এই অব্যবস্থাপনার দায় কার?

করোনায় অসহায় চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ১১:৫৫ অপরাহ্ণ , জুন ৪, ২০২০

রতন বড়ুয়া

দেশে প্রথম করোনা সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। যদিও এর আগে থেকেই করোনা মোকাবেলায় প্রস্তুতির কথা বলে আসছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। চট্টগ্রামে প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ৩ এপ্রিল। এর আগের কথা বাদ দিলেও প্রথম রোগী শনাক্তের পর এরই মধ্যে দুমাস পার করলো বন্দরনগরী। আর মার্চ মাসের শুরু থেকে হিসেব করলে তিনমাসের কম নয়। কিন্তু করোনা মোকাবেলায় এই সময়ে কতটা প্রস্তুতি বা কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে চট্টগ্রামে? চারপাশের মানুষের নিদারুণ অসহায়ত্ব দেখে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া খুব বেশি কষ্টকর নয়। হাসপাতালে অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর-আইসিইউ সাপোর্ট না পেয়ে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর খবর আসছে। এর বাইরে উপসর্গ থাকা রোগীর কথা বাদই দিলাম, করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে একটি শয্যা পেতে রোগীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কান্নাজড়িত আকুতি-ই জানিয়ে দেয় কোন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম। আক্রান্তদের চিকিৎসা সুবিধার বিষয়ে লেখার আগে প্রথমে রোগী শনাক্তের ব্যবস্থায় দৃষ্টি দেয়া যাক।
নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার ব্যবস্থা : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) শুরু থেকেই বলে আসছে- করোনাভাইরাসের সংক্রমন প্রতিরোধে সবচেয়ে যেটি বেশি জরুরি, তা হলো- নমুনা পরীক্ষা। এ জন্যই সংস্থাটির মহাপরিচালক বার বার বলেছিলেন- টেস্ট, টেস্ট এন্ড টেস্ট। পরবর্তীতে আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য প্রশাসনও একই বার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, প্রথম রোগী শনাক্তের দুমাস পরও সন্দেহজনক রোগীদের বা উপসর্গ থাকা ব্যক্তিদের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি চট্টগ্রামে। বুধবার (৩ জুন) পর্যন্ত চট্টগ্রামের মাত্র তিনটি হাসপাতালে সন্দেহজনক রোগীদের নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে। এই তিনটি হাসপাতালের মধ্যে রয়েছে- ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডি, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এখানে নমুনা নেয়া হয়। হাতে গোনা তিনটি কেন্দ্রে দিনে সর্বোচ্চ তিন-চার ঘন্টা নমুনা সংগ্রহ করায় সবখানেই মানুষের উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়ে। নির্দিষ্ট সময়জুড়ে প্রতিটি কেন্দ্রে কম হলেও দেড় থেকে দুশতাধিক মানুষের জটলা লেগেই থাকে। যেখানে শারীরিক বা সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার বিষয়টি অনেকটা কিতাবের বিষয়। এতে করে নমুনা সংগ্রহের এই তিনটি কেন্দ্রও ভাইরাস সংক্রমণের চরম ঝুঁকিপূর্ণ স্পট হিসেবে নতুন করে আবির্ভূত হয়েছে।
উপসর্গ রয়েছে তবে এখনো সংক্রমিত হননি, এমন কোন ব্যক্তি এসব কেন্দ্রে নমুনা দিতে গেলে নিশ্চিত ভাবে সেখান থেকেই তিনি সংক্রমিত হয়ে আসবেন বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা। অথচ, দফায়-দফায় প্রস্তুতির কথা বলা হলেও নমুনা সংগ্রহের জন্য অল্প কিছু সংখ্যক বুথও চট্টগ্রাম শহরে এখন পর্যন্ত প্রস্তুত করা যায়নি। যদিও মাস দেড়েক আগেই বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে বুথ স্থাপন করে নমুনা সংগ্রহের পরিসর বাড়ানো হয়েছে। ঢাকার দেখাদেখি চট্টগ্রামেও এ ধরণের বুথ স্থাপন কঠিন কিছু ছিলনা। যতটুক জানি, বেসরকারি একটি উন্নয়ন সংস্থারও মোটামুটি প্রস্তুতি ছিল। কেবল আন্তরিক