আগ্নেয়গিরির উপরে মানুষের বসতি!

প্রকাশিত: ১:৪৮ অপরাহ্ণ , এপ্রিল ৭, ২০২২

বিচিত্র এই পৃথিবী! আরও বিচিত্র এখানকার বসবাসকারীরা। দিন দিন বৈচিত্র্য আরও বাড়ছে। দিন দিন বৈচিত্র্য আরও বাড়ছে। বাড়বে নাই বা কেন, যত দিন যাচ্ছে পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যাও তো বাড়ছে। মানুষ নতুনত্ব ভালোবাসে। আর তারই জন্য সব আয়োজন। এই আয়োজন করতে গিয়েই বসতি গড়েছে আগ্নেয়গিরির উপরে, মাটির নিচে, আরও কত জায়গায়।

মানুষের সংখ্যা যত বাড়বে তত বাড়বে তাদের বাসস্থানের সংখ্যা। মাঠ, ঘাট, জঙ্গল পেরিয়ে পাহাড়ের উপরেও মানুষ বসতি স্থাপন করে। বাদ পড়েনি নদী, সমুদ্র এবং অন্যান্য জলাভূমিও। এ পর্যন্ত মানা গেল।

কিন্তু তাই বলে আগ্নেয়গিরির উপর কিংবা পাতালের নীচে বসবাস? এ কী সম্ভব!হ্যা, এই ভয়ানক কাজটিই করে চলেছেন সাতটি এলাকার মানুষ। এবং সেই বসতির বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, স্থাপত্য দেখতে সেখানে ভিড় জমান দেশ বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক।

চলুন জেনে নেওয়া যাক সাতটি এলাকা সম্পর্কে-

কুবার পেড়ি

কুবার পেড়ি শব্দের অর্থ সাদা মানুষের গর্ত। এই নামের কারণ এখানকার মানুষরা সবাই গর্তের ভিতরে থাকেন। আর এদের গায়ের রং ফর্সা। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড থেকে প্রায় ৮৪৬ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের মরুভূমিতে অবস্থিত এক ছোটো শহরের নাম হল কুবার পেড়ি।

শহরের লোক সংখ্যা দেড় হাজারের কিছু বেশি। আর এখানকার বাসিন্দারা সবাই বাস করেন মাটির নীচে। ফলে এই শহরের আরেক নাম ভূগর্ভস্থ নগরী।

মাটির নীচে রেস্তোরাঁ, বইয়ের দোকান, গির্জা, বিনোদন কেন্দ্র, ক্লাব, ব্যাঙ্ক, আর্ট গ্যালারি, মার্কেট কমপ্লেক্স সব কিছুই তৈরি করেছেন শহরের বাসিন্দারা। এটিই পৃথিবীর একমাত্র ভূগর্ভস্থ নগরী।

১৯১৫ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি এখানে প্রথম বহুমূল্য ওপল পাথরের হদিশ মেলে। তারপর থেকে বিশ্বের বহু দেশে সেই পাথরের রফতানি শুরু হয়। এখানে প্রায় ৬০টি ওপল পাথরের খনি রয়েছে।

মাটির ভিতরে মানুষের জীবনযাত্রা পর্যটকদের আকর্ষণ করে। মাটির ভিতরে যে এমন সাজানো গোছানো একটি শহর রয়েছে তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। মাটির নীচে থাকায় এখানকার আবহাওয়া বাইরের মরুভূমির থেকে ঠান্ডা। যদিও মাটির উপরে উঠলে তাপমাত্রা ভয়ানক বেড়ে যায়। রাতে অবশ্য এখানে বেজায় শীত।

গোরেম

টার্কির কাপাডোসিয়া শহরের এক অদ্ভুত জনবসতি পূর্ণ এলাকা হল গোরেম। দূর থেকে এই অঞ্চলকে দেখলে মনে হয় যেন বিশালাকার সূঁচালো পাথরের শিলা মাটিতে গেঁথে রয়েছে।

সেই পাথরের খাঁজে খাঁজে রয়েছে ছোটো ছোটো গুহা। এই পাথরগুলিকে বলা হয় পরিদের চিমনি। আর এই অদ্ভূত এলাকাতেই বসবাস করেন প্রায় দুই হাজার মানুষ। পাথরের মধ্যেকার গুহাগুলির মধ্যেই জাদুঘর, গ্যালারি, চার্চ, জাতীয় উদ্যান সব রয়েছে। বসবাস করে মানুষও।

এমনকি সুসজ্জিত হোটেল রেস্তোরাঁ রয়েছে এই গুহাগুলির ভিতরে। থাকবে নাই বা কেন, গোরেম উপত্যকার অদ্ভূত জীবনযাত্রা দেখতে যে এখানে শ’য়ে শ’য়ে পর্যটক হাজির হন। পর্যটকদের বিনোদনের যাবতীয় ব্যবস্থাও রয়েছে পরিদের এই চিমনিগুলিতে।

জাপানের টোকিওর আওগাশিমা গ্রামটি একটি অদ্ভূত গ্রাম। এটি একটি আগ্নেয় দ্বীপ। মানে দ্বীপের নীচে একটি আগ্নেয়গিরি রয়েছে। গ্রামের লোকসংখ্যা প্রায় ২০০। আর দ্বীপের আয়তন মাত্র ৬ বর্গ কিলোমিটারের কম।

