আর্তমানবতার সেবায় বঙ্গবন্ধু

প্রকাশিত: ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ , মে ২৯, ২০২০

যুগে যুগে বাংলায়  নানা মনীষী ও মহাপুরুষ  এর আগমন ঘটেছে। কিন্ত তাদের কেউ আমাদের স্বাধীনতার স্বাদ দিতে পারেন নি। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্রষ্টা হবার কৃতিত্বের সাথে অন্য সব ম্লান হয়ে যায় বলেই শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের জাতির পিতা এবং হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি।  

বাইগার নদীর তীর ঘেঁষে গোপালগঞ্জের  টুংগীপাড়ায় ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম নেয়া খোকা একদিনে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেন নি। ছোট বেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত হ্রদয়বান ব্যক্তিত্বের অধিকারী।

তখনকার দিনে পড়াশুনার তেমন সুযোগ ছিলনা। অনেকে দুর দুরান্ত থেকে জায়গীর থেকে পড়াশুনা করতেন। তারই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষায়-“দাদীর কাছে শুনেছি আব্বার জন্য মাসে কয়েকটা ছাতা কিনতে হত কারন আর কিছুই নয়। কোন গরীব, ছাতা কিনতে পারে না, দুরের পথ রোদ বা বৃষ্টিতে কষ্ট হবে দেখে তাদের ছাতা দিয়ে আসতেন। একদিন দেখেন তার খোকা গায়ের চাদর জড়িয়ে হেটে আসছে পরনে পায়জামা পাঞ্জাবি নেই। কি ব্যাপার? এক গরীব ছেলেকে তার শতচ্ছিন্ন কাপড়ে দেখে সব দিয়ে এসেছেন! আব্বার একজন স্কুল মাস্টার ছোট্ট একটা সংগঠন গড়ে তুলে এবং বাড়ি বাড়ি ঘুরে ধান,টাকা, চাল জোগাড় করে গরীব মেধাবী ছেলেদের সাহায্য করতেন। অত্যন্ত সক্রিয় তার সাথে কাজ করতেন ও অন্যদের উৎসাহ দিতেন।” ( বাবাকে যেমন দেখেছি)।

সব সময় দল মত ধর্ম নির্বিশেষে সবার পাশে দাঁড়াতেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৪৩-৪৪ সালের  মন্বন্তর (বাংলা ১৩৫০ সাল)এর সময় কোলকাতায় অবস্থানকালে সোহরাওয়ার্দির নির্দেশে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। সেসময় ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শুধু বাংলায় মারা যান। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন  ‘অনেকগুলো লংগরখানা খুললাম। দিনে একবার করে খাবার দিতাম। মুসলিম লীগ অফিসে, কোলকাতা মাদ্রাসা এবং আরো অনেক জায়গায় লঙ্গরখানা খুললাম, দিনভর কাজ করতাম,আর রাতে কোন দিন বেকার হোস্টেলে ফিরে আসতাম, কোন দিন অফিসের টেবিলে শুয়ে থাকতাম’ ( অসমাপ্ত আত্মজীবনী)। উনি সেসময়  গোপালগঞ্জ এসেও রিলিফের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন।

১৯৪৬ সালে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস পালন করা নিয়ে বিভিন্ন স্থানে এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাংগা হয়। তরুণ মুজিব সেসময় উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকে  বাঁচানোর জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেন ও নিরাপত্তা বিধানের চেষ্টা চালান। অথচ ছোট বেলায় স্থানীয় হিন্দু জমিদারের সাথে গন্ডগোল এর কারনেই তিনি প্রথম জেল খেটেছিলেন। কিন্ত সাম্প্রদায়িকতা তাকে কখনো প্রভাবিত করেনি।

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর ততকালীন পুর্বপাকিস্তান উপকুলে এক ভয়াবহ ঘুর্নিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে। বঙ্গবন্ধু সেসময় রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না তবুও তিনি  একটি মাঝারি ধরনের স্টিমারে করে ত্রান সামগ্রী নিয়ে ঘুর্নিঝড় উপদ্রুত এলাকা, বিশেষ করে উপকুল নিকটবর্তী দুর্গম দীপগুলোয় পরিদর্শন ও ত্রান সামগ্রী বিতরণ করতে যান। তিনি উপকূল অঞ্চল থেকে বেশ দূরে মনপুরা দ্বীপ পর্যন্ত গিয়েছিলেন।  সেখানে তিনি ৫/৬ দিন অবস্থান করেন। সেসময় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ঢাকায় অবস্থান করছিলেন অথচ দুর্গত ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের প্রয়োজনবোধ করেন নি। এমনকি সপ্তাহখানেক পর জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় এলেও ঘুর্নিঝড় উপদ্রুত এলাকায় যাওয়ার প্রয়োজনবোধ করেন নি। (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ-এম এ ওয়াজেদ মিয়া)

এমনকি এর পরেও ইয়াহিয়া বা ভুট্টো কেউই একবারের জন্যেও নিরাশ্রয়, নিস্ব অনাহার ক্লিষ্ট মানুষ কে দেখতে যাননি। এ থেকে বাংলার জনগণ এর প্রতি তাদের ঔপনিবেশিক মনোভাব বোঝা যায়। উল্লেখ্য শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ সেই দুর্যোগে ৫ লাখের উপর মানুষ মারা যায় কমপক্ষে ৩০/৪০ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়।

পরবর্তীকালে ১৯৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ৯ ডিসেম্বরে এক সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে যে ভাষণ দেন, সেখানেও ঘূর্ণিঝড়ে লাখ লাখ লোক নিহত ও ৩০ লাখ বেঁচে যাওয়া মানুষের জীবন-সংগ্রামে তাদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবকে তিনি নিজেদের জন্য পাহাড়সম কর্তব্য হিসেবে উল্লেখ করেন।বঙ্গবন্ধু ওই ভাষণের পরদিনই  আবারো  উপকূলীয় অঞ্চলে ছুটে যান ও দুর্গত মানুষদের সঙ্গে ত্রাণ তৎপরতায় নেতৃত্ব দেন। নৌকায় চড়ে ও হেঁটে দুর্গম এলাকায় তিনি জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাই নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও দুর্যোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এর উপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন।
৭৪ এর বন্যা কবলিত  মানুষের সেবায়ও দেশের নানা প্রান্তে বিরামহীন ভাবে ছুটে গেছেন। খাদ্য সংকট ও মানুষের প্রাণ হানীর কারনে তিনি সেসময় অত্যন্ত বিমর্ষ থাকতেন। আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন খাদ্য সংকট দুর করতে।

এমনি ভাবে তিনি সরকারে হোক বা বিরোধী দলেই হোক,  ব্রিটিশ আমল থেকে বাংলাদেশ, সব সময়ই মানুষের বিপদে পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। বর্তমানে কোভিড-১৯ এর আক্রমনে সারা পৃথিবী আজ বিপর্যস্ত। বাংলাদেশও আজ কঠিন সময় পাড় করছে। আজ বঙ্গবন্ধু নেই কিন্তু তার প্রিয় বাংলাদেশ আছে। মুজিববর্ষে মানবতার সেবায় সর্বদা নিয়োজিত জাতির পিতার জীবন থেকেই আমরা  মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারি।

মো. রিয়াদুল আহসান নিপু

লেখক: সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, ব্যাংকার।