করোনা সংকট অনলাইন ক্লাস ও কিছু কুতর্ক- অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফা

প্রকাশিত: ১:৫০ পূর্বাহ্ণ , জুলাই ২২, ২০২০

[ আমরা যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন লালন করি তার পূর্ণ বাস্তবায়নের পথ আরো সহজ করে দিয়েছে বর্তমানের এ মহাসংকট। তবে কিছু শিক্ষক বা ব্যক্তি নেতিবাচক বিষয়গুলো বেশি চর্চা করছেন। তার প্রথম কারণটি হল একটি অনলাইন ক্লাস তৈরি করতে যে প্রস্তুতির দরকার সেই সময়টুকু দেয়ার মন মানসিকতা নেই, পেশাদারিত্ব নেই, অনেকক্ষেত্রে যোগ্যতাও নেই ]

বিশ্বব্যাপী করোনা সংকটে মানুষের জীবন যাপন প্রণালীতে নেমে এসেছে নানান যাতনা। জাতীয় অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার উপর যতটা প্রভাব পড়েছে তার থেকে বেশি ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরে। চলছে লকডাউন, শাটডাউন ও বিধি-নিষেধ।

জাতীয়ভাবেই সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কঠোরভাবে লকডাউনের আওতায় আনা হয়েছে। কাঠামোবদ্ধভাবে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে শিক্ষাদান বা শিক্ষাগ্রহন কার্যক্রম পরিচালনা করাকে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে ১৬ মার্চ ২০২০ তারিখ থেকে। ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে নেমে এসেছে দুশ্চিন্তার এক ভারী পাহাড়। এদিকে ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যেও নানা কৌতুহল যে তারা আদৌ পরীক্ষা দিতে পারবে কি না, স্কুল কতদিন এভাবে চলবে, পড়াশোনার কি হবে ইত্যাদি।

এ সকল জল্পনা-কল্পনা ও আশংকার কিছুটা অবসান ঘটাতে আমাদের সরকার ইতিমধ্যে শিক্ষাধারা অব্যাহত রাখার বিকল্প পদ্ধতির উপর বেশ জোর দিয়েছেন। চালু করেছেন `আমার ঘরে আমার বিদ্যালয়` স্লোগান নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রমের বিকল্প ধারা। ইতিমধ্যেই সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে নিয়মিত ক্লাস পরিচালনা করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার কিছুটা অবসান ঘটানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্কুল কলেজগুলিতে বিকল্প পদ্ধতি তথা অনলাইন ভিত্তিক শিক্ষা ধারা অব্যাহত রাখার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

অনলাইন শিক্ষা হলো এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা যা সাধারণ শ্রেণি শিক্ষা থেকে ব্যতিক্রম এবং এটি একটি ডিজিটাল শিক্ষা পদ্ধতি যা বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজন হয় আধুনিক প্রযুক্তি তথা কম্পিউটার বা মোবাইল কিংবা এ জাতীয় কোন ডিভাইস ও ইন্টারনেট সংযোগ তা হতে পারে নেট ডাটার মাধ্যমে বা ওয়াই-ফাই বা ব্রডব্যান্ড সংযোগের মাধ্যমে সংযোগকৃত।

মোটকথা, ইন্টারনেট নির্ভর এ যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে কোন ক্লাশ পরিচালনা করাই হলো অনলাইন ক্লাশ যেখানে একজন শিক্ষক ক্লাশরুমের বাইরে সুবিধাজনক যে কোন স্থান থেকে পাঠদান করেন এবং শিক্ষার্থীগণ নিজ নিজ বাড়ীতে থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে লাইভ ক্লাশে অংশগ্রহন করে ও পারস্পারিক মতবিনিময় করে থাকে। শুধুমাত্র স্বশরীরে উপস্থিতি ছাড়া একাডেমিক বাস্তব ক্লাশের সাথে অনলাইন ক্লাশের কোন পার্থক্য নাই। এখানে অনুমতিপ্রাপ্ত সকল শিক্ষার্থী একই প্লাটফর্ম ব্যবহার করে বিশ্বের যেকোন প্রান্ত থেকেই ক্লাশে অংশগ্রহন করতে পারে। শিক্ষক সরাসরি ক্লাশ নেন আর শিক্ষার্থীর কম্পিউটার বা মোবাইল স্ক্রীনই হবে তার ক্লাশ। শিক্ষার্থী বাস্তব ক্লাশের মতো এখানেও শিক্ষককে প্রশ্ন করে তাৎক্ষনিক সমাধান পেতে পারে। এ যেন ফেইচ টু ফেইচ ক্লাসের মতই। এমনকি, এ ক্লাশসমূহ সেভ করা যায় বলে নোট করার প্রয়োজন হয় না এবং কেউ লাইভে উপস্থিত হতে না পারলেও পরে তা দেখতে পাবে। এছাড়াও ইমেজ, ভিডিও আপলোড, গ্রাফিক্স কিংবা এনিমেশনের মতো জীবন্ত উপস্থাপনা পাঠদান প্রক্রিয়াকে আরোও প্রাণবন্ত ও হৃদয়গ্রাহী করে তোলে।