উদ্যোগের অভাবেই সেটি সময়মতো হয়ে উঠেনি। এর দায়ভার স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনেরই। তাদেরই উদ্যোগ নিয়ে এ কাজে এগিয়ে আসার কথা। উদ্যোগ অবশ্য নেয়া হয়েছে, তবে সেটি বহু পরে। যার কারণে চট্টগ্রাম শহরে অদ্যবধি একটি বুথও নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু করতে পারেনি। আর নির্বিঘ্নে নমুনা দেয়ার সুযোগ না থাকায় উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ নমুনা দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এতে করে ভাইরাসটির সংক্রমন বিস্তারের ঝুঁকি আরো বহুলাংশে বাড়ছে।
এ-তো গেল, নমুনা সংগ্রহ ব্যবস্থার দৈন্যতা। নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা আরো নাজুক। ২৫ মার্চ ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডির ল্যাবের মাধ্যমে চট্টগ্রামে করোনার নমুনা পরীক্ষা কার্যক্রমের যাত্রা শুরু হয়। এর একমাসের মাথায় ২৫ এপ্রিল থেকে চালু হয় ভেটেরিনারি এন্ড অ্যানিমেল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবটি। গত ৯ মে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ল্যাবেও নমুনা পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। সবমিলিয়ে তিনটি ল্যাবে করোনার নমুনা পরীক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে চট্টগ্রামে। ল্যাবের সংখ্যা বাড়ায় নমুনা পরীক্ষার সংখ্যাও আনুপাতিক হারে কিছুটা বেড়েছে। প্রথম দিকে একটি ল্যাবে যেখানে সর্বোচ্চ দুইশোর মতো নমুনা পরীক্ষা সম্ভব হতো, সেখানে তিনটি ল্যাবে বর্তমানে পাঁচশো বা এর কিছু কম-বেশি নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে। সর্বশেষ গত সোমবার (১ জুন) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ল্যাবটি উদ্বোধন করা হয়েছে। আজ-কালের মধ্যে ওই ল্যাবেও নমুনা পরীক্ষা পুরোদমে চালু হতে পারে। নতুন একটি ল্যাব যুক্ত হওয়ায় এখন থেকে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা আরো কিছুটা বাড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। তবে ভাইরাসের সামাজিক সংক্রমন বিস্তার লাভ করায় এবং সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় নমুনা পরীক্ষার এই সংখ্যাও পর্যাপ্ত নয় চট্টগ্রামে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও নমুনা পরীক্ষার সাথে সংশ্লিষ্টরা বলছেন- চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতিতে দিনে কম হলেও দুই হাজার নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এক হাজার নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থাও করা যায়নি। দুই-তিন মাসেও নমুনা পরীক্ষার সুবিধা বাড়াতে না পারার পিছনেও রয়েছে যথাযথ উদ্যোগের অভাব। এ নিয়ে ছোট্ট একটি উদাহরণ পাঠকের সামনে তুলে ধরছি। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে করোনা নমুনা পরীক্ষার উপযোগী অন্তত পাঁচটি পিসিআর মেশিন থাকার তথ্য গণমাধ্যমের বরাতে কম-বেশি সকলের জানা। এর মধ্য থেকে একটি মেশিনে নমুনা পরীক্ষা কার্যক্রম চালু করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। হিসেবে আরো তিন/চারটি মেশিন থাকে। বিষয়টি গণমাধ্যমে বেশ কয়বার উঠে এসেছে। এর সুবাদে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়ে একটি পিসিআর মেশিন জামালপুরে হস্তান্তর করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। আর মেশিনটি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের মাধ্যমে। সে হিসেবে ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো কয়েকটি পিসিআর মেশিন থাকার বিষয়টি বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের না জানার কথা নয়। ভেটেরিনারির একটি মেশিন জামালপুরে পাঠানোর পরপরই চমেক ল্যাবে স্থাপন করা মেশিনটির ক্রুটি ধরা পড়ে। ফলে মেশিনটি পুনরায় ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। এতে করে চমেক ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা কার্যক্রম চালু করা নিয়ে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়। এমন পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিষ্টার বিপ্লব বড়ুয়া। তিনি ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মহোদয়কে ফোন করে একটি পিসিআর মেশিন চমেক ল্যাবে দিতে অনুরোধ জানান। ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়ার অনুরোধের প্রেক্ষিতে ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি পিসিআর মেশিন চমেক অধ্যক্ষের হাতে হস্তান্তর করেন। হস্তান্তরের পাশাপাশি নিজেদের প্রকৌশলী টিম দিয়ে দুদিনের মধ্যে মেশিনটি চমেক ল্যাবে স্থাপনও করে দেয় ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মধ্যে চমেক ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা কার্যক্রম চালু হয়। চট্টগ্রামের সন্তান হিসেবে আলাদা টান থেকেই ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া উদ্যোগী হয়ে হয়তো এগিয়ে এসেছেন। এখানেই প্রশ্ন, ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত পিসিআর মেশিন থাকার বিষয়টি জেনেও বিভাগীয় স্বাস্থ্য প্রশাসন কেন উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসেনি? চমেক ল্যাবের অনিশ্চয়তা দূরকরণে স্বাস্থ্য প্রশাসনেরই তো সবার আগে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন ছিল। ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়াকে কেন এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হলো। মোদ্দাকথা, টুকটাক সংকট নিরসনেও চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য প্রশাসনের নিজেদের তাড়নায় উল্লেখযোগ্য কোন ধরণের উদ্যোগ এ পর্যন্ত চোখে পড়েনি। কেবল কেন্দ্রের (ঢাকার) নির্দেশনার জন্য পথ চেয়ে থাকা ছাড়া। অথচ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বিসিএসআইআর (বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ) চট্টগ্রাম কার্যালয়সহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বেশ কিছু আরটিপিসিআর মেশিন রয়েছে। আর চমেক ল্যাব ও ভেটেরিনারি ল্যাবে আরো কয়েকটি মেশিন স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। তাছাড়া নগরীর নামি-দামি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বেশিরভাগেরই এ মেশিন রয়েছে। কেবল তাদের কাছ থেকে মেশিনগুলো চেয়ে নেয়ার উদ্যোগটাই ছিল জরুরি। আর জনবল নিশ্চিত করা। যেহেতু চট্টগ্রাম সিটিকর্পোরেশনে পর্যাপ্ত টেকনোলজিস্ট রয়েছে, সেহেতু এই জনবল ম্যানেজ করাও কঠিন কিছু নয়। এর বাইরে চবির শিক্ষার্থীরাও বিদ্যমান ল্যাবগুলোতে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করছেন। প্রয়োজনে চবি প্রশাসনের কাছেও আরো ভলান্টিয়ার চাওয়া যায়। তাছাড়া আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে সুরক্ষিত ল্যাবের পাশাপাশি পর্যাপ্ত টেকনোলজিস্টও রয়েছে। কেবল পিসিআর মেশিন নেই। বলতে গেলে সবকিছুই রয়েছে চট্টগ্রামে। হয়তো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। কিন্তু সবকিছু থাকার পরও কেবল উদ্যোগ ও সমন্বয়ের অভাবে চট্টগ্রামে বেশি সংখ্যক পিসিআর মেশিন স্থাপন করা যায়নি, যার কারণে পরীক্ষার সুবিধাও বাড়েনি।