গ্রামের নামকরণ হয়েছে আওগাশিমা আগ্নেগিরির নামে। ফিলিপিন্স সাগরের বুকে অবস্থিত এই আগ্নেয় দ্বীপে অতীতে লোকবসতি ছিল যথেষ্ট।

১৭৮০ সালে এই ভয়ানক অগ্নুৎপাত হয়। তারপরেই দ্বীপ ছেড়ে পালিয়ে যান সমস্ত মানুষ। ঘটনার প্রায় পঞ্চাশ বছর পর এখানে আবার লোকজনের আসা শুরু হয়। যারা এখনও এই দ্বীপে বসবাস করেন তাদের সাহসী আখ্যা দিয়েছেন দেশের অন্যান্য নাগরিকরা। বলা বাহুল্য, এই আগ্নেয় দ্বীপের জীবনযাত্রা দেখতে এখানে বহু পর্যটকের যাতায়াত আছে।

হুয়াকাচিনা

পেরুর দক্ষিণ পশ্চিম দিকের মরুভূমির একটি ছোট্টো গ্রাম হল হুয়াকাচিনা। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন একটা মরুদ্যানরূপী মরীচিকা। মনে হবে, কাছে গেলেই সেটি অদৃশ্য হয়ে যাবে। কিন্তু না, কাছে গেলেই ভুল ভাঙবে। সেটি একটি জ্বলজ্যান্ত মরুদ্যান। সেটি অদৃশ্য হয় না। চোখের ভুলও নয়। আসলে হুয়াকাচিনা হল একটি ছোট্টো গ্রাম।

ছোটো ছোটো টিলা দিয়ে ঘেরা এই গ্রামের রয়েছে অনেক সবুজ গাছপালা। ধূ ধূ মরভূমির মধ্যে এই ছোট্টো গ্রাম এক এক অপূর্ব দর্শণীয় স্থান। গ্রামে বসবাস করেন প্রায় একশো জন মানুষ। গ্রামের মাঝে রয়েছে একটি হ্রদ। সেই হ্রদের জলের রং নীল। এছাড়াও এখানে রয়েছে রিসর্ট, রেস্তোরাঁ এবং বিনোদনের আরও অনেক ব্যবস্থা। পর্যটকরা দল বেঁধে এখানে অবসর যাপন করতে যান।

আইসরটক

গ্রিনল্যান্ডের আইসরটক যেন এক স্বপ্নের নগরী। বরফে ঢাকা এই অঞ্চলে আগে জনবসতি ছিল না। পরবর্তী সময়ে এখানে লোকজন বসবাস শুরু করে। বরফের জমিতে চাষবাস করা যায় না। তাই এখানকার মানুষের প্রধান খাদ্য ছিল পশুর মাংস। যদিও বর্তমানে এখানে সুপারমার্কেট, বাড়ি ঘর এবং অন্যান্য সুবিধা পাওয়া যায়। ফলে ধীরে ধীরে এখানে জনবসতি বাড়ছে। বাড়ছে পর্যটকদের সংখ্যাও।

আন্ড্রেডাল

নরওয়ের আন্ড্রেডাল শহরটি একটি রঙিন শহর। পাশাপাশি শহরের সৌন্দর্য্যও ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। শহরটি একটি হ্রদের ঠিক মাঝ বরাবর অবস্থিত। কাঠের তৈরি বাড়িগুলি নানা উজ্জ্বল রঙে রঙিন।

অথচ ১৯৮৮ সালের আগেও এই অঞ্চলে প্রবেশ করা অসম্ভব ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এলাকার উন্নতি হয়। রাস্তাঘাট বাড়ি ইত্যাদি তৈরি হয়। মানুষ বসবাস স্থাপন করতে শুরু করেন। বর্তমানে এখানে নাগরিকের সংখ্যা একশোর মতো। গ্রামের লোকেরা ছাগল পোষেন। আন্ড্রেডাল শহরের গোট চিজ বিশ্ব বিখ্যাত। প্রতিবছর হ্রদের মাঝে অবস্থিত এই অভিনব শহরটি দেখতে ভিড় জমান পর্যটকরা।

হ্যাঙ্গিং মনাস্ট্রি

চিনের সবকিছুই যেন অদ্ভূত। এই যেমন সেখানকার ঝুলন্ত মঠ। চিনের শাংঝি প্রদেশে পাহাড়ের গা খোদাই করে এবং লোহার রড পুঁতে তৈরি হয়েছে মঠ। এখানে বসবাস করেন বহু মানুষ। এতটাই উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে এই মনাস্ট্রিটি তৈরি হয়ে যে এটি ভেঙে পড়ার কোনও লক্ষণই নেই। তাছাড়া এখানে বসবাসকারীরা সাবলীলভাবে এখানে জীবনযাপন করেন। এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়ার জন্য রয়েছে ঝুলন্ত সেতুও। সবচেয়ে মজার করা বাসস্থানগুলি কিন্তু বহুতল বিশিষ্ট। পাহাড়ের খাঁজে মনাস্ট্রি তৈর হলে প্রাকৃতিক ভারসাম্যের কিন্তু এতটুকু লোকসান হয়নি।

সূত্রঃ এই সময়