আমরা জানি গতানুগতিক শিক্ষা ধারায় আমাদের ছেলে মেয়েরা বই গুছিয়ে ও কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয় দলবল বেধে একসাথে স্কুলে যাওয়ার মাঝে অনেক আনন্দ পায়। একই শ্রেণিকক্ষে বসে সরাসরি শিক্ষকদের কাছ থেকে বিদ্যা নেয়ার তৃপ্তিই আলাদা। কিন্তু, করোনা সংকট যদি চলতে থাকে দীর্ঘকাল তাহলেতো আমাদেরকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে। তাই আবশ্যক হয়ে উঠেছে অনলাইনে শিক্ষা ধারা অব্যাহত রাখার।

আপদকালীন এ সময়ে অনলাইন ভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি যে অতি গুরুত্বপুর্ণ তা ইতিমধ্যেই প্রমানিত হয়ে গেছে। পৃথিবীর সকল দেশই এখন এ পদ্ধতির উপর ভর করে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রথম দিকে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও এখন অধিকাংশ ছাত্র ছাত্রীরা এতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। কারন, কোন বাঁধাই যেন আমাদের শিক্ষা ধারাকে ব্যাহত করতে না পারে তা আজ কোভিড-১৯ ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছে।

অনলাইনে শিক্ষা ধারার সবচেয়ে বড় উপকার হলো শিক্ষার্থী ও শিক্ষক তাদের পাঠদান ও গ্রহন ব্যবহৃত ডিভাইস এ সেভ করে রাখতে পারেন, যা পরবর্তীতে পুনরায় ডাউনলোড করে পাঠ অনুস্মরণ করতে পারে।

আমরা যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন লালন করি তার পূর্ণ বাস্তবায়নের পথ আরো সহজ করে দিয়েছে বর্তমানের এ মহাসংকট। যেহেতু এখন আর স্কুল-কলেজে যাওয়ার সুযোগ নেই এবং বাসাতেই পড়তে হবে, তাই অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থাই এখন গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। এ জন্য প্রয়োজন আবশ্যকীয় কিছু শিক্ষাদানের মাধ্যম যা ব্যবহার করে পড়াশোনার ধারা অব্যাহত রাখা যায়।

তবে কিছু শিক্ষক বা ব্যক্তি নেতিবাচক বিষয়গুলো বেশি চর্চা করছেন। তার প্রথম কারণটি হল একটি অনলাইন ক্লাস তৈরি করতে যে প্রস্তুতির দরকার সেই সময়টুকু দেয়ার মন মানসিকতা নেই, পেশাদারিত্ব নেই, অনেকক্ষেত্রে যোগ্যতাও নেই। সরকারের ইতিমধ্যে সমস্ত শিক্ষকদের তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ আওতায় আনার চেষ্টা করছেন। কেউ আবার প্রতিষ্ঠানটিকে ইন-হাউজ প্রশিক্ষণ বা সহকর্মীদের কাছ থেকে শিখে নেওয়ার ইচ্ছাও নেই। ফলে নিজের দুর্বলতাকে ঢাকার জন্য নানান ধরনের ফন্দি-ফিকির, অজুহাত ও সমস্যা তৈরি করেন। অনলাইন ক্লাস যেহেতু রেকর্ড, নিজের দুর্বলতা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই – ফলে অনেকেই এ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করছেন, অজুহাত তৈরি করে । অন্যকে নিরুৎসাহিত করেন। আশা করি সকলের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অনলাইন ক্লাস এগিয়ে নিবেন। সকলকে ধন্যবাদ।

লেখক:  অধ্যক্ষ, রাজু’র বাজার কলেজিয়েট স্কুল। নেত্রকোণা।
২৭.৬.২০২০