জার্মানির রাজধানী বার্লিনের স্মৃতি

প্রকাশিত: ২:১৪ অপরাহ্ণ , মার্চ ১৫, ২০২২

জিয়া উদ্দিন,চৌধুরী ।।

উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডের পর আমার দ্বিতীয় পছন্দের দেশ জার্মানি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে অধ্যায়নকালে জার্মান কালচারাল সেন্টারের আর্থিক সহযোগিতায় এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে পনেরো দিনের এক আর্ট ক্যাম্পে যোগদানের সুযোগ পেয়েছিলাম। তখন জার্মান আর্টিস্ট জর্জ বাগ হোফার ও তার সঙ্গীনি মার্সেলা সালাসের সান্নিধ্যে থেকে জার্মান সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি। সেই থেকে জার্মানির প্রতি বিশেষ আগ্রহ জন্মে। এরপর অন্যতম বিশ্বসেরা কোরিয়ান তাবু কোম্পানি এইচকেডি’তে চাকুরীকালে জার্মানির বিখ্যাত আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড Jack-wolfskin এর জন্য বিভিন্ন ধরণের তাবু ও ব্যাগের ডিজাইন করেছি। এমনকি Jack-wolfskin এর বাৎসরিক ক্যাটালগে প্রোডাক্টের ছবির পরিবর্তে আমার ত্রি-ডাইমেনশনাল ড্রইং ও ইলাস্ট্রেশন গুলো ছাপাতো। সেই সুবাদে Jack-wolfskin এর প্রোডাক্ট ম্যানেজার Dirk Hondrich এর সাথে খুব সখ্যতা জন্মে।

২০০৭ সালে এইচকেডি’র চাকরি ছেড়ে দেয়ার পর Dirk কে প্রস্তাব দিয়েছিলাম আমাকে জার্মানিতে Jack-wolfskin এর হেড অফিসে ডিজাইনার হিসেবে চাকরির ব্যবস্থা করতে। Dirk অত্যন্ত খুশি হয়ে বেশ কয়েকবার চট্টগ্রামের প্যানিনসুলায় বৈঠক করে। সে আমাকে চাকরির ব্যাপারে আস্বস্ত করে এবং কিছুদিন অপেক্ষা করতে বলে। এরই মধ্যে Dirk চাকরি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গেল, আমি ২০০৮ সালে যোগদান করলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আবার অধ্যায়নের আগ্রহ বেড়ে যায়। তারই ধারাবাহিকতায় জার্মানিতে DAAD Scholarship সহ CrossCulture Exchange Program এবং কিছু শর্ট কোর্সের জন্য কয়েকবার চেষ্টা করেও নানা কারণে ব্যর্থ হয়েছি। বুঝলাম বয়স একটা বড় বাঁধা, জার্মানিতে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয় তরুণদের। যাইহোক, জীবনে একবার জার্মানি দেখার স্বাদটা সেই থেকে রয়েই গেলো। অবশেষে আমার যখন ইউরোপ ভ্রমণের সুযোগ এলো তখন জার্মানি দেখার সুযোগটা লুফে নিলাম।

২০ নভেম্বর ২০১৮। সুইজারল্যান্ডের জুরিখের দৃষ্টিনন্দন বিমানবন্দর (flughafen-zuerich) থেকে ইজিজেটে (EasyJet) প্রায় দেড় ঘন্টা জার্নি করে রাত ১০টা নাগাদ জার্মানির রাজধানী বার্লিনের Tegel Airport (TXL)- বিমানবন্দরে এসে পৌঁছলাম। চাচাতো ভাই আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী (ডাক নাম তার পিলু) আমাকে নিতে এসেছে এয়ারপোর্টে। পিলুর সৌভাগ্য সে জার্মানির বিখ্যাত হম্বল্ড ইউনিভার্সিটিতে বৃত্তি (DAAD Scholarship) নিয়ে পিএইচডি করছে। স্বপরিবারে সে বার্লিনে থাকে। ছোট ভাই পিলু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একজন শিক্ষক। তার কৃতিত্বে আমরা অত্যন্ত গর্বিত।