পরীক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন- একটি পিসিআর মেশিনেও চাইলে দিনে সাড়ে তিনশ থেকে চারশো নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব। এর জন্য যেটা দরকার তা হলো- এক শিফটের পরিবর্তে একাধিক শিফটে নমুনা পরীক্ষা করা। শিফট বাড়াতে গেলে অবশ্য পর্যাপ্ত জনবলও (টেকনোলজিস্ট) নিশ্চিত করতে হবে। সেক্ষেত্রে কেবল জনবল বাড়িয়েও বিদ্যমান ল্যাবগুলোতে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো যায়। বিআইটিআইডি ল্যাবের ইনচার্জ ডা. শাকিল আহমেদ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. শামীম হাসান ও ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবের ইনচার্জ প্রফেসর ড. জুনায়েদ সিদ্দিকীর সাথে এ বিষয়ে কথা হয়। তাঁরা তিনজনই বলেছেন- শুধু জনবল বাড়ালেই ল্যাবগুলোতে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা দ্বিগুন করা সম্ভব। আর জনবল হিসেবে টেকনোলজিস্টের কথাই বলেছেন তাঁরা। অথচ, চট্টগ্রাম সিটির্কপোরেশনেও অন্তত ৪০ জন টেকনোলজিস্ট রয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিম আকতার চৌধুরী। তাছাড়া বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক টেকনোলজিস্ট রয়েছে। একজন নাগরিক হিসেবে যদি প্রশ্ন করি- এসব বিষয় সমন্বয় ও উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসার দায়িত্ব কার। অবধারিত ভাবে সবার আগে স্বাস্থ্য প্রশাসনের দিকেই আঙ্গুল উঠে। তাই বলা যায়- নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা ব্যবস্থায় চট্টগ্রামের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতির জন্য স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসন কোন ভাবেই তাঁর দায় এড়াতে পারে না।
চিকিৎসা ব্যবস্থা :
চট্টগ্রামের বেসরকারি ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল ও ইউএসটিসির বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতালকে কোভিড-১৯ (করোনা) ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গণমাধ্যমের বরাতে এরইমধ্যে বিষয়টি কম-বেশি হয়তো সকলেই অবগত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে চট্টগ্রাম জেলাপ্রশাসন ও জননিরাপত্তা বিভাগের চিঠির সূত্র উল্লেখ রয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়- বেসরকারি হাসপাতাল দুটিকে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণার জন্য চট্টগ্রাম জেলাপ্রশাসন ও জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে প্রস্তাবনা বা এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়। ২৪ মে প্রদত্ত চিঠির সূত্রে ২৬ মে এ দুটি হাসপাতালকে কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড ঘোষণা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। করোনা রোগীদের চিকিৎসায় এখন হাসপাতাল দুটি প্রস্তুতের তোড়জোড় চলছে। তবে এর একটিতে (ইউএসটিসির বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে) প্রাথমিক ভাবে সংক্রমিত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসা দেয়া হবে। আর অপরটি (ইম্পেরিয়াল) ফি’র বিনিময়ে করোনা রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদানের প্রস্তাবনা দিয়েছে বলে স্বাস্থ্য প্রশাসন সূত্রে আমরা জানতে পেরেছি। এরপরও হাসপাতাল দুটি চালু হলে অন্তত কিছু সংখ্যক করোনা রোগী চিকিৎসা সুবিধা পাবেন বলে আমরা আশাবাদী। এবার মূল কথায় আসি – মাস দুয়েক আগে থেকেই করোনা রোগীদের চিকিৎসায় চট্টগ্রামে হাসপাতাল প্রস্তুতে বিস্তর আলোচনার বিষয়টি আমরা সবাই জানি। সরকারি যে কয়টি হাসপাতাল আছে, সেগুলোতে দুই-আড়াইশ’র বেশি শয্যা সংস্থানের সুযোগ নেই, সেটাও কম-বেশি সবার জানা।
তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে করোনা রোগীদের চিকিৎসা সুবিধা বাড়াতে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে কিভাবে কাজে লাগানো যায়, সে আলোচনাই দরকার ছিল খুব বেশি। তাই কদিন আগে জেলা প্রশাসন ও জননিরাপত্তা বিভাগ কর্তৃক পাঠানো প্রস্তাবনার অনুরুপ কোন প্রস্তাবনা দেড়-দুই মাস আগে ঢাকায় পাঠানো ছিল সবচেয়ে জরুরি। সেটি হলে সব প্রক্রিয়া ও প্রস্তুতি শেষ করে অন্তত আরো একমাস আগে চট্টগ্রামের কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে করোনা রোগীর চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করা অসম্ভব ছিলনা। কিন্তু আমরা দেখলাম, তার উল্টো। সব কিছু রেডিমেড বা চালু থাকা বেসরকারি হাসপাতাল অধিগ্রহণের প্রস্তাবনার পথে না গিয়ে অচল পড়ে থাকা একটি হাসপাতালকে নতুন করে প্রস্তুতের সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। অথচ, চালুর পর সব খরচ ঠিকই সরকারের। জরুরি প্রশ্নটা এখানেই। সব খরচ যদি সরকারকে বহন করতে হয়, তবে সব সরঞ্জাম (ভেন্টিলেটর-আইসিইউসহ) রেডিমেড থাকা এবং চালু থাকা কোন হাসপাতালকে অধিগ্রহণ করার প্রস্তাবনা দেয়াই ছিল যুক্তিযুক্ত। তাতে অল্প সময়ে চিকিৎসা কার্যক্রম চালু করা সম্ভব। প্রয়োজনের গুরুত্ব অনুধাবন করে দেরিতে হলেও জেলাপ্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী যা করলো। তবে দেড়-দুই মাস আগে এমন প্রস্তাবনা দেয়ার দায়িত্ব ছিল চট্টগ্রামের স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের। কিন্তু স্বাস্থ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা এমন কোন উদ্যোগ দেখিনি। বরং মিথ্যে প্রস্তুতির কথা বলে চট্টগ্রামবাসীকে আজ এমন দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে ঠেলে দেয়া হয়েছে।
অপ্রিয় হলেও সত্য যে, বিভাগীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারাই সবখানে বলে বেড়িয়েছেন চট্টগ্রাম প্রস্তুত। রেলওয়ে হাসপাতাল প্রস্তুত, বিআইটিআইডির ১০০/৫০ শয্যা প্রস্তুত। জেনারেল হাসপাতালে প্রয়োজনে আড়াইশ শয্যা প্রস্তুত করা হবে। বেসরকারি পার্কভিউ হাসপাতালের ১০ শয্যা করোনা রোগীর জন্য নির্ধারিত হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে এখনো ঝলঝল করছে। কিন্তু, বাস্তবে বিআইটিআইডিতে ৩০ শয্যার বেশি নেই। রেলওয়ে হাসপাতাল এ পর্যন্ত প্রস্তুতি শেষ করতে পারেনি। সর্বশেষ মাত্র চারজন চিকিৎসক দিয়ে সেখানে রোগী ভর্তির প্রচেষ্টা চলছে। অন্যান্য জনবল সংকট তো আছেই। জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউসহ ১১৫-১২০ শয্যার বেশি সংস্থান হয়নি। আর পার্কভিউ হাসপাতালের কথা সবারই তো জানা।
অন্যদিকে, প্রস্তুত না হওয়া সত্ত্বেও হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতাল উদ্বোধনের নাটক মঞ্চায়ন করা হলো। কিন্তু উদ্বোধনের ১০/১২ দিনেও সেটি চালু করা যায়নি। ১০টি আইসিইউ এবং ৮টি এইচডিওসহ হাসপাতালটিতে সবমিলিয়ে একশ শয্যার প্রস্তুতির কথা বলে আসছিল স্বাস্থ্য প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে আইসিইউ এবং এইচডিও বাদ দিলে সেখানে বড়জোর ৩০টি আইসোলেশন শয্যা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে। আর আইসিইউ স্থাপন করা হলেও সেগুলো এখনো পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভাবে ফাংশনিং বা চালুর উপযোগী করা যায়নি। তাছাড়া জনবল সংকট তো আছেই। সবমিলিয়ে চরম অব্যবস্থাপনায় ডুবেছে চট্টগ্রামের সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থা। যার খেসারত দিতে হচ্ছে চট্টগ্রামবাসীকে।
এখন করোনা রোগীদের জন্য হাসপাতালে শয্যা নেই। অক্সিজেন নেই। ভেন্টিলেটর-আইসিইউর কথা বাদই দিলাম। মানুষ মরছে হাহাকার নিয়ে। কেবল ভুক্তভোগী পরিবারই জানে এ অসহায়ত্বের পরিসীমা। কোটিপতি থেকে শুরু করে দিনমজুর-রিকসাচালক সবাই যেন একই কাতারে। হাসপাতালে একটি শয্যা পেতে কত তদবির, দেন-দরবার। এরপরও কাক্সিখত শয্যার নাগাল মিলছেনা। কেবল করোনা সংক্রমিত রোগীরাই নয়, চিকিৎসা পাচ্ছেন না অন্যান্য সাধারণ রোগীরাও। জ্বর বা অন্য উপসর্গ থাকলে কোন হাসপাতালই রোগীদের ভর্তি নিচ্ছেনা। হাসপাতালের দ্বারে-দ্বারে ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। এমন অভিযোগ আসছে প্রতিনিয়ত। এসব মৃত্যু আবার করোনা রোগীর হিসাবেও যুক্ত হচ্ছেনা। চারদিকে যেন চরম অরাজকতা। মানুষ শুধু অসহায় হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা গুণে চলছে যেন। কিন্তু এমন পরিস্থিতি হওয়ার কথা ছিলনা চট্টগ্রামে। কম হলেও প্রায় তিন মাস সময় পাওয়া গেছে। তবে এই দীর্ঘ সময়ে সময়োপযোগী কোন সিদ্ধান্তই নিতে পারেনি স্বাস্থ্য প্রশাসন। তাঁরা কেবল মিথ্যে প্রস্তুতির কথাই শুনিয়েছে।
