স্পেনে মুসলিম শাসনের স্মৃতিচিহ্ন

প্রকাশিত: ১০:১০ পূর্বাহ্ণ , ডিসেম্বর ৭, ২০২০

দীর্ঘ আট শ বছর মুসলিমরা স্পেন শাসন করে। এই দীর্ঘ সময়ে ইসলাম ও ইসলামী সংস্কৃতি স্পেনের সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসান এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘এক বর্ণ এক ধর্ম’ নীতি গ্রহণের পর আজও স্প্যানিশ সমাজ-সংস্কৃতিতে ইসলামের প্রভাব দৃশ্যমান। আরব নিউজে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ ‘আন্দালুস রিভিজিটেড’ অবলম্বনে সে কথাই লিখেছেন আবরার আবদুল্লাহ।
স্প্যানিশ মুসলিমদের পরিচয় : স্প্যানিশ মুসলিমদের ‘মুর’ শব্দ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়, যার স্প্যানিশ উচ্চারণ মোরো। গ্রিক ‘মাবরো’ শব্দ থেকে মুর শব্দের উৎপত্তি। মারবো অর্থ কালো। রোমান উচ্চারণ ‘মাউরি’। রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত উত্তর আফ্রিকাকে বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হতো। মাউরি শব্দ থেকে সাম্রাজ্যের উত্তর আফ্রিকান প্রদেশকে মৌরিতানিয়া বলা হতো। আরবরা মাউরি শব্দকে ‘মুর’ উচ্চারণ করে। স্পেন বিজয় এবং পরবর্তী শাসনকার্য মূলত উত্তর আফ্রিকার মুসলিমদের মাধ্যমেই হয়েছিল। তারাই ছিল মুসলিম স্পেনের প্রাণসত্তা। তাই স্প্যানিশ মুসলিমদের বোঝাতে মুর শব্দটিই ব্যবহৃত হয়।

স্পেনের আত্মার সঙ্গে মিশে আছে ইসলাম : কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ল বিভাগের অধ্যাপক আন্তোনিয় ম্যানুয়েল রদ্রিগজ রোমাস বলেন, ‘এটা সত্য যে তারা কেবল একটি বর্ণের একক ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এ কারণে তারা ইহুদি, মুসলিম, জিপসি ও কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর অত্যাচার করেছিল। মানবিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অনেকেই তখন পালিয়ে গিয়েছিল। তবু এখনো স্পেনের শত শত শব্দ ও রীতি-নীতি আন্দালুসিয়ান। মোরিস ও আন্দালুসীয় পদচিহ্নগুলো আন্দালুসিয়ার পরিচয়ের সঙ্গে মিশে আছে এবং তা প্রমাণ করেছে বহিষ্কার আদেশটি ব্যর্থ হয়েছে। সাংস্কৃতিক সমজাতীয়করণ ও অভিন্ন কৃত্রিম স্পেনীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।’ রদ্রিগজ রোমাসের রচিত বইয়ের নাম ‘আ মিরর অব দ্য সউল : দ্য মরিস ফুটপ্রিন্ট-দ্য আন্দালুস উই ক্যারি ইনসাইড’।

স্পেনের দৈনন্দিন জীবনে ইসলামের প্রভাব : তিনি নিজের বই সম্পর্কে বলেন, ‘বইয়ের শব্দে শব্দে আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান করা হয়েছে গোপন সত্য উদ্ঘাটনের সঙ্গে সঙ্গে। যে শব্দ আমরা উচ্চারণ করি আমাদের অনুভূতি লাভের পদ্ধতি, সংগীত, নাচ, খাদ্য ও জীবনযাপনের পথ ধরে।’ তিনি আরো বলেন, ‘যারা এটি পাঠ করে তাত্ক্ষণিক নিজেদের চিনতে পারে, তারা আবিষ্কার করে যে তাদের মা-বাবা না জেনেই খাবার গ্রহণের আগে তাদের হাত ধুইয়ে দেন যেমন মুসলিমরা করে। তাদের মায়েরা ছুটির দিন ঘর পরিষ্কার করছে। তারা আরো জানতে পারবে, মুসলিম তাপসরাও ঘরে শুয়োর ও মদ রাখতেন, যেন তাদের বিরুদ্ধে ধর্মান্ধ হওয়ার অভিযোগ আনা না হয়, সোয়েলা (এক প্রকার সংগীত) ছিল তাদের আজান আর মার্টিনেট (এক প্রকার সংগীত) ছিল ইকামত। যা (নামাজ) তারা গোপনে তাদের ঘরে বা গুহার ভেতরে আদায় করত।’

স্প্যানিশ মুসলিমদের অব্যক্ত সংগ্রাম : স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসান হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মুসলিমরা গোপনে ঈমান ও ইসলামের চর্চা করত। ‘আজাগরা কালচারাল ফাউন্ডেশনে’র প্রেসিডেন্ট আবদুস সামাদ রোমিও একটি ক্যাথলিক পরিবারে জন্ম নেন। ১৯৮০ সালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। নিজের পরিবারের একটি ঘটনা তিনি বর্ণনা করেন। একদিন তিনি তাঁর ভাইকে অজু ও নামাজ শেখাচ্ছিলেন। তাঁর খ্রিস্টান মা কিছু দূর থেকে তা দেখছিলেন। পরের রাতে তিনি কাঁদতে শুরু করেন এবং বলেন, যখন তিনি ছোট ছিলেন তখন তিনি তাঁর নানিকে এমন করতে দেখেছেন— তিনি নানির সঙ্গেই বেশি থাকতেন। তবে তাঁর নানি তাঁর মা বা তাঁকে কখনো বলেননি তিনি কী করেন।

আন্দালুস ছাড়া স্পেনকে বোঝা সম্ভব নয় : সেভিল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক দর্শনের অধ্যাপক এবং স্প্যানিশ মুসলিম বোর্ডের সহসভাপতি ড. আন্তোনিও ডে ডিয়াগো বলেন, ‘গ্রানাডায় আন্দালুসিয়ান প্রভাব বিপুলভাবে প্রশংসিত হতে পারে। কেননা ইসলামিক যুগ ছাড়া আপনি সত্যিই স্পেনকে বুঝতে পারবেন না।’

দুর্ভাগ্য স্প্যানিশ ঐতিহাসিকরা মুসলিম শাসনকালকে চরমভাবে উপেক্ষা করে থাকেন। ঐতিহাসিক মানজানো হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের ভেতর যারা আন্দালুসের ব্যাপারে প্রকৃত জ্ঞান রাখি তাদের জন্য এটা (অজ্ঞতা ও উপেক্ষা) দুঃখজনক। অথচ আন্দালুস পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্মান এবং সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন তৈরিতে অবদান রাখতে পারে, যা অতীতের তুলনায় এখন খুব বেশি প্রয়োজনীয়।’