প্রথমে বাসে এবং পরে ট্রামে করে এয়ারপোর্ট থেকে পিলুর বাসায় আসলাম। সারাদিন সুইজারল্যান্ডের জুরিখে যে হাড় কাঁপানো শীতের অসহনীয় যন্ত্রনায় ছিলাম সেখান থেকে তার বাসায় এসে যেন হাঁফ ছেড়ে বাচঁলাম। ইতালী থেকে আমার ইউরোপ ভ্রমণের দীর্ঘ যাত্রার দশম দিনে বার্লিনে এসে আপনজনের ছত্রছায়ায় যাত্রা বিরতি নিতে পারছি। আহ কি শান্তি ! কি সৌভাগ্য ! পিলুর বড় ছেলে আজমাইনের রুমটি আমার জন্য বরাদ্দ হলো। ভাতিজার রুম দখলে আমার উপর তার অভিমান লক্ষ্য করলাম। তার হাতে মোবাইল দিয়ে ভাব জমালাম। শরীরটা একেবারে ক্লান্ত ! পিলুকে বলে দু’ভাই মিলে রাতের ডিনারটা তাড়াতাড়ি সেরে মোটা লেপের তলায় ঢুকে পড়লাম।

জার্মানি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক চালিকাশক্তি। মধ্য ইউরোপের এই দেশটিকে বলা হয় ল্যান্ড অব আইডিয়া। ১৯৯০ সালে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি একত্রিত হয়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে। জগৎ বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনসহ ১০৭ জার্মানকে ইতিমধ্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী সাফল্য, গবেষণা ও উন্নয়ন প্রচেষ্টা তাদের অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিজ্ঞান এবং প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রী প্রদানে তারা এগিয়ে। জার্মানির উল্লেখযোগ্য শিল্পগুলির মধ্যে রয়েছে লোহা, ইস্পাত, যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম এবং মোটরগাড়ি। তাছাড়া আইটি, ফার্মাসিউটিক্যালস, জৈবিক প্রকৌশল, জৈব প্রযুক্তি, পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি, নির্মাণ ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীও আছে ।

২১ নভেম্বর জার্মানিতে আমার দ্বিতীয় দিন। আজ বিশ্রাম নিয়ে কালকে বার্লিন শহর দেখতে বের হবো। সারাদিন রুমের ভিতর উষ্ণ পরিবেশে ভাল ভাল দেশীয় খাবার খেয়ে নিজেকে চাঙ্গা করে নিয়েছি। দুই ভাতিজার সাথে খেলায় খেলায় কাটিয়ে দিলাম সারাদিন। এই বিদেশ বিভূঁয়ে পারিবারিক পরিবেশে আত্মীক যত্নে থাকাটা নি:সন্দেহে ভাগ্যের ব্যাপার। দুই ছেলেকে লালন পালনসহ নিজের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে ছোট ভাইয়ের বৌয়ের যে পরিশ্রম তার উপর আমি এসে এক্সট্রা ঝামেলা বাড়ালাম। এ জন্য আফরোজা খানম সুইটিকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। যাক ! যে ক’দিন থাকবো দিনগুলো স্মৃতি হয়েই থাকবে।

বার্লিন জার্মানির রাজধানী এবং জনসংখ্যায় ইউরোপের বৃহত্তম শহর। ইউনেস্কো কতৃক বার্লিন ”সিটি অব ডিজাইন” হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই নগরী সৃজনশীল শিল্প এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের জন্য অনন্য। বার্লিনকে বলা যায় টেকনো সিটি। স্প্রে নদীর তীরে অবস্থিত বার্লিন সংস্কৃতি, রাজনীতি, প্রচার মাধ্যম ও বিজ্ঞান বিষয়ে বিশ্বের একটি অন্যতম প্রধান শহর। বার্লিনে রয়েছে বিশ্বের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়, অর্কেস্ট্রাস, জাদুঘর, বিনোদনমূলক স্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন খেলাধুলা ও প্রদর্শনীর প্রাণকেন্দ্র। এখানকার জিওলজিক্যাল গার্ডেন ও চিড়িয়াখানা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়। সৃজনশীল শিল্পের বিভিন্ন পরিসর, গবেষণা সুবিধা, মিডিয়া কর্পোরেশন ছাড়াও শহরটি উৎসব, বিভিন্ন স্থাপত্য, নাইটলাইফ, সমসাময়িকক শিল্প এবং জীবনযাত্রার উচ্চ মানের জন্য সর্বাধিক পরিচিত। এছাড়া বার্লিন বিমান ও রেল চলাচলের মহাদেশীয় কেন্দ্র এবং এর অত্যন্ত জটিল পাবলিক পরিবহন নেটওয়ার্ক রয়েছে।

