারে উচ্চ শিক্ষা। এখন কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম/অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করে তা হলে প্রতিষ্ঠানটি হবে প্রাথমিক বিদ্যালয় (primary school) । আর কোনো প্রতিষ্ঠান দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করলে -তা হবে মাধ্যমিক বিদ্যালয় (Secondary School) । একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির যুক্ত থাকলে হবে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় (higher Secondary School) । ডিগ্রি/অর্নাস থেকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। অর্থাৎ দেখা যায় যে “উচ্চ” (higher) শব্দটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্তরের সাথে যুক্ত যেখানে একাদশ -দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ দেশে দেখা যায় যে সব প্রতিষ্ঠানে ৬ষ্ঠ-দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয় তার বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে উচ্চ বিদ্যালয় বা ইংরেজিতে হাইস্কুল। অথচ প্রতিষ্ঠানগুলোর নামকরণ করা উচিত ছিল সেকেন্ডারি স্কুল বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়।

আমরা যে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বোর্ড চুড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করি তার নাম- নবম-দশম শ্রেণির চূড়ান্ত পরীক্ষা এসএসসি (সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা ) এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির বোর্ড চুড়ান্ত পরীক্ষার নাম এইচএসসি ( হাইয়ার সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা)। এমনকি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম “মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ( Secondary And Higher Secondary Education Board). আজ আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এ ধরনের ভুল নামকরণের ফলে বিভ্রান্তিকর তথ্যে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের কাছে। ফলে শিক্ষা জীবন শেষ করেও এই ভুল নামকরণের বার্তা থেকে অনেকে বেড়িয়ে আসতে পারেছে না। অন্যদিকে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথেও শিক্ষার স্তর ও নাম মিল না থাকায় ভোগাতে হয় নানান জটিলতায়। কাজেই আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণের সময় শিক্ষা স্তরের সাথে মিল রেখে করা উচিত।

লেখক : অধ্যক্ষ
রাজুর বাজার কলেজিয়েট স্কুল।
নেত্রকোনা ১৭/০২/২০২১