আজ কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করেন জিয়া

প্রকাশিত: ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ , জুলাই ৯, ২০২১

আজ ৯ জুলাই। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কালো দিন। ১৯৭৯ সালের আজের এই দিনে অর্থাৎ জিয়াউর রহমানের আমলে সংসদে একটি কালো আইন অনুমোদন দেওয়া হয়। 

 

জাতির পিতাকে হত্যার ৪২ দিনের মাথায়, ২৬ সেপ্টেম্বর কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে খুনি খন্দকার মোশতাক। অধ্যাদেশে যে কোনো আদালতে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার বিচারের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। যেহেতু তখন সংসদ অধিবেশন ছিল না, সেহেতু ১৯৭৫ সালের এই দিনে অবৈধভাবে রাষ্ট্রপতির পদ দখলকারী খুনি মোশতাক একটি অধ্যাদেশ আকারে ইনডেমনিটি জারি করেন। এটি ১৯৭৫ সালের অধ্যাদেশ নং ৫০ নামে অভিহিত ছিল।

ইনডেমনিটি শব্দের অর্থ ‘শাস্তি এড়াইবার ব্যবস্থা’, অর্থাৎ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ হলো সেই অধ্যাদেশ যার মাধ্যমে শাস্তি এড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর সহযোগী এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারকে হত্যার পেছনে যারা জড়িত ছিল, তাদের শাস্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এই অধ্যাদেশটি জারি করা হয়।পরে ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই জিয়াউর রহমানের আমলে সংসদে এই কালো আইনটিকে অনুমোদন দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই জেনারেল জিয়ার আমলে বাংলাদেশ সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর পর সংশোধিত এ আইনটি বাংলাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যার ফলে এটি একটি আনুষ্ঠানিক আইন হিসেবে অনুমোদন পায়।

আইনের শাসনের ইতিহাসে এটি একটি কালো দিন।

জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর রাষ্ট্র ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭৬ সালের ২৯ এপ্রিল জিয়া রাষ্ট্রপতি সায়েমের কাছ থেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নিয়ে নেয়। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করায় এবং প্রহসনের হ্যাঁ-না ভোটে নিজে রাষ্ট্রপতি হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেয়া হয়। সংসদে উত্থাপিত আইনটির নাম ছিলো সংবিধান (সংশোধনী) আইন, ১৯৭৯। এটি সংবিধানের চতুর্থ তফসিলের ১৮ অনুচ্ছেদে সংযুক্ত হয়েছিলো, যা পঞ্চদশ সংশোধনীতে বিলুপ্ত হয়।

পঞ্চম সংশোধনীকে বৈধতা না দিলে জিয়াউর রহমানের আমলে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করা যেত কিন্তু জিয়াউর রহমান তা করেনি। মূলত, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করে জিয়া প্রমাণ করেছেন তিনি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের রক্ষাকারী এবং এই হত্যার ষড়যন্ত্রের মূল কুশিলবদেরই একজন।

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার পরে লাভবান কারা হয়েছে, এগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, জিয়াউর রহমান এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত ছিল।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিচারপতি সাত্তার, জেনারেল এরশাদ এবং খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকলেও কোনো সরকারই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করেনি। বরং খুনীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করা হয়েছে। সামরিক স্বৈরাচারের ভোট খেলায় খুনিদের এমপিও বানানো হয়ছে।

কুখ্যাত এই অধ্যাদেশে দীর্ঘ ২১ বছর দৃশ্যত থমকে ছিল আইনের শাসন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দরজা খুলে যায়।

সাবেক আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরু বলেছিলেন, যা আমি সংসদে উত্থাপন করলাম, পাস হলো। এই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের ছুতা দিয়ে ২১ বছর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার করা হয়নি।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, যদি কেউ বাংলাদেশকে ভালবাসে তাহলে তার এটা বাতিল করা উচিত ছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান সেটা করেনি, এরশাদ করেনি, খালেদা জিয়াও সেটা করেনি।

’৯৬ এর ১২ নভেম্বর কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে সংসদ। পরে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের আইনকে বৈধ বলে রায় দেয়।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স থাকলেও তাদের বিচার করা যেত। বিরাট একটা কলঙ্ক এবং জননেত্রী শেখ হাসিনা সেই কলঙ্ক দূর করেছেন।

এরই পথ ধরে দায়ের করা হয় মামলা। আইনের আওতায় আনা হয় খুনিদের। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসে বাংলাদেশ।

ইতিহাসের নৃশংস এ কালো অধ্যায়ের নেপথ্যে ছিলেন যারা, তাদের বিচার শুরু হতেও অপেক্ষা করতে হয়েছে ৩৪টি বছর। তবে দন্ডপ্রাপ্তদের কয়েকজন এখনো পলাতক। সর্বশেষ ২০২০ সালের ১১ এপ্রিল রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত খুনি ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এরআগে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারী রাতে ফাঁসি কার্যকর হয় ৫ খুনীর।