২২ নভেম্বর দু’ভাই মিলে বার্লিনে একটা চক্কর দিব ভেবে সকালে খেয়েদেয়ে যাত্রা শুরু করলাম। পিলু গুগলে দেখে নিল কিভাবে আমরা বার্লিনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গুলো এক চক্করে দেখে নেয়া যায়। দু’তলা বাংলো বাড়ি থেকে বের হতেই পরিচয় হলো বাড়ির মালিকের সাথে। সুঠাম দেহী বয়স্ক ভদ্রলোককে পিলু বাবা বলে ডাকে। তিনিও পিলুকে নিজের ছেলের মতো স্নেহ করে। তার এই কাঠের বাংলো বাড়ি আমার খুব পছন্দ হয়েছে তাই দু’জনে বাড়ির সামনে ছবি তুলে রাখলাম। তারপর মেট্রো স্টেশনে গিয়ে দেখি কারো কাছে খুচরা কয়েন নেই। পিলু ক্রেডিট কার্ডে মেট্রো কার্ড কিনতে গিয়ে পড়ল বিপাকে। মেশিন থেকে কার্ডটি বেরুচ্ছে না। মনে হয় মেশিনটা হ্যাঙ করেছে। অনেক চেষ্টা করেও লাভ হলো না। বোধ হয় কয়টা ইউরো গচ্চা গেল। নিরুপায় হয়ে ট্রেন আসতেই উঠে পড়লাম। বাইরে মেঘলা পরিবেশ ভীষন ঠান্ডা কিন্তু মেট্রোতে বেশ উষ্ণ। বার্লিন শহর দেখতে দেখতে গল্প করতে করতে চলছি। একি ! মেট্রো কখনো জঙ্গলের ভিতরদিয়ে যাচ্ছে। বেশ মজা লাগছে! নিদ্দিষ্ট স্টেশনে এসে পড়লে দু’জনে নেমে পড়লাম। ঠান্ডাটা আবার গায়ে লাগছে। তাড়াতাড়ি কান টুপিটা পরে নিলাম।

যেখানে নেমেছি সেই স্টেশনের নাম Berlin Alexanderplatz Bahnhof। বার্লিনের সব চেয়ে উচুঁ টেলিভিশন টাওয়ার (Fernsehturm Berlin) এখানেই। চত্বরটা দেখে বেশ মজা পাচ্ছি। আমার কৌতূহলী মনে খুব উৎফুল্লতা অনুভব করছি। উন্নত বিশ্বের উন্নত জীবন যাপনের ভাব-গম্ভীর্যের অনুভূতি নিয়ে পদভ্রজে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। প্রথমে Checkpoint Charlie-র হয়ে স্প্রে নদীর তীরে গ্রাফিটি আকাঁ দীর্ঘ দেয়ালের কাছে খোলা চত্বরে। দেখা যাচ্ছে নদীর উপর লঞ্চের মতো ভাসমান হোটেল ও রেস্তোরাঁ। ওবেরবাম সেতুর (Oberbaum Bridge) কারুকাজ । ঠান্ডার কারণে লোকজন কম মনে হচ্ছে । এখানে কয়েকটি ছবি তুলে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম মিউজিয়াম আইল্যান্ডে (Museum Island)। রাস্তার পাশে কার্ল মার্কসের ভাস্কর্য দেখালো পিলু। আইল্যান্ডের সেতু পেরিয়ে দু’কদম এগিয়ে এসে দাঁড়ালাম জার্মানির বিখ্যাত চার্চ বার্লিন ক্যাথেড্রালের (Berlin Cathedral) সামনে। এখানে রয়েছে Altes Museum এবং দু’টি দৃষ্টি নন্দন ফোয়ারা বিশিষ্ট খোলা উদ্যান। Altes Museum হচ্ছে ১৮ কলামের একটি নিউক্লাসিক্যাল স্থাপত্যে রীতিতে তৈরী একটি জাদুঘর। যাতে প্রদর্শিত হয় রোমান ও গ্রিক প্রত্নসামগ্রী। খুব সুন্দর পরিবেশ।

