ব্রেক্সিট: বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সম্পর্ক কেমন হবে?

প্রকাশিত: ৯:৪৮ পূর্বাহ্ণ , জানুয়ারি ৩, ২০২১

পয়লা জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেছে যুক্তরাজ্য৷ এর ফলে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক কেমন হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন রপ্তানিতে এখনই এর কোন প্রভাব পড়ছে না৷ তবে কিছু ক্ষেত্রে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে৷

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে জার্মানির পরই বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস যুক্তরাজ্য৷ ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশটিতে প্রায় সাড়ে তিনশো কোটি ডলারের পণ্য পাঠিয়েছে বাংলাদেশ যার সিংহভাগই তৈরি পোশাক৷ জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত রপ্তানিসুবিধা পেয়ে আসছে৷ ইইউ এর অধীন এই সুবিধা দিয়ে আসছিল যুক্তরাজ্যও৷ ব্রেক্সিট কার্যকর হলেও এর কোন পরিবর্তন হচ্ছে না৷ গত বছরই যুক্তরাজ্য সেটি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে৷ তবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে গেলে সেটি আর কার্যকর থাকবে না৷ সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে এ নিয়ে একটি গবেষণা হয়েছে৷ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন এক্ষেত্রে তিনটি প্রশ্ন রয়েছে৷ প্রথমত, ২০২৪ এর পর যুক্তরাজ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা বহাল রাখবে কিনা? দ্বিতীয়ত, ২০২৭-এর পর ইইউ’র একটা জিএসপি প্লাস সুবিধা আছে৷ সেটা বাংলাদেশ পাবে কিনা? তৃতীয়ত, ২০২৭-এর ইউকে জিএসপি প্লাস-এর মতো কোনো স্কিম করবে কিনা?
তার মতে, কমনওয়েলথ ভুক্ত দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে বাংলাদেশ এখন নতুনভাবে বাণিজ্য সুবিধা পেতে পারে৷ কমনওয়েলথ ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টের কথা হচ্ছে৷ একই সঙ্গে এইড সুবিধাও পেতে পারে বাংলাদেশ৷ তবে যুক্তরাজ্য ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইইউর মতো শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখার কথা বলেছে৷ কিন্তু পরের সুবিধাগুলোর ক্ষেত্রে পণ্য উৎপাদনে ‘রুলস অব অরিজিন’ কেমন হবে তা গুরুত্বপূর্ণ৷ এখন বাংলাদেশ আরেক দেশ থেকে কাঁচামাল এনে পোশাক বানালে সেই সুবিধা পায়৷ কিন্তু যুক্তরাজ্য সেই নীতির পরিবর্তন করলে বাংলাদেশের লাভ হবে না৷

এজন্য বাংলাদেশকে বাণিজ্যিক এবং কূটনৈতিক পর্যায়ে কাজ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি৷ বাণিজ্য, পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সমন্বয়ে এরইমধ্যে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে৷ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ২০২৪ সালের পরও শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে যুক্তরাজ্যকে এবং বিবেচনার আশ্বাস পাওয়া গেছে৷

বাংলাদেশ থেকে পণ্য রপ্তানিতে যুক্তরাজ্যের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়৷ ২০১৯ সালে দেশটিতে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ৩৪৫ কোটি ৩৯ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য৷ একই সময়ে আমদানি করেছে ৪১ কোটি ডলারের৷
শিল্প উদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকরা ব্রেক্সিট নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা আছে বলে মনে করেন না৷ বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ও এফবিসিসিআই এর সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘‘২০২৪ সালের পরও যুক্তরাজ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে৷ আর কমনওয়েলথভুক্ত দেশ হিসেবে আমরা নতুন সুবিধা পাওয়া জন্য কাজ করছি৷ দুই সরকারের মধ্যে আলোচনাও হচ্ছে৷’’ তার মতে, ‘‘এই করোনায় পোশাক শিল্পসহ আরো অনেক শিল্পের নতুন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে৷ সিরিয়াসনেস বেড়েছে৷ ২০২৪ সালের পর পরবর্তিত পরিস্থিতিতেও আমরা খাপ খাওয়াতে পারবো৷’’

তবে কূটনৈতিক যোগাযোগটা আরো ঘনিষ্ঠ হওয়া উচিত বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল শহীদুল হক৷ তিনি মনে করেন, ‘‘সেটা হলে আমরা যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে লাভবান হতে পারি৷ ইউরোপীয় ইউনিয়নে শুল্কমুক্ত সুবিধার পাশাপাশি ট্যারিফ নিয়ে কিছু জটিলতা আছে৷ যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে ওই সুবিধাটা আমরা পেতে পারি৷ কিন্তু এজন্য এখনই উদোগ নিতে হবে৷ আমাদের এখন নতুন একটি চ্যানেল খুলতে হবে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে৷ অনেক দেশই শুরু করেছে৷ কিন্তু বাংলাদেশ এখনো করছে বলে দৃশ্যমান হচ্ছে না৷’’

এই বিষয়ে বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বক্তব্যের জন্য কাউকে পাওয়া যায়নি৷

তবে বিশ্লেষকরা ব্রেক্সিটে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনাই দেখছেন৷ তবে সেটি কাজে লাগানোর মত দক্ষতা দেখাতে হবে বাংলাদেশকে৷ DW