জড়পদার্থ হওয়ার পথে চট্টগ্রাম শহর

প্রকাশিত: ৮:০৮ অপরাহ্ণ , নভেম্বর ৭, ২০২২

কামাল পারভেজ : যাঁর জীবন নেই তাঁকেই জড়পদার্থ বলি। আবার এই জড়পদার্থের কয়েকটি সংজ্ঞা আছে, এই সংজ্ঞা নিয়ে ব্যাখ্যা দাঁড় করালে নির্লিপ্ত প্রাণীর মতো বুননকাটতে থাকবো। তারপরও বলা হয় এমনই ভাবে জড়পদার্থ জীবন যেমন না থাকে, তাই এটি আশা করা যায় যে এটি নিজের ইচ্ছামতো সরানো বা সরানো নয়। কিন্তু কিছু ব্যতিক্রম আছে। এটি প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম উত্সের একটি নির্জীব বস্তু বা উপাদান তবে বায়ু বা জলের মতো কিছু বাহ্যিক ভূতাত্ত্বিক এজেন্টগুলির দ্বারা এটি বাস্তুচ্যুত হতে পারে। সত্যি তো আমরা এখন ঘুগরা সাপ লালন পালন করছি, সাথে গিরগিটি রেখেছি, কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়ানোর একদম সময় পাইনা কারণ বউ চিরনি দিয়ে মাথার চুলের বাজ ঠিক করে দেয়। ঐদিকে আদর্শহীন স্ত্রীর আবদার পূরনে মাস্টারপ্ল্যান ম্যাপটাও উলটে ধরতে হয়, তা-না হলে যে শার্টের কলার চুলের বাজ ঠিক থাকবেনা। আমি বুঝাতে চাইছি যে প্রকৌশলী এবং যাঁরা নগরায়নের সৌন্দর্যের পরিকল্পনার চিন্তা ভাবনা করে দিনের বেলায় বিভোর স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করেন তাঁরা কি জড়পদার্থের কোন অংশীদার হিসেবে পরিচালিত কিনা। যদি আমরা উন্নয়নের কথা বলি তাহলে একটু ঢাকা রাজধানীর দিকে নজর দেওয়া যাক, এতো উন্নয়ন হয়েছে যা পুরো রাজধানী জুড়ে ফ্লাইওভার (উড়ালপথ বা উড়াল সেতু) জনসাধারণকে যানজট (জ্যাম) থেকে মুক্তি দিতে একেক করে নিত্য নতুন পরিকল্পিত হচ্ছে উন্নয়নের জোয়ার। বাস্তব চিত্র হচ্ছে তাঁর উল্টো, প্রাচীন ঢাকা এখন ভুতুড়ের গল্পে পরিনত হয়েছে। অন্ধকারে ডেকে গেছে এখন রাজধানী, বিকেল হতে না হতেই রাস্তা ঘাট অবহেলিত এক কাকাতুয়ার ডাকেরবচন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ হবে থাইল্যান্ড, ডুবাই ও সিঙ্গাপুর আনন্দে আত্মহারা হবে সাধারণ জনগণ, তাইতো উন্নয়নের বিকল্প হচ্ছে হরিলুট। ঐদিকে ভুতুড়ের ঢাকায় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে জড়পদার্থে পরিনত হয়েছে। ঠিক তদরুপ চাটিগাঁর আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি বিলীন করে এবং প্রকৃতির নান্দনিক শহরটাকে গিলে ফেলতে বসেছে জড়পদার্থের জড়পন্ডিত অংশীদাররা। উন্নয়ন সৌন্দর্যের নামে ঢাকা শহরের মতোই নির্লিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে জড়পদার্থের শহর বানাতে শুরু করেছে। আর বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবেনা আমরা খুব শিগগিরই ভুতুড়ে বাড়িতে বসবাস করতে শুরু করবো। পরবর্তী প্রজন্মর ভবিষ্যৎ দেখতে পাবো জবাবহীন নির্লিপ্ত জড়পদার্থ, জীবন আছে তবে নড়াচড়া নেই। সৌন্দর্য গড়ে তুলতে গিয়ে গিলে খেয়েছে নগরীর ২২টি খাল, প্রায় ১৫টির মতো দিঘি ও ৩০০ শতর মতো পুকুর। খাল, দিঘি, পুকুর এগুলো কোন ভিক্ষুকরা গিলে খায়নি, গিলে খেয়েছে উচ্চ বিত্তবানরা, কেউ কলমের খোঁচায় আবার কেউ রাজনৈতিক দাপটে প্রহসন তৈরি করে মোটা অংকের উৎকোচদান আবার উৎকোচক হয়েছে। এভাবেই প্রকৃতির নান্দনিক চাটিগাঁ শহর ময়লার ডিপোতে পরিনত হয়েছে। চাটিগাঁ শহর গিলে খাওয়া লোহ মানব গুলোই আবার সোশিল সমাজের তিরত্নধর হয়ে গলা ফাটিয়ে বক্তিতা করেন। তখন মনেই হবেনা যে তাঁরা কর্ণফুলী নদী, খাল -বিল, দিঘি, পুকুর ও পাহাড় খেকোদের গডফাদার। নজর পড়েছিল সিআরবিতেও, যেখানে নগরীর মানুষ গুলো হতাশার ভাগাভাগি নিঃশ্বাসের ও ফুসফুসের অংশীদার হিসেবে সিআরবিটাকে নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতো এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস ঐতিহ্য ছুয়ে আছে সিআরবি ও পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাব। সৌন্দর্যের প্রতীকী গুলো ধ্বংস করে হাসপাতালের নামে আকাশ চুম্বক দালান কোঠা তৈরি করে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়ার আশায় নিজের বিবেককেও বিক্রি করে দেয়। আদালতে আসামী হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা যায় কিন্তু বিবেকের আদালতের কাছে অথবা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কি জবাব দিবো আমরা। শেষ প্রশ্নটা হলো এই নগরের হর্তাকর্তাদের কাছে এই নান্দনিক শহরটাকে আর কতো ধ্বংস করা হলে এবং বড় বড় দালান কোঠা দাঁড় করালে জড়পদার্থ থেকে বাঁচা যাবে কি-না।।
লেখক আবাসিক সম্পাদক, দৈনিক দেশবাংলা।