মূলত মিউজিয়াম আইল্যান্ডকে ঘিরেই সব জাদুঘর ও উল্লেখযোগ্য স্থাপনা গুলো রয়েছে। এই এলাকায় বার্লিনের বিখ্যাত স্থাপনা গুলোর মধ্যে বার্লিন প্রাচীর, বার্লিন ব্রডকাস্টিং টাওয়ার, ভিক্টোরি কলাম, রিচস্ট্যাগ বিল্ডিং, বার্লিন ক্যাথিড্রাল, সিটি হল, ব্র্যান্ডেনবার্গ গেট, বুন্দেসট্যাগের অফিস, ফেডারেল চ্যান্সেলরি ভবন এবং জার্মান চ্যান্সেলরের অফিস অন্যতম। এর মধ্যে কয়েকটি স্থাপনা ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে বিবেচিত।

এরপর এগিয়ে আসলাম “হম্বল্ড ইউনিভার্সিটির (Humboldt University)” প্রবেশ দ্বারে। এটি জার্মানির অন্যতম প্রাচীন এবং উচ্চ শিক্ষার জন্য বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়। আলবার্ট আইনস্টাইন সহ অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি এখানে অধ্যায়ন করেছেন। কার্ল মার্কসও নাকি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চেয়েছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ পর্যন্ত ৪০ জন স্কলার নোবেল পুরস্কার পেয়েছে। ছোট ভাই পিলু এই বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণা করেছে ভাবতেই বুক ফুলে উঠছে।

হম্বল্ড ইউনিভার্সিটি পেরিয়ে সামনের রাস্তাটি দু’ভাগে ভাগ হয়ে বার্লিনের বিখ্যাত ঐতিহাসিক ল্যান্ডমার্ক ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটের (Brandenburg Gate) দিকে চলে গেছে। যত এগোচ্ছি তত বেশি লোক-লোকারণ্যে জম জমাট দেখতে পাচ্ছি। জার্মান জাতির ঐক্য ও শান্তির প্রতীক হিসেব দাড়িয়ে আছে ব্র্যান্ডেনবার্গ গেট (Brandenburg Gate)। বেলেপাথরের ২৬ মিটার লম্বা স্মৃতিস্তম্ভটির নকশা গ্রীক স্থ্যাপত্য শৈলী হতে অনুপ্রাণিত। এই ঐতিহাসিক তোরণকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের আনাগোনা, সব মিলিয়ে অন্যরকম অনুভতি টের পাচ্ছি ।

ব্র্যান্ডেনবার্গ গেট পেরিয়ে ডানে আসতেই চোখে পড়লো আরো একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা রিচস্ট্যাগ বিল্ডিং (Reichstag Building) বা জার্মানীর সংসদ ভবন। বিশাল গ্লাসনির্মিত গম্বুজসহ দাঁড়িয়ে আছে। সামনে প্রশস্থ খোলা উদ্যান। গম্বুজের উপরের তলা থেকে বার্লিন শহরকে ৩৬০ ডিগ্রী কৌনিকতায় উপভোগ করা যায়। নীচের তলায় বসে জার্মানির সংসদ অধিবেশন। ১৯৯৯ সালে এই ভবনের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হলে জার্মান ফেডারেল পার্লামেন্টকে (বান্ডেস্ট্যাগ) এখানে স্থানান্তর করা হয়।