সর্বশেষ গত ৩০ মে সার্কিট হাউজের এক সভায় আরো দুটি বেসরকারি হাসপাতালকে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় ডেডিকেটেড করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর একটি পাঁচলাইশের পার্কভিউ হাসপাতাল, অপরটি জিইসি মোড়ের নিকটবর্তী রয়েল হাসপাতাল। চট্টগ্রামের মেয়র, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য প্রশাসন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিক সমিতির নের্তৃবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট সকলে ওই সভায় অংশ নেন। এখন এই দুটি বেসরকারি হাসপাতালও করোনা রোগীদের চিকিৎসায় প্রস্তুত করে তোলা হবে। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতালগুলো কোন রোগীকে এখন থেকে ফিরিয়ে দিতে পারবেনা বলে সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা কার্যক্রম তদারকিতে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে (উন্নয়ন) আহবায়ক করে সাত সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
মন্দের ভালো এই যে- তিনমাসের মাথায় এসে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। কিন্তু মাস দেড়েক আগেও যদি এমন সিদ্ধান্ত বা প্রস্তাবনা ঢাকায় পাঠানো যেতো, তবে চট্টগ্রামকে আজকের এমন অসহায় পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতোনা। যথা সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহন ও যথাযথ প্রস্তাবনা পাঠানোর দায় বর্তায় স্বাস্থ্য প্রশাসনের উপর। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকে চট্টগ্রামবাসী এমন কোন উদ্যোগ দেখতে পায়নি।
সহজ কথায় একজন উদ্যোগী স্বাস্থ্য প্রশাসকের অভাবেই চট্টগ্রামের এমন অসহায় পরিস্থিতি বলে আমরা মনে করি। বিশেষ করে স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের শীর্ষ পদে একজন সৎ-যোগ্য ও উদ্যোগী কর্মকর্তা খুবই প্রয়োজন চট্টগ্রামে। যিনি নিজ থেকে উদ্যোগী হয়ে টুকটাক সমস্যা সমাধান থেকে শুরু করে বাস্তবিক অর্থেই যথাযথ ব্যবস্থা ও প্রস্তুতি নেয়ার যোগ্যতা রাখেন। যিনি মিডিয়ার সামনে গিয়ে কেবল মিথ্যে প্রস্তুতির ফাঁকা বুলি আওড়াবেন না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে চিকিৎসক, এমনকি সাধারণ নাগরিকরাও তাই মনে করেন। কম হলেও ডজনখানেক চিকিৎসকের সাথে এ নিয়ে আমার ব্যক্তিগত ভাবে কথা হয়েছে। তাঁরাও মনে করেন- শুরু থেকে উদ্যোগী হয়ে যথাযথ প্রস্তুতি নেয়া হলে চট্টগ্রামবাসীকে আজ এতটা অসহায় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতোনা। কিন্তু প্রস্তুতির কথা বলে কেবল দফায়-দফায় বৈঠকই করেছে স্বাস্থ্য প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টরা। আর মিডিয়ার সামনে গিয়ে কেবল মিথ্যে প্রস্তুতির গাল-গল্প শুনিয়েছেন। কাজের কাজ যে কিছুই হয়নি, তা বুঝাতে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার প্রয়োজন পড়েনা। অন্যদের কথা বাদই দিলাম, চট্টগ্রামের পরিস্থিতি নিয়ে চিকিৎসকদের সিংহভাগ নিজেরাই এ মুহুর্তে শঙ্কিত। কদিন পর পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন তাঁরা। যার বা যাদের অব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রামের এমন পরিণতি, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কেন নয়? মিডিয়ায় মুখ দেখাতে চেহারা সর্বস্ব কোন ব্যক্তিকে স্বাস্থ্য প্রশাসনের শীর্ষ পদে দেখতে চায় না চট্টগ্রামবাসী।
লেখক : স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী ## আজাদী