রৌদ্রৌজ্জ্বল দিনে সূর্যের আলো সংসদীয় আসনের পুরো ফ্লোর জুড়ে বিস্তৃত হয়। একটি বৃহৎ সূর্য ঢাল সূর্যের বৈদ্যুতিক গতি ট্র্যাক করে এবং সরাসরি সূর্যালোক পুরো হল জুড়ে বন্টন করে। নিবন্ধন সাপেক্ষে গম্বুজটি দর্শকদের জন্য উম্মুক্ত। এই ঐতিহাসিক ভবন পুননির্মানের আগে ১৯৯৫ সালে বুলগেরিয়ান-আমেরিকান শিল্পী ক্রিস্টো এবং তার স্ত্রী এই বৃহৎ স্থাপনাটিকে সাদা কাপড়ে সম্পূর্ন মোড়িয়ে এক অভিনব শিল্প হিসেবে উপস্থাপন করেন যা লক্ষ লক্ষ দর্শককে আকৃষ্ট করেছে । ভবনের বামপাশে দেখা যাচ্ছে সরকারী ভবন The Marie-Elisabeth-Lüders-Haus। সংসদীয় সদস্যদের আবাসন এবং সংসদীয় কার্যালয়।

এরই মধ্যে চৌধুরী পরিবারের দুই সদস্যের বার্লিনের ঐতিহাসিক স্থাপনা গুলোর সাথে ছবি তুলতে কোনো গাফলতি নেই । তাই ছবি আর ভিডিওর কাজটা সারছি ফাঁকে ফাঁকে। ঐতিহাসিক স্থাপনার সাথে আমরাও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রইলাম। এসব স্মৃতি জমা রেখে বুড়ো বয়সে স্মৃতি রোমন্থন করা যাবে ।
কখন যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো টেরও পেলামনা । হাঁটতে হাঁটতে স্প্রে নদীর উপর সেতু পেরিয়ে পেলাম বার্লিনের সেন্ট্রাল রেল স্টেশন হুপ্ব্বাহ্নহফ (Berlin Hauptbahnhof)। অত্যন্ত দৃষ্টি নন্দন কাঁচের তৈরী স্টেশনটি দেখলে মনজুড়ে যায়। এই হুপ্বাহ্নহফ ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তম রেল স্টেশন।

বার্লিন সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে মেট্রোতে আচমকা একটা স্টেশনে নেমে পড়লো পিলু । আমিও তার পিছু পিছু নেমে পড়লাম । ঠান্ডাটা যেন তীব্রভাবে লাগছে ! কি ব্যাপার আমার কান টুপিটা গেলো কই ? হায় ! হায় ! টুপিটাতো মেট্রোর সিটে ! বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পিলু দৌড়ে গিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু ততক্ষনে মেট্রোর সয়ংক্রিয় দরজা বন্ধ হয়ে গেলো। দু’জনে চেয়ে চেয়ে দেখলাম, আমার কানটুপিটা মেট্রোতে অজানা উদ্দেশ্যে পাড়ি দিল।

নিরুপায় হয়ে আমাকে তাগাদা দিয়ে জোরে পা চালিয়ে হনহন করে পিলু হেঁটে চললো । ঠান্ডাটা যাতে কম লাগে আমি ছুটলাম তার পিছনে। একটু পরেই ঢুকে পড়লাম এক বাড়িতে। পিলু পরিচয় করিয়ে দিলো বাড়ির অধিবাসী মিলনদার সাথে। এখানে আসার ব্যাপারে পিলু আগে আমাকে কিছু বলেনি। রীতিমতো জেনে অবাক হলাম যে মিলনদার বাড়িতে রাতে ভোজের আয়োজন হবে। আরো কিছু বাংলাদেশী ছেলেপেলে আসার কথা।

এক সময় এক এক করে সবাই এসে পৌঁছলো। পরিচয় হলো বার্লিনে অধ্যায়নরত কয়েকজন বাংলাদেশী ছেলেমেয়েদের সাথে। সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় মিলনদার নেতৃত্বে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু ডিনার। কেউ পিঁয়াজ কাটছে তো কেউ থালা বাসন ধুচ্ছে ! কিন্তু আমাকে কেউ কিছু করতে দিলোনা। আমি এখানে মেহমান। জানিয়ে রাখছি একাডেমিক কাজের পাশাপাশি পিলু নিয়মিত বাউল সংগীত চর্চা করে। সেই সন্ধ্যা থেকে রাত প্রায় ১১টা নাগাদ চললো জমজমাট আড্ডা, গল্পগুজব ও মরমী গানের আসর। অসাধারণ দেশীয় রান্নার খাবার সেরে মিলনদাকে ধন্যবাদ জানিয়ে যখন ফিরবো তখন মনে পড়লো কানটুপির কথা। বাইরে যে তীব্র ঠান্ডা, কানটুপি ছাড়া বেরোনোর কথা কল্পনাও করা যায়না। মিলনদা তার নিজের একটি কানটুপি জোর করে আমাকে দিয়ে বিদায় জানালেন। সেদিন বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় ১২টা বেজে গেলো।

এই ক’দিনে ভালো খাওয়া দাওয়া আর চিন্তামুক্ত ভাবে আয়েশী সময় কাটানোর ফলে শরীর বেশ ফুরফুরে লাগছে। তাই নব উদ্যমে শক্তি সঞ্চয় করে আমার পরবর্তী গন্তব্য ঠিক করার জন্য ২৩ নভেম্বর সকালে পিলুর সাথে ইন্টারনেটে বসলাম। আমার ইচ্ছা ছিল নরওয়ের রাজধানী অসলো এবং বেলজিয়াম হয়ে প্যারিস যাবো। প্যারিস থেকে ঢাকা আমার ফিরতি টিকেট করা আছে। পিলু বললো, স্কান্ডেনেভিয়ান কান্ট্রি গুলোতে এখন প্রচন্ড ঠান্ডা আপনি বরং বার্সিলোনা যান। দুর্দান্ত একটা জায়গা আমি গত মাসে গিয়েছিলাম। আমি বললাম, ঠিক আছে স্পেন যখন যাচ্ছি তাহলে কর্ডোবাও যেতে চাই। অবশেষে দু’জনে দীর্ঘ সময় নিয়ে অনলাইনে কম খরচে আসা-যাওয়া ও থাকার ব্যবস্থা ঠিক করে ফ্লাইট ও হোটেল বুকিং দিয়ে দিলাম।

আমার নতুন গন্তব্য ঠিক হওয়ার পর নতুন উদ্দীপনায় উজ্জীবিত হলাম। বিকেলে একা বার্লিন দেখতে বের হই। পিলুর বাসা থেকে মেট্রোতে সোজা “বার্লিন হুপ্বাহ্নহফ” ট্রেন স্টেশনে এসে নামি। হেঁটে ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটের ঠিক সামনে দিয়ে বিশাল চওড়া রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে পেলাম সেভিয়েত যুদ্ধের স্মৃতি সৌধ (Soviet War Memorial Tiergarten)। এই স্মৃতি সৌধ ছাড়াও ৫২০ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত জার্মানির বৃহত্তম ও বার্লিনের সবচেয়ে জনপ্রিয় অভ্যন্তরীণ শহুরে উদ্যান টিয়ারগার্টেনের (Tiergarten) মধ্যে রয়েছে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

টিয়ারগার্টেনের দক্ষিণ দিকের ফুটপাতের রাস্তা ধরে উদ্যানের গাছ গাছালি দেখতে দেখতে ভিক্টোরি কলামের (Victory Column) উদ্দেশ্যে হাঁটছি। নানান ধরণের গাছের ঘন জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে ভাস্কর্য চোখে পড়ছে। জঙ্গলের ভেতরে হাঁটার ও সাইকেল চালানোর আলাদা রাস্তাও আছে। হটাৎ লক্ষ্য করলাম বড় রাস্তায় বিশাল এক রাষ্ট্রীয় মোটর বহরের যাত্রা। ব্র্যান্ডেনবার্গ গেট অতিক্রম করে আসা এই বহর ভিক্টোরি কলামের সামনে দিয়ে জার্মানির রাষ্ট্রপতির কার্য্যালয় ও বাসভবনের দিকে প্রবেশ করছে। কে জানে হয়তো জার্মানির বর্তমান চ্যান্সেলর ড. অ্যাঞ্জেলা মার্কেল এই বহরেই আছেন।

হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়লাম টিয়ারগার্টেনের কেন্দ্রে ভিক্টোরি কলামের নিচে। ৭.২ মিটার উচ্চ স্তম্ভে নিচের বেদিতে চারটি ব্রোঞ্জের রিলিফ রয়েছে যাতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিজয়ের দৃশ্য চিত্রিত করা হয়েছে। অনেক দামি দামি উপকরণ দিয়ে তৈরী হয়েছে এই বিজয় স্তম্ভ। দীর্ঘ পথ হেঁটে আমি প্রায় ক্লান্ত। ততক্ষনে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। এরপর অনেক হাঁটাহাঁটির পর আবার এলাম জাদুঘর দ্বীপে (Museum Island)| ইচ্ছা ছিল ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ বিল্ডিং পুরাতন ন্যাশনাল গ্যালারিতে (The Alte Nationalgalerie) পেইন্টিং এবং ভাস্কর্যের কালেকশন দেখবো কিন্তু ততক্ষনে গ্যালারি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তাই ভেতরে ঢুকতে পারলামনা। বাইরে জাদুঘরের আশেপাশে চক্কর দিয়ে একটি উম্মুক্ত প্রদর্শনী পরিদর্শন করে সন্ধ্যায় নদী পাড় বরাবর হাঁটাতে হাঁটতে আবার হুপ্বাহ্নহফ ট্রেন স্টেশন হয়ে ফিরে আসি বাসায়।

২৪ নভেম্বর জার্মানিতে আমার শেষ দিন। দুপুরে খেয়ে দেয়ে বাসা থেকে বিদায় নিয়ে আমি আর পিলু দুই ভাই মেট্রোতে রওনা দিলাম বার্লিনের অন্য এক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শোনেফেল্ড Schönefeld Airport (SXF) -এর দিকে। ইতিমধ্যে আমরা একটি মেট্রো স্টেশনে নামলাম। পিলু এখানে বিদায় নিয়ে অন্য কাজে যাবে তাই আমাকে এমন একটি মেট্রোতে তুলে দিলো যা সরাসরি বিমানবন্দরে যাবে। ছোট ভাইকে বিদায় দিতে কষ্ট হচ্ছে ! এ ক’দিন বেশ আনন্দে কেটেছে দিনগুলো। মনমরা হয়ে জানালার পাশে জার্মানিকে শেষ বারের মতো দেখতে দেখতে কখনযে এয়ারপোর্টে আসে পৌঁছলাম টেরই পাইনি। দুপুর ১টায় রাইনএয়ার (Ryanair)-এ বার্সেলোনার উদ্দেশ্যে রওনা দিব। এয়ারপোর্টে বোর্ডিংপাস সংগ্রহের জন্য বুথে গিয়ে চমকে উঠলাম ! কাউন্টার থেকে জানালো অনলাইনে চেক-ইন না করার কারনে মাসুল গুনতে হবে ৫০ ইউরো। আঁতকে উঠলাম ! যেনো মাথায় বাজ পড়লো। সামান্য আলসেমির জন্য ৫ হাজার টাকা গচ্ছা ?

কাউন্টারের ভদ্রমহিলাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে অগত্য টাকা জমা দিয়ে ম্যানূয়ালি বোর্ডিং পাশ নিলাম। টিকেট কাটার সময় পিলু আগে ভাগে চেক-ইন করতে বলেছিলো আমিই আলসেমির জন্য না করেছিলাম । ভেবেছি আগে ভাগে এয়ারপোর্টে গিয়ে বোর্ডিং পাশটা নিয়ে নিবো। কিন্তু এখানে দেখি অন্য কাহিনী। উন্নত বিশ্বে সব ক্ষেত্রে পেপারলেস কর্মকান্ডকে উৎসাহিত করে। ওরা সত্যিকার অর্থে ডিজিটাল। নিজের বোকামির জন্য রাগ হচ্ছিল। একদিকে বার্লিনের মেঘে ঢাকা কুয়াশাচ্ছন্ন বৈরী আবহাওয়া অন্যদিকে প্রিয়জনদের ছেড়ে যাওয়ার বেদনা। তার উপর এই অনাখাংকিত মাসুলের জন্য মনটা একেবারে তীক্ততায় বিষন্ন হয়ে জার্মানি ছাড়তে হলো –##জিয়া উদ্দিন,চৌধুরী’র ফেসবুক দেয়াল থেকে নেয়া ।।